सङ्गीतपारिजात (अहोबल - वीणा के तारों पर शुद्ध व विकृत स्वर-स्थान निर्धारण का ऐतिहासिक ग्रन्थ)
Sangitaparijata of Ahobala on Indian Musicology
पण्डित अहोबल (टीकाकार: कलानिधि कलिन्द) द्वारा
৩০০ সঙ্গীত পারিজাত
তালৈ রাগৈ স্ত্রিভিঃ প্রোক্ত উমাতিলক সংজ্ঞকঃ ॥ ৫৭৭।১
যে কোন তিনটি তাল ও তিনটি রাগের দ্বারা গঠিত প্রবন্ধকে উমাতিলক
প্রবন্ধ বলে। ৫৭৭।১
টিপ্পনী : উমাতিলক প্রবন্ধ সম্বন্ধে পারিজাতকার যা বলেছেন তার
সঙ্গে রত্নাকরের সামঞ্জস্য আছে। রত্নাকরে দেখা যায়, উমাতিলক তিনটি
তাল ও তিনটি রাগের সাহায্যে গীত হতো এবং এর সমাপ্তিতে যুক্ত
করা হতো বিরুদ। এটাও ছিল একটি ষড়ঙ্গযুক্ত ত্রিধাতুক নির্যুক্ত
প্রবন্ধ। ৫৭৭ ১
বিজয়াখ্যেন তালেন বিজয়ঃ স্যাজ্জয়ঃ প্রদঃ ॥ ৫৭৭।২
যে প্রবন্ধ বিজয় নামক তালে গীত হয়, তাকেই বলে বিজয় প্রবন্ধ। ৫৭৭ ২
টিপ্পনী : বিজয় তালের লক্ষণ হচ্ছে প্লুত+প্লুত+প্লুত+লঘু (বিজয়ঃ
পগপা লঘুঃ) এই প্রবন্ধটি, সাধারণত, বিজয়ী নরপতিদের স্বাগত জানাবার
ক্ষেত্রেই গীত হতো বিজয় তালে। অঙ্গ ছিল যথাক্রমে, তেন, স্বর, পাট ও পদ।
কল্লিনাথের মতানুসারে, বিজয় প্রবন্ধব তেন ও স্বরযুক্ত অংশটি ছিল উদ্গ্রাহ এবং
পাট ও পদযুক্ত অংশটি ছিল ধ্রুব। এদিক দিয়ে বিচার করলে বিজয় ছিল
দ্বিধাতুক প্রবন্ধ। কিন্তু, পদাস্তর সহযোগে আভোগ অনুষ্ঠানেরও সুযোগ-
সুবিধা ছিল প্রবন্ধটির মধ্যে। সুতরাং অনুরূপ ক্ষেত্রে বিজয়, বিরুদহীন পঞ্চাঙ্গযুক্ত
ত্রিধাতুক প্রবন্ধরূপেও গ্রাহ্য হতো। ৫৭৭।২
যস্মিন্ বা ভূষণং বর্জ্যং তদ্গীতং বস্তু সংজ্ঞকম্ ॥ ৫৭৮।১
যে প্রবন্ধ গানে ভূষণ ( অলঙ্কার) বর্জিত হয়, তাকেই বলে বস্তু
প্রবন্ধ। ৫৭৮।১
টিপ্পনী : বস্তু প্রবন্ধর পরিচয় প্রসঙ্গে পারিজাতকার যা বলেছেন তা যেন
একটা ব্যতিক্রমেরই ইঙ্গিত বহন করছে। বস্তু প্রবন্ধর মধ্যে ভূষণাদি বর্জনের
উদাহরণ স্থাপন করে গ্রন্থকার যে ঠিক কী বোঝাতে চাইছেন সেইটাই বোঝা
যাচ্ছে না। অতীতের বিলুপ্ত গান্ধর্ব গীতি তথা মার্গ সঙ্গীত ব্যতীত আর সব
গানই রঞ্জনীশক্তিসম্পন্ন। রঞ্জনীশক্তিহীন গান কখনও গান হিসাবে গ্রাহ্য
হয় না। অপরপক্ষে, গানের মধ্যে অঙ্গ, ধাতু, রাগ প্রভৃতি বজায় থাকে বলেই
গান রঞ্জনীশক্তিসম্পন্ন হয়ে ওঠে। আলোচ্যক্ষেত্রে গানের রঞ্জনীশক্তির
সঙ্গীত পারিজাত
৩০১
উৎসগুলিকে যদি বস্তু হিসাবে গ্রহণ করা যায় তাহলে প্রশ্ন উঠবে, বস্তুযুক্ত গানের
ভূষণ বর্জিত হতে পারে কী করে? উৎস যদি থাকে তাহলে তার প্রাণশক্তিও
থাকতে বাধ্য। অর্থাৎ গানের মধ্যে বস্তু যদি কিছু থাকে তাহলে সে সব
বস্তুর শক্তি থাকতেও বাধ্য। এই শক্তিই তো রঞ্জনীশক্তি তথা ভূষণ! অথচ,
পারিজাতকার বস্তু প্রবন্ধর সব চাইতে বড় পরিচয় হিসাবে ভূষণ বর্জনের
কথাই বলেছেন। তাহলে কি বুঝতে হবে এ ভূষণ অর্থে গানের রঞ্জনীশক্তি
বোঝাচ্ছে না। পরন্তু বস্তুগুলির প্রয়োগজনিত কোন বৈশিষ্ট্যের ইঙ্গিত বহন
করছে। কিন্তু, তাই যদি হয়, তাহলেও প্রশ্ন উঠবে, কেমন ছিল সে বৈশিষ্ট্যের
স্বরূপ? গানের মধ্যে বস্তু থাকবে, তার রঞ্জনীশক্তিও থাকবে, অথচ, বস্তু-
প্রয়োগের বৈশিষ্ট্যের জন্য ভূষণ থাকবে না—এ কেমন করে হতে পারে?
বলা বাহুল্য, গ্রন্থকার যে ক্ষেত্রে নীরব সে ক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিক যুক্তির পরিবর্তে
আনুমানিক তথ্য-তত্ত্বের আশ্রয় গ্রহণ ব্যতীত গত্যন্তর থাকে না। সুতরাং,
প্রাসঙ্গিক উদাহরণ হিসাবে এখানে, বাংলাদেশে প্রচলিত গদ্য-কবিতার উল্লেখ
করা যেতে পারে। এই শ্রেণীর কবিতার উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্যই হচ্ছে,
কবিতা সম্পর্কিত প্রচলিত ধ্যান-ধারণার বিপক্ষে উদাহরণ স্থাপন করা।
এই শ্রেণীর কবিতাকে অনেকে গবিতা নামে অভিহিত করে অন্য কিছু
বোঝাবার চেষ্টা করে থাকেন, কিন্তু, গদ্য কবিতা যে কবিতা নয়, এমন
প্রমাণ কেউ দাখিল করতে পারেন নি বৈজ্ঞানিক যুক্তি-তর্কের সাহায্যে। বস্তুতঃ,
এই গদ্য-কবিতার মধ্যে অনেকে কবিতার ঝঙ্কার শুনতে না পেলেও আর
একটা কিছু শুনতে পায় নিঃসন্দেহে এবং সে শোনার স্বভাবে শ্রুতিমাধুর্য
না থাকলেও যেটা নিশ্চিতভাবে বজায় থাকে সেটা হচ্ছে Normative বিজ্ঞানের
ত্রিস্রোতা ক্রম-অনুক্রমের বিজ্ঞানগ্রাহ্য সত্য। সুতরাং, গদ্য-কবিতা যেমন
অনুপ্রাসাদি বর্জিত হয়েও কবিতা হতে পারে তেমনি বস্তু প্রবন্ধও ভূষণ বর্জিত
হয়েও গান হতে পারে।
বস্তু প্রবন্ধর ভূষণ-বর্জনের ব্যাপারটার ওপর অধিকতর গুরুত্ব আরোপ করে
এর আদি গুরুত্বের জের টেনে নিয়ে যেতে পারা যায় গান্ধর্ব-গীতির আমল
পর্যন্ত যেহেতু, গান্ধর্ব-গীত দেশী সঙ্গীতের মতো রঞ্জনীশক্তিসম্পন্ন ছিল না।
অর্থাৎ, ভূষণহীন বস্তু ও রঞ্জনীশক্তিহীন গান্ধর্বর মধ্যে একদা যে একটা ঘনিষ্ঠ
সম্পর্ক ছিল—এমন কল্পনাকে প্রশ্রয় দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু আলোচ্যক্ষেত্রে
আমাদের স্মরণ রাখতে হবে, বস্তু প্রবন্ধটিকে প্রাচীন গ্রন্থকারগণ বিপ্রকীর্ণ
৩০২ সঙ্গীত পারিজাত
প্রবন্ধাবলীর অন্তর্ভূক্ত করে পরিবেশন করে গেছেন এবং যাবতীয় বিপ্রকীর্ণ
প্রবন্ধ সংগৃহীত হয়েছিল গ্রাম্য সঙ্গীত সমাজ থেকে—সেগুলিকে ক্লাসিক্যালের
পর্যায়ে উন্নীত করবার উদ্দেশ্যেই। বস্তু প্রবন্ধর সঙ্গে গান্ধর্ব-গীতির সম্পর্ক যদি
বিন্দুমাত্রও কশ্মিনকালে থাকতো তাহলে, তার পরিচিতিটা বিপ্রকীর্ণর
পরিবর্তে শুদ্ধ সূড়ের অন্তর্ভূক্ত হতো। কিংবা এমনও হতে পারে, বহু পরবর্তীযুগে,
বস্তুকে বিস্মৃতির অতল থেকে খুঁজে বার করে বিপ্রকীর্ণর মধ্যে স্থান দেওয়া
হয়েছিল। পাঠকবর্গ লক্ষ্য করবেন, প্রবন্ধ অধ্যায়ের প্রারম্ভে গ্রন্থকার যেভাবে
বস্তু ও রূপকের কৌলীন্য ( ৫০৪ সূত্র দ্রষ্টব্য ) ঘোষণা করেছেন, গ্রন্থের মধ্যে
সে কৌলীন্যের মর্যাদা যথাযথভাবে রক্ষিত হয় নি। কারণটা বিশেষভাবেই
বিচার্য। কেবলমাত্র পারিজাতেই নয়—বৃহদ্দেশী, সময় সার, রত্নাকর প্রভৃতি
যাবতীয় গ্রন্থের মধ্যেই, নিবদ্ধ গান আলোচনা প্রসঙ্গে, বস্তু ও রূপক যথাযথভাবে
পরিচিত হয় নি। রত্নাকর ও পারিজাতে বস্তুকে পরিচিত করা হয়েছে
বিপ্রকীর্ণর অন্যতমরূপে। কিন্তু, রূপক সম্বন্ধে যদিও বা রত্নাকর কিছু বলেছেন,
পারিজাত একেবারে নীরব। অথচ, আদিতে এ দুটি যে অনুরূপ স্ব-কুলীন
ছিল না তার সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায় প্রবন্ধ অধ্যায়ের প্রারম্ভিক পরিচিতি লক্ষ্য
করলেই। অর্থাৎ নাট্যশাস্ত্র থেকে বৃহদ্দেশী যুগের কয়েক শতাব্দীকালের মধ্যে
কোন সময়, বস্তু ও রূপক সম্পর্কিত সত্য তথ্যগুলি হারিয়ে গিয়েছিল বা
সম্মুখীন হয়েছিল বিকৃত ব্যাখ্যার। এবং, সেই জেরেই চলে আসছে এবম্বিধ
অবস্থা।
বস্তু প্রবন্ধ সম্পর্কে পারিজাতের বিবৃতি অতি সংক্ষিপ্ত কিন্তু, রত্নাকরের
আশ্রয়ে বস্তু প্রবন্ধ-টি নিয়ে গবেষণারত হলে। সে সম্বন্ধে একটা ধারণা করা
যায়। এই প্রবন্ধর মধ্যে পাদ থাকতো পাঁচটি। পাদের মধ্যে প্রথম দুটি পাদকে
পূর্বার্দ্ধরূপে পাওয়া হতো এবং বাকি তিনটি পাদ থাকতো উত্তরার্দ্ধর অন্তর্ভুক্ত
হয়ে। পাদ পাঁচটির মাত্রাসংখ্যা ছিল, যথাক্রমে—১ম পাদ ১৫ মাত্রাযুক্ত।
২য় পাদ ১০ মাত্রাযুক্ত। ৩য় পাদ ১১ মাত্রাযুক্ত। ৪র্থ পাদ ১২ মাত্রাযুক্ত।
এবং ৫ম পাদ ১৫ মাত্রাযুক্ত। গান শেষ করা হতো তেনকের অনুষ্ঠান করে।
কিন্তু, তেনকের অনুষ্ঠান করা হতো দু’বার দু’রকমভাবে। প্রথমবার তেনকের
অনুষ্ঠান করা হতো কেবলমাত্র উত্তরার্দ্ধকে অবলম্বন করে। তারপর, উক্ত
উত্তরার্দ্ধকেই দোধক ছন্দে পরিবেশন করা হতো। তারপর সমগ্র প্রবন্ধটিকেই
আবার তেনক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে পরিবেশন করে গান শেষ করা হতো।
সঙ্গীত পারিজাত ৩-৩
কল্লিনাথের মতানুযায়ী, বস্তু প্রবন্ধর মধ্যে দোধক ছন্দে অনুষ্ঠিত অংশটি ছিল
ধ্রুব এবং তেনক অনুষ্ঠানের অর্ধাংশটি ছিল উদ্গ্রাহ ধাতুর অন্তর্গত। সুতরাং,
বস্তু ছিল একটি দ্বিধাতুক, বিরুদহীন, নির্যুক্ত প্রবন্ধ। অবশ্য, এর মধ্যে আভোগ
অনুষ্ঠানেরও অবকাশ ছিল এবং সে সুযোগ গ্রহণ করলে বস্তু হয়ে যেত ত্রিধাতুক
প্রবন্ধ। প্রসঙ্গক্রমে এখানে উল্লেখযোগ্য যে রত্নাকরের পরবর্তী যুগে, হরিনায়ক
কর্তৃক পঞ্চদশ শতাব্দীতে বিরচিত 'সঙ্গীত সার' গ্রন্থের গীত অধ্যায়ের ৪।৫ সূত্রে
দেখা যায়—
ত্র্যাদিভির্ধাতুভিশ্চাঙ্গৈঃ পঞ্চভির্বস্তু কথ্যতে।
দ্বিধাতুকং তথা দ্বাঙ্গং রূপকং পরিকীর্তিতম্ ॥
'অর্থাৎ পঞ্চদশ শতাব্দীতেও বস্তু প্রবন্ধ ছিল পাঁচ অঙ্গযুক্ত ত্রি-ধাতুক প্রবন্ধ এবং
রূপক ছিল দুই অঙ্গের দুই ধাতুযুক্ত প্রবন্ধ। ৫৭৮।১
ত্রিপদাদিত্রয়ং গীতং তত্তদ্ দেশস্য ভাষায়া। ৫৭৮।২
তত্তৎ সংখ্যাবিশিষ্টেন খণ্ডেন সুখদায়কম্।
বর্ণানাং নিয়মাভাবৈস্তত্র দোষো ন বিদ্যতে॥ ৫৭৯
ত্রিপদী, চতুষ্পদী ও ষট্পদী নামক তিনপ্রকার প্রবন্ধ গীতি বিভিন্ন দেশীয়
ভাষায় রচিত হয়ে থাকে। এই তিন প্রকার প্রবন্ধ গীতির পদাদি খণ্ডের সংখ্যা ও
বিভিন্ন এবং এই বিভিন্নতার বৈশিষ্ট্যগুলি যথাযথভাবে বজায় রেখে গান গাইলে
তবেই প্রবন্ধগুলি শ্রুতিমধুর হয়ে ওঠে। এই তিন প্রকার গীতিতেই বর্ণাদি
প্রয়োগের অনিয়ম দোষণীয় নয়। ৫৭৮।২--৫৭৯
টিপ্পনী: পারিজাতকার এখানে যে তিনটি প্রবন্ধর কথা বলেছেন, আমরা
পৃথকভাবে তাদের পরিচয় দেবার চেষ্টা করছি:
ত্রিপদী প্রবন্ধর পদের সংখ্যাটা আসলে তিন এবং সেই কারণেই তার নাম
হয়েছে ত্রিপদী। শাস্ত্রমতে ত্রিপদীর মধ্যে এগারটি বর্ণগণের প্রয়োগ ব্যবস্থা
ছিল অপরিহার্য এবং তার শাস্ত্রনির্দিষ্ট বিভাগ ছিল, যথাক্রমে, প্রথম পদে চারটি
বর্ণগণ; দ্বিতীয় পদে চারটি বর্ণগণ এবং তৃতীয় পদে তিনটি বর্ণগণ। অর্থাৎ
৪+৪+৩=১১। এই এগারটি বর্ণগণের মধ্যে ৬ ও ১০ সংখ্যক গণদুটি ছিল
রতিগণ ও বাকি ৯টি গণ ছিল কামগণ। অর্থাৎ ত্রিপদীর দ্বিতীয় পাদের
তৃতীয় গণটি ও তৃতীয় পাদের দ্বিতীয় গণটি ছিল রতিগণ। রতিগণের বর্ণসংখ্যা
হচ্ছে দুই এবং প্রস্তার ভেদে এই দুই চার হতে পারে। অপরপক্ষে কামগণের
৩০৪ | সঙ্গীত পারিজাত
বর্ণসংখ্যা হচ্ছে তিন এবং বিভিন্ন প্রস্তারে এই তিন আট পর্যন্ত হতে পারে।
যেমন, বিনতি—৩, মানব—৪ বা কৃপাল—৫। অর্থাৎ কামগণের ত্রি-বর্ণ
প্রস্তার ভেদে ১+১+১ হতে পারে, ২+১+১ হতে পারে কিংবা ২+২+১
হতে পারে। অধিকন্তু, ৫-এর সঙ্গে ৩ যুক্ত করে অথবা ৪-এর সঙ্গে ৪ যুক্ত
করে আটও হতে পারে। কিন্তু ত্রিপদীর প্রয়োগ ব্যবস্থার প্রতি লক্ষ্য করলে
দেখা যায়, ত্রিপদীকে চতুষ্পদীরূপে পরিবেশন করা হতো। কেন?—এ
সম্বন্ধে কল্লিনাথ বলেছেন, ত্রিপদীর প্রথম দুটি পদ আসলে একই পদের
পুনরাবৃত্তি; ও দুটির মধ্যে কোনই প্রভেদ নেই। কিন্তু, তাই যদি হবে,
তাহলে, একই পাদকে দু’বার গাইবার বিশেষ নির্দেশ শাস্ত্রকার দিয়ে গেলেন
কেন? কারণটা অবশ্যই গুরুতর ছিল। কিন্তু সেটা কি হতে পারে।
আপাততঃ আমরা দেখতে পাচ্ছি, ত্রিপদীকে চতুষ্পদীরূপে পরিবেশন করার
ফলস্বরূপ এর গণ-ব্যবস্থাটা হয়ে যাচ্ছে ২+২=৪+৪+৩=১১। অথচ,
আলোচ্যক্ষেত্রে এই ২+২-কে রতিগণ বলবারও উপায় নেই যেহেতু প্রবন্ধটির
৬ ও ১০ সংখ্যক গণদুটি ছিল মাত্র রতিগণ। এ ছাড়াও শাস্ত্রকার আবার
বলেছেন, ত্রিপদীর দ্বিতীয় পাদটিকে, অর্থাৎ আপাতদৃষ্টিতে যে পাদটিকে তৃতীয়
পাদ বলে মনে হবে, সেই পাদটিকে প্রথমে “কিছুটা” গেয়ে তারপর সম্পূর্ণ
পাদটি গাইতে হয়। কিন্তু এই “কিছুটা” বলতে আসলে কি বোঝাচ্ছে?
দেড়গুণ নয়, দ্বিগুণ তো নয়ই। তবে কতখানি? আবার ত্রিপদীর শেষোক্ত
পাদটি (আপাতদৃষ্টিতে যাকে চতুর্থ পাদ বলে মনে হয়) সম্বন্ধে শাস্ত্রকার
একবার মাত্র গাইবার নির্দেশ দিয়েছেন। অর্থাৎ, বর্ণগণের যথাযথ প্রয়োগ
বজায় রাখবার কারণেই যে শাস্ত্রকার প্রবন্ধর প্রথম পাদটিকে দু’বার, দ্বিতীয়
পাদটিকে কিঞ্চিদধিক একবার এবং তৃতীয় পাদটিকে কেবলমাত্র একবার গাইবার
নির্দেশ দিয়েছেন তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু, এই নির্দেশ কিভাবে প্রতিপালিত
হতো সেটা বোঝা যাচ্ছে না। বস্তুতঃ গায়কীর অভাবে নায়কীর যথাযথ
পরিচয় যে পাওয়া সম্ভবপর হয় না, আলোচ্য ত্রিপদীর অস্তিত্বটা তার
একটা উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। সর্বোপরি, আলোচ্যক্ষেত্রে পারিজাতের
মন্তব্যটিও যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। অহোবল বলেছেন, ত্রিপদী, চতুষ্পদী ও
ষট্পদী প্রবন্ধর ক্ষেত্রে বর্ণাদি প্রয়োগের “অনিয়ম” দোষণীয় নয়। সুতরাং,
ঠিক কিভাবে যে এই ত্রিপদীকে পরিবেশন করা হতো, কিছুই বোঝা
যাচ্ছে না।
সঙ্গীত পারিজাত ৩০৫
ত্রিপদী প্রবন্ধ ছিল তালহীন, রচিত হতো কর্ণাটক ভাষায় এবং অন্তে
প্রযুক্ত হতো স্বর। এর দ্বিখণ্ডে বিভক্ত প্রথম পাদটি ছিল উদগ্রাহ এবং বাকি
দুটি পাদ ছিল ধ্রুব ধাতুর অন্তর্গত। অর্থাৎ ত্রিপদী ছিল দ্বিধাতুক প্রবন্ধ।
কিন্তু, তালহীন হওয়ার কারণে অনির্ভুক্ত ছিল না, পদ-আইনের নির্দেশাদি
থাকার জন্য ত্রিপদী ছিল নিযুক্ত প্রবন্ধ। ইচ্ছা করলে এর মধ্যে আভোগেরও
অনুষ্ঠান করা যেতে পারতো। সেরূপ ক্ষেত্রে ত্রিপদী হয়ে যেত ত্রিধাতুক।
ত্রিপদীর অঙ্গ ছিল মাত্র দুটি। অতএব ত্রিপদী ছিল তারাবলী জাতীয়
নিযুক্ত প্রবন্ধ।
অতঃপর চতুষ্পদীর পরিচয়—
চতুষ্পদী প্রবন্ধর পাদ সংখ্যা ছিল সাকুল্যে চারটি। এই পাদ চারটির মধ্যে
প্রথম ও তৃতীয় পাদদুটি ছিল ১৫ মাত্রাযুক্ত এবং দ্বিতীয় ও চতুর্থ পাদদুটি
ছিল ১৬ মাত্রাযুক্ত। চতুষ্পদীর চারটি পাদেই যমক অলঙ্কার যুক্ত করতে হতো
যা বাক্য হিসাবে অভিন্ন মনে হলেও অর্থের দিক দিয়ে ছিল ভিন্ন। কল্লিনাথের
মতানুযায়ী, ত্রিপদীর মতো, চতুষ্পদীও রচিত হতো তালহীন কর্ণাটিক ভাষায়।
চতুষ্পদীর প্রথম দুটি পাদ হতো স্বরযুক্ত এবং শেষের দুটি পাদে যুক্ত হতো
তেনক। এই তেনকেই গান শেষ করতে হতো। অতএব চতুষ্পদী ছিল
দ্বিধাতুক ভাবনীজাতীয় প্রবন্ধ এবং তালহীন হওয়া সত্ত্বেও, নির্দিষ্ট মাত্রা
ব্যবস্থা থাকার কারণে, ছিল নিযুক্ত। বলা বাহুল্য, চতুষ্পদীর মধ্যেও আভোগ
অনুষ্ঠানের অবকাশ ছিল এবং তাহলে প্রবন্ধটি হয়ে যেত ত্রিধাতুক, ভাবনী-
জাতীয় নিযুক্ত প্রবন্ধ।
পরিশেষে ষটপদীর পরিচয়—
ষটপদী প্রবন্ধর পাদসংখ্যা ছিল ছয়টি। এই পাদ ছয়টি ১৫টি বর্ণগণের
মাধ্যমে গীত হতো। যথা—
১-ম, ২-য়, ৪ র্থ পাদে থাকতো দুটি করে কামগণ। অর্থাৎ, ৬টি গণ।
৩-য় পাদে থাকতো তিনটি গণ। তার মধ্যে ১ম গণটি হতো বাণগণ ও বাকি
দুটি হতো কামগণ। অর্থাৎ, ৬+৩=৯টি গণ।
৫-ম পাদে থাকতো দুটি কামগণ। অর্থাৎ ৯+২=১১টি গণ।
৬-ষ্ঠ পাদে থাকতো তিনটি গণ। তার মধ্যে প্রথম দুটি গণ হতো কামগণ
এবং শেষেরটি হতো বাণগণ। অর্থাৎ ১১+৩=১৪টি বর্ণগণ।
কামগণের পরিচয় ইতিপূর্বে আমরা ত্রিপদী প্রবন্ধর প্রসঙ্গে দিয়েছি।
বাণগণের বর্ণসংখ্যা ছিল চার। প্রস্তাবভেদে ১৬টি পর্যন্ত হতে পারে।
ষটপদী প্রবন্ধর গায়কী প্রসঙ্গে একটা বৈশিষ্ট্যের উল্লেখ করেছেন
শার্ঙ্গদেব। বলেছেন, এই প্রবন্ধ গানটি নাদ-মুক্তিক্। নাদ-মুক্তিক্ শব্দের ব্যাখ্যা
করে কলিনাথ বলেছেন, নাদ অর্থে এখানে স্থায়ী স্বর বোঝাচ্ছে এবং মুক্তি অর্থে
বোঝাচ্ছে ন্যাসক্রিয়ার মতো একটা সাঙ্গীতিক ক্রিয়া। অর্থাৎ ষটপদীর গানে
(রাগের কারণে) যে স্বরগুলি স্থায়িস্বর রূপে বিবেচিত হতো সেই স্বরগুলিকে
সুস্পষ্টভাবে প্রয়োগ করা হতো না; নাদ-মুক্তিক ক্রিয়ার সাহায্যে কেবলমাত্র
জানিয়ে দেওয়া হতো তার অস্তিত্বের অস্পষ্ট রূপটি।
পূর্বোক্ত ত্রিপদী চতুষ্পদীর মতো ষটপদীও রচিত হতো তালহীন কর্ণাটক
ভাষায়। অন্তে যোজিত হতো স্বর এবং মাত্রা-ব্যবস্থার কারণে এটিও ছিল
নির্যুক্ত। এর প্রথম তিনটি পদকে উদ্গ্রাহ ও শেষের তিনটি পদকে ধ্রুব
হিসাবে গ্রাহ্য করা হতো। অতএব এটি ছিল একটি দ্বিধাতুক প্রবন্ধ। কিন্তু,
ইচ্ছা করলে আভোগের অনুষ্ঠানও করা যেতে পারতো এবং সেরূপ ক্ষেত্রে
ষটপদী হয়ে যেত ত্রিধাতুক, তারাবলী জাতীয় নির্যুক্ত প্রবন্ধ।
দেখা যাচ্ছে, ত্রিপদী, চতুষ্পদী ও ষটপদী নামক তিনটি প্রবন্ধই ছিল
কর্ণাটক ভাষায় রচিত তালহীন প্রবন্ধ—কিন্তু নির্যুক্ত। আলোচ্যক্ষেত্রে
আমাদেরকে বিশেষভাবে স্মরণ রাখতে হবে পর্য্যাপ্তাকারের মন্তব্যটি। এই
তিনটি প্রবন্ধ সম্পর্কে তিনি বলেছেন, 'বর্ণৈঃ পরিচয দোষনীয়
নয়' ২। ১-৫৫৯
সিংহলীলেন তালেন সিংহ-লীলাঃ স উচ্যতে। ৮০১।
যে প্রবন্ধ-গীতে সিংহলীল তাল দ্বারা গীত হয়, তাকেই সিংহলীল প্রবন্ধ
বলা হতো।
টিপ্পনী: সিংহলীল প্রবন্ধ সিংহলীল তালে গীত হতো। কিন্তু প্রবন্ধটির
পরিচয় দেবার পূর্বে সিংহলীল তালের মাত্রা ব্যবস্থা সম্পর্কে একটা অনন্য সাধারণ
মতভেদের কথা উল্লেখ করা প্রয়োজন। এই সিংহলীল তালটির পরিচিতি
প্রসঙ্গে রত্নাকর ও তাঁর টিকাকারদের মধ্যে মতভেদ দৃষ্ট হয়। মূল রত্নাকরে
দেখা যায়, লঘ্বন্তে দ্রুত্রয়ং সিংহলীলঃ। অর্থাৎ (0001) তিনটি দ্রুত মাত্রার পর
একটি লঘু মাত্রা। কিন্তু সিংহভূপাল বলেছেন "লঘুঃ আদৌ অন্তে চ যস্য,
এবম্বিধং দ্রুতত্রয়ং।” অর্থাৎ, ( 10001 ) আদিতে একটি লঘুমাত্ৰা, মধ্যে তিনটি
দ্রুতমাত্রা ও অন্তে আবার একটি লঘুমাত্ৰা। কল্লিনাথের বক্তব্যও সিংহভূপালেরই
অনুরূপ। অপরপক্ষে, রত্নাকরের প্রায় সমসাময়িককালেই বিরচিত সঙ্গীত
সময়সার গ্রন্থে দেখা যাচ্ছে “সিংহলীলে বিধাতব্যং লঘু দ্ব্যদ-মন্ত দ্রতত্রয়ম্”।
অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে, সিংহভূপাল ও কল্লিনাথ রত্নাকরের টীকা করেছেন বটে
কিন্তু সিংহলীল তালের সঠিক পরিচিতি প্রসঙ্গে সমর্থন জানিয়েছেন শার্ঙ্গদেবকে
নয়—সমসাময়িককালের আর একজন গ্রন্থকার পার্শ্বদেবকে। সুতরাং
আলোচ্যক্ষেত্রে এমন অনুমান করা অসঙ্গত হবে না যে, সিংহলীল তালের
“10001” এই বিভাগটিই রত্নাকর ও সঙ্গীত সময়সারের আমলে প্রচলিত ছিল
এবং শার্ঙ্গদেব সম্ভবতঃ সিংহলীলের কোনও একটি “পূর্ব প্রসিদ্ধ” রূপ লিপিবদ্ধ
করবার সঙ্গে সঙ্গে তার “অধুনা প্রসিদ্ধ” মাত্রা-বিভাগটির কথা লিখে রেখে
যেতে ভুলে গিয়েছিলেন।
সিংহলীল তালে গঠিত সিংহলীল প্রবন্ধ, স্বর, পাট, বিরুদ ও তেনক দ্বারা
রচিত হতো। এর মধ্যে স্বর ও পাট সহযোগে গীত অংশটি হতো উদ্গ্রাহ এবং
বিরুদ ও তেনক সহযোগে গীত অংশটি হতো ধ্রুব। অর্থাৎ, সিংহলীল ছিল
দ্বিধাতুক মেদিনীকাতীয় নিরুক্ত প্রবন্ধ। বলা বাহুল্য, গতিবিক্ত পদ যুক্ত
করে এর মধ্যে আভোগ অনুষ্ঠান করবারও সুযোগ সর্বদা ছিল। সে ক্ষেত্রে
সিংহলীল হয়ে যেত ত্রিধাতুক। ৫৮০-১
হংসলীলোহপি তালেন হংসাখ্যেন সুখপ্রদঃ। ৫৮০।২
হংসলীল তালে গঠিত প্রবন্ধকে হংসলীল প্রবন্ধ বলে। এটি একটি শ্রুতিমধুর
প্রবন্ধ। ৫৮০।২
টিপ্পনীঃ চর্চ্চরী পদ্যাও হংসলীল তালে গীত হতো। হংসলীল
তালটি ছিল “বিরামান্তং লঘুদ্বন্দ্বলক্ষিতম্।” অর্থাৎ ( । - । - । বিরামযুক্ত
দুটি লঘুমাত্রার প্রয়োগ দ্বারা হংসলীল তাল গঠিত হতো। কিন্তু, আলোচ্য
ক্ষেত্রেও রত্নাকর ও তার টিকাকার সিংহভূপালের মধ্যে মতভেদ দৃষ্ট হয়।
সিংহভূপাল বলেছেন, হংসলীলের দ্বিতীয় মাত্রাটিই কেবল বিরামযুক্ত।
হংসলীল প্রবন্ধের পাদের সংখ্যা ছিল মাত্র দুটি। প্রথম পাদটি ছিল
বাক্যাংশযুক্ত উদ্গ্রাহ ও দ্বিতীয় পাদটি ছিল পাটযুক্ত। অর্থাৎ এটি ছিল
দ্বিধাতুক ভাবনীজাতী নিরুক্ত প্রবন্ধ। তবে, অন্যান্য অনেক দ্বিধাতুক প্রবন্ধর
মতো একেও আভোগ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ত্রিধাতুক করা যেত। ৫৮০।২
৩০৮ সঙ্গীত পারিজাত
একস্মিন্নেব সময়ে চত্বার স্তাল ধারিণঃ।
চতুর্ম্মুখঃ স বিজ্ঞেয়ঃ সমকালেন শোভিতঃ ॥ ৫৮১
যে প্রবন্ধর মধ্যে সমকালে চারটি তাল বিদ্যমান থাকে এবং গাইবার সময়
চারজন তালাধ্যায়ীর প্রয়োজন হয় এই চারটি তালকে দেখাবার জন্যে—সেই
চারটি তালের দ্বারা সুশোভিত প্রবন্ধ চতুর্মুখ নামে প্রখ্যাত। ৫৮১
টিপ্পনী : চতুর্মুখ প্রবন্ধ পরিচিতি প্রসঙ্গে পারিজাতকার যা বলেছেন
তার সঙ্গে রত্নাকরের সামঞ্জস্য নেই। পারিজাতকার বলেছেন, এই প্রবন্ধ
গাইবার সময় চারজন তালাধ্যায়ীর প্রয়োজন হতো তাল রক্ষার জন্যে।
অর্থাৎ, এমনই কোন তালের সাহায্যে এই প্রবন্ধটি গীত হতো যার মাত্রা
সংখ্যা ছিল অভিন্ন কিন্তু বিভাগ ছিল চতুবিধ। বলা বাহুল্য, এই চার রকম
মাত্রাবিভাগজনিত তালটি চার রকম তালের মূর্ত্তি পরিগ্রহ করতো বলেই
গানের সময় চারজন তালধারীর প্রয়োজন হতো। এবং শেষে সম্ এসে
পড়ত যথাস্থানেই। মনে হয়, তাল প্রদর্শনের এই বিচিত্র ব্যবস্থার জন্যই
প্রবন্ধটি চতুর্মুখ নামে প্রখ্যাত হয়েছিল। কিন্তু, রত্নাকরে চতুর্মুখের বৈশিষ্ট্য
সম্পর্কে কোন আলোচনাই স্থান পায়নি।
চতুর্মুখ প্রবন্ধের পাদের সংখ্যা ছিল চারটি এবং এই চারটি পদে যথাক্রমে
ব্যবহৃত হতো চারটি বর্ণ। যথা—১ম পদে, স্থায়ী বর্ণ, নিবদ্ধ স্বরানুষ্ঠান
করা হতো। ২য় পদে, আরোহী বর্ণে, পাট্ প্রযোজিত হতো। ৩য় পদে
বাক্যাংশের সঙ্গে যুক্ত থাকতো অবরোহী বর্ণ। ৪র্থ পদে, সঞ্চারী বর্ণে,
তেনকের অনুষ্ঠান করা হতো।
চতুর্মুখ প্রবন্ধে চারটি বর্ণের যথাযথ প্রয়োগ লক্ষ্য করবার মতো। হয়তো,
চারটি বর্ণের দ্বারা গঠিত ছিল বলেই প্রবন্ধটি চতুর্মুখ নামে প্রচলিত হয়েছিল।
চতুর্মুখের প্রথম পাদ দুটি ছিল উদ্গ্রাহ ও শেষের পাদ দুটি ছিল ধ্রুব ধাতুর
অন্তর্গত। সুতরাং এটি ছিল একটি দ্বিধাতুক আনন্দিনী জাতীয় নির্যুক্ত
প্রবন্ধ। ইচ্ছে করলে আভোগ অনুষ্ঠানের দ্বারা চতুর্মুখকে ত্রিধাতুকও করা
যেতে পারতো। কিন্তু, সম্পূর্ণ প্রবন্ধটি গাইবার পর গান শেষ করতে হতো
উদ্গ্রাহে। ৫৮১
পদৈশ্চ বিরুদৈ স্তেনৈঃ সুদর্শনো নিগদ্যতে। ৫৮২।
বিরুদ ও তেনক দ্বারা নিবদ্ধ এবং অনেকগুলি পদের সাহায্যে সুশোভিত
প্রবন্ধকে সুদর্শন প্রবন্ধ বলে। ৫৮২।
সঙ্গীত পারিজাত ৩০৯
টিপ্পনী : সুদর্শন প্রবন্ধর পরিচয় প্রসঙ্গে পারিজাতকার যা বলেছেন তার
সঙ্গে রত্নাকরের সামঞ্জস্য আছে। পারিজাতে অনেকগুলি পদের কথা উল্লিখিত
হয়েছে; কিন্তু রত্নাকরে উল্লিখিত হয়েছে তিনটি “খণ্ড”র কথা। অর্থাৎ এই
খণ্ডত্রয়ের উল্লেখ দ্বারা বহুপদের অস্তিত্ব প্রমাণিত হচ্ছে। কিন্তু, এই খণ্ডত্রয়ের
মধ্যে কতগুলি করে পদ বর্তমান থাকতো; অথবা, শিল্পী তার ইচ্ছানুযায়ী
পদের সংখ্যা বাড়াতে বা কমাতে পারতেন কিনা সে সম্বন্ধে রত্নাকরে কিছু
আলোচিত হয়নি। সুদর্শনের প্রথম খণ্ডটি ছিল নিরঙ্কুশ বাক্যাংশযুক্ত পদ;
দ্বিতীয় খণ্ডটি ছিল বিরুদযুক্ত এবং তৃতীয় খণ্ডের প্রতিপাদ্য ছিল তেনক।
প্রবন্ধর প্রথম খণ্ডটি হতো উদ্গ্রাহ এবং দ্বিতীয় ও তৃতীয় খণ্ড মিলে হতো
ধ্রুব। সুতরাং, সুদর্শন ছিল একটি দ্বিধাতুক দীপনী জাতীয় নির্যুক্ত প্রবন্ধ।
সম্ভবতঃ, আভোগ অনুষ্ঠানের দ্বারা একে ত্রিধাতুক করবারও ব্যবস্থা
ছিল। ॥৮২১॥
ত্রিভি রাগৈস্ত্রিভিস্তালৈ স্ত্রিভঙ্গী স্যাৎ ষড়ঙ্গকঃ ॥ ৮২২॥
যে প্রবন্ধর অঙ্গ হচ্ছে ছয়টি এবং যা তিনটি রাগ ও তিনটি তালের দ্বারা
বিরচিত হয়ে থাকে, তাকেই বলে ত্রিভঙ্গি প্রবন্ধ। ॥৮২২॥
টিপ্পনী : ত্রিভঙ্গি প্রবন্ধর পরিচয় প্রসঙ্গে পারিজাতকার যা বলেছেন
তার সঙ্গে রত্নাকরের পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। অহোবলের বক্তব্য অনুযায়ী
ত্রিভঙ্গি ছিল ছয় অঙ্গযুক্ত প্রবন্ধ। কিন্তু রত্নাকরে, এটিকে স্বর, পাট্ ও
পদযুক্ত তিন অঙ্গের দীপনী জাতীয় নির্যুক্ত প্রবন্ধরূপে চিহ্নিত করা হয়েছে।
অপরপক্ষে, পারিজাতকার বলেছেন ত্রিভঙ্গিতে তিনটি রাগ ও তিনটি তাল
ব্যবহৃত হয়, কিন্তু রত্নাকর বলেছেন, ত্রিভঙ্গি পাঁচটি প্রকার ভেদের মধ্যে
একটিতে তিনটি রাগ ও তিনটি তালের প্রয়োগ হয়ে থাকে। ত্রিভঙ্গির পাঁচটি
প্রকার ভেদের পরিচয় হচ্ছে, যথাক্রমে—
১। যে প্রবন্ধ ত্রিভঙ্গি তালে গীত হয়। ত্রিভঙ্গি তালের লক্ষণ হচ্ছে
ত্রিভঙ্গিঃ স-গণাদ্ গুরুঃ। অর্থাৎ, ( IISS ) পরের পর দুটি লঘু ও দুটি
গুরুমাত্রার প্রয়োগ।
২। যে প্রবন্ধ ত্রিভঙ্গি ছন্দে গীত হয়। এই ছন্দটি ছিল গাথা ছন্দের
অসংখ্য প্রকার ভেদের অন্যতম।
৩। যে প্রবন্ধে তিন রকম রাগ ও তিন রকম তাল প্রযুক্ত থাকে।
৪। যে প্রবন্ধ যে কোন তিন রকম ছন্দের মাধ্যমে গীত হয়ে থাকে।
৩১০ সঙ্গীত পারিজাত
৫। যে প্রবন্ধর মধ্যে যে কোন তিনটি দেবতার স্তুতি সংযুক্ত থাকে।
ত্রিভঙ্গির এই প্রকারটির আরও একটা বৈশিষ্ট্য ছিল—“তালদৈগুণ্য মুক্তকঃ”।
অর্থাৎ, গানটিকে দ্রুত লয় থেকে মধ্য লয়ে নামিয়ে এনে কিংবা মধ্য লয় থেকে
বিলম্বিত লয়ে নামিয়ে এনে শেষ করতে হতো।
ত্রিভঙ্গির ধাতু ব্যবস্থা কেমন ছিল, সে সম্বন্ধে সঠিক কিছু জানা
যায় না। । ৫৮২।
ত্রিপথঃ সতুবিজ্ঞেয়ো যস্মিন্ সন্তি গতিত্রয়ম্। ৫৮৩
যে প্রবন্ধর তিনটি পদে তিন গতি (লয়) বর্তমান থাকে তাকেই
বলে ত্রিপথ প্রবন্ধ। ৫৮৩
টিপ্পনী: পারিজাতের ত্রিপথ রত্নাকরে ত্রিপথক-রূপে উল্লিখিত হয়েছে
এবং বলাই বাহুল্য, উভয়ের পরিচিতির মধ্যে সামঞ্জস্য নেই। রত্নাকরে
ত্রিপথ-এর গতি সম্বন্ধে কোন আলোচনা স্থান পায়নি। পরন্তু, ত্রিপথক-এর
তিনটি পদকে পরিচিত করা হয়েছে, যথাক্রমে,—প্রথম পদে পাট্, দ্বিতীয়
পদে বিরুদ এবং তৃতীয় পদের প্রতিপাদ্য স্বরানুষ্ঠান। কল্লিনাথের মতানুযায়ী
ত্রিপথকের প্রথম দুটি পদ ছিল উদ্গ্রাহ এবং শেষের পদটি ছিল ধ্রুব ধাতুর
অন্তর্গত। অর্থাৎ, পদ ও তেনকহীন চতুরঙ্গ বিশিষ্ট দীপনী জাতীয় দ্বিধাতুক
নিযুক্ত প্রবন্ধ ছিল ত্রিপথ। তবে, এর মধ্যে পদ যোজনা করে আভোগ
অনুষ্ঠানেরও অবকাশ ছিল। সেরূপ ক্ষেত্রে ত্রিপথক হয়ে যেত তেনক-হীন
পঞ্চাঙ্গযুক্ত নন্দিনী বা আনন্দিনী জাতীয় ত্রিধাতুক নিযুক্ত প্রবন্ধ। ৫৮৩
নাস্তি যস্যান্তরং যস্মিন্ দণ্ডকঃ স নিগদ্যতে ॥ ৫৮৪
দণ্ডক ছন্দে নিবন্ধ হওয়ার কারণে যে পবন্ধর মধ্যে কোন রকম অন্তর বা
“ছেদ” থাকবার অবকাশ থাকে না, তাকেই বলে দণ্ডক প্রবন্ধ। ৫৮৪
টিপ্পনী: দণ্ডক প্রবন্ধর পরিচয় প্রসঙ্গে পারিজাতকার যা বলেছেন, তার
সঙ্গে রত্নাকরের সামঞ্জস্য আছে। রত্নাকরও বলেছেন, এই প্রবন্ধটি পদ ও স্বর
সহযোগে দণ্ডক ছন্দে রচিত হতো। কিন্তু আলোচ্য সূত্রে পারিজাতকার
'অন্তর' বা 'ছেদ'-হীন প্রবন্ধর উল্লেখ করে ঠিক কী বোঝাতে চেয়েছেন, সেটা
বুঝতে পারা যাচ্ছে না।
দণ্ডক ছন্দে অনেক রকম ভেদ হতো। যেমন—
চণ্ড-বৃষ্টি-প্রপাত-দণ্ডক। এর লক্ষণ ছিল দণ্ডকো নৌ রঃ। অর্থাৎ,
সঙ্গীত পারিজাত ৩১১
প্রথমে দুটি ন-গণ ও তার পরে সাতটি র গণের পদের পর প্রয়োগ। বর্ণগণের
আইন অনুযায়ী এই দণ্ডক ছন্দের বর্ণ বা অক্ষরের সংখ্যা দাঁড়ায় ( 111 × ২+
SIS × ৭ ) ছয়টি লঘু অক্ষরের পর গুরু-লঘু গুরু যুক্ত একুশটি অক্ষর এবং
( ৬+২১ = ২৭ ) এই লঘু-গুরু যুক্ত সাতাশটি অক্ষরের প্রয়োগ হতো একটি
আবৃত্তির মধ্যে। সাধারণ দণ্ডক প্রবন্ধ এই ছন্দেই গীত হতো।
আবার এই সাতাশটি অক্ষরের প্রয়োগ অন্যভাবেও দেখানো হতো।
যেমন, ছাব্বিশটি অক্ষরের সঙ্গে একটি অতিরিক্ত অক্ষর যুক্ত করে, সাতাশ
অক্ষরযুক্ত দণ্ডক ছন্দের আবৃত্তি পূর্ণ করা হতো।
কখনও আবার উক্ত সাতাশটি অক্ষরের সঙ্গে আরও একটি র-গণ যুক্ত
করে অর্থাৎ ( 111 × ২ + SIS × ৭ + SIS ) ত্রিশটি অক্ষরের মাধ্যমে দণ্ডক
প্রবন্ধের অন্তত একটি পদের ছেদন দেখানো হতো প্রস্তারের সাহায্যে।
কখনও র-গণের পরিবর্তে য-গণ ( ISS ) যুক্ত করে, অর্থাৎ র-গণের
গুরু-লঘু-গুরু বর্ণের একুশটি অক্ষরের পরিবর্তে য-গণের লঘু গুরু গুরু বর্ণের
একুশটি অক্ষর যুক্ত করে প্রত্যেক দণ্ডক ছন্দের প্রয়োগও দেখানো হতো।
এইভাবে দণ্ডক ছন্দের নানা প্রকার প্রকারভেদ দেখানো হতো। এবং
বলা বাহুল্য যে এই জাতীয় ছন্দের মধ্যে সাধারণতঃ "চ্ছেদ"
থাকে না। সুতরাং সঙ্গীত পারিজাতকার কেন ‘পদ’ বা ‘চ্ছেদ’-হীন
প্রবন্ধের কথা বলেছেন।
পূর্বে বলা হয়েছে, দণ্ডক ছন্দ ও স্বরযুক্ত দ্বিধাতুক প্রবন্ধ। গাওয়া
হতো তালে সুতরাং এটি ছিল একটি ভাবনী জাতীয় নির্যাত প্রবন্ধ।
এর পদযুক্ত প্রথমাংশটি ছিল উদ্গ্রাহ এবং স্বরযুক্ত শেষাংশটি ছিল ধ্রুব।
দণ্ডকের মধ্যে আরও পদ যোজনা করে আভোগ অনুষ্ঠানেরও অবকাশ
ছিল। সেরূপ ক্ষেত্রে দণ্ডক হয়ে যেতো ত্রিধাতুক প্রবন্ধ। এই প্রবন্ধ-গান
শেষ করা হতো উদ্গ্রাহে। ৫৮৩
শম্পাতালে যো গেয়ো ঝম্পটঃ সোঽভিধীয়তে। ৫৮৪।১
যে প্রবন্ধ শম্পাতালে গীত হয়, তাকেই বলে ঝম্পট প্রবন্ধ।
টিপ্পনী: ঝম্পট প্রবন্ধ প্রসঙ্গে পারিজাতকার যা বলেছেন, তার সঙ্গে
রত্নাকরের সামঞ্জস্য নেই। রত্নাকরের বিবৃতি অনুযায়ী ঝম্পট প্রবন্ধটি গাওয়া
হতো ঝম্পট ছন্দে এবং ক্রীড়া তালে—শম্পা তালে নয়। ঝম্পট ছন্দটি ছিল
গাথা ছন্দেরই একটি প্রকারভেদ এবং ক্রীড়া তালের লক্ষণ হচ্ছে, ক্রীডা দ্রুতৌ
৩১২ সঙ্গীত পারিজাত
বিরামান্তে। অর্থাৎ (০'০') দুটি বিরামযুক্ত দ্রুতমাত্রার প্রয়োগ। ঝম্পট
ছিল ত্রিপদৈঃ প্রাঞ্চঃ। অর্থাৎ পূর্ব বর্ণিত ত্রিপদী প্রবন্ধর মতো তিন পাদযুক্ত
প্রবন্ধ। এর প্রথম পাদ দুটি ছিল উদগ্রাহ ও শেষের পাদটি ছিল ধ্রুব।
ঝম্পটের মধ্যে কেবলমাত্র পদের অস্তিত্ব ছিল এবং সে পদগুলি পাওয়া হতো
তালে। সুতরাং ঝম্পট ছিল একটি দ্বিধাতুক তারাবলী জাতীয় নির্যুক্ত
প্রবন্ধ। এর মধ্যে আভোগ পরিকল্পনারও অবকাশ ছিল। সেরূপ ক্ষেত্রে
ঝম্পট হয়ে যেতো ত্রিধাতুক। ঝম্পট প্রবন্ধ-গানও শেষ করা হতো
উদগ্রাহে। । ৫৮১।
তালেন কন্দুকেনৈব কন্দুক, স নিগদ্যতে ॥ ৫৮১।২
যে প্রবন্ধ কন্দুক তালে গীত হয় তারই নাম কন্দুক প্রবন্ধ। । ৫৮১।২
টিপ্পনী : পারিজাতকার কন্দুক তালের কথা বলেছেন। কিন্তু রত্নাকর
বলেছেন কন্দুক ছন্দে গীত প্রবন্ধর নাম কন্দুক। সঙ্গীত শাস্ত্রে ছন্দ এবং
তাল অভিন্ন অর্থের অন্তর্গত বিষয়বস্তু নয়। তবে লিপিকার-প্রমাদ বশতঃ
ছন্দেন র স্থলে তালেন হয়ে যাওয়াও বিচিত্র নয়। যাহা হোক, পূর্ব বর্ণিত
ত্রিপদী ও ঝম্পট ছন্দের মতো কন্দুক ছন্দটিও ছিল গাথা ছন্দেরই প্রকারভেদ,
এবং এটিও ছিল ত্রিপাদযুক্ত প্রবন্ধ। কন্দুকের প্রথম পাদে থাকতো পদ,
দ্বিতীয় পাদে থাকতো পাট্ এবং তৃতীয় পাদের বিষয়বস্তু ছিল পদ।
ঝম্পটের মতো কন্দুকের ও প্রথম দুটি পাদ ছিল উদগ্রাহ ধাতুর অন্তর্গত এবং
শেষের পাদটি ছিল ধ্রুব। এই প্রবন্ধর প্রতিপাদ্য ছিল পদ, পাট্ ও পদ
এবং গাওয়া হতো তালে। সুতরাং এটি ছিল একটি দ্বিধাতুক তারাবলী জাতীয়
নির্যুক্ত প্রবন্ধ। কন্দুক প্রবন্ধ-গানও শেষ করা হতো উদগ্রাহে।
পারিজাত-পাঠক লক্ষ্য করবেন, প্রবন্ধ-গীতি-শাস্ত্রের প্রচলিত বিধি লঙ্ঘন
করে, পূর্ববর্ণিত সিংহনাদ, হংসলীল, দণ্ডক, ঝম্পট এবং আলোচ্য কন্দুক
এই পাঁচটি প্রবন্ধ-গীত ধ্রুবর পরিবর্তে উদগ্রাহে পরিসমাপ্তি ঘটাবার নির্দেশ
বহন করছে। বক্তব্য এই যে, এই নির্দেশ মূল রত্নাকরের নয়, টীকাকার
কল্লিনাথের। । ৫৮১।২
পদৈঃ পাটৈস্তথা চযা চর্চ্চাথাদ্যন্তকৈঃ পদৈঃ ॥ ৫৮২।১
পদ ও পাটযুক্ত প্রবন্ধকে চযা প্রবন্ধ বলে এবং যে প্রবন্ধের মধ্যে আদ্যন্ত—
অর্থাৎ, প্রথম থেকে শেষ পাদ-এর মধ্যে কেবলমাত্র পদ ব্যবহৃত হয়, তাকেই
বলে চর্চরী প্রবন্ধ। । ৫৮২।১
সঙ্গীত পারিজাত ৩১৩
টিপ্পনী : চয্যা ও চচ্চরী প্রবন্ধ সম্পর্কে পারিজাতকার যা বলেছেন তার
সঙ্গে রত্নাকরের অসামঞ্জস্য ও সামঞ্জস্য দুইই আছে।
চয্যা সম্পর্কে পারিজাতকার বলেছেন, এতে পদ ও পাট ব্যবহৃত হতো,
এ ছাড়া তাল তো ছিলই। অতএব পারিজাতের চয্যা ছিল ত্রি-অঙ্গযুক্ত
ভাবনাকাতীয় নিযুক্ত প্রবন্ধ। কিন্তু, রত্নাকরের চয্যা ছিল দ্বি-धातুক এবং
কেবলমাত্র তাল ও পদযুক্ত ভাবাবলী জাতীয় নিযুক্ত প্রবন্ধ। রত্নাকরে
দেখা যায় চৰ্যা রচিত হতো প্রধানতঃ পদ্ধটিকা ছন্দে—প্রাকৃত ভাষায়
যার নাম পদ্ধড়ী। এই গানের বিষয়বস্তু গ্রথিত হতো আধ্যাত্মিক তত্ত্ব ও
তথ্য অবলম্বনে। প্রতি পাদের শেষ অক্ষরে মিল রক্ষা করা হতো এবং গাওয়া
হতো—প্রধানতঃ দ্বিতীয় তালে। দ্বিতীয় তালের লক্ষণ হচ্ছে (০০।) দুটি
দ্রুত এবং একটি লঘু মাত্রার সমাবেশ। অন্যান্য অনেক প্রবন্ধের মতো চয্যারও
দুটি প্রকারভেদ ছিল—পূর্ণা ও অপূর্ণা। গানের ছন্দ ছন্দবিজ্ঞান অনুযায়ী
যথাযথভাবে পূর্ণ থাকলে তবেই তাকে পূর্ণা চৰ্যা বলা হতো। অন্যথা, সে গান
অপূর্ণা চয্যার অন্তর্গত হয়ে যেতো। চয্যা গানের অপরিহার্য্য অঙ্গ ছিল "ধুয়া"।
পূর্ণা-চয্যা ও অপূর্ণা-চয্যাও আবার দুটি শ্রেণীতে বিভক্ত থাকতো—সমধ্রুবা
ও বিষমধ্রুবা। এই সম ও বিষম ধ্রুবার পরিচিতি সম্পর্কে রত্নাকরের টীকাকার-
দ্বয়ের মধ্যে মতান্তর পরিলক্ষিত হয়।
যা হোক এক্ষেত্রে লক্ষ্য করবার বিষয় এই যে, রত্নাকর আমলের পাটহীন
চয্যা পারিজাতের আমলে পাটযুক্ত রূপ ধারণ করেছিল। এই রূপান্তরটা যে
অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সে কথা বলা বাহুল্য কারণ, চয্যা-গীত হচ্ছে এ দেশে
প্রচলিত প্রাচীনতম প্রবন্ধগুলির অন্যতম। প্রমাণ পাওয়া যায়, দ্বাদশ শতাব্দীর
মধ্যভাগেও চৰ্যার অনুশীলন প্রচলিত ছিল, আবার আজকের দিনের অনেক
গুণীজ্ঞানীও—বিশেষতঃ বাঙালী সাহিত্যসেবী, চৰ্যার প্রতিপাদ্য নিয়ে আলাপ
আলোচনা করে থাকেন। অবশ্য, এ হেন আলোচনার উদ্দেশ্য আদৌ
সাঙ্গীতিক নয়, এদেশের গতিশীল কাব্য-সাহিত্যের মূল্যায়ন তথা তার
প্রাচীনতম রূপ সম্বন্ধে সঠিক সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়ার আকাঙ্ক্ষাই চর্যালোচনার
অন্যতম কারণ। কিন্তু, এতাবৎকালের মধ্যে, কখনও কোন প্রামাণ্য চৰ্যার
মধ্যে পাটের অস্তিত্ব পরিলক্ষিত হয়নি। তৎপরবর্ত্তী যুগের চর্য্যার
পরবর্তী কালে বিরচিত পারিজাতের মধ্যে, চৰ্যা পাটযুক্ত প্রবন্ধরূপে উল্লিখিত
হলো কেন?
২১
আলোচ্যক্ষেত্রে, চর্চার পাটযুক্ত রূপ গ্রাহ্য হতে পারে না যেহেতু, পূর্বেই
বলেছি, প্রামাণ্য চর্যার মধ্যে পাটের অস্তিত্ব পরিলক্ষিত হয় না। কিন্তু,
এ কথাও স্বীকার্য যে আমাদের দেশে এমন পদ্ধতির আধ্যাত্মিক গান প্রচলিত
ছিল এবং আজও রয়েছে, যার লিখিত পরিচয়ের মধ্যে পাটের অস্তিত্ব না
থাকলেও, প্রয়োগের ক্ষেত্রে পাটের অস্তিত্ব প্রকট হয়ে ওঠে। আমরা এখানে
উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের জবাবী বাজনার কথা বলছি না, বিভিন্ন প্রদেশের ভিন্ন ভিন্ন
সম্প্রদায়ের মধ্যে এমন গান প্রচলিত ছিল এবং আজও রয়েছে যার পদযুক্ত
গীতাংশ শেষ হলে, চর্মবাদ্যের বোল বাজতো। যথা', গানের কিছুটা অংশ
গেয়ে গায়ক বা গায়কগণ নিবৃত্ত হতেন, তখন বাদ্যকার আরম্ভ করতেন ত ব
বাজনা। আবার বাজনা থামলে গায়ক বা গায়কগণ গানের বাকি অংশ
গাইতে আরম্ভ করতেন। এবং এইভাবে চলতো থাকতো এই পদ্ধতির
গান। ইতিহাসের দিক দিয়েও, এ রকম গীতি-রীতির উল্লেখ পাওয়া যায়।
আকবরের সমসাময়িক বদাউনীও তাঁর গ্রন্থের মধ্যে অনুরূপ গীতি-রীতির
পরিচয় দিয়ে গিয়েছেন দরবেশ সম্প্রদায়ের গীতি রীতির আলোচনা প্রসঙ্গে।
সুতরাং এমন অনুমানকে প্রশ্রয় দেওয়া বোধহয় অসঙ্গত হবে না যে,
পারিজাতের আমলের চর্চরী-গীতের মধ্যে পাটের অস্তিত্ব লিখিতভাবে না
থাকলেও প্রয়োগ-সাপেক্ষ ছিল। এবং সেই কারণেই চর্চাকে আমরা দ্বি-অঙ্গের
পরিবর্তে ত্রি-অঙ্গ-যুক্ত প্রবন্ধরূপে দেখতে পাচ্ছি।
চর্চরী প্রবন্ধ সম্পর্কে পারিজাতকার যা বলেছেন তার সঙ্গে রত্নাকরের
সামঞ্জস্য আছে। পারিজাতের চর্চরী ‘স্বাদ্বন্ত’ পদ দ্বারা সুশোভত থাকতো।
রত্নাকরও বলছেন, চর্চরীতে অসংখ্য পদ থাকে এবং যথাযথভাবে দুটি পাদের
শেষ অক্ষরে মিলও রক্ষা করা হয়। চর্চরী প্রবন্ধ গাওয়া হতো সাধারণতঃ
চর্চরী তালে এবং কেবলমাত্র হিন্দোল রাগে। চর্চরী তালের লক্ষণ হচ্ছে
( ০০’ ০০’ ০০’ ০০’ ০০’ ০০’ ০০’ ০০’ । ) বিরামান্ত দুটি দ্রুত মাত্রার আটটি
সমাবেশ এবং শেষে একটি লঘু মাত্রা। অপরপক্ষে, সেদিনকার হিন্দোল
রাগটিও বর্তমানের হিন্দোলের মতো ছিল না। পারিজাতের আমলে প্রচলিত
হিন্দোলের রূপ ছিল রে-পা বর্জিত জ্ঞ-দ-ণ। অর্থাৎ, ঔড়ব জাতীয় আশাব্বারী
ঠাটের রাগ ছিল হিন্দোল।
চর্চরী গান চর্চরী তাল ছাড়া ক্রীড়াতালেও গাওয়া যেতে পারতো এবং
ধত্তা-ছন্দ বা অনুরূপ যে কোন ছন্দে গাইবার ব্যবস্থাও ছিল। কিন্তু, যে কোন
ছন্দেই চর্চরী গাওয়া হোক না কেন, চর্চরীর সম্পর্কে এলেই সেই ছন্দটির নামও
চর্চরী-যুক্ত হয়ে যেতো।
চর্চরী গান মূলতঃ ছিল উদ্গ্রাহ ও ধ্রুব-যুক্ত দ্বি-ধাতুক প্রবন্ধ। কিন্তু,
আভোগ অনুষ্ঠানের দ্বারা একে ত্রি-ধাতুক করবার ব্যবস্থাও ছিল। চর্চরী
ছিল পদ ও তালযুক্ত দ্বি-অঙ্গ বিশিষ্ট প্রবন্ধ। অর্থাৎ, তারাবলী জাতীয় নির্যুক্ত
প্রবন্ধ।
আমাদের দেশে অনেক গুণীজ্ঞানী মনে করেন, প্রাচীন চর্চরী গীতির সঙ্গে
বর্তমানের চাঁচর গানের সম্বন্ধ ঘনিষ্ঠ। বলা বাহুল্য, ইতিহাসের পরিপ্রেক্ষিতে
চাঁচর গানের অস্তিত্বও অতি-প্রাচীন। প্রাচীন চর্চরীর সঙ্গে হয়তো একদা
তার ছিল সম্পর্কযুক্ত। কিন্তু, আমাদের জানিত চাঁচরের রাগ ও তালের
সঙ্গে বিলুপ্ত চর্চরীর রাগ ও তালের আপাততঃ কোন মিল দেখতে পাচ্ছি
না। । ৫৮৬/১ ।
পদৈশ্চ বিরুদৈস্তদ্বৎ স্বর পাটকৈঃ ॥ ৫৮৬।২
যে বদ্ধ গানে পদ, বিরুদ, স্বর ও পাট ব্যবহৃত হয়, তাকেই বলে হর্ষবর্ধন
প্রবন্ধ। ৫৮৬।২
টিপ্পনীঃ হর্ষবর্ধন সম্পর্কে পারিজাতকার যা বলেছেন, তার সঙ্গে
রত্নাকরের যথাযথ সামঞ্জস্য দেখা যায়। প্রবন্ধটি গাওয়া হতো তালে, অধিকন্তু,
পদ, বিরুদ, স্বর ও পাটযুক্ত ছিল। অর্থাৎ, হর্ষবর্ধন ছিল পঞ্চাঙ্গযুক্ত,
নন্দিনীজাতীয় নির্যুক্ত প্রবন্ধ। তবে, এর অঙ্গ-ব্যবস্থা সম্পর্কে রত্নাকরের
টীকাকারদ্বয়ের মধ্যে মতভেদ দৃষ্ট হয়। কল্লিনাথ বলেছেন, হর্ষবর্ধন ছিল
দ্বি-ধাতুক প্রবন্ধ। এর উদ্গ্রাহ অংশে থাকতো পদ ও বিরুদ এবং ধ্রুব অংশ
রচিত হতো স্বর ও পাট সহযোগে। অপরপক্ষে, সিংহ ভূপাল বলেছেন, হর্ষবর্ধন
ছিল কেবলমাত্র পদ ও বিরুদ যুক্ত প্রবন্ধ। সম্ভবতঃ, হর্ষবর্ধন চিরকালই নন্দিনী
জাতীয় প্রবন্ধ ছিল না। ৫৮৬।২
তাল-মানদ্বয়ং য্যাসৌ ভবেচ্ছ্রীবর্ধনাভিধঃ ॥ ৫৮৭।১
যে প্রবন্ধ গান তাল-মান সহযোগে গীত হয়, তাকেই বলে শ্রীবর্ধন
প্রবন্ধ। ৫৮৭।১
টিপ্পনীঃ শ্রীবর্ধন প্রবন্ধর পরিচয় প্রসঙ্গে পারিজাতকার কেবলমাত্র
তাল-মানের কথা বলেছেন, অঙ্গাদি সম্বন্ধে কোন কথা বলেন নি। এই অতি
৩১৬ সঙ্গীত পারিজাত
সংক্ষিপ্ত পরিচিতির কারণ দ্বিবিধ হতে পারে। হয়তো পরবর্তী কালের কোন
নকল-নবিশীর অসাবধানতার জন্য মূল সূত্রের মধ্যে থেকে কিছু অংশ বাদ পড়ে
গিয়েছে। কিংবা, প্রবন্ধটি অহোবলের আমলে এতই বেশী প্রচলিত ছিল যে,
অতি পরিচয় নিবন্ধন স্বয়ং গ্রন্থকারহ অসাবধান হয়েছিলেন। রত্নাকরে দেখা
যায়, শ্রীবর্ধন ছিল বিরুদ, পাট, পদ ও স্বরযুক্ত নন্দিনী জাতায় নিযুক্ত প্রবন্ধ।
প্রবন্ধটি ছিল দ্বি-ধাতুক। এর উদগ্রাহ অংশ রচিত হতো বিরুদ ও পাট
সহযোগে এবং ধ্রুব অংশে থাকতো পদ ও স্বর। সর্ব্বোপরি, গান শেষ করা
হতো তাল-মান বজায় রেখে।
বর্তমানে দেখা যায়, অনেক গুণীজ্ঞানী তাল-মান কথাটি অভিন্ন অর্থেই
ব্যবহার করে থাকেন। কিন্তু, আমাদের স্মরণ রাখা কর্তব্য, প্রাচীন যুগের
পণ্ডিতগণ পারতপক্ষে এমন কোন বাক্যের ব্যবহার করতেন না যার ফলে
ভ্রান্ত ধারণার সৃষ্টি হতে পারে। বাক্য হিসেবে “তাল-মান” অভিন্ন সংজ্ঞার
অন্তর্গত একটি কথা নয়—বিভিন্ন সংজ্ঞার পরিচায়ক দুটি কথা। ‘মান’ কথাটা
অবশ্য গতি-নির্দেশক, কিন্তু, সে গতি, তাল-মাত্রা-লয়-এর গতি নয় – উক্ত
তাল-মাত্রা-লয়-এর মধ্যে নিবদ্ধ মূল বাণীর নিজস্ব বৈশিষ্ট্য-জ্ঞাপক গতি—
যে গতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রক্ষা করার প্রয়োজনে, উক্ত তালেরই “মান” কে
তদনুরূপ প্রকৃতি গ্রহণ করতে হয়। যেমন, ধ্রুপদ ধামার প্রভৃতি গানের
বাঁট-উপজের গতি। আলোচ্য ক্ষেত্রে তাল-মাত্রা-লয়-বরাবর থাকে ; কিন্তু
বাণী ও বোলের গতি দ্রুত হয়ে যায়। ॥ ৮৭১ ॥
মধ্য মধ্য স্বরৈঃ র্যঃ স্যাৎ ( ? ) স্বরাঙ্গ সোঽভিধীয়তে। ॥ ৮৭২ ॥
যে প্রবন্ধ গানের মধ্য ধাতুতে অর্থাৎ ধ্রুব ধাতুতে স্বরের প্রয়োগ হয়,
তাকেই বলে স্বরাঙ্গ প্রবন্ধ। ॥ ৮৭২ ॥
টিপ্পনী : পারিজাতের স্বরাঙ্গ প্রবন্ধ সম্পর্কে আলোচ্য সূত্রের বক্তব্যটি
নিতান্তই দুর্বোধ্য। রত্নাকরে স্বরাঙ্গ নেই, স্বরাঙ্ক আছে। এবং, এই
স্বরাঙ্ক প্রবন্ধর টীকা-ভাষ্য আলোচনা করেই, আলোচ্য সূত্রের ‘মধ্য’ শব্দটিকে
আমরা মধ্যম ধাতু, অর্থাৎ, ধ্রুব ধাতুরূপে অনুমান করছি। কিন্তু, পরের
পর দুটি ‘মধ্য’ শব্দ ব্যবহার করে পারিজাতকার কী বোঝাতে চেয়েছেন,
সেটা কিছুতেই ধরতে পারছি না। একটি ‘মধ্য’ অর্থে যদি আমরা মধ্যম
ধাতুকে গ্রহণ করি, তাহলে অপর ‘মধ্য’টির অর্থ কী হতে পারে? মধ্যম
গ্রাম মধ্য (মুদারা) সপ্তক? কিংবা মধ্যম (মা) স্বর? বলাবাহুল্য,
উপরিউক্ত তিন রকম অনুমানের স্বপক্ষে ও বিপক্ষে সম্ভাব্য সকল রকম
যুক্তি প্রয়োগ করেও, আমরা এমন কিছুই পাচ্ছি না যাকে সঙ্গীত-বিজ্ঞানানুগ
তথ্যরূপে গ্রাহ্য করতে পারি। অপরপক্ষে, স্বরাঙ্কের সঙ্গে স্বরার্থ প্রবন্ধের
(স্বরপাঠৈরেব বাস্তুতোহং) গোলযোগও কল্পনা করতে পারি না যেহেতু,
পারিজাতের স্বরার্থ প্রবন্ধের উল্লেখ ও আলোচনা ইতিপূর্ব্বেই (৫৬০।১ সূত্র দ্রষ্টব্য)
করা হয়েছে। অতএব, আমরা বলতে বাধ্য যে, পূর্ব্বোল্লিখিত আরও অনেক
সূত্রের মতো পারিজাতের আলোচ্য সূত্রটিকেও বিকৃত করেছেন পরবর্তী কালের
কোন্ সঙ্গীত-অজ্ঞ লিপিকার।
রত্নাকরে স্বরাঙ্গ নেই, কিন্তু স্বরাঙ্ক প্রবন্ধ সম্পর্কে বিশদ আলোচনা স্থান
পেয়েছে। স্বরাঙ্কের অঙ্গ ছিল পদ, স্বর, বিরুদ এবং তাল তো ছিলই।
এবং স্বরাঙ্ক ছিল চতুরঙ্গবিশিষ্ট দীপনী জাতীয় নির্যুক্ত প্রবন্ধ। এতে ধাতুর
ব্যবস্থা তিনটি। কিন্তু, সেই ধাতু তিনটির মধ্যে উদ্গ্রাহ ও ধ্রুব ব্যতীত,
মেলাপক ব্যবহৃত হতো কিম্বা আভোগকে গ্রহণ করা হতো, সে সম্বন্ধে
রত্নাকর টীকাকারদ্বয়ের মধ্যে মতভেদ দৃষ্ট হয়। স্বরাঙ্ক যে ত্রিধাতুক ছিল
সে সম্বন্ধে উভয় টীকাকারই একমত। কিন্তু, তবুও, কল্লিনাথ মন্তব্য করেছেন
যে, স্বরাঙ্কের মধ্যে মেলাপক ও আভোগ উভয় ধাতুর ব্যবহার পরিলক্ষিত হলে,
প্রবন্ধটিকে চার ধাতুযুক্ত প্রবন্ধরূপে গণ্য করতে হবে। অধিকন্তু, স্বরাঙ্ক
প্রবন্ধ গাইতে হয় কেবলমাত্র মালবশ্রী রাগে। অর্থাৎ, কল্লিনাথের আমলে
স্বরাঙ্ক পাওয়া হতো কেবলমাত্র মালবশ্রী রাগে এবং প্রবন্ধটির ধাতু ব্যবস্থা ছিল
তিন কিংবা চার।
কিন্তু সেটা কী করে হতে পারে? সঙ্গীত বিজ্ঞানের সুস্পষ্ট নির্দেশ হচ্ছে
এই যে, ত্রিধাতুক প্রবন্ধ অর্থে মেলাপকহীন প্রবন্ধ বুঝতে হবে। মূলেও
আমরা পাচ্ছি, স্বরাঙ্ক ছিল ত্রিধাতুক প্রবন্ধ। কল্লিনাথের পূর্ব্ববর্তী টীকাকার
সিংহভূপালও প্রবন্ধটিকে তিন ধাতুযুক্ত প্রবন্ধরূপে উল্লেখ করেছেন। অথচ,
কল্লিনাথ আবার প্রবন্ধটির সম্ভাব্য চার ধাতুর উল্লেখ করতে গেলেন কেন?
এ কেনর উত্তর বোধহয় একটা পাওয়া যেতে পারে, উক্ত টীকাকারদ্বয়ের
টীকা ভাষ্যের দিক্টাকে লক্ষ্য করলে। আমরা দেখতে পাচ্ছি, সিংহভূপাল
যে সূত্রটিকে অবলম্বন করেছিলেন তার ভিত্তি “স্বরাঙ্ক ন্যাসবং স্বরৈঃ।” এখানে
“ন্যাসনং স্বরৈঃ” অর্থে বুঝতে হবে শেষ ধাতুর, অর্থাৎ আভোগ ধাতুর শেষ
৩১৮ সঙ্গীত পারিজাত
অংশে স্বর থাকবে এবং এখানে মালবশ্রী রাগের উল্লেখমাত্রও নেই। অপরপক্ষে,
কল্লিনাথ যে সূত্রটিকে অবলম্বন করেছিলেন তার মধ্যে স্বরাঙ্কের উল্লেখমাত্রও
নেই, পরন্তু, “মালবশ্রয়া গীয়তে” লিপিবদ্ধ রয়েছে।
স্বরাঙ্ক প্রবন্ধ গানে তালের ব্যবহার ছিল একাধিক এবং বৈশিষ্ট্যপূর্ণ।
যথা—
পদৈঃ স্তবৈশ্চ বিরুদৈরুদগ্রাহ্যাদিধ্রুবং ক্রমাৎ।
একদ্বিতৃচ তালাঃ স্যুঃ স্বরাদে ন্যাসনং স্বরে॥
অর্থাৎ, পদে উদগ্রাহ্, স্তবে ধ্রুব, বিরুদে আভোগ এবং পদে একটি তা- স্বরে
দুটি তাল বিরুদে তিনট তাল ও স্বরে সমাপ্তি বা ন্যাস।
বলাবাহুল্য স্বরাঙ্কর ধাতুগত ভাব ব্যবস্থার জন্য তার প্রয়োগ প রবেশনাও
তা ক্রমিক নিয়মানুসারে। ৫৮৭৷২
পাটৈশ্চ বিরুদৈঃপাটৈ স্তেনৈশ্চ বিলাসকঃ। ৫৮৮।১
যে প্রবন্ধ গানে পদ, বিরুদ ও তেনক ব্যবহৃত হয়, তাকেই বলা হয়-
বিলাসক প্রবন্ধ। ৫৮৮।১
টিপ্পনী : পারিজাতেব হরি-বিলাসক, এখানে হরি বিলাসকরূপে উল্লিখিত
হয়েছে। অঙ্গাদি ব্যবস্থার দিক দিয়েও উভয় গ্রন্থের মধ্যে সামঞ্জস্য আছে।
রত্নাকরের হরি বিলাসকও ছিল পঞ্চাঙ্গযুক্ত নন্দিনী জাতীব নিযুক্ত প্রবন্ধ। এর
উদগ্রাহে পদ ও বিরুদ থাকতো এবং আভোগে থাকতো পাট ও তেনক। সুতরাং
দ্বিধাতুক হলেও, প্রবন্ধটির মধ্যে অনিবদ্ধ পদ যোজনা করে আভোগ
অনুষ্ঠানেরও সুযোগ সূচনা ছিল। ৫৮৮।১
তালৈস্তু পদ যোগেন রাহড়ী সোঽভিধীয়তে॥ ৫৮৮।১
কেবলমাত্র তাল ও পদযুক্ত প্রবন্ধকেই রাহড়ী প্রবন্ধ বলে। ৫৮৮।২
টিপ্পনী : রাহড়ী সম্বন্ধে পারিজাতকার যা বলেছেন তার সঙ্গে রত্নাকরের
সামঞ্জস্য আছে। রত্নাকরের রাহড়ীও ছিল কেবলমাত্র পদ ও তালযুক্ত
তারাবলী জাতীয় নিযুক্ত প্রবন্ধ। গানের বিষয়বস্তু হতো বীররসাত্মক এবং
অসংখ্য পাদযুক্ত। যুদ্ধের সময় স্বদেশের সৈনিকদের মনে উদ্দীপনা জাগিয়ে
তোলাই ছিল রাহড়ী গানের প্রধান বৈশিষ্ট্য। কল্লিনাথের মন্তব্য পড়ে মনে
হয়, অসংখ্য পাদযুক্ত কোন রাহড়ী প্রবন্ধর সবটুকু গাওয়া বাধ্যতামূলক ছিল
না, প্রয়োজনমত পাদ নির্বাচন করে, উদগ্রাহ ও ধ্রুব ধাতুর মধ্যে যথাযথভাবে
সঙ্গীত পারিজাত ৩১৯
বণ্টন করে, প্রবন্ধটি গাওয়া হতো। দ্বিধাতুক রাগাদীকে, আভোগ অনুষ্ঠানের
দ্বারা ত্রিধাতুক করবারও ব্যবস্থা ছিল। ৫৮৮।২
শুভবাচক শব্দৈস্তু মঙ্গলাচার ঈরিতঃ। ৫৮৯।১
যে সব শব্দের সাহায্যে শুভ-কামনা বা কল্যাণ-কামনা করা হয়, সেই রকম
শব্দের দ্বারা গ্রথিত প্রবন্ধর নাম মঙ্গলাচার। ৫৮৯।১
টিপ্পনী: মঙ্গলাচার প্রবন্ধর পরিচয় প্রসঙ্গে পারিজাতকার যা বলেছেন
তা পড়ে প্রবন্ধটির সাঙ্গীতিক পরিচয় কিছুই পাওয়া যায় না। এ সম্বন্ধে
রত্নাকর বলেছেন, মঙ্গলাচার প্রবন্ধ গাওয়া হতো কৈশিকী রাগে, নিঃসারুক
তালে এবং স্বরাচরণ ছিল প্রবন্ধটির অন্যতম বৈশিষ্ট্য। নিঃসারুক তালের
লক্ষণ হচ্ছে বিরামন্তো লঘু নিঃসারকো মতঃ। অর্থাৎ, (।।') দুটি লঘুমাত্রার
সমাহার, কিন্তু শেষের লঘুমাত্ৰাটি বিরামযুক্ত। টীকাকার কল্লিনাথের
মতানুযায়ী মঙ্গলাচার প্রবন্ধটি ছিল ত্রিধাতুক এবং এর মধ্যে পৃথকভাবে
আভোগ অনুষ্ঠানের সুযোগ সুবিধা ছিল। অর্থাৎ, মূলে প্রবন্ধটি ছিল
উদগ্রাহ, মেলাপক ও ধ্রুব ধাতুযুক্ত ত্রিধাতুক প্রবন্ধ কিন্তু আভোগযুক্ত করে
একে চারধাতুযুক্তও করা যেতে পারতো। প্রবন্ধটির মধ্যে স্বরানুষ্ঠান করা
হতো গানের শেষাংশে কিংবা সম্পূর্ণ প্রবন্ধটির অন্তর্গত বিষয়বস্তুর
অন্ততপক্ষে অর্ধাংশ গীত হবার পরে। অর্থাৎ, গানের প্রথমাংশে স্বরানুষ্ঠান
করা বে-আইনী ছিল। কিন্তু, 'গানের অর্ধাংশ' অর্থে আলোচ্যক্ষেত্রে আমরা
কী বুঝবো? এখানে বিশেষভাবে লক্ষণীয় টীকাকারের মন্তব্য। ব্যবস্থাটা
ধাতুগত নয়, অংশগত। অর্থাৎ, ত্রিধাতুক প্রবন্ধের ক্ষেত্রে স্বরানুষ্ঠান আরম্ভ
হতো মেলাপক ধাতুর মাঝামাঝি অংশ থেকে ধ্রুবর সমাপ্তি পর্যন্ত, কি বা,
চারধাতুর ক্ষেত্রে স্বরানুষ্ঠান আরম্ভ হতো ধ্রুবর প্রারম্ভ থেকে আভোগের
শেষাংশ পর্যন্ত—এই রকম একটা বিশ্বাসই মনকে আচ্ছন্ন করে। কিন্তু,
ব্যাপারটা বোধহয় অত সহজ সরল ছিল না। কারণ, এই সহজ ব্যবস্থার
কথাটা টীকাকার খুব সরলভাবেই বলে যেতে পারতেন, কিন্তু তা বলেন নি।
বিশেষতঃ, “অন্ততপক্ষে অর্ধাংশে”র উদাহরণটি বিপরীত ইঙ্গিতই বহন করছে।
অপরপক্ষে, কল্লিনাথের মন্তব্যের মধ্যে পাঠান্তর গ্রহণের অবকাশ আছে।
যেমন, “প্রবন্ধটি ছিল ত্রিধাতুক, কিন্তু/এবং এর মধ্যে আভোগ অনুষ্ঠানেরও
সুযোগ সুবিধা ছিল।”—আলোচ্যক্ষেত্রে “কিন্তু/এবং”-এর স্থলে “যেহেতু”