सामग्री पर जाएँ
सर्वकोश
संग्रह पर लौटें

सङ्गीतपारिजात (अहोबल - वीणा के तारों पर शुद्ध व विकृत स्वर-स्थान निर्धारण का ऐतिहासिक ग्रन्थ)

Sangitaparijata of Ahobala on Indian Musicology

पण्डित अहोबल (टीकाकार: कलानिधि कलिन्द) द्वारा

DevanagariHindipublished358 पृष्ठ

রাগ, পরিবেশনা-কাল প্রাতঃকাল এবং পকড় হচ্ছে, ধপ, গপ, ধর্স, ধপ,
গপ, ধ, প।
বলাবাহুল্য, আমাদের আলোচনার বিষয়বস্তু, রাগ-বিবর্তন নয়, পণ্ডিত-প্রবর
অহোবলের বক্তব্য। এবং এই বক্তব্যটিকে সুস্পষ্ট করবার দুর্ব্বুদ্ধিতেই,
‘বিশ্যল্যকরণী’র প্রয়োজনে ‘গন্ধমাদনের’ প্রসঙ্গ অবতারণা করতে বাধ্য হচ্ছি।
পারিজাতে, ভূপালী আছে (১৭ সংখ্যক রাগ)। কিন্তু, একালের
ভূপালীর সঙ্গে তার কোনই সামঞ্জস্য নেই। পারিজাতের ভূপালীর স্বর ছিল
ঋজ্ঞদন। অর্থাৎ ভৈরবী ঠাটের রাগ ছিল পারিজাতের ভূপালী এবং একালের
ভূপাল বা ভূপাল-তোড়ির সঙ্গে এর কিছুটা সামঞ্জস্য আছে বলা চলে।
পারিজাতে তীব্র গা-নি-যুক্ত অর্থাৎ একালের শুদ্ধ গা-নি-যুক্ত দেশকারী
নামক একটি রাগ আছে (১৪ সংখ্যক রাগ)। কিন্তু, একালের, বিলাবল
ঠাটের অন্তর্গত ঔড়ব জাতীয় দেশকারের সঙ্গে তার কোনই সামঞ্জস্য নেই,
যেহেতু, দেশকারী ছিল সম্পূর্ণ জাতীয় রাগ।
স্বরমেল-কলানিধি (১৪৭২-১৫৪৯ খৃঃ অঃ) গ্রন্থে ভূপালীও নেই দেশকারও
নেই। কিন্তু, ম-নি বর্জিত আসোয়ারী ঠাটের একটি ঔড়ব জাতীয় ভূপাল
আছে।
সদ্রাগচন্দ্রোদয় (১৫৯৯ খৃঃ অঃ) গ্রন্থে ভূপালী এ কালের মতোই, ম-নি
বর্জিত শুদ্ধ স্বরযুক্ত ঔড়ব জাতীয় রাগ ছিল। কিন্তু দেশিকার নামক রাগটি
ছিল ঋম্রদ-যুক্ত পূবী ঠাটের সম্পূর্ণ জাতায় রাগ।
রাগমঞ্জরী (১৫৯৯ খৃঃ অঃ) গ্রন্থে, ভূপালী নেই। কিন্তু দেশিকার নামক
একটি দুই গা-যুক্ত রাগ আছে।
চতুর্দণ্ডী প্রকাশিকা (১৬৬০ খৃঃ অঃ?) গ্রন্থে ভূপালী বা দেশকারের
উল্লেখমাত্রও নেই।
রাগ বিবোধ (১৬১০ খৃঃ অঃ) গ্রন্থে, ভূপালী ছিল একালের মতোই ম-নি
বর্জিত, শুদ্ধ স্বরযুক্ত ঔড়ব জাতীয় রাগ। কিন্তু, দেশকার ছিল, ঋহ্মদ যুক্ত পূর্বী
ঠাটের সম্পূর্ণ জাতীয় রাগ।
রাগ তরঙ্গিনী (১১৬২ খৃঃ অঃ?) গ্রন্থে ভূপালী ছিল একালের মতোই ম-নি
বর্জিত, শুদ্ধ স্বরযুক্ত ঔড়ব জাতীয় রাগ। কিন্তু, দেশকার বা দেশকারী নামক
কোন কিছুর অস্তিত্ব নেই।

২১৪ সঙ্গীত পারিজাত
হৃদয় নারায়ণদেব (১৬৬৭ খৃঃ অঃ) বিরচিত গ্রন্থ দুটিতেও ভূপালী ছিল
একালের মতো এবং দেশকারের অস্তিত্ব নেই।
সঙ্গীত সারামৃতোদ্ধার (১৭৮৩ খৃঃ অঃ) গ্রন্থে ভূপালী ছিল ম-নি বর্জিত
ঋদ্ধদ-যুক্ত ঔডুব জাতীয় রাগ এবং দেশকারের অস্তিত্ব নেই।
অতঃপব আমাদের বিবেচনা করতে হবে—
১। একালের শুদ্ধ স্বরযুক্ত ঔডুব জাতীয় দেশকারের সঙ্গে একটিও প্রাচীন
দেশকারের সামঞ্জস্য নেই কেন?
২। প্রাচীন ঋদ্ধদ-যুক্ত দেশকারের মতো একটি পূর্বী ঠাটের দেশকার
বর্তমানেও অর্ধ প্রচলিত অবস্থায় অস্তিত্ব বজায় রেখেছে, হঠাৎ বিলাবল ঠাটের
ঔডুব জাতীয় দেশকার জন্মগ্রহণ করল কেন এবং কী ভাবে?
৩। একালের ভূপালীর তুলনায় বিলাবল ঠাটের দেশকারের প্রচলন
অল্প কেন?
৪। ভূপালী রাগটিকে ত্রিবিধ-লয়ের সাহায্যে যে ভাবে পরিবেশন করা
যায়, বিলাবল ঠাটের দেশকারকে সে রকমভাবে পরিবেশন করা যায় না কেন
এবং অসুবিধার কারণগুলো কী?
৫। ভূপালীর

সঙ্গীত পারিজাত ২১৫
হয়ে গেছে, তেমনি, তীব্র গ-নি ও কোমল ঋ-ধ যুক্ত হওয়ার ফলে, আসলে
ষাড়ব জাতীয় রাগের রূপ পরিগ্রহ করেছে। অথচ, যেহেতু, মূর্ছনার
মধ্যে একই স্বরের দুটি নাম ব্যবহার করা যায় না, অতএব রাগদুটি
অনুপ্রাস যুক্ত হয়ে, একাধারে চতুঃস্বারিক রাগের পরিচয় ও ষাড়ব জাতীয়
রাগের রূপ বজায় রাখছে। এ সম্বন্ধে, ৩৪, ৯৬ ও ১০৩-২০৩ সূত্রগুলির
টিপ্পনী দ্রষ্টব্য।
তবুও প্রশ্ন উঠতে পারে, কেবলমাত্র তিনটি বা চারটি স্বরের প্রয়োগ দ্বারা
রাগ গঠন করা কি সম্ভবপর নয়?
রাগ অর্থে যদি “বাহাদুরী করা” না বোঝায়, তাহলে অবশ্যই সম্ভবপর
নয় কেন, বহুকাল পূর্বে, লৌকিক রাগ সৃষ্টি হবার অনেক কাল আগে,
ব্রাহ্মণগণ যখন যজ্ঞ সম্পন্ন করতেন বৈদিক মন্ত্রাদির সাহায্যে তখন সেই
মন্ত্রগুলি যজ্ঞ বিশেষের প্রয়োজনানুসারে কখনও এক স্বরের আর্চিক, দুই
স্বরের গাথিক, তিন স্বরের সামিক, চার স্বরের স্বরান্তর বা চতুঃস্বারিক,
এমন কি পরবর্তী কালের ঔড়ব, ষাড়ব ও সম্পূর্ণ জাতির মতো, পাঁচ, ছয়
ও সাত-স্বর প্রয়োগ-রীতি অনুযায়ীও উদ্‌গীত হতো। পরবর্তী কালে, লৌকিক
রাগ সৃষ্টি হবার পরে, আর্চিক ও গাথিক রীতি অনুসরণ করে কোন সঙ্গীত
শিল্পী রাগের মাধ্যমে গান পরিবেশন করতে সক্ষম না হলেও—তিনটি বা
চারটি স্বরকে মাত্র অবলম্বন করে “লৌকিক গান” গাইবার চেষ্টা যে করে
গেছেন, তার প্রমাণ আছে। ধ্রুপদ গীতি পদ্ধতি সৃষ্টি হবার পূর্বে, আমাদের
দেশে যখন “প্রবন্ধ গান” গাওয়া হতো, তখন, সামিক ও চতুঃস্বারিক রীতির
প্রবন্ধগীত—খুব প্রচলিত না হলেও, অপ্রচলিত ছিল না। আরও পরবর্তী যুগে
প্রবন্ধ গীতি লোপ পেয়ে গিয়ে যখন ধ্রুপদ পদ্ধতি প্রচলিত হলো তখনও
অধিকাংশ গীতিকারই প্রাচীনত্বের মহিমা কীর্তন ত্যাগ করতে পারেন নি।
বিলুপ্ত ছন্দ, প্রবন্ধ, ধ্রুবক প্রভৃতি গীতি পদ্ধতির পরিচয়গুলো যেমন ধ্রুপদ গানের
মধ্যে—কেবলমাত্র বাক্য হিসাবেই সংযুক্ত হলো, তেমনি, কোন কোন শিল্পী
তিন স্বর ও চার স্বরের ধ্রুপদ গান পরিবেশন করে, উক্ত সুপ্রাচীন ও নিঃশেষে
বিলুপ্ত গীতি পদ্ধতি দুটিকে “রাগ” হিসাবে মর্যাদা দেবার চেষ্টা করেছিলেন বা
বাঁচিয়ে রাখবার চেষ্টা করেছিলেন। মৎ প্রণীত ভারতীয় সঙ্গীত পরিচিতি
গ্রন্থেও, তানসেনের সমসাময়িক নায়ক গোপালের বা গোপাল লালের
ভণিতাযুক্ত অনুরূপ একটি ধ্রুপদ গান স্বরলিপিকৃত হয়ে উদ্ধৃত হয়েছে। কিন্তু,

২১৬ সঙ্গীত পারিজাত
বিবেচ্য এই যে, রাগের যা স্বধর্ম—সেই রঞ্জনীশক্তি, এই সব সামিক
চতুঃস্বারিকের মধ্যে কতটুকু বজায় থাকতে পারে! পারে না বলেই আমরা
দেখতে পাই, পাঁচস্বরের মালকোষ, ভূপালী, হিন্দোল প্রভৃতি রাগের তুলনায়
এরা কিছুই নয়। সামিক মালবশ্রীর সগপ স্বর তিনটির সঙ্গে পরিমাণ মতো
ঋ-নি যুক্ত করেও রাগটি ঔড়ব রাগ-সমুদ্রের তুলনায় বুদ্বুদের মর্যাদাও পায়
না—যেমন, বিলাবল ঠাটের দেশকারের মধ্যে সামান্য পরিমাণে শুদ্ধ নি যুক্ত
করা সত্ত্বেও রাগটি ভূপালীর তুলনায় অপ্রচলিত।
পরিশেষে বক্তব্য এই যে, আমাদের দেশের প্রাচীন গ্রন্থাদি পাঠ
করলে স্বতঃই ধারণা জন্মায়, সেকালের গুণী-জ্ঞানীগণ যেমন ছিলেন
বৈচিত্র্যবিলাসী তেমনি ছিলেন সত্য-নিষ্ঠ। অর্থাৎ নিরঙ্কুশ সত্যকেই
রূপায়িত করবার চেষ্টা করতেন তাঁরা রস-মাধুর্যের সুষ্ঠু প্রয়োগ
পরিবেশনার দ্বারা। তারা অবয়বের মহিমা কীর্তন করতেন রাগরূপকেই
ভিত্তি করে—ভিত্তিটাকে ভুলে গিয়ে বৈচিত্র্যটাকেই ‘সত্য’ প্রতিপন্ন
করবার মতো বৃথা বকতেন না। কিন্তু

সঙ্গীত পারিজাত ২১৭
দৈন্য বা করুণ রসের অভিব্যঞ্জক ( স্বর বা শ্রুতি ) হচ্ছে করুণা জাতীয়া।
বীভৎস, ভয়ানক ও ( অধিকন্তু ) হাস্য ও শৃঙ্গার রসের ক্ষেত্রেও মধ্যা
জাতীয়া ( স্বর বা শ্রুতি ) প্রযোজ্যা। ৪৭১-৭২
টিপ্পনী : পারিজাতের ৯৪-৯৬ সূত্রে এই শ্রুতি জাতির কথা উল্লিখিত
হয়েছে। রাগাধ্যায়ের শেষে গ্রন্থকার আবার এ সম্বন্ধে আলোচনার সুযোগ
গ্রহণ করেছেন, সম্ভবতঃ এই পঞ্চ-শ্রুতি-জাতির বিশেষত্ব সম্বন্ধে তাঁর পাঠক-
বর্গকে সচেতন করবার উদ্দেশ্যেই। ৪৭১-৭২
তত্তজ্জাতিরসৈরেব স্বরাস্তত্তদ্রসাত্মকাঃ।
তাদৃশাংশ গ্রহন্যাসৈ রাগৈস্তত্তদ্রসাত্মতা ॥ ৪৭৩
এই “জাতি”গুলি যথাযথভাবে প্রযোজিত হলে, স্বরগুলিও স্বাভাবিক-
ভাবেই সেই সব “রসের” অভিব্যঞ্জক হয়ে পড়ে। অর্থাৎ, এইসব “রসের”
অভিব্যঞ্জক স্বরগুলি রাগের মধ্যে গ্রহ, অংশ, ন্যাসস্বর রূপে বিরাজ করে বলেই,
সেই রাগগুলিও সেইসব “রসের” অভিব্যঞ্জক হয়ে থাকে। ৪৭৩
টিপ্পনী : পারিজাতের ৭৩-৭৮ সংখ্যক সূত্রের টিপ্পনীতে আমরা বিশদ-
ভাবেই আলোচনা করেছি—রাগের প্রয়োজনে যখন যে শ্রুতিটির উপর দাঁড়াবার
দরকার হয়, সেই শ্রুতিটিই তখন স্বরনাম গ্রহণ করে। যেমন, অধুনা প্রচলিত
মুলতান ও তোড়ি উভয় রাগেই কোমল জ্ঞ ব্যবহৃত হয়; কিন্তু শ্রুতির
দিক দিয়ে বিচার করলে দেখা যাবে, স্বরনাম হিসাবে এই কোমল জ্ঞ
স্বরটি অভিন্ন হলেও, শ্রুতি হিসাবে ভিন্ন। এবং এই শ্রুতির মাধ্যমেই
ভিন্ন “রস” প্রকাশ পেয়ে থাকে দুটি রাগের মধ্যে—স্বর-নাম এক হওয়া
সত্ত্বেও। আলোচ্য সূত্রে পারিজাতকার বলছেন, কীভাবে শ্রুতিগুলি তথা
স্বরগুলি বিভিন্ন “রসের” অভিব্যঞ্জক হয়ে থাকে। কিন্তু, বক্তব্যটির মধ্যে
বিভ্রান্ত হবারও অবকাশ আছে। মনে রাখতে হবে, কেবলমাত্র কোন
একটি স্বরের প্রয়োগ দ্বারাই কোন ‘রস’ সৃষ্টি করা যায় না। ‘রসের’
পরিচয় পাওয়া সম্ভবপর হতে পারে কেবলমাত্র রাগের মাধ্যমেই। অর্থাৎ,
রাগের মধ্যে যে যে শ্রুতি বা স্বর গ্রহ, অংশ বা ন্যাসরূপে প্রযোজিত হয়ে
রসসৃষ্টি করছে, শিল্পী ও শ্রোতার পক্ষে সেগুলিকে প্রত্যক্ষ করা সম্ভবপর হতে
পারে; এবং তখনই কেবল, সেই স্বর বা শ্রুতিগুলি দীপ্তা, আয়তা,
করুণা, মৃদু বা মধ্যা জাতীয়া “রসের” প্রতীকরূপে পরিচিত হয়ে পড়ে।
১৫

২১৮ সঙ্গীত পারিজাত
আজকের দিনে অবশ্য, গ্রহ-অংশ ন্যাস স্বরের স্থান গ্রহণ করেছে বাদী-
সমবাদী স্বর, কিন্তু, তার জন্য “রসের” প্রতীক স্বরকে চিতে অসুবিধা
হয় না। ৪৯৩
পূর্ব-কোমল-তীব্রৈশ্চ তথা তীব্রতরেণ চ।
অতি-তীব্রতমেনৈব সর্বে রাগা উদীরিতা ॥ ৪৯৪
রিঞ্চ পূর্বং তথা তীব্রং তীব্রতরঞ্চ গ-স্বরম্।
তীব্রতমং তথা গঞ্চ মঞ্চ তীব্রং স্বরং তথা ॥ ৪৯৫
মঞ্চ তীব্রতমং ধঞ্চ পূর্ব্বাখ্যং তীব্রসংজ্ঞিতম্।
তীব্রতরং নিষাদঞ্চ তীব্রতমঞ্চ নি-স্বরম্ ॥ ৪৯৬
ইত্যেতাংশ্চ দশ ত্যক্ত্বা রাগলক্ষণমীরিতম্ ॥ ৪৯৭।১
পূর্ব, কোমল, তীব্র, তীব্রতর ও অতি-তীব্রতম— এই পাঁচটি বিকৃত স্বর-নামযুক্ত
রাগের আলোচনাই (আলোচ্য রাগাধ্যায়ের মধ্যে) সীমিত করা হলো।
এবং—
পূর্ব-রে, তীব্র-রে, তীব্রতর-গা, তীব্রতম-গা, তীব্র-মা, তীব্রতম-মা, পূর্ব-ধা,
তীব্র-ধা, তীব্রতর-নি ও তীব্রতম-নি—এই দশটি বিকৃত স্বর-নামযুক্ত কোন
রাগের আলোচনা (আলোচ্য রাগাধ্যায়ের মধ্যে) করা হলো না। ৪৯৪-৯৭।১
টিপ্পনী: আলোচ্য গ্রন্থের মধ্যে পারিজাতকার যে ১২১টি রাগের পরিচয়
দিয়েছেন, সেগুলিকে বোঝাবার জন্য তিনি মাত্র পাঁচটি বিকৃত স্বর-নাম
ব্যবহার করেছেন। যেমন—
১। পূর্ব গা হিসাবে শুদ্ধ রে স্বরের উল্লেখ করেছেন, মূর্ছনার কারণে।
২। কোমল রে-ধা স্বরের উল্লেখ করেছেন সাধারণ আইন অনুযায়ী।
৩। তীব্র গ,-নি স্বরেরও উল্লেখ করেছেন সাধারণ আইন অনুযায়ী।
৪। তীব্রতর মা ও ধা স্বরের উল্লেখ করেছেন, কড়ি-মা ও (পারিজাতের)
শুদ্ধ নি স্বরদুটিকে বোঝাবার জন্য। এখানে মনে রাখতে হবে, বর্তমানে তীব্র-
মা অর্থে কড়ি-মা স্বরটিকে বোঝালেও পারিজাতের কড়ি-মা ছিল তীব্রতর।
অর্থাৎ এক শ্রুতি বেশী। ধা-ও ছিল এক শ্রুতি বেশী।
৫। অতি-তীব্রতম গা হিসাবে শুদ্ধ মা স্বরের উল্লেখ করেছেন, মূর্ছনার
কারণে।
সদ্য সমাপ্ত রাগাধ্যায়ের টিপ্পনীগুলির সঙ্গে, পূর্বোক্ত ১৪-১৬ সংখ্যক সূত্রের

সঙ্গীত পারিজাত ২১৯
শেষে আমরা যে স্বর-শ্রুতি-মণ্ডল চিত্রটি এঁকে দিয়েছি, সেই চিত্রটি মিলিয়ে
দেখলেই, অহবলের আলোচ্য বক্তব্যটি পাঠকদের নিকট আরও সুস্পষ্ট হবে।
বলা বাহুল্য, একই স্বর তথা শ্রুতি একাধিক নামে অভিহিত হওয়ার ফলে, যাতে
গোলযোগের সৃষ্টি না হয়, সেই জন্যই রাগাধ্যায়ের মধ্যে পারিজাতকার আবার
সচেতন করে দিচ্ছেন তার পাঠকবর্গকে। ৪৯৪-৯৭।১
দ্বাদশভির্বিকারাদ্যৈঃ শুদ্ধৈশ্চ সপ্তভিঃ স্বরৈঃ ॥ ৪৯৭-২
এতৈঃ ক্লপ্তা প্রসিদ্ধা যে ত এবাত্র প্রকীর্তিতাঃ।
তত্তদ্দেশে চ তৈঃ ক্লপ্তা রাগা অপি প্রতিষ্ঠিতাঃ ॥ ৪৯৮
১২-টি বিকৃত স্বর (নাম) ও ৭ টি শুদ্ধ স্বর, সাকুল্যে এই ১৯-টি স্বরের সাহায্যে
যে ১২২টি প্রসিদ্ধ রাগ নিষ্পন্ন হয়, আলোচ্য রাগ-প্রকরণের মধ্যে কেবল তাদেরই
লক্ষণাদি বর্ণিত হলো। আমাদের পরিত্যক্ত, দশটি বিকৃত স্বর ( নামের )
সাহায্যেও অন্যান্য দেশে রাগ বর্ণনার ব্যবস্থা আছে। ৪৯৭।২-৪৯৮
টিপ্পনী : প্রাচীন ভারতীয় সঙ্গীতের মূর্চ্ছনা-বিজ্ঞান অনুযায়ী, কীভাবে
একই স্বর একাধিক নামে অভিহিত হয়ে ২৯-টি পর্যন্ত নাম গ্রহণ করে থাকে, সে
সম্বন্ধে আমরা ৭৩-৭৮ সংখ্যক সূত্রের টিপ্পনীতে বিশদভাবেই আলোচনা করেছি।
ব্যাপারটাকে অধিকতর সুস্পষ্ট করবার জন্য ৯৮-৯৯ সংখ্যক সূত্রের শেষে একটি
শ্রুতি-স্বর-মণ্ডল চিত্রও এঁকে দিয়েছি। পারিজাত পাঠক যদি এই টিপ্পনীগুলিকে
স্মরণে রেখে, আলোচ্য অধ্যায়ের মধ্যে বর্ণিত রাগগুলির টিপ্পনী যথাযথভাবে
অনুসরণ করেন, তাহলেই বুঝতে পারবেন, কীভাবে আমাদের অতি-পরিচিত
৫-টি বিকৃত ও ৭টি শুদ্ধ, সাকুল্যে ১২-টি মাত্র স্বর পারিজাতের মধ্যে
( ২৯ - ১০ = ) ১৯-টি নামে অভিহিত হয়েছে। অর্থাৎ, পারিজাতকার আসলে
১২-টি মাত্র স্বরের সাহায্যেই ১২২-টি রাগের পরিচয় লিপিবদ্ধ করেছেন, কিন্তু
মূর্চ্ছনার আইন বজায় রাখবার জন্য স্বর-নাম ব্যবহার করেছেন ১৯-টি।
পারিজাতের মধ্যে আরও দশটি বিকৃত স্বর-নামের উল্লেখ থাকা সত্ত্বেও
( ১৯ + ১০ = ২৯ ) অহোবল সে দশটি বিকৃত স্বর-নামের সাহায্যে কোন রাগের
বর্ণনা করেন নি; কিন্তু বলেছেন, এই ( বর্জিত ) দশটি নামের সাহায্যে অন্যান্য
দেশে রাগালোচনার ব্যবস্থা আছে। বলা বাহুল্য, অন্যান্য দেশ অর্থে পারিজাতকার
কোন অ-ভারতীয় দেশের কথা বলেন নি। বস্তুতঃ, ভারতবর্ষ ব্যতীত অন্য
কোন দেশেই পূর্ব-রে, তীব্র-রে জাতীয় স্বর-নামের সাহায্যে সঙ্গীতালোচনার

২২০ সঙ্গীত পারিজাত

ব্যবস্থা নেই। কিন্তু এই অজুহাতে, উক্ত অন্যান্য দেশগুলিকে কর্ণাটক সঙ্গীত-
পদ্ধতির অনুসরণকারী দেশ মনে করলেও ভুল করা হবে। সম্ভবতঃ, অহোবলের
সমসাময়িক কালে এমন কোন ভারতীয় সঙ্গীত-গ্রন্থের অস্তিত্ব ছিল বা এমন কোন
ভারতীয় সঙ্গীত-পদ্ধতি প্রচলিত ছিল, যার মর্যাদা রক্ষার জন্যই পারিজাতকার
অন্যান্য দেশের কথা উল্লেখ করে গেছেন। কিন্তু, আপাততঃ আমাদের মনে
রাখতে হবে—
১। হিন্দুস্থানী ও কর্ণাটক, উভয় পদ্ধতির অনুসরণকারী যত কিছু সঙ্গীত-
গ্রন্থ আজ পর্য্যন্ত পাওয়া গিয়েছে, তার মধ্যে এমন রাগ একটিও আলোচিত হয়নি
যার ব্যাখ্যাকার্থের জন্য অহোবল ব্যবহৃত ১৯টি স্বর-নামযুক্ত স্বর তথা শ্রুতি
ছাড়াও, অধিকন্তু হিসাবে, (তাঁর উদ্ধৃত অথচ বর্জিত ) দশটি স্বর-নামযুক্ত স্বর
তথা শ্রুতির কোন একটিকেও প্রয়োজন হতে পারে। নামের দিক্ দিয়ে অবশ্য
কর্ণাটকদের সঙ্গে হিন্দুস্থানীদের স্বর-শ্রুতি নামের অনেক পার্থক্য পরিলক্ষিত
হয়; কিন্তু আমাদের আলোচ্য বিষয়, উপরোক্ত ১৯-টি শ্রুতি তথা স্বরের
ব্যবহারজনিত অস্তিত্ব।
২। ভারতীয় সঙ্গীতের অন্তর্গত তিন গ্রামের কথা সকল গ্রন্থকারই উল্লেখ
করে গেছেন। সোমনাথের মতো কেউ কেউ শ্রুতি তথা স্বরের ভিত্তিতে নয়
শতাধিক আনুমানিক মেল্-এর কথাও বলে গেছেন। কিন্তু, নিরঙ্কুশ ষড়জ-গ্রাম
ব্যতীত অন্য দুটি গ্রামের ভিত্তিতে উদ্ভূত কোন রাগের আলোচনা কেউই করেন
নি। কয়েকটি গান্ধার ও মধ্যম বাদীস্বরযুক্ত রাগের আলোচনা করতে গিয়ে
কোন কোন গ্রন্থকার যদিও বা বলেছেন রাগগুলি গান্ধার ও মধ্যম গ্রামের
অন্তর্ভূক্ত, কিন্তু, ব্যাখ্যাকার্থের ভিত্তিস্বরূপ কেউই গান্ধার ও মধ্যম গ্রামের
মূর্ছনাকে অবলম্বন করেন নি—নির্বিবাদেই গ্রহণ করেছেন ষড়জ গ্রামের।
সুতরাং, অহোবলের বর্জিত দশটি বিকৃত স্বর-নাম ও অন্যান্য দেশের প্রচলিত
সঙ্গীত-পদ্ধতি সম্বন্ধে, আজ নিশ্চিতভাবে কোন কিছু বলার অসুবিধা আছে
বলাই বাহুল্য। ৪৯৭-২।৪৯৮
ইতি রাগ-প্রকরণম্।

প্রবন্ধ লক্ষণম্
অনিবদ্ধং নিবন্ধঞ্চ সঙ্গীতং দ্বিবিধং স্মৃতম্।
অনিবদ্ধন্তু তৎ প্রোক্তং নিবন্ধমধুনোচ্যতে ॥ ৪৯৯
অনিবদ্ধ ও নিবন্ধ ভেদে সঙ্গীত দু’রকমের হয়। ইতিপূর্বে অনিবদ্ধ সঙ্গীত
সম্বন্ধে বলা হয়েছে। এইবার নিবন্ধ সঙ্গীত সম্বন্ধে আলোচনা করা যাচ্ছে। ৪৯৯
টিপ্পনী : আলোচ্য সূত্রে পারিজাতকার বলছেন, অনিবদ্ধ সঙ্গীত সম্বন্ধে
আলোচনা করা হয়ে গেছে। কিন্তু, কোথায় কোন্ কোন্ সূত্রের মাধ্যমে এ
আলোচনা পরিবেশিত হয়েছে, আমরা খুঁজে পাচ্ছি না। অবশ্য, ইতিপূর্বে বর্ণিত
রাগগুলি অহোবল কর্তৃক নিরংশ রাগ হিসাবে আলোচিত হয়েছে, কোন
গীতিপদ্ধতির বিষয়-বস্তুরূপে চিহ্নিত হয়নি। কিন্তু, অনিবদ্ধ সঙ্গীত অর্থে কি
কেবলমাত্র নিবন্ধের বিপরীত-ধর্মী সঙ্গীত বোঝায়?
সঙ্গীত পারিজাত যে সঙ্গীত রত্নাকরের পরবর্তী কালে রচিত গ্রন্থ তার অসংখ্য
প্রমাণ পারিজাতের মধ্যেই আছে। সুতরাং, অহোবলের মতো পণ্ডিত ব্যক্তি
নিবন্ধ সঙ্গীতের আলোচনা আরম্ভ করবার পূর্বে অনিবদ্ধ সঙ্গীত সম্বন্ধে একটিও
কথা বলবেন না, এমন অনুমান অশ্রদ্ধেয়। আমাদের মনে হয়, পারিজাতের
অনিবদ্ধ সঙ্গীত সম্পর্কিত সূত্রগুলি নষ্ট হয়ে গেছে।
কিন্তু, অনিবদ্ধ ও নিবন্ধ পদ্ধতির মধ্যে পার্থক্য কী?
আজকের দিনের সঙ্গীত-রসিকদের নিকট থেকে, এ প্রশ্নের সব চাইতে সহজ
সরল প্রচলিত উত্তর যা পাওয়া যায় তা হচ্ছে,—যখন কোন রাগ অর্থহীন
শব্দযুক্ত হয়ে, তালহীন অবস্থায় আলাপিত হয়, অথবা (মতান্তরে) অর্থযুক্ত
মন্ত্রপাঠের মতো বা ছড়া-গান গাওয়ার মতো তালহীন অবস্থায় পরিবেশিত হয়,
তখনই তাকে “আলাপ” অঙ্গের সঙ্গীতরূপে চিহ্নিত ক’রে, প্রাচীন অনিবদ্ধ
সঙ্গীতের পর্যায়ভুক্ত করা যেতে পারে। এবং, যখন কোন রাগ গান বা বাজনার
মাধ্যমে তালবদ্ধ অবস্থায় পরিবেশিত হয়, তখন তাকে প্রাচীন নিবন্ধ-গীতি
পদ্ধতির অনুরূপ একটা পদ্ধতিরূপে গ্রাহ্য করা হয়।
নিবন্ধ গীতি-পদ্ধতি সম্বন্ধে পারিজাতের পরবর্তী সূত্রগুলির মধ্যে অনেক
কিছুই আলোচিত হয়েছে; অতএব, আপাততঃ আমরা অনিবদ্ধ গীতি-পদ্ধতি
সম্পর্কেই কিঞ্চিৎ আলোচনার সুযোগ গ্রহণ করছি :—

পারিজাতের ৩৩৮ সূত্রের টিপ্পনীতে, দুর্গাশক্তির উদাহরণ স্থাপন করে আমরা
বলেছি, অনিবদ্ধ পদ্ধতি একদা গান্ধর্ব্বর অন্তর্গত ছিল। প্রসঙ্গতঃ উল্লেখযোগ্য
যে, পরবর্তী কালের দেশী গীতি-পদ্ধতির প্রায় পনের আনা অংশই সুপ্রাচীন
গান্ধর্ব্ব থেকে মার্গিত হয়েছিল। কিন্তু, বর্তমানের বাজার চালু রাগালাপের
আদি-গেহত্ব উক্ত গান্ধর্ব্বর অন্তর্গত অনিবদ্ধ পদ্ধতির সঙ্গে কী পরিমাণ সম্পর্কযুক্ত
সে সম্বন্ধে যথাযথ আলোচনার অসুবিধা অনেক। যেমন—
আমাদের প্রথমেই দেখতে হবে যে-গান্ধর্ব্বের মধ্যে অনিবদ্ধ পদ্ধতিকে পাওয়া
যাচ্ছে সেই গান্ধর্ব্বের মধ্যে আবার ‘আলাপ’ কথাটাকেও পাওয়া যায় কি
না? অর্থাৎ, যদি দেখা যায়, গান্ধর্ব্বের মধ্যে অনিবদ্ধ ও আলাপ এই দুটি
পরিভাষা একই সঙ্গে অস্তিত্ব রক্ষা করছে তাহলে তাদের সংজ্ঞা-পার্থক্যটাও
স্বাভাবিকভাবেই যুক্তি-গ্রাহ্য হয়ে পড়বে। কিন্তু, মুস্কিল হচ্ছে এই যে,
গান্ধর্ব-বেদের অস্তিত্ব নিঃশেষে বিলুপ্ত। এ সম্বন্ধে যৎকিঞ্চিৎ যা কিছু জানা
যায় তা সবই বহু পরবর্তী কালের সঙ্গীত গ্রন্থাদির উদ্ধৃতি বা সংকলনের
মাধ্যমে। পরন্তু, এই সব সঙ্গীত গ্রন্থের মধ্যে অনিবদ্ধ ও আলাপের ঔপপত্তিক
বিষয়বস্তুসমূহ এমনই অ-সুষ্ঠুভাবে পরিবেশিত হয়েছে যে, প্রামাণিক
উদাহরণ স্থাপন করে বলবার উপায় নেই--গান্ধর্ব পদ্ধতির মধ্যে আলাপের
অস্তিত্ব নিশ্চয়ই ছিল না কিংবা ছিল এবং অনিবদ্ধ ও আলাপ অভিন্ন অথবা
ভিন্ন সংজ্ঞার বিষয়বস্তু। অপরপক্ষে, গান্ধব্বর মধ্যে আবার এমন ‘গেয়’
অংশ পাওয়া যাচ্ছে যার প্রয়োগ বৈশিষ্ট্য ছিল পরবর্তী কালের ‘গাথা’র অনুরূপ।
অর্থাৎ, যা তালের দ্বারা নিবদ্ধ তো থাকতোই না অধিকন্তু নির্দিষ্ট কোন
ছন্দেরও ধার ধারতো না। অতএব বিবেচ্য, গান্ধর্ব্বর এই ‘গেয়’ অংশটি
পরিচিত হতো কোন সংজ্ঞায়—অনিবদ্ধ না আলাপ?
আলাপ সম্বন্ধে প্রাচীন সঙ্গীত গ্রন্থাদির বিবরণ পাঠ করে আমাদের ধারণা
জন্মেছে, আলাপ কথাটা দেশী সঙ্গীতের ক্ল্যাসিক্যালত্ব প্রাপ্তির পূর্বে থেকেই
প্রচলিত ছিল। দেশী সঙ্গীতের আমলে আলাপ নামান্তরিত হয় আলপ্তি-তে
এবং এই আলপ্তিই আবার আলাপ নামে অভিহিত হতে আরম্ভ করে রত্নাকর-
পরবর্তী যুগে। অবশ্য, গান্ধর্ব্বর আমলে আলাপের অস্তিত্ব ছিল কি না, এমন
[

সঙ্গীত পারিজাত ২২৩
কথাটার ব্যবহার কতদিনের প্রাচীন? বস্তুতঃ 'আলাপাদি' কথাটার ব্যবহার
নাট্যশাস্ত্র (২০০-৪০০ খৃঃ পূঃ) ও বৃহদ্দেশীর (৩০০-৭০০ খৃঃ অঃ) মধ্যবর্তী কালে
সুপ্রচারিত ছিল এবং রত্নাকর ও প্রাক্-রত্নাকর যুগের গ্রন্থাদির মধ্যে আলাপ,
আলপ্তি, অনিবদ্ধ ও অনিযুক্ত (পরবর্তী ৫১১-৫১৩ সূত্র দ্রষ্টব্য) পদ্ধতির
উদাহরণ এমন ভাবে পত্রস্থ হয়েছে যে ন্যায়শাস্ত্র অনুযায়ী তর্কের মীমাংসা হওয়া
সম্ভবপর নয়।
অবশ্য, এ প্রমাণ আমরা পাই যে, গান্ধর্ব্বের আমলে রাগ কথাটার উৎপত্তিই
হয়নি; তখন রাগ অর্থে জাতি বোঝাতো। কিন্তু 'রাগ-গায়নের' মতো
'জাতি-গায়নে'র ওপর যদি আমরা গুরুত্ব আরোপ করি তাহলে উক্ত 'জাতি-
গায়নে'র বিষয়বস্তু হিসাবে কেবলমাত্র তো নিবদ্ধ বস্তুকেই বোঝাবে না—
অ-নিবদ্ধ, আলাপ প্রভৃতি সব কিছুই উক্ত 'গায়নে'র মধ্যে থাকতে বাধ্য।
অথচ, মুস্কিল এই যে, প্রাচীন জাতি কেমন করে রাগরূপ পরিগ্রহ করেছিল সে
সম্বন্ধে আমরা যদিও বা একটা রূপান্তরের ইতিহাস খুঁজে বার করতে পারি,
কিন্তু, গান্ধর্ব্ব “অনিবদ্ধ” এবং “আলাপ” কোন কোন স্তর অতিক্রম করে,
ঠিক কোন সময়, পরবর্তী কালের দেশী সঙ্গীতের “আলপ্তির” মতো, গ্রহস্বরকে
ভিত্তি করে, অংশস্বরসমূহের অল্পত্ব-বহুত্ব বজায় রেখে, সন্ন্যাস-বিন্যাস
অপন্যাসাদির বেড়াজাল ভেদ করে, ন্যাস স্বরে এসে লীন হতো, সে সম্বন্ধে
কোন নির্ভরযোগ্য সিদ্ধান্তেই উপনীত হতে পারছি না। বস্তুতঃ, সুপ্রাচীন
অনিবদ্ধ পদ্ধতির স্বরূপ সন্ধানের পথে অন্তরায়রূপে বিরাজ করছে এই ধরণের
আরও অজস্র সমস্যা।
আলোচ্য সমস্যার মধ্যে সর্বপ্রধান সম্ভবতঃ—গান্ধর্বের সংজ্ঞা ও তার
বিবর্তনের বিবরণ। দেখা যাচ্ছে গান্ধর্ব-গীতির পরিচয় প্রসঙ্গে নাট্যশাস্ত্রকার
ভরত 'পদের' ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন। এ ক্ষেত্রে গীত অর্থে আমরা
স্বর + তাল + পদ = সতাল সুছন্দযুক্ত নিবদ্ধ গীতকে পেতে পারি কিংবা স্বর +
পদ = অতাল যথেচ্ছ-ছন্দযুক্ত অ-নিবদ্ধ গীতকেও পেতে পারি এবং এই অ-তাল
অ-নিবদ্ধকে আলাপ নামেও অভিহিত করতে পারি আজকেকার সাঙ্গীতিক
সংস্কার অনুযায়ী। কিন্তু, সুপ্রাচীন গান্ধর্ব-গীতিবিজ্ঞান কি পরবর্তী যুগের
প্রবন্ধ (নিবদ্ধ) গীতি-বিজ্ঞানের অনুরূপ ছিল?
এই প্রসঙ্গে 'গীত' এবং 'পদের' সংজ্ঞাটীও বিবেচ্য। আমরা গান্ধর্ব-গীতি
কথাটির সঙ্গেই পরিচিত; গান্ধর্ব-সঙ্গীতের উল্লেখ কখনো পাইনি। এ দিক

১২৪ সঙ্গীত পারিজাত
দিয়ে বিচার করলে, গান্ধর্ব-গীতি কেবলমাত্র কণ্ঠ-সঙ্গীতেরই বিষয়বস্তু ছিল
এবং নিবদ্ধ-অনিবদ্ধ-ভেদে তার পদগুলিও অর্থবহ ছিল নিশ্চয়ই। কিন্তু,
নাট্যশাস্ত্রে দেখা যায় ভরত যন্ত্র-বাদনকেও গীতরূপে অভিহিত করেছেন এবং
সঙ্গে সঙ্গেই জানিয়ে দিয়েছেন, এ গীতের ভাষা নেই। অর্থাৎ, গীত অর্থে
এখানে সঙ্গীতকেই বোঝাচ্ছে এবং পদ বলতে বোঝাচ্ছে অক্ষর-বিন্যাসকে—যার
ভাষা অর্থবহ কিংবা অর্থহীন দুই হতে পারে। অতএব, এই পদের সাহায্যে
আমরা কণ্ঠসঙ্গীতের ক্ষেত্রে কাব্যধর্মী অর্থবহ ( নিবদ্ধ ? ) ভাষাকে পেতে
পারি। তোম্ নোম্ নেতে তেরিন্ মতো ( অনিবদ্ধ ? ) আলাপকে পেতে
পারি অথবা বীণা-যন্ত্রের ঘেনে নেনে-র দ্বারা আলাপ, জোড়, তার-পরন
প্রভৃতি আলাপ ( অনিবদ্ধ ? ) গৎ ( নিবদ্ধ ? ) পেতে পারি। কিন্তু, ব্যাপারটা
যদি এতই সহজ সরল হবে তাহলে অতগুলি সঙ্গীত গ্রন্থের মধ্যে অত রকমভাবে
দেশী ও গান্ধর্বের ভেদাভেদ নির্ণয়ের প্রচেষ্টা পরাস্ত হলো কেন! বিশেষতঃ,
দেশী সঙ্গীতের আলপ্তির মধ্যে 'অনক্ষ

বিবেচনা করে রত্নাকরের অন্যতম টীকাকার কল্লিনাথ মন্তব্য করে গেছেন,
“অনাদি সম্প্রদায়” কথাটির প্রয়োগ দ্বারা প্রমাণিত হচ্ছে, এই গান্ধর্ব-গীতির
ব্যাপারটা বেদের মতোই অপৌরুষেয়। অর্থাৎ অপৌরুষেয় বেদের মতো এই
গান্ধর্ব-গীতিপদ্ধতিও কোন কিছু পরিবর্তন করবার অধিকার কারুর নেই।
অথচ, এই রত্নাকরের মধ্যেই আবার ভরত, মতঙ্গ, পরমর্দি প্রমুখ সঙ্গীত-
শাস্ত্রকারদের মন্তব্য এমনভাবে উল্লিখিত হয়েছে যার সাহায্যে নিশ্চিতভাবেই
প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে, গান্ধর্ব-গীতিপদ্ধতি ইতিমধ্যে একাধিকবার সমাদৃত তথা
সুসংস্কৃত হয়েছিল। অপর পক্ষে—
প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে, সুপ্রাচীন গান্ধর্ব-গীতিপদ্ধতি এবং গান্ধর্ব থেকে মার্গিত
হয়ে যে মার্গ-সঙ্গীত রত্নাকরের পূর্ববর্তী আমলে প্রতিষ্ঠালাভ করেছিল, সেই
গান্ধর্ব এবং মার্গপদ্ধতি দুটি রত্নাকরের আমলেই নিঃশেষে বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল।
কিন্তু, তদানীন্তনকালে প্রচলিত দেশী পদ্ধতির “আলপ্তি”র কোন কোন অংশ
বিলুপ্ত গান্ধর্ব ও মার্গপদ্ধতির “আলাপ” বা “অনিবদ্ধ” (?) অংশ থেকে মার্গিত
হয়েছে, সে সম্বন্ধে গ্রন্থকারের তথা তাঁর টীকাকারদ্বয়ের ভাষ্য দুর্বোধ্য। বিশেষতঃ
বিলুপ্ত গান্ধর্বের অনিবদ্ধ অংশ কোন অজুহাতে, কী কী স্থান দান করে দেশী
পদ্ধতির মধ্যে প্রতিষ্ঠালাভ করল, তার তথ্য-তত্ত্বাদি যেমনি সংক্ষিপ্ত তেমনি
দুর্বোধ্য। অর্থাৎ, ভারতীয় সঙ্গীতের ঐতিহাসিক তথ্য আহরণের ক্ষেত্রে
প্রত্যক্ষভাবে বিপর্যয় ঘটিয়েছে প্রাচীন সঙ্গীত গ্রন্থ রচয়িতাদের কালধর্ম সম্পর্কে
সচেতনতার অভাব এবং পরোক্ষে বাদ সেধেছে প্রাচীন তথ্য-তত্ত্বাদি সম্পর্কে
তাঁদের অহেতুক শ্রদ্ধাবোধ। যার ফলে, আমাদের দেশের সঙ্গীত গ্রন্থগুলি
সংকলন গ্রন্থরূপেই গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছে, ইতিহাস হিসাবে প্রামাণ্য হয়ে
ওঠেনি।
আমরা যদি আমাদের দেশের প্রাচীন ইতিহাস জানবার চেষ্টা করি, তাহলে,
প্রথমেই যে সত্যটার সঙ্গে পরিচিত হয়ে পড়ি সেটা হচ্ছে “দ্যো পিতা পৃথিবী
মাতা”। পৃথিবী অর্থে এখানে সেই দেশটাকেই বোঝাচ্ছে, পরবর্তী কালে যার
নাম হয়েছিল ভারতবর্ষ এবং আজকের মতো সেদিনও যার আয়তন ছিল
“তাবৎ ত্রিকোণা”। অর্থাৎ, এ দেশটা হচ্ছে আমাদের মাতৃভূমি—পিতৃদেবরা
এসেছিলেন কোন একটা “দ্যো” নামক জায়গা থেকে। বর্তমানে আমরা যেমন
মার্কিনী নাগরিকত্ব গ্রহণ করেও বাঙ্গালী থেকে যাই, তেমনি সেদিন দ্যো নামক
স্থানের আদিম অধিবাসী হিসাবে আমাদের ভারতীয় পিতৃদেবরাও ছিলেন

২২৬ সঙ্গীত পারিজাত
“দেবতা”। এই দেবতারা বিজয়ীর ভূমিকা গ্রহণ করে এদেশে আধিপত্য বিস্তার
করেছিলেন বলেই তাঁরা আর্য বা প্রভুরূপে প্রখ্যাত এবং বলাই বাহুল্য, বিজিত
হয়েছিলেন যাঁরা তাঁরাই বেদ পুরাণাদিতে কুখ্যাত হয়েছেন অনার্যরূপে।
আর্যগণ কর্তৃক বিজিত হয়ে এদেশের রক্ষ, যক্ষ, দ্রাবিড়, কিন্নর, গন্ধর্ব, শবর,
কিরাত প্রভাত যেখানে যত সম্প্রদায় ছিল, সকলেই তাদের রাজনৈতিক
স্বাধীনতার সঙ্গে সঙ্গে কুলগত ঐতিহ্যও বিসর্জন দিতে আরম্ভ করে নূতন কালের
নতুন দেবতাদের সমগোত্রীয় হবার প্রলোভনে বা বাধ্য হয়ে। এই সব কুলগত
ঐতিহ্যের মধ্যে গন্ধর্বদের গীতি-পদ্ধতি ছিল অন্যতম। যতদূর মনে হয়, তখনকার
প্রাক্-বৈদিক ভারতবর্ষে গন্ধর্বদের এই গীতি-পদ্ধতিটাই ছিল ক্লাসিক্যাল কলা-
বিজ্ঞান হিসাবে একমাত্র মান্য ও প্রামাণ্য। অবশ্য, বাজার-চালু সাধারণ গান-
বাজনার অভাব ছিল না সে সময়; কিন্তু, গন্ধর্বদের সাঙ্গীতিক ঐতিহ্যটা
সর্বজন-শ্রদ্ধেয় ছিল এই কারণে যে এই গীতি-পদ্ধতি আদৌ গণদেবতার
মনোরঞ্জনের জন্য ব্যবহৃত হতো না, নানাবিধ অভ্যুদয়প্রদ: আভিচারিক উদ্দেশ্য
সাধনের ক্ষেত্রেই প্রযোজিত হতো। এবং বলাই বাহুল্য, কার্যোদ্ধারের
প্রয়োজনে বিজয়ী আর্যরা বিজিত গন্ধর্বদের এই সাঙ্গীতিক নৈপুণ্যটাকে আত্মসাৎ
করবার চেষ্টা করেছিলেন। অর্থাৎ তদানীন্তন আর্যাবর্তের ইন্দ্র বরুণ উপাধিধারী
দেশ-শাসকরা নিজেদের স্ফটিক প্রাসাদাদি নির্মাণের জন্য যেমন অনার্য
ময়দানবদের কাজে লাগাতেন, বংশবৃদ্ধির নিগূঢ় কারণে বিশেষভাবে বহন
করতেন অনার্য নারীদের, তেমনি তন্ত্রত্ব রক্ষাকামী আর এক শ্রেণীর চিন্তাশীল
সম্প্রদায়, তাঁদের নতুন ধর্মমতকে ফলপ্রসূ করবার উদ্দেশ্যে গন্ধর্বদের কুলগত
ঐতিহ্যটাকে কাজে লাগিয়েছিলেন। প্রমাণ, সাম-বেদ।
সেকালের মন্ত্রশক্তি একালের যন্ত্রশক্তির তুলনায় ক্ষীণ হয়তো ছিল, কিন্তু
হীন যে ছিল না তার প্রমাণ পাওয়া যায় বৈদিক ঋষিদের উদ্দেশ্য-প্রণোদিত
মন্ত্র সৃষ্টির ক্রমবর্ধমান সংখ্যা লক্ষ্য করলে। বৈদিক মন্ত্রদ্রষ্টারা গ্রামগেয়,
অরণ্যগেয় উহ এবং ঊহ্য নামক চারটি গীতি-পদ্ধতির সাহায্যে যজ্ঞ সম্পাদন
করতেন এবং বলাই বাহুল্য এই পদ্ধতি চতুষ্টয়ের মূল উপকরণ সংগ্রহ করেছিলেন
তাঁরা বিজিত গন্ধর্বদের নিকট থেকেই। ফলে, এদেশের সর্বজনমান্য ক্লাসিক্যাল
গীতি-পদ্ধতিরূপে এতকাল গন্ধর্বদের যে ঐতিহ্য ছিল সেটা সামগদের প্রাপ্য হয়ে
গেল এবং কপাল, কম্বল প্রভৃতি যে সব গান্ধর্ব-পদ্ধতির কল্যাণে সামগরা পথের
সন্ধান পেয়েছিলেন, সেই পদ্ধতিগুলো তদানীন্তন গীর্বাণ ভাষার মাধ্যমে পুঁথিগত

হয়ে বা সনাতনপন্থী কয়েকজন সঙ্গীতবিদের স্মৃতির ভাণ্ডারে কিছুকাল উজ্জীবিত
থেকে নিঃশেষে নির্বাণলাভ করল। বহু পরবর্তী কালের রত্নাকর প্রভৃতি সঙ্গীত
গ্রন্থাদিতে আমরা “ঝন্টুং ঝন্টুং খটাঙ্গধবং” প্রভৃতি যে সব ‘কপালের’ উল্লেখ
দেখতে পাই, সেগুলি নিতান্তই যে নকল-নবিশীর উদাহরণ, ‘কপালের’ নায়কী
এবং গায়কী, কোন কিছু সম্বন্ধেই যে গ্রন্থকারদের কোন রকম প্রত্যক্ষ ধারণা
ছিল না, তার সব চাইতে বড় প্রমাণ, নিবন্ধ পদ্ধতির বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের
প্রসঙ্গে অনিবদ্ধ পদ্ধতির অতি সংক্ষিপ্ত পরিচিতি। এই পরিচিতির মধ্যে
অনিবদ্ধ কেবলমাত্র নিবন্ধর বিপরীত পদ্ধতিরূপেই উদ্ধৃত হয়েছে—বৈজ্ঞানিক
বিশ্লেষণের মাধ্যমে যুক্তিগ্রাহ্য হয়ে বিন্দুমাত্রও আলোকপাত করেনি।
কিন্তু, এই সব সংকলন গ্রন্থের সাহায্যে, সামগদের আমলের সঙ্গীত কলা-
বিজ্ঞান যে কী পরিমাণ প্রগতিশীল ছিল, সে সম্বন্ধে অনেক কিছুই জানা যায়।
সামগরা ইতিপূর্বে গন্ধর্বদের নিকট থেকে যে সপ্তক পেয়েছিলেন তার স্বর এবং
শব্দ ছিল অভিন্ন, চিহ্নিত হতো উদাত্ত, অনুদাত্ত ও স্বরিত, এই তিনটি সংজ্ঞার
মাধ্যমে। যথোচিত অনুশীলনের ফলে, সংজ্ঞার সংখ্যাটা তিনের পরিবর্তে সাত
হয়ে গিয়ে নামান্তরগত হয় জাত্য, অভিনিহিত, ক্ষৈপ্র, প্রশ্লিষ্ট, তৈরোব্যঞ্জন,
তৈরোবিরাম এবং পাদবৃত্ত। কিন্তু, এই সাম-গানের কতটুকু অংশ অনিবদ্ধ ছিল
আর কতটুকু অংশ নিবন্ধ ছিল সে সম্বন্ধে আমরা কিছুই জানতে পারছি না।
কেবল জানতে পারছি, এই সময়কার সাম-গানের মধ্যে ধাতু, ছন্দ ও তালের
অস্তিত্ব বেশ ভালোভাবে ছিল।
যে পদ্ধতি একবার মার্গিত হয়, তার পক্ষে একাধিকবার মার্গিত হবার
সম্ভাবনা থাকেই। ফলে, কালক্রমে দেখা গেল, সুপ্রাচীন গান্ধর্বের মতো
সামগানের ঐতিহ্যও নষ্ট হবার উপক্রম করেছে। অর্থাৎ, সাম-গানের সঙ্গে সঙ্গে
যে নন্-ক্লাসিক্যাল সাধারণ গান-বাজনা চলে আসছিল এতদিন শিব, হূহু,
তম্বুরু প্রমুখ কয়েকজন প্রতিভাধর ব্যক্তির চেষ্টায়, সেই সাধারণ গান-বাজনা
অসাধারণের পর্যায় উন্নীত হবার উপক্রম করেছে প্রধানত ক্লাসিক্যাল সাম-
গানের গুপ্ত-ভাণ্ডার থেকে অনেক কিছু সাঙ্গীতিক বৈজ্ঞানিক উপকরণ আহরণ
করার ফলে। অতএব, সাম-গানের ঐতিহ্য যথাযথভাবে বজায় রাখবার সঙ্কল্প
গ্রহণ করে তদানীন্তনকালের গুণীজ্ঞানীরা একটা অভিনব পন্থা গ্রহণ করলেন।
ক্লাসিক্যাল-প্রয়াসী, জনসাধারণকে যদৃচ্ছা সাম অনুকরণের মোহ থেকে নিবৃত্ত
করবার সদুদ্দেশ্যে তাঁরা এক রকমের আধা-ক্লাসিক্যাল গীতি-পদ্ধতি উদ্ভাবন

২২৮ সঙ্গীত পারিজাত
করলেন এবং নারদ উপাধিধারী জনৈক বিশেষজ্ঞের ওপর দায়িত্ব অর্পণ করলেন
সেই নতুন পদ্ধতির গান গন্ধর্বদেরও শিক্ষা দেবার জন্য। অর্থাৎ, নারদের নিকট
থেকে শিক্ষাগ্রহণ করে গন্ধর্বরা যাতে সেই নতুন পদ্ধতির গান জনসাধারণের
মধ্যে প্রচলিত করে দেয় তারই ব্যবস্থা গৃহীত হলো।
ফল হলো কিঞ্চিৎ গোলমেলে। এই নতুন পদ্ধতির গান সামের মতো
ক্লাসিক্যাল তো ছিলই না, পরন্তু পরিকল্পিত হয়েছিল গণদেবতার সাঙ্গীতিক
প্রয়াস ভিন্নপথে পরিচালিত করবার নিগূঢ় উদ্দেশ্যে। প্রচারকদের ভূমিকায়
গন্ধর্বদের নিয়োগ ব্যবস্থাটাও ছিল অনুরূপ কূটনৈতিক উদ্দেশ্য-প্রণোদিত।
কিন্তু, ফল হলো একবারে আশাতীত। অর্থাৎ গন্ধর্বদের দ্বারা প্রচলিত হওয়ার
কল্যাণে এই আধা-লৌকিক আধা-ক্লাসিক্যাল গীতি-পদ্ধতিটাও গান্ধর্ব মর্যাদা
পেয়ে গেল। উপরন্তু, এই নতুন পদ্ধতির অতি-প্রচলনটা সাম-গানের সুষ্ঠু
স্বর-শব্দ ব্যবস্থার মধ্যেও একটা গণ্ডগোল পাকিয়ে দিল। ফলে, সাম রক্ষকদের
মধ্যে একটা সামাল-সামাল রব উঠল—যার নকল-নবিশীভূত উদাহরণ আমরা
বহু পরবর্তী যুগের মতঙ্গ প্রমুখ সঙ্গীত গ্রন্থকারদের রচনার মধ্যেও সাঙ্গীতিক
স্লোগানরূপে পাচ্ছি। যেমন—“ন স্ববুদ্ধ্যা গীয়তে, গুরু-শিষ্য-পরম্পরয়া গায়তে,
ঐহিক সুখস্য স্বর্গাপবর্গ রূপস্য হেতুঃ”। ইত্যাদি।
কিন্তু, এত সব চেষ্টা সত্ত্বেও, সাম-গান্ধর্বব বিশুদ্ধতা রক্ষা করা সম্ভবপর
হলো না। জাত্য, অভিনিহিত প্রভৃতি বনেদী সপ্তকের স্থানে লৌকিক
উপকরণের দ্বারা পরিকল্পিত ক্রুষ্ট, প্রথমা, দ্বিতীয়া, তৃতীয়া, চতুর্থ, মন্দ্র ও
অতিস্বর—এই সাতটি সংজ্ঞা নিরঙ্কুশ স্বররূপেই প্রতিষ্ঠালাভ করল।
এর পরই দেখা যাচ্ছে, ব্রহ্মা উপাধিধারী জনৈক রাষ্ট্রপালকের নির্দেশে ভরত
উপাধিধারী জনৈক বিশেষজ্ঞ, কয়েকজন সমধর্মীর সাহায্যে আমাদের নাট্য-
সঙ্গীতকে নিরঙ্কুশ করবার চেষ্টা করছেন গান্ধর্ব থেকে উপকরণ গ্রহণ করে।
সম্ভবতঃ পূর্বতন সাম-গানের মতো এদেশের নাট্য-সঙ্গীতের মধ্যেও ইতোমধ্যে
লৌকিক গানের প্রভাব প্রতিপত্তি বিস্তারলাভ করেছিল। কিন্তু, এই নাট্য-
সঙ্গীতকে নিরঙ্কুশ করতে গিয়ে ভরত কোন্ গান্ধর্ব থেকে উপকরণ সংগ্রহ
করেছিলেন সেটা বিশেষভাবেই বিবেচ্য। উপকরণগুলো যে সুপ্রাচীন গান্ধর্ব
থেকে মার্গিত হয়নি, পরন্তু, সাম-পরবর্তী গান্ধর্ব থেকেই গৃহীত হয়েছিল তার
প্রমাণ, সুপ্রাচীন গান্ধর্বব অপরিহার্য অঙ্গ গান্ধার গ্রামের প্রসঙ্গ সম্পূর্ণরূপে
এড়িয়ে গিয়ে ভরত লৌকিক সঙ্গীতের অবদান ষড়জ ও মধ্যম গ্রামদুটিকেই

সঙ্গীত পারিজাত ১২৯
বিষয়বস্তু পরিবেশনার ভিত্তি হিসাবে গ্রহণ করেছিলেন। অর্থাৎ, এই গ্রহণ
বর্জনের উদাহরণ দ্বারা নিশ্চিতরূপেই প্রমাণিত হয়ে যাচ্ছে, নাট্যশাস্ত্রের আমলে
সুপ্রাচীন গান্ধর্ব তার গান্ধার গ্রামটিকে নিয়ে বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল কালের
অতলে।
আমাদের বিশ্বাস, সুপ্রাচীন "অনিবদ্ধ রীতি"র ব্যাপারটাও, দুর্বোধ্য হয়ে
ওঠার কারণে, এই সময় থেকেই গুরু-গম্ভীর অনুপ্রাসযুক্ত হয়ে পুঁথিগত হতে
আরম্ভ করে।
নাট্যশাস্ত্রের (২০০।৪০০ খৃঃ পূঃ) পর আমরা প্রামাণ্য হিসাবে বৃহদ্দেশীকে
(৩০০।৭০০ খৃঃ অঃ) পাচ্ছি। বলা বাহুল্য, ইতিমধ্যে অবরোহণ গতির ক্রুষ্ট, প্রথমা,
দ্বিতীয়া প্রভৃতি স্বর-ব্যবস্থা বানচাল হয়ে গিয়ে লৌকিক ষড়জ, ঋষভ প্রভৃতি
স্বর আরোহণ গতিতে প্রতিষ্ঠালাভ করে দেশী পদ্ধতির সঙ্গীতকে প্রগতিশীল
করে তুলেছিল। অপরপক্ষে মতঙ্গর প্রাচীন সঙ্গীত সম্বন্ধীয় উদ্ধৃতিগুলি
বিশ্লেষণ করে এমন কথা আমরা জানতে পারছি না,—তাঁর আমলে, আদি-
গান্ধব থেকে মার্গিত সাম-গান, সাম-গান থেকে মার্গিত পরবর্তী গান্ধর্ব রীতি
এবং শেষোক্ত গান্ধর্ব থেকে মার্গিত নাট্য-গান্ধর্ব বেঁচে ছিল কি না। পরন্তু,
মার্গিত সঙ্গীত বা মার্গ-সঙ্গীতপদ্ধতি সম্বন্ধে তিনি এবং তাঁর পরবর্তী
গ্রন্থকারবৃন্দ এমনভাবে উদ্ধৃতি পরিবেশন করে গেছেন যা অনুধাবন করে ধারণা
জন্মায়, মতঙ্গর আমলে একমাত্র দেশী পদ্ধতির সঙ্গীত ব্যতীত আর কোন
রকমের প্রাচীন ক্ল্যাসিক্যাল শ্রেণীর সঙ্গীত প্রচারিত ছিল না এবং ছিল না
বলেই তাঁরা গান্ধব তথা মার্গপদ্ধতির অপরিবর্তনীয় আইন-কানুন সম্পর্কে অত
বিধিনির্দেশের পুনরুক্তি করে গেছেন।
এই বৃহদ্দেশীতেই আমরা পাচ্ছি “আলাপাদি নিবন্ধ যঃ স চ মার্গঃ প্রকীর্তিতঃ”
এবং “আলাপাদি বিহীনস্ত স চ দেশী প্রকীর্তিতঃ”। অথচ, সঙ্গে সঙ্গেই আবার
আমরা পাচ্ছি আলাপাদি নিবন্ধ মার্গপদ্ধতির মধ্যে পদ-তাল-ছন্দ প্রভৃতির
অস্তিত্ব রক্ষিত হয়েছে এবং আলাপবিহীন দেশী সঙ্গীতের মধ্যে প্রকট হয়ে
উঠেছে আলপ্তির অস্তিত্ব। সর্বোপরি, দেশী সঙ্গীতপদ্ধতির পরিচয় প্রসঙ্গে
“বণ্টেলা” নামক একটি গীতি-রীতির পরিচয়ও আমরা পাচ্ছি যা তালহীন
অবস্থায় পরিবেশিত হতো। অতএব বিবেচ্য, নিঃশেষে বিলুপ্ত গীতিপদ্ধতির
অন্তর্গত অনিবদ্ধ কথাটিকে, এইভাবে, দেশী পদ্ধতির পরিচয় প্রসঙ্গে ক্রমাগত
ব্যবহার করে যাওয়ার সার্থকতা ও তাৎপর্য কী এবং অত সব উদ্ধৃতির মধ্য

২৩০ সঙ্গীত পারিজাত
থেকে অনিবদ্ধ রীতির সঠিক স্বরূপ সম্বন্ধে আমরা আদৌ কিছু জানতে
পারলাম কি না।
প্রাচীন অনিবদ্ধ পদ্ধতির সঙ্গে পরবর্তী কালের রাগ-আলপ্তি ও রূপক-
আলপ্তির কোন সম্পর্ক আছে কি না এবং থাকলেও তার রূপান্তরের ধারাটা কী
পরিমাণ যুক্তিগ্রাহ্য, সে সম্বন্ধে এতক্ষণ আমরা যা বললাম,—আমরা জানি,
অনেকের নিকটেই তা “ধান ভানতে শিবের গীতের” মতোই গ্রাহ্য হবে; কিন্তু,
আজকের দিনেও যাঁরা রাগালাপকে অনিবদ্ধরূপে অভিহিত করে থাকেন,
তাঁদের কথা স্মরণ করে, রাগালাপ সম্বন্ধে দু-একটি কথা বলা বাঞ্ছনীয় মনে
করছি :
তানসেনের আমলের শুদ্ধবাণী ডাঙ্গুরবাণী প্রভৃতি গীতিপদ্ধতি সুপ্রাচীন শুদ্ধা
ভিন্না প্রভৃতি অনিবদ্ধ রীতির অনুকরণে পরিকল্পিত হয়েছিল—এ মন্তব্যের
বিরুদ্ধে তর্ক চলে না। কিন্তু কেউ যদি বলেন উক্ত শুদ্ধা ভিন্নার সঙ্গে শুদ্ধবাণী
ডাঙ্গুরবাণী প্রভৃতির একটা নিগূঢ় সাঙ্গীতিক সম্পর্ক আছে, তাহলে, ওই নিগূঢ়
তত্ত্বটি সম্বন্ধে স্বাভাবিক কারণেই প্রশ্ন জাগবে। অনুরূপ যুক্তি আলপ্তি ও
পূর্ববর্তী যুগের অনিবদ্ধ এবং আলাপের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। প্রবন্ধ গীতি-পদ্ধতির
অঙ্গ হিসাবে, মতঙ্গের বহু পরবর্তী কালের গ্রন্থকার পার্শ্বদেব আলপ্তির যে ছক
এঁকে গেছেন, তার বিভাগটা ছিল—
আলপ্তি
┌───────────────┴───────────────┐
বিষম প্রাঞ্জল
┌───────┴───────┐ ┌───────┴───────┐
স-অক্ষর অনক্ষর স-অক্ষর অনক্ষর
┌──┴──┐ ┌──┴──┐ ┌──┴──┐ ┌──┴──┐
স-তাল অ-তাল স-তাল অ-তাল স-তাল অ-তাল স-তাল অ-তাল
দেখা যাচ্ছে, ধাতু-ছন্দ-তালহীন ব্যবস্থা ও ধাতু-ছন্দ-তালবদ্ধ ব্যবস্থা
মিলিয়ে সাকুল্যে ১৬টি বিভাগে বিভক্ত ছিল আলপ্তির সামগ্রিক রূপ।
পার্শ্বদেবের প্রায় সমসাময়িককালেই রচিত সঙ্গীত রত্নাকরে (১২১০-
১২৪৭ খৃঃ অঃ) দেখা যাচ্ছে, এই আলপ্তি প্রধানতঃ চারটি স্বস্থানে বিভক্তিকৃত
হয়ে অধিকতর আলঙ্কারিক রূপ পরিগ্রহ করেছে।

সঙ্গীত পারিজাত ২৩১
এখানে লক্ষ্য করবার বিষয়, একই যুগের দুজন গ্রন্থকার দু’ রকমভাবে
আলপ্তির পরিচয় প্রদান করেছেন। পার্শ্বদেব সংক্ষিপ্ত—রত্নাকর ব্যাপক।
সুতরাং, এই আলপ্তির যথার্থ প্রচলন কোন্ সময় ছিল সে সম্বন্ধে একটা প্রশ্ন
থেকে যাচ্ছে।
রত্নাকরের পরে আড়াই শ’ বছর অন্ধকার। তারপর আমরা রাজা মান
তোমার (১৪৮৬-১৫১৬ খৃঃ অঃ) প্রবর্তিত ধ্রুপদ গীতি-পদ্ধতির সঙ্গে পরিচিত
হচ্ছি। অর্থাৎ, এই সময় প্রবন্ধ গীতি-পদ্ধতি লোপ পেয়ে গিয়েছিল এবং
আলপ্তি আবার নামান্তরিত হয়েছিল আলাপ-এ। এই আলাপের গতি-প্রকৃতি
ও প্রয়োগ-পরিবেশনার বৈশিষ্ট্য সম্বন্ধে তানসেন-বংশীয়দের খাতা-পত্রে যা লেখা
আছে, তা বিশ্লেষণ করে আমরা জানতে পারি--রবাবিয়া-বাজ ও বীণকারী-
বাজের মাধ্যমে এই আলাপের মূল রূপ ছিল দ্বিবিধ। মূল আবার বৈচিত্র্য-
প্রয়াসী হয়ে নাম গ্রহণ করেছিল রাগালাপ, রূপ-আলাপ, সোম-আলাপ বা
সমোচার-আলাপ, কয়েদ-আলাপ ও বন্ধান-আলাপ। এই সব আলাপের বিস্তার,
জোড়, তার-পরণ, ঝালা, লড়ি, লড়গূথা, দুয়া-মাঠী প্রভৃতি বিভিন্ন অংশ
যথাযথভাবে বিশ্লেষিত হয়ে চিহ্নিত হয়েছিল। বস্তুতঃ এই আমলের আলাপ-
পদ্ধতি রত্নাকর-বিবৃত আলপ্তির আলঙ্কারিক অংশসমূহের তুলনায় সংক্ষিপ্ত
হলেও, উপকরণগুলি যে সে আলপ্তি থেকেই সংগ্রহ করেছিল তাতে সন্দেহ
নেই। কিন্তু, আলপ্তি আলাপ-এ নামান্তরিত হলেও, এর সঙ্গে অনিবদ্ধর কী
সম্পর্ক থাকতে পাবে সে সম্বন্ধে ‘ঘরানা’ ঐতিহ্যও নীরব।
এই প্রসঙ্গে সঙ্গীত পারিজাত গ্রন্থখানির রচনাকাল সম্পর্কিত রহস্যও
অনুধাবনযোগ্য। পারিজাত রত্নাকরের পরবর্তী কালে রচিত হয়েছিল সন্দেহ
নেই; কিন্তু তার মধ্যে অনিবদ্ধ, নিবন্ধ, আলপ্তি প্রভৃতি তানসেন-পূর্ব-যুগের
বিষয়বস্তুই পরিবেশিত হয়েছে, আলাপ বা ধ্রুপদের মতো কোন কিছু স্থান
পায়নি। সুতরাং, অহোবল তানসেনের পূর্ববর্তী আমলের গ্রন্থকার ছিলেন
বলা চলে;—বিশেষতঃ পারিজাতের ঋষভ-যুক্ত ভৈরবীর অস্তিত্বটাকে কোন
অজুহাতেই তুচ্ছ করা যেতে পারে না। কিন্তু, যেহেতু তিনি আলোচ্য
অনিবদ্ধ পদ্ধতির মতো গুটিকতক সাঙ্গীতিক সংজ্ঞা সম্বন্ধে পূর্বসূরীদের মতোই
নকল-নবিশী করে গেছেন, অতএব তাঁর অস্তিত্বকালটা তানসেনের পরবর্তী
হিসাবেও গ্রাহ্য হতে পারে।
পরিশেষে বক্তব্য এই যে, সুপ্রাচীন অনিবদ্ধ রীতির রহস্য সন্ধানে রত হয়ে

২৩২ সঙ্গীত পারিজাত
আমরা সর্বশেষ তথ্য হিসাবে যা সংগ্রহ করতে পেরেছি, তা আমাদের ক্ষেত্রে
নৈরাশ্যজনক হলেও, অপর কোন গুণীজ্ঞানীর প্রচেষ্টাকে সাফল্যমণ্ডিত করলেও
করতে পারে।
ব্যাপারটা এই যে, দেশী সঙ্গীতের আমলে বীণা যন্ত্রটির যেমন কৌলীন্য
ছিল, পূর্ববর্তী গান্ধর্ব আমলে তেমনি কৌলীন্য অর্জন করেছিল বেণু।
সুপ্রাচীন বিশ্বাবসু তাঁর আমলের শ্রুতি-সংখ্যা নির্ণয় করেছিলেন এই বেণুর
সাহায্যেই। সে কালে কত রকমের কত ছিদ্রযুক্ত বেণু প্রচলিত ছিল বর্তমানে
তা আর জানবার উপায় নেই, কিন্তু, আজকের দিনেও, অসংখ্য অসভ্য
অশিক্ষিত সম্প্রদায়ের মধ্যে এমন সব অদ্ভুত ধরনের অবৈজ্ঞানিক ছিদ্রযুক্ত বাঁশী
প্রচলিত রয়েছে যার স্বর-বৈচিত্র্য আমাদেরকে বিভ্রান্ত করে;—বিশেষ চেষ্টা
করেও তার গ্রাম, ঠাট, সপ্তক ও অ তাল অনক্ষর ধ্বনির রূপ-রহস্য বুঝতে
পারা যায় না। যেমন—
অনার্য মনসাদেবীর কয়েকজন বনেদী সেবকের সাহচর্য করে আমরা জানতে
পেরেছি—যে বিশেষ ধরনের সঙ্গীতের প্রভাবে প্রভাবান্বিত হয়ে অহিকুল তাদের
নিশ্চিন্ত বিশ্রাম বা দুর্ভেদ্য আশ্রয় ছেড়ে বেরিয়ে আসতে বাধ্য হয়, সে সঙ্গীত
তারা গুরু-পরম্পরাক্রমে শিক্ষা করেছে। এই সঙ্গীত মন্ত্রপাঠ ও বংশীধ্বনির
মাধ্যমেই উদ্‌গত হয়, কিন্তু, কী তার স্বর-ব্যবস্থা, গ্রাম-মূর্ছনা বা ছন্দ-
তালহীন গতির পরিমাপ সে সম্বন্ধে প্রয়োগকারীরা কিছুই জানে না কিংবা
জানলেও বলে না যেহেতু কুলগত বিধি-নিষেধ লঙ্ঘন করার মহাপাপকে তারা
গুরুহত্যা ও মাতৃহত্যার সমান বলে মনে করে। এই চির-দরিদ্র সম্প্রদায়কে
অর্থের প্রলোভন দেখিয়ে মারণ-উচাটন প্রভৃতি জীবন-মরণের খেলাতেও নিযুক্ত
করা সম্ভবপর হয়, কিন্তু, সম্প্রদায়-বহির্ভূত কোন মানুষের কৌতূহল চরিতার্থ
করানো কিছুতেই সম্ভবপর হয় না।—আমাদের কে বলে দেবেন এই সঙ্গীতের
সংজ্ঞা কী! ৪৯৯
নিবদ্ধং গীত-রূপং যৎ তস্য লক্ষণমুচ্যতে।
সুস্বরৈর্গীয়মানত্বাৎ গীতমিত্যাভিধীয়তে॥ ৫০০
নিবদ্ধ সঙ্গীতের লক্ষণাদি বলা যাচ্ছে। সুবিন্যস্ত স্বরের সাহায্যে যা গীত
হয় তাকেই বলে নিবদ্ধ গীত। ৫০০