सामग्री पर जाएँ
सर्वकोश
संग्रह पर लौटें

सङ्गीतपारिजात (अहोबल - वीणा के तारों पर शुद्ध व विकृत स्वर-स्थान निर्धारण का ऐतिहासिक ग्रन्थ)

Sangitaparijata of Ahobala on Indian Musicology

पण्डित अहोबल (टीकाकार: कलानिधि कलिन्द) द्वारा

DevanagariHindipublished358 पृष्ठ

সঙ্গীত পারিজাত ২৩৩
সাম-বেদাদিদং শাস্ত্রং সংজহার পিতামহঃ।
নারদেন তু তৎপ্রাপ্য বীণয়া বাদনং কৃতম্ ॥ ৫০১
গণতালস্বরৈঃ কৃত্বা মাত্রাভিশ্চ সুশোভিতম।
তচ্চ গীতং পৃথিব্যাঞ্চ নারদেন প্রতিষ্ঠিতম্ ॥ ৫০২
তেন গীতেন হৃষ্যন্তে দেবাশ্চ মুনয়ো নরাঃ
তস্য গীতস্য মাহাত্ম্যং বক্তুং কো বা ক্ষমো ভবেৎ ॥ ৫০৩
এই সঙ্গীত-শাস্ত্র লোকপিতামহ ব্রহ্মা সামবেদ থেকে সংকলন করেন।
তদনন্তর, নারদগণ এই সঙ্গীত-শাস্ত্র ব্রহ্মার নিকট থেকে শিক্ষা করে পৃথিবীতে
প্রচলিত করেন বীণাযন্ত্রের সাহায্যে। নারদগণ কর্তৃক তাল, স্বর ও মাত্রাদির
দ্বারা সুশোভিত এই সঙ্গীত শ্রবণ করে, দেবতা, মুনি ও সাধারণ মানুষ—সকলেই
ইষ্টলাভ করে থাকেন। সুতরাং, কার সাধ্য এ হেন সঙ্গীতের মাহাত্ম্য বর্ণনা
করে। ৫০১-৫০৩
টিপ্পনী : পূর্ব্ব কোনো টিপ্পনীতে আমরা নাট্য-গান্ধর্ব্ব পুর্ব্ববর্তী গান্ধর্ব
উৎপত্তি প্রসঙ্গে যা বলেছি তার সঙ্গে অহোবলের আলোচ্য মাহাত্ম্য বর্ণনার কিছু
সামঞ্জস্য আছে। মনে হয়, এই আখ্যানটি গৃহীত হয়েছে পুরাণ থেকে—
প্রাতিশাখ্য থেকে নয়। পুরাণে এই ধরনের গল্প আরও আছে। যেমন, নারদ
একবার বিকলাঙ্গ রাগ-রাগিণী পুনর্গঠনে সচেষ্ট হয়েছিলেন। কিন্তু, প্রচেষ্টাটা
গান্ধর্ব অথবা দেশী কোন পদ্ধতির সঙ্গীতের জন্য হয়েছিল; রাগ অর্থে তখন
জাতি বোঝাত কি না, কিংবা "সঙ্গীত" নামক কথাটার উৎপত্তি আদৌ
হয়েছিল কি না, সে সম্পর্কে পুরাণ থেকে কিছুই জানবার উপায় নেই, কারণ,
পুরাণ সঙ্গীত-গ্রন্থ নয়। নারদ যে একটা উপাধিমাত্র এবং নারদ-মুনি, নারদ-
ঋষি, দেবর্ষি নারদ, শিক্ষাকার নারদ, সংহিতাকার নারদ এবং আরও পরবর্তী
কালের জনকয়েক নারদ যে অভিন্ন নন ভিন্ন সে সংবাদ পরিবেশন করবার
দায়িত্ব পুরাণকারগণ গ্রহণ করেন নি। ফলে, সঙ্গীত কথাটার মতো নারদ
ভরতরাও সব একাকার হয়ে গিয়েছেন। ৫০১-৫০৩
গীতেঽস্মিন্ পঞ্চনামানি প্রসিদ্ধান্যুদিতানি হি।
রূপঞ্চ রূপকং বস্তু প্রবন্ধো গেয়মিত্যপি ॥ ৫০৪
এই নিবন্ধ গীত পাঁচটি প্রসিদ্ধ নামে অভিহিত হয়ে থাকে। যথা, ১। রূপ,
২। রূপক, ৩। বস্তু, ৪। প্রবন্ধ ও ৫। গেয়।
১৬

২০৪ সঙ্গীত পারিজাত
টিপ্পনী : পারিজাতকার নিবন্ধ সঙ্গীতের সংখ্যা নির্দেশ করেছেন, পাঁচ।
কিন্তু, রত্নাকর বলছেন, নিবন্ধ গীতের সংখ্যা হচ্ছে তিন। যথা, রূপক, বস্তু ও
প্রবন্ধ। তাহলে, রূপ এবং গেয় নামক অতিরিক্ত দুটি নিবন্ধ-গীতিকে অহোবল
পেলেন কোথায়? তাঁর সময় কি রূপ এবং গেয় নামক আরও দুটি নিবন্ধ-
গীতি-পদ্ধতি অতিরিক্ত হিসাবে প্রচলিত হয়েছিল?
দামোদর বিরচিত সঙ্গীত-দর্পণ (১৬১০ খৃঃ অঃ) একখানি প্রামাণ্য গ্রন্থ।
দামোদরও তাঁর প্রবন্ধাধ্যায়ের চতুর্থ সংখ্যক সূত্রে বলেছেন :
গীতঞ্চরূপকংবস্তু প্রবন্ধোঙ্গেয়মিত্যপি।
গীতং পঞ্চবিধাপ্রোক্তা গ্রন্থেস্মিন্পূর্বসূরিভিঃ॥
এখানেও নিবন্ধ গীতির সংখ্যা পাঁচ এবং “গীত” কথাটাকেই দুবার ব্যবহার
করেছেন দামোদর দু’ রকম অর্থে। ফলে, অহোবলের তুলনায় এঁর বক্তব্য-
বিষয়ট। আরও দুর্বোধ্য হয়ে উঠেছে।
দামোদরের অস্তিত্বকালটা অহোবলের মতো রহস্যারুত নয়। অর্থাৎ
দামোদরের সম-সাময়িককালে এ দেশে কোন কোন পদ্ধতির সঙ্গীত প্রচলিত
ছিল তার প্রমাণ পাওয়া কঠিন নয়। এই আমলে প্রবন্ধ-গীতি-পদ্ধতি বিলুপ্ত
হয়ে গিয়েছিল এবং প্রচলিত ছিল ধ্রুপদ্ পদ্ধতি, দরবারী সঙ্গীত রূপে।
অপরপক্ষে, আমীর খসরো প্রবর্তিত নক্শগুল তথা কাওয়াল পদ্ধতি ও
পরবর্তী কালে যা খেয়াল পদ্ধতিরূপে প্রতিষ্ঠালাভ করেছিল, সেই পদ্ধতির আদিম
রূপটিও সঙ্গীত-রসিক সমাজে প্রচলিত ছিল অ-দরবারী পদ্ধতিরূপে। এখন
আলোচ্য ক্ষেত্রে আমাদের বিবেচ্য—সঙ্গীত দর্পণ প্রণেতা এই দরবারী ও
অ-দরবারী পদ্ধতি দুটিকে দুটি নূতন গীতি-পদ্ধতির মর্যাদা দিয়ে গ্রন্থভুক্ত
করেছিলেন কি না। কিংবা—
দামোদর তার আলোচ্য সূত্রের প্রারম্ভিক “গীত” কথাটিকে গান্ধর্ব অর্থেই
স্থাপন করেছিলেন এবং পরবর্তী “গীত” কথাটিকে “গান্ধর্ব এবং গান”-এর
“গান”—অর্থাৎ দেশী পদ্ধতির গীত অর্থেই সংকলন করেছিলেন কি না সেটাও
বিচার্য। বিচার্য, নিবন্ধ পদ্ধতির প্রবন্ধ সঙ্গীতের পরিচয় দিতে গিয়ে, কোন
প্রাচীন গ্রন্থকারের পক্ষে, দেশী পদ্ধতির সঙ্গীতকে পৃথক সংজ্ঞায় ভূষিত করবার
মতো বুদ্ধি-বিবেচনা থাকা সম্ভবপর কি না।
অহোবলের উদ্ধৃত অতিরিক্ত সংজ্ঞা দুটি দামোদরের তুলনায় কথঞ্চিৎ

সরল। অর্থাৎ একই সঙ্গে দু’ রকম “গীতির” উল্লেখ না করে ইনি রূপ ও গেয়
কথা দুটি ব্যবহার করেছেন। কিন্তু, আসলে কী বোঝাতে চেয়েছেন সেটা
দুর্বোধ্য। দেখা যায়, তানসেনের পরবর্তী যুগে অনেকে রূপক আলাপকে
“রূপ-আলাপ” নামেও অভিহিত করেছেন। কিন্তু, অহোবলের “রূপ” যে ওই
ধরনের কোন অপভ্রংশ সংজ্ঞার উদ্ধৃতি এমন অনুমান করবার উপায় নেই।
কারণ, পারিজাতের মধ্যে রূপ ও রূপক নামক দুটি সংজ্ঞাই স্বনামে অস্তিত্ব
রক্ষা করছে। “গেয়” সম্বন্ধেও অনুরূপ সমস্যার উদ্ভব হয়। এই “গেয়”
সংজ্ঞাটাকে প্রাচীন গান্ধর্বের গেয়-রূপেও গ্রহণ করা যেতে পারে অথবা কোন
অর্বাচীন গীতি-পদ্ধতির গেয়-রূপেও কল্পনা করা যেতে পারে। এই প্রসঙ্গে
উল্লেখযোগ্য যে সঙ্গীত পারিজাত উত্তর-ভারতীয় সঙ্গীত গ্রন্থ হলেও,
কর্ণাটক তথা দক্ষিণ-ভারতীয় সঙ্গীত বিজ্ঞানের ওপর অহোবলের অধিকার
যে অল্প ছিল না তার অসংখ্য প্রমাণ পারিজাতের মধ্যেই আছে। সুতরাং,
“রূপ” ও “গেয়” অর্থে তিনি কোন স্বল্পকাল প্রচলিত কর্ণাটিক প্রবন্ধদ্বয়ের
উদাহরণ স্থাপন করে গেছেন—এমনও হতে পারে। হতে পারে, এই কর্ণাটিক্
পদ্ধতি দুটি হিন্দুস্তানেও প্রচলিত হয়েছিল কিছুকালের জন্যে; পরে বিলুপ্ত
হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু আসলে যে কী হয়েছিল, তা আমাদের পক্ষে জানা
সম্ভবপর হচ্ছে না। ৫০৪
পঞ্চধা কথিতো ভাগো গীতেঽস্মিন্ পূর্বসূরিভিঃ।
আদ্য উদ্গ্রাহকো জ্ঞেয়ো মেলাপকস্তদুত্তরঃ॥ ৫০৫
তৃতীয়ো ধ্রুবসংজ্ঞঃ স্যাদন্তরঃ স্যাচ্চতুর্থকঃ।
আভোগঃ পঞ্চমোভাগঃ পঞ্চানাং লক্ষণং ব্রুবে॥ ৫০৬
প্রাচীন সঙ্গীতাচার্যদের মতানুযায়ী, এই গীতি-পদ্ধতি পাঁচটি ভাগে বিভক্ত।
এর প্রথম ভাগের নাম, উদ্গ্রাহ। দ্বিতীয় ভাগের নাম মেলাপক। তৃতীয়
ভাগের নাম ধ্রুব। চতুর্থ ভাগের নাম অন্তর। এবং পঞ্চম ভাগের নাম
আভোগ। অতঃপর এই বিভাগ পাঁচটির লক্ষণাদি বলা যাচ্ছে। ৫০৫-৫০৬
আদাবুদ্‌গৃহ্যতে গীতং তস্মাদুদ্‌গ্রাহ সংজ্ঞকঃ।
মেলাপকঃ স বিজ্ঞেয়ো ধ্রুবকোদ্গ্রাহ মেলনাৎ॥ ৫০৭
ধ্রুবত্বাদ্ ধ্রুব-সংজ্ঞোঽয়ং ধ্রুবা ভোগান্তরোঽন্তরঃ।
আভোগো গীত পূর্ণার্থমিতি ভাগাঃ প্রকীর্তিতাঃ॥ ৫০৮

২৬৬ সঙ্গীত পারিজাত
১। যে ভাগটিকে অবলম্বন করে গান আরম্ভ করা হয়, সেই প্রথম ভাগটির
নাম উদগ্রাহ।
২। যে ভাগটি মধ্যবর্তী হয়ে প্রথম ভাগটির সঙ্গে তৃতীয় ভাগটিকে মিলিয়ে
দেয়, সেই দ্বিতীয় ভাগটির নাম মেলাপক।
৩। যে ভাগটি প্রত্যেক গীতের মধ্যেই অপরিহার্যরূপে বিরাজ করে, সেই
তৃতীয় ভাগটির নাম ধ্রুব।
৪। ধ্রুবের পরবর্তী চতুর্থ ভাগটির নাম অন্তর।
৫। গীতের সমাপ্তির ক্ষেত্রে যে ভাগটি প্রযোজিত হয় সেই পঞ্চম বা
শেষ ভাগটির নাম আভোগ। —৫০৭-৫০৮।
টিপ্পনী : আলোচ্য সূত্রদুটির মধ্যে পারিজাতকার গীত কথাটিকে ব্যবহার
করেছেন। গীত অর্থে এখানে প্রবন্ধ গীত বোঝাচ্ছে।
প্রবন্ধ গীতির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য পাঁচটি বিভাগ—সাঙ্গীতিক ভাষায় যার নাম
ধাতু—সেই পাঁচটি ধাতুর সংক্ষিপ্ত পরিচয়মাত্র আলোচ্য সূত্রদুটির মধ্যে
পরিবেশিত হয়েছে। কিন্তু, এই পঞ্চধাতুর পরিচয়কে পঞ্চ ধাতুর যথারূপ স্থাপনা
হিসাবে গ্রহণ করলে অত্যন্ত ভুল করা হবে। বর্তমানে, ধ্রুপদ পদ্ধতির গানের
মধ্যে সাধারণতঃ আমরা যে চারটি ধাতুর পরিচয় পাই, সেই ধাতু চারটি
যথাক্রমে, স্থায়ী, অন্তরা, সঞ্চারী ও আভোগরূপে ধ্রুপদ গানের মধ্যে পরের পর
অস্তিত্ব বজায় রাখে। কিন্তু, প্রবন্ধ গীতির ক্ষেত্রে, উদগ্রাহ, মেলাপক, ধ্রুব,
অন্তর ও আভোগ নামক পাঁচটি ধাতু—ধ্রুপদ গানের মতো—পরের পর যে
স্থাপিত হতোই, এমন কথা মনে করলে অত্যন্ত ভুল করা হবে। এখানে
বিশেষভাবেই স্মরণ রাখতে হবে, বর্তমানের ধ্রুপদ গানের মতো সেকালের
প্রবন্ধ গানের মধ্যেও চারটির বেশী ধাতু থাকতো না।
কিন্তু তাই যদি হবে, তাহলে প্রবন্ধ গীতের পরিচয় প্রসঙ্গে গ্রন্থকার চারটির
পরিবর্তে পাঁচটি ধাতুর নামোল্লেখ করলেন কেন?
এ প্রশ্নের উত্তর পারিজাতে নেই। কিন্তু, রত্নাকরে আছে। রত্নাকরের
প্রবন্ধাধ্যায়ের ৯১০ সূত্রে গ্রন্থকার বলেছেন—"ধ্রুবাভোগান্তরেজাতো
ধাতুস্তোন্তস্ত্বভাবিধঃ স তু সালগসূড়স্থ রূপকেম্বেবদৃশ্যতে।” অর্থাৎ, কেবলমাত্র
সালগ-সূড জাতীয় প্রবন্ধগুলির রূপান্তরিত গীতি-পদ্ধতির মধ্যে, ধ্রুব ও
আভোগের মধ্যবর্তী হিসাবে 'অন্তর' ধাতুটিকে পাওয়া যায়।—
এখানে লক্ষ্য করবার বিষয় প্রাচীন সঙ্গীত গ্রন্থাদির মধ্যে যে অসংখ্য

সঙ্গীত পারিজাত ২৩৭
রকমের প্রবন্ধ গীতির পরিচয় লিপিবদ্ধ আছে, তার মধ্যে কেবলমাত্র সালগ-সূড
জাতীয় প্রবন্ধ গীতির একটি রূপান্তরিত প্রকার ব্যতীত অন্য কোন রকম প্রবন্ধ
গীতির মধ্যে 'অন্তর' নামক ধাতুটির ব্যবহার হতো না। কিন্তু, আলোচ্য
বক্তব্যের তাৎপর্য্য এ-ও নয় যে, সালগ্-সূড জাতীয় এই রূপান্তরিত প্রবন্ধ
গীতিগুলি পাঁচটি ধাতুর মাধ্যমে গীত হতো। এখানে আমাদের স্মরণ রাখতে
হবে, যে কোন জাতের প্রবন্ধ গীতিই হোক না কেন, কোন প্রবন্ধই কখনও
পাঁচটি ধাতুযুক্ত হয়ে গীত হতো না। বর্তমানে প্রচলিত ধ্রুপদ, ধামার, সাদ্‌রা,
খেয়াল প্রভৃতি গানের ধাতুর মতো, সেকালের প্রবন্ধ গীতিগুলিও, জাতি ও
প্রকারভেদে,—দ্বিধাতুযুক্ত, ত্রিধাতুযুক্ত ও চার ধাতুযুক্ত হতো, কিন্তু, কোন
অজুহাতেই পাঁচ ধাতুযুক্ত হতে পারতো না। সুতরাং বলাই বাহুল্য, আলোচ্য
সালগ্-সূড জাতীয় রূপান্তরিত প্রবন্ধগুলির ক্ষেত্রেও চারটির অধিক পাঁচটি
ধাতুযুক্ত করবার উপায় ছিল না। কিন্তু তাই যদি হয়, তাহলে অহোবল,
শার্ঙ্গদেব প্রমুখ গ্রন্থকারেরা 'অন্তর' ধাতুটির উল্লেখ করলেন কেন? কেনই বা
বিষয়বস্তুর পরিবেশনটা এমনভাবে করলেন, যার ফলে, সাধারণ বুদ্ধিতে, পাঁচটি
ধাতুযুক্ত প্রবন্ধ গীতির অস্তিত্বটাই মনকে আচ্ছন্ন করে?
এ প্রশ্নের উত্তর দিয়ে গেছেন, রত্নাকরের অন্যতম টীকাকার কল্লিনাথ। তিনি
বলছেন, “অয়মন্তরো লৌকিকরূপান্তর ইত্যাচ্যতে।” অর্থাৎ, আলোচ্য সালগ-
সূড জাতির রূপান্তরিত প্রবন্ধ গীতিগুলির মধ্যে যে “অন্তর” ধাতুটিকে পাওয়া
যায়, সে “অন্তর” ধাতু হিসাবে নিরঙ্কুশ নয়, ধ্রুব ধাতুরই লৌকিক রূপান্তর
মাত্র। এবং, এই “অন্তর” কে 'ধ্রুবখণ্ড' হিসাবেই গ্রাহ্য করা কর্তব্য। অর্থাৎ—
আলোচ্য প্রবন্ধ গীতিগুলির ক্ষেত্রে “অন্তর” নামক ধাতুটি, অন্যান্য ধাতুর
মতো, ধাতু হিসাবে গণ্য নয়। পরন্তু, সব সালগ-সূড জাতীয় প্রবন্ধর মধ্যেই
যে “অন্তর”কে পাওয়া যাবে তা-ও নয়। অর্থাৎ, কোন কোন সালগ-সূড
জাতীয় প্রবন্ধর রূপান্তরিত গীতি-পদ্ধতির ক্ষেত্রে “অন্তর”কে পাওয়া যায়। এবং,
যে ক্ষেত্রে পাওয়া যায়, সে ক্ষেত্রে গানের মধ্যে থেকে ধাতু হিসাবে “ধ্রুব ধাতুর”
উল্লেখটা পরিত্যক্ত হয়, কারণ, “অন্তর” এখানে “ধ্রুবখণ্ড” হিসাবেই গ্রাহ্য হচ্ছে।
অপরপক্ষে, ধ্রুব ধাতুর উল্লেখ বজায় রেখে যদি আবার “অন্তর”কে ধাতু হিসাবে
উল্লেখ করতে হয়, তাহলে, আলোচ্য প্রবন্ধ গীতির ধাতু সংখ্যাটা হয়ে যায়
চারের পরিবর্তে পাঁচ। পাঁচ ধাতুযুক্ত গীতির অস্তিত্ব, সাঙ্গীতিক ব্যাভিচারেরই
নামান্তর মাত্র।

এখানে ‘ধ্রুবখণ্ডর’ তাৎপর্যটাও প্রণিধানযোগ্য। ধ্রুবখণ্ড অর্থে এখানে
ধ্রুবধাতুর খণ্ড বা অংশ বিশেষকেই বোঝাচ্ছে। ব্যাপারটা হচ্ছে এই যে, প্রাচীন
প্রবন্ধ গীতির অন্তর্গত উদগ্রাহ, ধ্রুব ও আভোগ নামক ধাতু তিনটি, সাধারণতঃ,
দুটি ভাগে বিভক্ত থাকতো। আলোচ্য ক্ষেত্রে, ধ্রুব ধাতুর প্রথম অংশটিকে
ধ্রুব-ধাতুর অনুরূপ রেখে, দ্বিতীয় অংশটিকে রূপান্তরিত করা হতো কিঞ্চিৎ
“উচ্চস্বর” যুক্ত করে। ধ্রুব ধাতুর এই রূপান্তর সম্বন্ধে রত্নাকরের অন্যতম
টীকাকার সিংহ ভূপাল বলে গেছেন, “কিঞ্চিদ্দুচ্চং খণ্ডং অন্তরাখ্যং কর্তব্যম্”।
প্রসঙ্গ ক্রমে এখানে উল্লেখযোগ্য যে, মূল রত্নাকরের “রূপকেষু” কথাটির
ওপর নির্ভর করে, ‘অন্তরার’ অস্তিত্বটাকে সালগ-সূড় জাতীয় রূপক প্রবন্ধর
ক্ষেত্রেও গ্রাহ্য করা যেতে পারে। কারণ, রূপক প্রবন্ধও রূপান্তরিত গীতি
পদ্ধতিরই প্রমাণ বহন করে। কিন্তু, আমাদের মনে হয়, আলোচ্য সূত্রের
ব্যাখ্যায় কল্লিনাথ যে “লৌকিক রূপান্তর” কথাটি ব্যবহার করেছেন সেটি
সমধিক গুরুত্বপূর্ণ। মনে হয়, রত্নাকরের “রূপকেষু” আলোচ্য ক্ষেত্রে রূপক
প্রবন্ধ অর্থে ব্যবহৃত হয় নি, সালগ-সূড় প্রবন্ধর একটি বিশিষ্ট রূপ তথা
রূপান্তরিত গীতি-পদ্ধতি অর্থেই উল্লিখিত হয়েছে।
পূর্বেই বলেছি, যে কোন জাতের প্রবন্ধ গানই হোক না কেন, কোন গানের
মধ্যেই চারটির বেশী ধাতু ব্যবহারের স্বাধীনতা ছিল না। অপরপক্ষে, অনেক
প্রবন্ধ গান আবার দ্বি-ধাতু ও ত্রি-ধাতুযুক্তও ছিল। এই দ্বিধাতু ও ত্রিধাতুযুক্ত
প্রবন্ধগুলির ধাতু স্থাপনার বিধি-নিদেশ সম্বন্ধে যথাযথ আলোচনার অবকাশ
আপাততঃ আমাদের নেই, কারণ, ব্যাপারটা ছিল যেমন বৈচিত্র্যপূর্ণ তেমনি
ব্যাপক। সেই জন্য, এখানে অতি-সংক্ষেপে কেবল এইটুকুই বলা যেতে পারে
যে, যে কোন প্রবন্ধ গানই হোক না কেন, তার মধ্যে ধ্রুব ধাতুর প্রতিপাদ্য
ছিল অপরিহার্য। বর্তমানে, স্থায়ী ধাতুর অস্তিত্ব ব্যতীত যেমন কোন রকম
গান-বাজনার অস্তিত্ব কল্পনাও করা যায় না, তেমনি দ্বিধাতু, ত্রিধাতু বা
চার ধাতুযুক্ত যে কোন প্রবন্ধ গীতির ক্ষেত্রেও ধ্রুব ছিল অপরিহার্য। কিন্তু,
ধ্রুব ধাতুর প্রতিপাদ্য বিষয়টা যে সব প্রবন্ধর মধ্যে “ধ্রুব” ধাতু নামযুক্ত হয়েই
অস্তিত্ব বজায় রাখতো তা নয়—ক্ষেত্র বিশেষে উদগ্রাহর মধ্যেও অন্তর্নিহিত
থাকতে পারতো। এই অন্তর্নিহিত থাকার ব্যবস্থাটা বিশেষভাবে প্রচলন ছিল
দ্বিধাতু ও ত্রিধাতুযুক্ত প্রবন্ধ গানগুলির ক্ষেত্রে। অধিকন্তু, দ্বিধাতু ও ত্রিধাতুযুক্ত
অনেক প্রবন্ধ গানের মধ্যে আবার “আভোগ আচরণে”রও অবকাশ থাকতো।

[Page-Header: সঙ্গীত পারিজাত ২৩৯]

অর্থাৎ—নির্দিষ্ট ব্যবস্থা নয়, অবকাশ থাকতো মাত্র। ফলে, আভোগ ধাতুর
প্রতিপাদ্যকে গ্রহণ করেও অনেক দ্বিধাতু ও ত্রিধাতুযুক্ত গান ত্রিধাতু ও
চার ধাতুর গান হিসাবে গ্রাহ্য হতো না—দ্বিধাতু ও ত্রিধাতুযুক্ত গান হিসাবেই
পরিচিত থাকতো। কিন্তু, সব গানের মধ্যেই ধ্রুব ধাতুর অস্তিত্ব তথা প্রতিপাদ্য
ছিল বর্তমানের স্থায়ী ধাতুর মতো অপরিহার্য। অথচ—
ধাতু স্থাপনার দিক দিয়ে দেখতে গেলে, ধ্রুবকে প্রবন্ধ গানের মধ্যে প্রথম
ধাতু হিসাবে পাওয়া যায় না, তৃতীয় ধাতুরূপে পাওয়া যায়। এখানে প্রশ্ন
উঠতে পারে সেকালের ধ্রুব ও একালের স্থায়ী যদি ধাতু হিসাবে অভিন্নধর্মী হয়
তাহলে, ধ্রুবর পূর্ববর্তী উদগ্রাহ ও মেলাপক ধাতুদুটিকে কোন্ উদ্দেশ্য সাধনের
জন্য ব্যবহার করা হতো?
মেলাপক কথাটির অর্থ খুব অস্পষ্ট নয়। এই ধাতুটি পূর্ববর্তী উদগ্রাহকে
পরবর্তী ধ্রুবর সঙ্গে মিলিয়ে দেবার জন্য সেতুবন্ধর কাজ করতো। কিন্তু,
উদগ্রাহর ব্যাপারটা কী হতে পারে?
বর্তমানে, গান ধরবার পূর্বে, অর্থাৎ গানের স্থায়ির প্রকাশের পূর্বে, আলাপ
করবার একটা রীতি প্রচলিত আছে। কিন্তু, উদগ্রাহকে আলাপাংশ হিসাবেও
গণ্য করা চলে না যেহেতু, প্রবন্ধ গীতির আমলেও অনেক রকমের আলাপ
ব্যাপ্তি প্রচলিত ছিল। তাহলে, উদগ্রাহর প্রতিপাদ্য ছিল কী?
প্রাচীন উদগ্রাহ ধাতুর প্রতিপাদ্য যা ছিল তা বর্তমানের স্থায়ী ধাতুটির প্রায়
বিপরীত ধর্মী। উদগ্রাহর প্রকাশ-পরিবেশনটা ছিল কখনও নিরঙ্কুশ স্বরযুক্ত,
কখনও অর্থবোধক বাণীযুক্ত, কখনও, একাধারে দ্রুত-মধ্য-বিলম্বিত গতির
ছন্দ-বৈচিত্র্যযুক্ত, কখনও বা স-চমক স-গমক দ্রুত পরিবর্তনশীল সাঙ্গীতিক
ক্রিয়াযুক্ত। অর্থাৎ, উদগ্রাহের প্রতিপাদ্যটা ছিল, কতকটা, প্রতিমার প্রাণ-
প্রতিষ্ঠার পূর্বে যথোচিত নিষ্ঠার সঙ্গে আনুষঙ্গিক ব্যবস্থাদি অবলম্বনের তৎপরতার
মতো। আজকের দিনে, ধ্রুবপদাঙ্গ, খেয়াল-অঙ্গ গীতি পদ্ধতির মধ্যে প্রাচীন
উদগ্রাহ ধাতুর প্রতিপাদ্যের মতো কোন কিছুরই প্রমাণ মেলে না। কিন্তু, আজও
তবলা পাখোয়াজের লহরা বাজানোর সময়, তার 'মুখ-চাল' প্রভৃতি প্রারম্ভিক
ক্রিয়াকাণ্ডের মধ্যে প্রাচীন উদগ্রাহের প্রতিপাদ্য কথঞ্চিৎ পরিমাণে প্রকট হয়ে
ওঠে। উচ্চাঙ্গ নৃত্যকলার 'উঠান সালামী' নামক অপরিহার্য ক্রিয়াকাণ্ডটিও
প্রাচীন উদগ্রাহর প্রতিপাদ্য রীতি ব্যতীত আর কিছুই নয়। অপরপক্ষে,
যাঁরা বাংলাদেশের উচ্চাঙ্গ কীর্তন গানের সঙ্গে পরিচিত, তাঁরা অবশ্যই

২৪০সঙ্গীত পারিজাত

“আপস্তন” নামক প্রারম্ভিক সাঙ্গীতিক ক্রিয়াকাণ্ডটির সঙ্গে সুপরিচিত।
“আপস্তন” ও উদ্‌গ্রাহ অভিন্নধর্মী। অধিকন্তু, ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রদেশে
আজও এমন অনেক লোক-সঙ্গীত ও লোক-নৃত্য প্রচলিত আছে, যার প্রারম্ভিক
ক্রিয়াদির মধ্যে প্রাচীন উদ্‌গ্রাহ ধাতুর প্রতিপাদ্যকে খুঁজে পাওয়া যায়।
বলা বাহুল্য, প্রবন্ধ গীতি পদ্ধতি লুপ্ত হয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার উদ্‌গ্রাহ
ধাতুটিও ধাত হিসাবে লুপ্ত হয়ে গেছে। কিন্তু, অন্যান্য ধাতুগুলি আজও বেঁচে
আছে ধ্রুপদাঙ্গ ও খেয়াল-অঙ্গ গান বাজনার মধ্যে। যেমন—
প্রাচীন উদ্‌গ্রাহের স্থান গ্রহণ করেছে স্থায়ী। এই স্থায়ী ধাতুটি, প্রাচীন
ধ্রুব ধাতুর মতো, বর্ত্তমানে প্রচলিত সব রকম গান-বাজনার মধ্যেই প্রথম ধাতু
হিসাবে বর্ত্তমান থাকে। এখানে স্মরণ রাখা দরকার, এই স্থায়ীর সঙ্গে স্থায়ী
বর্ণের কোন সম্পর্ক নেই। রত্নাকর বর্ণিত “রাগস্থায়াবয়বং স্থায়”—অর্থাৎ “স্থায়”-
এর মধ্যেই রাগের স্বরূপ বর্ত্তমান থাকে— এই সত্যটিকেই গ্রহণ করেছিলেন
ধ্রুপদ গীতি পদ্ধতির স্রষ্টাগণ। উদ্‌গ্রাহ বর্ত্তমানে বিলুপ্ত তথা অস্বীকৃত।
প্রাচীন মেলাপক ধাতুটি পরবর্তী কালে নামান্তরিত হয়েছে “সানঝা-মানঝা”
বা “মানঝা” নামে। প্রাচীন মেলাপকের মতো পরবর্তী কালের মানঝাও দ্বিতীয়
ধাতুরূপে চিহ্নিত। কিন্তু, এই মানঝার ব্যবহার, বর্তমানে, কোন রকম কণ্ঠ
সঙ্গীতের মধ্যেই প্রযোজ্য হয় না, কেবলমাত্র সেতার, শরদ প্রভৃতি যন্ত্রের
মাধ্যমে পরিবেশিত খেয়াল-অঙ্গ গৎ-এর মধ্যেই মানঝাকে ধাতু হিসাবে ব্যবহৃত
হতে দেখা যায়। কিন্তু সব গৎ-এর মধ্যেই যে মানঝার অস্তিত্ব থাকে তা-ও
নয়—কোন কোন গৎ-এর মধ্যে থাকে। অর্থাৎ, প্রাচীন প্রথম ধাতু উদ্‌গ্রাহের
মতো পরবর্তী কালের প্রথম ধাতু স্থায়ীও মূলতঃ দুটি অংশে বিভক্ত। কণ্ঠ
সঙ্গীতের ক্ষেত্রে মানঝাকে বিলুপ্ত করা হয়েছে স্থায়ীর দ্বিতীয় অংশের মধ্যে।
কিন্তু, যন্ত্র সঙ্গীতের মাধ্যমে খেয়ালাঙ্গ বাজনা পরিবেশন কবার ক্ষেত্রে—কোন
কোন গৎ এর স্থায়ী ধাতুর দ্বিতীয় অংশটিকে মানঝা নামে চিহ্নিত করা হয়ে
থাকে। বলা বাহুল্য, প্রাচীন মেলাপক ধাতুটি নামান্তরিত হয়েও আজও
‘ধাতুনাম’ হিসাবে অস্তিত্ব বজায় রেখেছে খেয়ালাঙ্গ পদ্ধতির যন্ত্র-সঙ্গীতের মধ্যে।
প্রাচীন ধ্রুব ধাতুটিও, প্রাচীন উদ্‌গ্রাহ ধাতুর মতো বর্তমানে বিলুপ্ত।
কিন্তু, ধাতুনাম হিসাবে ধ্রুবর অস্তিত্ব বিলুপ্ত হলেও তার প্রতিপাদ্য বিষয়সমূহ
অস্বীকৃত নয়। বর্তমানের স্থায়ী ধাতুটির প্রতিপাদ্য প্রাচীন ধ্রুবেরই অনুরূপ।
পার্থক্য কেবল এই যে, প্রাচীন ধ্রুব ছিল প্রবন্ধ গীতি-পদ্ধতির তৃতীয় ধাতু

সঙ্গীত পারিজাত
২৪১

বর্তমানের স্থায়ী হচ্ছে ধ্রুপদ গীতি পদ্ধতির প্রথম ধাতু। এখানে, স্বাভাবিক
ভাবেই একটা প্রশ্ন উঠতে পারে—ধ্রুপদাঙ্গ পদ্ধতির মধ্যে, ধাতু নাম হিসাবে
ধ্রুবর নামটি পরিত্যক্ত হলো কেন।
ইতিপূর্বে, অন্তর তথা ধ্রুবখণ্ডর আলোচনা প্রসঙ্গে এ সম্বন্ধে আমরা কিছু
বলেছি। বলেছি, রত্নাকরের প্রবন্ধাধ্যায়ের প্রারম্ভে “অন্তর” ধাতুর প্রয়োগ
বৈশিষ্ট্য সম্বন্ধে সুস্পষ্ট নির্দেশ আছে। সেই সুস্পষ্ট নির্দেশ আবার সুস্পষ্ট
উদাহরণের মাধ্যমেও চিহ্নিত হয়েছে প্রবন্ধাধ্যায়ের শেষের দিকে। শার্ঙ্গদেব
এখানে সালগ-সূড় প্রবন্ধ-গীতির পরিচয় দান প্রসঙ্গে যে সাতটি প্রবন্ধ-গীতির
উদাহরণ স্থাপনা করেছেন, তার প্রথমটি হচ্ছে ধ্রুব প্রবন্ধ।
আলোচ্য ক্ষেত্রে ধ্রুব প্রবন্ধ অবশ্য মূল রত্নাকরের মধ্যে “রূপান্তরিত সালগ-
সূড়” হিসাবে চিহ্নিত হয়নি, কিন্তু, 'অন্তর' ধাতুর পরিচিতিটাকে গ্রহণ
করেছে। এর টীকাকার কল্লিনাথ আলোচ্য ক্ষেত্রেই 'অন্তর' তথা ধ্রুবখণ্ডের
বার্তাটি সুস্পষ্টভাবে প্রাঞ্জল করেছেন। অর্থাৎ, যে ধ্রুব প্রবন্ধকে আমরা এখানে
বিশুদ্ধ ধ্রুব প্রবন্ধ হয়তো সাঙ্গীতিক গীতি-পদ্ধতির মাধ্যমে পরিবেশিত হতো
না বিবেচনা হতো, কিন্তু সালগ-সূড় জাতীয় প্রবন্ধর অন্যতম ছিল। এবং তার
মধ্যে “অন্তর” ধাতুর অস্তিত্ব থাকার কারণে, ধাতু নাম হিসাবে ধ্রুবর নামটি
যুক্ত হলো না।
ধ্রুব-ধাতুহীন এই ধ্রুব তখন পর্যায়-ভুক্ত ছিল ষোল রকম এবং তার মধ্যে
উদগ্রাহ ধাতুরও অস্তিত্ব ছিল। কিন্তু যা ছিল কল্লিনাথের (১৪৫৬-১৪৭৭ খৃঃ অঃ)
আমলে, তা হয়তো ক্ষুণ্ণ হয়ে এসেছিল বা বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল গোয়ালীয়রের
রাজা মান তোমর (১৪৮৬-১৫১৬ খৃঃ অঃ) প্রমুখ ধ্রুপদ গীতি-পদ্ধতি স্রষ্টাদের
সময়। বলা বাহুল্য, প্রবন্ধ-পরবর্তী যুগের এই সব সঙ্গীত-বিজ্ঞানী কালধর্মের
মর্যাদা রক্ষা করেই তাদের সৃষ্টিকার্যে সাফল্যলাভ করেছিলেন, কিন্তু নূতন
সৃষ্টির মোহে তারা পূর্বসূরীদের অবদানগুলাকেও অগ্রাহ্য করেন নি। সৃষ্টি
কার্যে তারা যথোচিতভাবেই গ্রহণ-বর্জনের নীতিটাকে গ্রহণ করেছিলেন,
কিন্তু, মূল আধারটি সম্বন্ধে তাঁরা ছিলেন একান্তভাবেই সচেতন। প্রাচীন
ধ্রুব-ধাতুহীন অথচ অন্তর-যুক্ত ধ্রুব-প্রবন্ধ সমসাময়িককালে ধ্রুবগীতি, ধ্রুবক্‌-গীতি
এবং ধ্রুবপদ রূপেও উল্লিখিত হতো। তাই, ধ্রুবপদ-পদ্ধতির স্রষ্টাগণ তাঁদের
সৃষ্টিকে সৃষ্টি হিসাবে অভিহিত না করে, মূলাধারের নামেই স্মরণীয় করে রাখা,
সার্থক বিবেচনা করেছিলেন।

২৪২ সঙ্গীত পারিজাত
প্রাচীন ‘অন্তর’ প্রবন্ধ-পরবর্তী যুগ থেকে অন্তরা নামে প্রচলিত হয়েছে।
বর্তমানে সব রকম সঙ্গীতের মধ্যেই অন্তরাকে দ্বিতীয় ধাতুরূপে পাওয়া যায়।
তবে, সেতার, শরদ প্রভৃতি যন্ত্রের মাধ্যমে পরিবেশিত কিছু কিছু খেয়ালাঙ্গ
গৎ-এর মধ্যে—অন্ততঃ ধাতুনাম হিসাবে অন্তরার অস্তিত্ব গ্রাহ্য না হতে দেখা
যায়। কিন্তু, ধ্রুপদাঙ্গ সঙ্গীতের মধ্যে অন্তরা অপরিহার্য ধাতুরূপেই বর্তমান
থাকে।
প্রাচীন আভোগ আজও অস্তিত্ব বজায় রেখেছে, কেবলমাত্র ধ্রুপদাঙ্গ
সঙ্গীতের মধ্যে; কিন্তু, দ্বি-খণ্ডিত হয়ে। ধ্রুপদ গীতি-পদ্ধতির স্রষ্টাগণ, প্রাচীন
সালগ-সূড় প্রবন্ধর দুইভাগে বিভক্ত ধ্রুব ধাতুকে (রূপান্তরিত গায়কীর ক্ষেত্রে?)
যেমন স্থায়ী ও অন্তরা ধাতু হিসাবে গ্রহণ করেছিলেন, তেমনি প্রাচীন
আভোগের দুটি ভাগকেও ব্যবহার করেছিলেন সঞ্চারী ও আভোগ ধাতুরূপে।
আলোচ্য ক্ষেত্রে ধাতু ব্যবস্থার পার্থক্য এই যে, প্রাচীন সালগ-সূড় জাতীয়
প্রবন্ধর মধ্যে অন্তরাকে ‘অন্তর’ ধাতু হিসাবে পাওয়া যায়, কিন্তু, সঞ্চারী নামক
কোন ধাতুর অস্তিত্ব—স্থায়ী ধাতুর মতো—প্রবন্ধ গীতি-পদ্ধতির মধ্যে ছিল না।
বলা বাহুল্য, স্থায়ী ধাতুর পরিকল্পনার মতোই, নিগূঢ় বৈজ্ঞানিক যুক্তিতেই,
সঞ্চারী ধাতুর পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছিল ধ্রুপদাঙ্গ পদ্ধতির মধ্যে। এবং,
এখানে এ কথাও উল্লেখযোগ্য যে, স্থায়ী ধাতুর সঙ্গে যেমন স্থায়ী বর্ণের কোন
সম্পর্ক নেই তেমনি সঞ্চারী ধাতুটিরও সঞ্চারী বর্ণের সঙ্গে সম্পর্কহীন। ধাতুনাম
হিসাবে স্থায়ী ও সঞ্চারীর পরিকল্পনাটা গ্রহণ করা হয়েছিল, প্রবন্ধ যুগের
রাগালাপের স্থায়ী ও সঞ্চার নামক ক্রিয়াসিদ্ধ অংশের সংজ্ঞা থেকে।
“রাগস্থায়ত্বব স্থায়ঃ”— এর মতো রাগালাপের ‘সঞ্চার’ অংশটিও একটি বিশিষ্ট রূপ
প্রকাশ করতো। অর্থাৎ, বোঝা যাচ্ছে, অধিকাংশ ঘরোয়ানা ধ্রুপদের সঞ্চারীর
মতো প্রাচীন আভোগ ধাতুর প্রথম অংশটিও একই অবরোহণ আরোহণযুক্ত
মিশ্র গতির ছন্দে স-গমক মুদারা সপ্তকের বাদী-সম্বাদীকে কেন্দ্র করে পরিক্রমণ
করতো এবং এই পরিক্রমণ সমাধা করেই সোজা তারার সপ্তককে আশ্রয়
করতো আভোগের দ্বিতীয় অংশটিকে অবলম্বন করে। কিন্তু, প্রাচীন আভোগের
এই দ্বিতীয় অংশটি অন্তরার পুনরাবৃত্তি ছিল না। স্থায়ীর প্রতিপাদ্যের সঙ্গে যেমন
সঞ্চারীর কোন সম্পর্ক নেই, তেমনি অন্তরা ও আভোগের প্রতিপাদ্যও
অভিন্নধর্মী নয়। প্রাচীন ‘অন্তর’ ধাতুর গতিটা ছিল নিরঙ্কুশ আরোহণ
প্রভাবযুক্ত। প্রাচীন আভোগ ধাতুর মধ্যে আবার অন্তরের তুলনায় আরও

[Page Header]
সঙ্গীত পারিজাত ২৪৩

বেশী “উচ্চস্বর” নিযুক্ত করা হতো; কিন্তু, তার গতিটা ছিল মূলতঃ অবরোহণ
প্রভাবযুক্ত। অর্থাৎ আভোগের স্বরূপ প্রকাশের মধ্যে, স্ব-স্থানে প্রত্যাবর্তন
করার একটা প্রচেষ্টা পরিলক্ষিত হতো মিশ্রগতির মাধ্যমে। প্রসঙ্গক্রমে এখানে
একথাও উল্লেখযোগ্য যে, প্রবন্ধ গীতি-পদ্ধতির মধ্যে আভোগ নামক ধাতুটির
অস্তিত্ব সম্ভবতঃ উদগ্রাহ, ধ্রুব প্রভৃতি ধাতুর মতো সুপ্রাচীন নয়। সঙ্গীত
রত্নাকরের কিছুকাল পূর্বে বিরচিত সঙ্গীত-সময়সার গ্রন্থে, গ্রন্থকার পার্শ্বদেব
স্পষ্টই উল্লেখ করেছেন, আভোগ নামক ধাতুটির স্রষ্টা পরমর্দি। পরমর্দি ছিলেন
একাদশ শতাব্দীর সঙ্গীত-বিজ্ঞানী।
বিলুপ্ত প্রবন্ধ গীতি-পদ্ধতির মতো ধ্রুবপদ গীতি-পদ্ধতিও আজ আসন্ন মৃত্যুর
সম্মুখীন। এবং, পদ্ধতিটা অচিরেই যে প্রবন্ধ গীতি-পদ্ধতির মতো অতীতের
অতলে তলিয়ে যাবে সে সম্বন্ধে অবহিত হয়েই এই পদ্ধতিটি সম্পর্কিত
ব্যতিক্রমের নজীরগুলোও এখানে উল্লেখ করা যুক্তিযুক্ত মনে করছি।
ধ্রুবপদ পদ্ধতির মধ্যে ধাতু হিসাবে স্থায়ী, অন্তরা, সঞ্চারী, আভোগের
যথাযথ প্রয়োগ প্রায় সর্বজনপরিচিত। কিন্তু, উত্তর ভারতীয় সঙ্গীত সমাজে,
৩০।৪০ বছর পূর্বেও, এমন ধ্রুপদী ‘ঘরও’ ছিল, যে ঘরের শিল্পীরা সঞ্চারীর
পরিবর্তে ভোগ কথাটিকে ব্যবহার করতেন। প্রাচীন সঙ্গীত শাস্ত্রে এই “ভোগ”
কথাটির স্বরূপ কী ছিল সে প্রসঙ্গ আপাততঃ অপ্রাসঙ্গিক, কিন্তু, আলোচ্য ঘরের
শিল্পীরা নজীর হিসাবে যে সব খাতাপত্র দাখিল করতেন, তার ওপর নির্ভর করে
স্পষ্টই ধারণা জন্মাতো—সঞ্চারী আভোগের স্থলে “ভোগাভোগের” প্রচলনটা
প্রায় তানসেনের আমল থেকেই চলে আসছে। অপরপক্ষে, তানসেন বংশীয়
ওস্তাদদের মধ্যে ভোগাভোগের পরিবর্তে সঞ্চারী আভোগের ব্যবস্থাটাই একমাত্র
ব্যবস্থারূপে গ্রাহ্য হতে দেখা যায়। প্রখ্যাত আল্লাদিয়া খাঁ সাহেবের 'ঘরে'
ভোগাভোগ প্রচলিত ছিল। কিন্তু, আগ্রা ঘরের মুজফ্ফর খাঁ, ফৈয়াজ খাঁ প্রমুখ
ওস্তাদরা সঞ্চারী আভোগের নামকরণটাকেই শাস্ত্রসম্মত মনে করতেন।
ধ্রুপদ গানের মতো বীণকারী বাজের মধ্যেও সঞ্চারী আভোগের প্রয়োগ
ব্যবস্থার ব্যতিক্রম পরিলক্ষিত হতো। বর্তমানে, রেডিও যন্ত্রটির মাধ্যমে, মাঝে
মাঝে যা দু'একটা বীণাবাদনের প্রোগ্রাম শোনা যায়, তা শুনে, বীণকারী বাজ
সম্বন্ধে কোন রকম ধারণায় উপনীত হওয়া কারুর পক্ষেই সম্ভবপর নয়। কিন্তু,
৩০।৪০ বছর পূর্বে, উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতটা যখন আজকের মতো মাস্-এর সম্পত্তি না
হয়ে গিয়ে ক্লাশ-এর মধ্যেই গণ্ডীবদ্ধ ছিল, তখন বীণকারী বাজের বিভিন্ন

২৪৪ সঙ্গীত পারিজাত
ঘরোয়ানা সম্বন্ধে অনেক কিছু বৈশিষ্ট্যই লক্ষ্য করবার সুযোগ সুবিধা ঘটতো
তখনকার আমলে, প্রাচীন দ্বি-ধাতুযুক্ত প্রবন্ধ-গীতির অনুরূপ ধাতুব্যবস্থা কোন
বীণ্‌কারের বাজের মধ্যে ছিল না। কিন্তু, চার ধাতুযুক্ত বাজের মধ্যে ধাতু-
ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য পরিলক্ষিত হতো। এবং, বৈশিষ্ট্যগুলি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই
পরিলক্ষিত হতো রবাব্ জাতীয় যন্ত্রের ক্ষেত্রে—পর্দাযুক্ত বীণার ক্ষেত্রে নয়।
এমনও দেখা যেতো যে, যে বীণ্‌কারের “সাজ” রুদ্রবীণা, তিনি শিষ্যবর্গকে
সারস্বত বীণ্ শিক্ষা দেবার সময় যথাযথভাবে স্থায়ী, অন্তরা, সঞ্চারী ও আভোগ
ধাতুর প্রয়োগ পরিবেশনার তালিম দিচ্ছেন। কিন্তু, রুদ্রবীণা তথা রবাব্
জাতীয় বীণার মাধ্যমে তালিম দেবার সময় ধাতুনাম হিসাবে, আভোগের পর
সঞ্চারীকে গ্রাহ্য করছেন। প্রশ্ন করে উত্তর পেয়েছি—এ সঞ্চারী ‘অলগ’,
অর্থাৎ এ সঞ্চারী সে সঞ্চারী নয়। এবং সেই আভোগ-পরবর্তী সঞ্চারী ধাতুটি
সত্যই আভোগ-পূর্ববর্তী সঞ্চারী ধর্মী ছিল না।
বলা বাহুল্য, সঞ্চারী ধাতু-ব্যবস্থার এই অসঙ্গতি সম্পর্কে তারা আর কিছুই
[

তারপর, গতি-সঙ্গতির সামঞ্জস্য বজায় রেখেই এঁরা দ্রুত গমকগুলিকে “ঘসিট্” ও
ও “সূত্”-এ রূপান্তরিত করতে করতে ক্রমে আবার ফিরে আসতেন মধ্য লয়ের
মীড়-এ। এবং শেষে, বিলম্বিত লয়ের উপযুক্ত চার পাঁচ স্বরের দীর্ঘ মীড়-এর
সাহায্যে স্বস্থানে প্রত্যাবর্তন করে, হয় বাজনা শেষ করতেন কিংবা কেউ কেউ
আবার সেই লয় থেকেই "তার-পরণের” কাজ আরম্ভ করতেন। আলোচ্য ক্ষেত্রে
লক্ষ্য করবার বিষয় এই যে, সঞ্চারী-আভোগকে একই ধাতুর প্রতিপাদ্য হিসাবে
গ্রাহ্য করবার নিগূঢ় কারণটি সম্বন্ধে ওয়াকিফহাল না হয়েও এই সব বীণকার
একাধারে প্রবন্ধ ও ধ্রুবপদ পদ্ধতির মর্যাদা রক্ষা করতেন। অর্থাৎ, সঙ্গীতের
মধ্যে চারটির অধিক ধাতুনাম ব্যবহার করতেন না।
কিন্তু, পঞ্চ-ধাতুযুক্ত বাজের অস্তিত্বও আছে। এই বাজটির ঘরোয়ান।
ঐতিহ্য ও উদ্ভবকাল সম্পর্কে যে তর্কের অবকাশ আছে সে কথা বলাই বাহুল্য।
কিন্তু বর্তমানে, মূলতঃ খাতাপত্রের মাধ্যমে এই পঞ্চ ধাতুযুক্ত বাজের অস্তিত্ব
পরিলক্ষিত হয়। যথা, স্থায়ী, অন্তরা, ভোগ, আভোগ ও সঞ্চারী অর্থাৎ,
এ ক্ষেত্রে ভোগাভোগকে একটি ধাতু অন্তর্গত না করে দুটি ধাতুর মধ্যে গ্রহণ
করা হয়েছে। আমাদের বিশ্বাস, এই পঞ্চধাতুযুক্ত সঙ্গীতের পরিকল্পনার সঙ্গে
প্রাচীন প্রবন্ধ গীতি পদ্ধতির পঞ্চধাতু সম্পর্কিত গতানুগতিক পরিচিতিটা
স-সম্পর্কযুক্ত নয়। ৩৭-৫০৩
পদতাল স্বরাঃ পাটস্তেনো বিরুদ মেবচ।
প্রবন্ধস্য ষড়ঙ্গানি কীৰ্ত্তিতানি মনীষিভিঃ ॥ ৫০৯
ধ্বনি বাচকাঃ শব্দা স্তালাশ্চঞ্চৎ পুটাদয়ঃ।
স্বরাঃ ষড়জাদয়স্তেষ্যাং পাটো বাদ্যোদ্ ভবাক্ষরম্ ॥ ৫১০
তেনঃ স্যান্মঙ্গলং শব্দো বিরুদং গুণ নামধূক্। ৫১১১
প্রাচীন সঙ্গীতজ্ঞগণ প্রবন্ধ গীতির ছয়টি অঙ্গের কথা বলে গেছেন। যথা—
১। পদ ২। তাল ৩। স্বর ৪। পাট ৫। তেন ও ৬। বিরুদ।
এই ছয়টি অঙ্গের মধ্যে—
১। অর্থ-বাচক শব্দকে বলে পদ। ২। চঞ্চৎপুট প্রভৃতি হচ্ছে তালের
নাম। ৩। ষড়, ঋষভ্ প্রভৃতি হচ্ছে স্বর। ৪। বাদ্য সমুদ্ভূত অক্ষরের
নাম পাট। ৫। মাঙ্গলিক অর্থে প্রযোজিত শব্দ-বিশেষকে তেন বলে
এবং ৬। গানের বর্ণনীয় ব্যক্তির গুণবাচক শব্দকে বলে বিরুদ।

টিপ্পনী : আজকের দিনের ধ্রুপদ গানগুলির মধ্যে উপরোক্ত ছয়টি অঙ্গকে
প্রায় অটুট রূপেই পাওয়া যায়। অবশ্য, ধ্রুপদ পদ্ধতি বর্তমানে প্রায় অচল
অবস্থায় এসে পৌঁছেছে। দু' একজন প্রবীণ ধ্রুপদী ও তাঁদের অতি-নগণ্য শিষ্য-
সম্প্রদায়ের কণ্ঠে যে সব ধ্রুপদ শোনা যায় সেগুলির অধিকাংশই তানসেন প্রমুখ
স্রষ্টাদেরই রচনা। সুতরাং, একালের সৃষ্ট কোন ধ্রুপদের মধ্যে আলোচ্য ছয়টি
অঙ্গ বর্তমান থাকে কি না সে আলোচনার সুযোগ নেই। তবে, বর্তমান শতাব্দীর
প্রথম দিকে প্রখ্যাত কাশীনাথ যে সব ধ্রুপদাঙ্গ চতুরঙ্গ রচনা করেছিলেন বা
যদু ভট্ট, ক্ষেত্রমোহন গোস্বামী প্রমুখ বিষ্ণুপুরের সনিষ্ঠ সঙ্গীত-সেবীরা যে সব
ধ্রুপদ রচনা করেছিলেন, সে সব গানের মধ্যে আলোচ্য ছয়টি অঙ্গকে পাওয়া
যায়। কিন্তু, পূর্ব সূত্রের টিপ্পনীতে বলেছি, আমাদের সব ধ্রুপদ গানই চার
ধাতুযুক্ত নয়। অর্থাৎ, স্থায়ী ও অন্তরাযুক্ত যে সব ধ্রুপদ প্রচলিত আছে, সেই
সব গানের মধ্যে প্রাচীন ছয়টি অঙ্গের স্থান সঙ্কুলন হয় না। তবে, চার ধাতুযুক্ত
ক্ল্যাসিক্যাল গানগুলির মধ্যে, সাধারণতঃ ব্যতিক্রম পরিলক্ষিত হয় না।
প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখযোগ্য এই যে, চার ধাতুযুক্ত সব ধ্রুপদের মধ্যেই যে আলোচ্য
ছয়টি অঙ্গকে পাওয়া যায়, তা নয়। চতুরঙ্গ গানের মধ্যে হয়তো “তেন” অঙ্গ
বাদ পড়তে পারে। অনুরূপ নিরঙ্কুশ পদযুক্ত গানের মধ্যে থেকে চঞ্চৎপুট,
স্বর ও পাটও বাদ পড়তে পারে। কিন্তু, সামগ্রিক বিচারে, ধ্রুপদ পদ্ধতির
মধ্যে আলোচ্য ছয়টি অঙ্গই বজায় থাকে। ॥ ৫০৯।৫১১-১

প্রবন্ধ জাতয়ঃ পঞ্চ ইতি প্রোক্তাঃ ক্রমেণ চ॥ ৫১১২
ষড়্‌ভিরেতৈর্মেদিনী স্যাং বিদিনী পঞ্চভির্ভবেৎ।
চতুর্ভি দীপিনী জাতি স্ত্রিভিরঙ্গৈর্বিলম্বিনী॥ ৫১২
দ্বাভ্যাং তারাবলী জাতিরিতি সূরি বিনির্ণয়ঃ। ৫১৩।১

প্রবন্ধগীতি পাঁচটি জাতিতে বিভক্ত। ক্রমিক সংখ্যানুসারে এই পাঁচটি
জাতির পরিচয় পাওয়া যাচ্ছে। যথা :—
১। যে প্রবন্ধগীতির মধ্যে (পূর্বোক্ত পদ, তাল, স্বর, পাট, তেন ও
বিরুদ) ছয়টি অঙ্গই বিদ্যমান থাকে, তার নাম মেদিনী জাতীয়
প্রবন্ধ।
২। যে প্রবন্ধগীতির মধ্যে মাত্র পাঁচটি অঙ্গ থাকে, তার নাম বিদিনী
জাতীয় প্রবন্ধ।

৩। যে প্রবন্ধ-গীতির মধ্যে মাত্র চারটি অঙ্গ বিদ্যমান থাকে, তার নাম
দীপিনী জাতীয় প্রবন্ধ।
৪। যে প্রবন্ধ-গীতির মধ্যে মাত্র তিনটি অঙ্গ বর্তমান থাকে, তার নাম
বিলঙ্গিনী জাতীয় প্রবন্ধ
৫। যে প্রবন্ধ-গীতির মধ্যে মাত্র দুটি অঙ্গ বজায় থাকে, তার নাম তারাবলী
জাতীয় প্রবন্ধ। ৫১১২-৫১৩১
টিপ্পনী : সঙ্গীতরত্নাকরেও প্রবন্ধ গীতির পাঁচটি জাতির কথা উল্লিখিত
হয়েছে। কিন্তু, সংখ্যাটা অভিন্ন হলেও নামকরণের মধ্যে পার্থক্য পরিলক্ষিত
হয় রত্নাকরে উল্লিখিত পাঁচটি প্রবন্ধ-জাতিও পারিজাতের মতো ক্রমিক
নিয়মানুসারে বিশ্লেষিত হয়েছে, কিন্তু নামগুলি হচ্ছে যথাক্রমে, ১। মেদিনী,
২। নন্দিনী, ৩। দীপনী, ৪। ভাবনী ও ৫। তারাবলী। অর্থাৎ, দেখা যাচ্ছে
উভয় গ্রন্থের মধ্যে কেবলমাত্র প্রথম, তৃতীয় ও পঞ্চম জাতি তিনটি ছাড়া বাকি
দুটি জাতি ভিন্ন নামে উল্লিখিত হয়েছে। রত্নাকরের নন্দিনী ও ভাবনী
পারিজাতের মধ্যে হয়েছে বিদিনী ও বিলঙ্গিনী। রত্নাকরের দীপনীও পারিজাতের
মধ্যে দীপিনী হয়ে গেছে। তবে, এটা উল্লেখযোগ্য বিষয়বস্তু নয়।
সমস্যা হচ্ছে, পারিজাতের মধ্যে প্রাচীন নন্দিনী ও ভাবনী পরিত্যক্ত হয়ে
'বিদিনী' ও বিলঙ্গিনী নামে উল্লিখিত হলো কেন। শাস্ত্রে বলে, ভাষা যোজনান্তরে
গিয়ে বিকৃত হয়ে যায়। কালের প্রভাবে, দেশান্তরের গ্রন্থকারের নিকট,
অনুরূপ কারণে নন্দিনীর বিদিনী হয়ে যাওয়া বা ভাবনার বিলঙ্গিনী হয়ে
যাওয়া বিচিত্র নয়। কিন্তু, আলোচ্য ক্ষেত্রে ব্যাপারটা অনেকের নিকটই
যুক্তিগ্রাহ্য হবে না এই কারণে যে, প্রাচীন সাঙ্গীতিক শব্দ ব্যবহার করার
ক্ষেত্রে অহোবল বরাবর শার্ঙ্গদেবকেই অনুসরণ করেছেন, এ ধরনের ব্যতিক্রম
পারিজাতে নেই বললেই হয়। সুতরাং, আলোচ্য ক্ষেত্রে অনেকের পক্ষেই
এমন অনুমান করা অসঙ্গত নয় যে, কালক্রমে, রত্নাকরে উল্লিখিত নন্দিনী ও
ভাবনী জাতির মধ্যে নতুন কিছু সাঙ্গীতিক উপাদান মিশ্রিত হয়েছিল বলেই
জাতিদুটি নামান্তর গ্রহণ করেছিল। কিংবা সম্পূর্ণ নূতন উপকরণ নিয়েই
বিদিনী ও বিলঙ্গিনী বিলুপ্ত নন্দিনী ও ভাবনীর স্থান পূর্ণ করেছিল। অথবা—
পরবর্তী কালের কোন অশিক্ষিত বা অসাবধানী পারিজাত নকলকারীর
দোষেই এই নামান্তর ঘটেছিল। বস্তুতঃ ভারতীয় সঙ্গীত সমাজে, পার্বতীসুত
লম্বোদরকে পাক দিয়ে সূতো লম্বা করো-র উদাহরণ বিরল নয়। বিশেষতঃ

২৪৮ সঙ্গীত পারিজাত
যখন দেখা যাচ্ছে, এই জাতি পাঁচটির প্রতিপাদ্য বিষয়বস্তু সম্বন্ধে পারিজাতের
মধ্যে কোন আলোচনা স্থান পায় নি, তখন এই নামান্তরের ব্যাপারটাকে
নিছক নকলনবিশীর পরিণাম হিসাবে গ্রাহ্য করা অসঙ্গত নয় নিশ্চয়ই।
আলোচ্য জাতি পাঁচটির প্রতিপাদ্য বিষয়বস্তু সম্বন্ধে পারিজাতে কোন
আলোচনা স্থান পায় নি—সম্ভবতঃ সূত্রগুলির পরবর্তী অংশ নষ্ট হয়ে গিয়েছিল
বলেই, কিংবা আলোচ্য সূত্রগুলি প্রক্ষিপ্তও হতে পারে। এ সম্বন্ধে সঙ্গীত
রত্নাকরে কিছু আলোচনা স্থান পেয়েছে; কিন্তু, মতান্তরিত জাতি নামের
বিশ্লেষণ প্রসঙ্গে। অর্থাৎ, আলোচ্য পাঁচটি জাতি, মতান্তরে, অন্য নামেও
অভিহিত হতো। যথা :—
১। মেদিনীর অপর নাম শ্রুতি। শ্রুতি অর্থে, বেদের শিক্ষা, জ্যোতিষ,
নিরুক্ত, নিঘণ্টু, ছন্দ ও ব্যাকরণ—এই ছয়টি অঙ্গকে বোঝাচ্ছে।
২। নন্দিনীর অপর নাম নীতি। নীতির লাভাপায়, কর্ম আরম্ভ করবার
উপায়, পুরুষদ্রব্যসম্পৎ, দেশকাল বিভাগ, বিনিপাত-প্রতিকার ও কার্যসিদ্ধি—
এই পাঁচটি অঙ্গকে বোঝাচ্ছে।
৩। দীপনীর অপর নাম সেনা। সেনা অর্থে, হস্তীসেনা, অশ্বারোহী সেনা,
রথারোহী সেনা ও পদাতিক সেনা—এই চারটি অঙ্গকে বোঝাচ্ছে।
৪। ভাবনীর অপর নাম কবিতা। কবিতা অর্থে, শক্তি, ব্যুৎপত্তি ও
অভ্যাস—এই তিনটি অঙ্গকে বোঝাচ্ছে।
৫। তারাবতীর অপর নাম চম্পূ। চম্পূ অর্থে, গদ্য ও পদ্য--এই দুটি অঙ্গকে
বোঝাচ্ছে।
বলা বাহুল্য, প্রাচীন প্রবন্ধ-গীতির বাক্যাংশের মধ্যে কী ভাবে এই সব
“অঙ্গ” প্রচ্ছন্ন থাকতো এবং উক্ত “অঙ্গ”গুলিকে সাঙ্গীতিক রূপ দেবার জন্য কী
ভাবে কোন কোন ছন্দে স্বর স্থাপনা করা হতো, সে সম্বন্ধে যথাযথ উদাহরণ
পরিবেশনার সুযোগ আমরা গ্রহণ করতে পারছি না যেহেতু আমাদের আলোচ্য
বিষয়বস্তু সঙ্গীত পারিজাত, রত্নাকর নয়। অপরপক্ষে, ব্যাপারটা যেমনি
জটিল তেমনি ব্যাপক এবং নিতান্তই বিশেষজ্ঞদের আলোচনার বিষয়বস্তু।
৫১১।২-৫১৩।১
ছন্দস্তালাদি নিয়মান্নির্যুক্তঃ স্যাদতোঽন্যথা ॥ ৫১৩।২
অনিযুক্ত ইতি দ্বিধা প্রবন্ধঃ পরিকীর্তিতঃ ॥ ৫১৪

সঙ্গীত পারিজাত ২৪৯
প্রবন্ধ গীতি দু'রকমের হয়—নিযুক্ত ও অনিযুক্ত। যে গানগুলি ছন্দ
তালাদির নিয়ম অনুসরণ করে গীত হয়, তার নাম নিযুক্ত প্রবন্ধ-গীতি এবং
যে গানগুলির মধ্যে নিযুক্ত গীতির নিয়মাদি মেনে চলা হয় না, তার নাম
অনিযুক্ত প্রবন্ধ-গীতি। ৫১৩।২ ৫১৪
টিপ্পনী: এখানে নিবদ্ধ-গীতির বিপরীত অর্থ অনিবদ্ধ গীতির কথাটাই
চট করে মনে আসে। কিন্তু, লক্ষ্য করবার বিষয়, নিযুক্ত বা অনিযুক্ত
এখানে নিরঙ্কুশ নয়। নিযুক্ত বা অনিযুক্ত কথা দুটি এখানে নিবদ্ধ বা প্রবন্ধ
গীতি-পদ্ধতির প্রসঙ্গেই ব্যবহৃত হয়েছে—অনিবদ্ধ গীতির মতো নিরঙ্কুশভাবে
ব্যবহৃত হয়নি। অর্থাৎ, অনিযুক্ত অর্থে এখানে আদৌ অনিবদ্ধ পদ্ধতি
বোঝাচ্ছে না—নিবদ্ধ পদ্ধতিরই একটি প্রকারকে বোঝাচ্ছে।
নিবদ্ধ গীতির মধ্যে বা কী নিযুক্ত আছে?—ধাতু, অঙ্গ, ছন্দ, তাল প্রভৃতির
শাস্ত্র ও তার প্রয়োগ-পদ্ধতি সম্বন্ধীয় গুটিকতক বাধা-ধরা আইন। কিন্তু,
কোন সঙ্গীতশিল্পী যদি ওই বাধা-ধরা আইনগুলোকে না মেনে চলেন, তাহলে
কী হবে? নিযুক্ত অনিযুক্ত হয়ে যাবে। কিন্তু, কী অনিযুক্ত হয়ে যাবে?
ধাতু, ছন্দ, অঙ্গ, তাল প্রভৃতির মতো নিবদ্ধগীতির অবিচ্ছেদ্য অঙ্গগুলি কি বা
সেই অঙ্গগুলির প্রয়োগ-পরিবেশনা সম্পর্কিত বাধা-ধরা আইনগুলি?—
কেবলমাত্র আইনগুলি।
আলোচ্য ক্ষেত্রে আরও দুটি প্রশ্নের উদ্ভব হতে পারে। যথা:—
১। শিল্পীর পক্ষে কোন নিযুক্ত গীতকে অনিযুক্ত পদ্ধতির মাধ্যমে
পরিবেশন করবার অধিকার ছিল কি না।
২। শিল্পকারিতার পরিপ্রেক্ষিতে কোন পদ্ধতির গীতি উচ্চস্তরের গীতি
হিসাবে গণ্য হতো। নিযুক্ত না অনিযুক্ত?
আলোচ্য প্রথম প্রশ্নটির সদুত্তরের মধ্যেই দ্বিতীয় প্রশ্নের সমাধান প্রচ্ছন্ন
আছে। কিন্তু, দুঃখের বিষয়, প্রাচীন সঙ্গীত গ্রন্থাদির মধ্যে এ সম্পর্কে কোন
আলোচনা বা নির্দেশ স্থান পায় নি। আমরা কেবল সিংহ ভূপাল কল্লিনাথ
প্রমুখ টীকাকারদের মন্তব্য পাঠ করে জানতে পারি, অমুক প্রবন্ধটি নিযুক্ত ছিল
কিংবা ছিল না। তবে, আলোচ্য ক্ষেত্রে, টীকাকারদের বক্তব্য পরিবেশনার
ভঙ্গিমাটাও প্রণিধানযোগ্য। বস্তুতঃ, নিযুক্ত গীতি-পদ্ধতি প্রসঙ্গে তাঁরা যত কথা
বলেছেন, অনিযুক্ত পদ্ধতি প্রসঙ্গে কিছুই প্রায় বলেন নি সে তুলনায়।
১৭

সুতরাং, আলোচ্য ক্ষেত্রে আমাদের পক্ষে অনুমানের আশ্রয় গ্রহণ করা ছাড়া
গত্যন্তর নেই।
নির্যুক্ত গীতিকে প্রাচীন গ্রন্থাদির মধ্যে যে ভাবে বিশ্লেষণের মাধ্যমে
সুচিহ্নিত করা হয়েছে, তাতে মনে হয়, কোন নির্যুক্ত প্রবন্ধকে অনিযুক্ত
পদ্ধতির মাধ্যমে পরিবেশন করবার ব্যবস্থা বা অধিকার সে যুগের সঙ্গীতসমাজে
স্বীকৃত হতো না। অপরপক্ষে, অনিযুক্ত পদ্ধতির প্রবন্ধগুলিও যে তখন
Experimental Stage-এ ছিল বা অবাচীনদের প্রতিপাদ্য অবৈজ্ঞানিক
পদ্ধতিরূপে গ্রাহ্য হতো, এমন কথা মেনে নেওয়াও যুক্তিযুক্ত নয়, যেহেতু,
অনিযুক্ত পদ্ধতিকে তারা অচিহ্নিত করেও রাখেন নি গ্রন্থের মধ্যে। অর্থাৎ
অনিযুক্তির সাঙ্গীতিক প্রয়োগগুলো কেবলমাত্র নির্যুক্ত পদ্ধতির ক্ষেত্রে বে-আইনী
ছিল, নচেৎ উক্ত বে আইনী ব্যাপারটা অনিযুক্তের ক্ষেত্রে ছিল নিতান্তই নিজস্ব
আইন। অবশ্য, নির্যুক্ত প্রবন্ধগুলোর বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করে ধারণা জন্মায়--
অনিযুক্ত প্রবন্ধগুলির মধ্যে স-তাল-এর তুলনায় অ-তালের ব্যবহারটাই প্রকট
ছিল। অর্থাৎ ছন্দের বন্ধনের তুলনায় ভাব ও সুরের ঐশ্বর্যটাই প্রকট হয়ে উঠত।
কিন্তু, আসলে কী যে ছিল, তা আমাদের জানবার উপায় নেই। তবে, নির্যুক্তর
মতো অনিযুক্ত পদ্ধতির গানও যে সে যুগের সঙ্গীতসমাজে রীতিমত
প্রচলিত ছিল তাতে সন্দেহের অবকাশমাত্রও নেই। প্রবন্ধ গীতি আলোচনা
করবার সময় দেখা যাবে প্রখ্যাত কৈবাড, প্রভৃতি প্রবন্ধগুলি অনিযুক্ত
ছিল। ॥ ৫১৩-৫১৪
তত্র গীতোপযোগিত্বাদ গণ বর্ণাদি কথ্যতে।
আদি, মধ্যাবসানেষু যরতা' যান্তি লাঘবম্॥ ৫১৫
ভজসা গৌরবং যান্তি মনৌ তু গুরু লাঘবম্।
মে ভূমির্দেবতা নে চ বাসবো ভেচ চন্দ্রমাঃ॥ ৫১৬
যে বারি জে রবি স্তে চ খং সেঽনিলশ্চ রেঽনলঃ।
লক্ষ্মীর্বপুষ্যশঃ সৌখ্যং দুঃখঞ্চাথ দরিদ্রতা॥ ৫১৭
দেশো বৃদ্ধির্মৃতিস্তেষ্বা মিত্যেতানি ফলানি চ॥ ৫১৮
অতঃপর, গীতের প্রতিপাদ্য গণ ও বর্ণাদির বিষয় বলা যাচ্ছে। (ছন্দ ও গীতি)
শাস্ত্রে তিনটি করে বর্ণ বা অক্ষরের সন্নিবেশে একটি করে গণ নির্দিষ্ট হয়েছে।

সঙ্গীত পারিজাত ২৫১
এইরকম গণ-এর সংখ্যা আটটি। যথা, ম-গণ, ন-গণ, ভ-গণ, য-গণ, জ-গণ,
ত-গণ, স-গণ ও র-গণ। এদের অধিষ্ঠাত্রী দেবতা হচ্ছেন যথাক্রমে:—
ম-গণের অধিষ্ঠাত্রী দেবতা — ভূমি।
ন-গণের " — ইন্দ্র।
ভ-গণের " — চন্দ্র।
য-গণের " — জল।
জ-গণের " — গৃহ।
ত-গণের " — আকাশ।
স-গণের " — বায়ু।
র-গণের " — অগ্নি।
গীতের প্রথমে পূর্বোক্ত গণগুলি প্রয়োগ করলে, গীতের বর্ণনীয় ব্যক্তিগণ
যথাক্রমে ফললাভ করেন:—
ম-গণের প্রয়োগে — লক্ষ্মীযুক্ত শরীর।
ন-গণের " — যশ।
ভ গণের " — সুখ।
য-গণের " — দুঃখ।
জ-গণের " — দারিদ্র্য।
ত-গণের " — দেশ বা রাজ্য।
স-গণের " — ভূমি।
র-গণের " — মৃত্যু।
৫১৫-৫১৮
টিপ্পনী: আলোচ্য সূত্রগুলির মাধ্যমে পারিজাতকার আটটি গণের
অধিষ্ঠাত্রী দেবতা ও তাদের প্রয়োগ-জনিত ফললাভের কথা বলেছেন। কিন্তু,
গণ-এর প্রকৃত পরিচয় সম্পর্কে আলোকপাত করেন নি। সেকালে, গণ-এর
দেবতা পরিকল্পনা করা বা ফললাভের প্রত্যাশা করার মধ্যে সম্ভবতঃ কোন
বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব ও তথ্য নিহিত ছিল যা আজকের দিনের আমাদের পক্ষে
উপলব্ধি করা সম্ভবপর হচ্ছে না। কিন্তু, সঙ্গীতের ক্ষেত্রে গণ-এর বৈজ্ঞানিক
তাৎপর্য সেদিনকার মতো আজও আছে, কেবল বদলে গেছে তার পরিচিতির
উপকরণগুলো। সুপ্রাচীন গান্ধর্ব রীতির মধ্যে যেমন নিরঙ্কুশ স্বর বলে কিছু
ছিল না, তেমনি, সেই স্বরের প্রয়োগ-বৈশিষ্ট্য ও কাল পরিমাপের জন্যও মীড়,

২৫২ সঙ্গীত পারিজাত
গমক্, মাত্রা প্রভৃতির মতো সাঙ্গীতিক সংজ্ঞাদিরও অস্তিত্ব চিহ্নিত হতো না।
তখন যেমন শব্দের উদাত্ত, অনুদাত্ত, স্বরিত, উৎক্ষিপ্ত প্রভৃতির প্রয়োগ-বৈশিষ্ট্যের
সাহায্যে স্বরের অস্তিত্ব অনুভূতিগ্রাহ্য হতো, তেমনি, সেই স্বর-শব্দ-সম্ভূত
গীতের মীড্, গমক্ মাত্রা-বিভাগ প্রভৃতিও নির্ভরশীল ছিল প্রয়োজনমত লঘু গুরু
উচ্চারণের অক্ষরযুক্ত বাক্য চয়নের ওপর। এই ছিল গণ-এর আদি রূপ।
পরে, দেশী পদ্ধতির সঙ্গীতেও গণ-এর এই আদি রূপটিকে তিনটি বর্ণ বা অক্ষরের
মাধ্যমে চিহ্নিত-করণের দ্বারা গ্রহণ করা হয়েছিল। কিন্তু, রত্নাকর প্রভৃতি
প্রাচীন গ্রন্থাদিতে দেখা যায়, আদি গণ-এর সংখ্যা আটটি হিসাবে চিহ্নিত হলেও,
ইতিমধ্যে তার অনেক প্রকারভেদও প্রচলিত হয়ে গিয়েছিল—গানের মাত্রা
বিভাগ নিরীক্ষণের জন্য।
রত্নাকর প্রভৃতি গ্রন্থে গুরু ও লঘু অক্ষরকে চিহ্নিত করা হয়েছে, যথাক্রমে,
“S” ও “I” চিহ্নের দ্বারা। যেমন, আটটি গণ-এর বর্ণ-ব্যবস্থা ছিল :-
ম-গণ = তিনটি গুরু অক্ষরের ব্যবহার—S S S
ন-গণ = তিনটি লঘু অক্ষরের ব্যবহার I I I
ভ-গণ- প্রথমটি গুরু ও পরের দুটি লঘু = S I I
য-গণ = প্রথমটি লঘু ও পরের দুটি গুরু = I S S
জ-গণ = মাঝেরটি গুরু ও বাকি দুটি লঘু = I S I
ত-গণ = প্রথম ও দ্বিতীয় গুরু ও শেষেরটি লঘু = S S I
স-গণ-- প্রথম ও দ্বিতীয় লঘু ও শেষেরটি গুরু = I I S
র-গণ = মাঝেরটি লঘু ও বাকি দুটি গুরু = S I S
গুরুবর্ণের “S” কে যদি দু' মাত্রা ও লঘুবর্ণের “I” কে যদি একমাত্রা হিসাবে
গ্রহণ করা যায়, তাহলে, গণগুলির মাত্রা বিভাগটা কেমন দাঁড়ায় তারও অসংখ্য
উদাহরণ আছে সঙ্গীত রত্নাকরে—অন্যান্য গণ-এর উল্লেখ ও আলোচনা প্রসঙ্গে।
বর্তমানেও, আমরা গণ-এর বিন্যাস লক্ষ্য করতে পারি, অবহিত হলে। যেমন:
যখন সঘন গগন গরজে = চারটি ন-গণ ( III×৪) = ১২ মাত্রা।
ললনা চলিছে চপলা গতিতে = চারটি স-গণ ( II S×৪) = ১৬ মাত্রা।
সা-ধনা বা-সনা কা-মনা যো- - র == চারটি র-গণ (SIS×৪) = ২০ মাত্রা।
ডা-ডিরি ডা-ডিরি ডা-ডিরি ডা-ডিরি = চারটি ভ-গণ (SII×৪) = ১৬ মাত্রা।
—৫১৫-৫১৮