सङ्गीतपारिजात (अहोबल - वीणा के तारों पर शुद्ध व विकृत स्वर-स्थान निर्धारण का ऐतिहासिक ग्रन्थ)
Sangitaparijata of Ahobala on Indian Musicology
पण्डित अहोबल (टीकाकार: कलानिधि कलिन्द) द्वारा
৩০৮ সঙ্গীত পারিজাত
একস্মিন্নেব সময়ে চত্বার স্তাল ধারিণঃ।
চতুর্ম্মুখঃ স বিজ্ঞেয়ঃ সমকালেন শোভিতঃ ॥ ৫৮১
যে প্রবন্ধর মধ্যে সমকালে চারটি তাল বিদ্যমান থাকে এবং গাইবার সময়
চারজন তালাধ্যায়ীর প্রয়োজন হয় এই চারটি তালকে দেখাবার জন্যে—সেই
চারটি তালের দ্বারা সুশোভিত প্রবন্ধ চতুর্মুখ নামে প্রখ্যাত। ৫৮১
টিপ্পনী : চতুর্মুখ প্রবন্ধ পরিচিতি প্রসঙ্গে পারিজাতকার যা বলেছেন
তার সঙ্গে রত্নাকরের সামঞ্জস্য নেই। পারিজাতকার বলেছেন, এই প্রবন্ধ
গাইবার সময় চারজন তালাধ্যায়ীর প্রয়োজন হতো তাল রক্ষার জন্যে।
অর্থাৎ, এমনই কোন তালের সাহায্যে এই প্রবন্ধটি গীত হতো যার মাত্রা
সংখ্যা ছিল অভিন্ন কিন্তু বিভাগ ছিল চতুবিধ। বলা বাহুল্য, এই চার রকম
মাত্রাবিভাগজনিত তালটি চার রকম তালের মূর্ত্তি পরিগ্রহ করতো বলেই
গানের সময় চারজন তালধারীর প্রয়োজন হতো। এবং শেষে সম্ এসে
পড়ত যথাস্থানেই। মনে হয়, তাল প্রদর্শনের এই বিচিত্র ব্যবস্থার জন্যই
প্রবন্ধটি চতুর্মুখ নামে প্রখ্যাত হয়েছিল। কিন্তু, রত্নাকরে চতুর্মুখের বৈশিষ্ট্য
সম্পর্কে কোন আলোচনাই স্থান পায়নি।
চতুর্মুখ প্রবন্ধের পাদের সংখ্যা ছিল চারটি এবং এই চারটি পদে যথাক্রমে
ব্যবহৃত হতো চারটি বর্ণ। যথা—১ম পদে, স্থায়ী বর্ণ, নিবদ্ধ স্বরানুষ্ঠান
করা হতো। ২য় পদে, আরোহী বর্ণে, পাট্ প্রযোজিত হতো। ৩য় পদে
বাক্যাংশের সঙ্গে যুক্ত থাকতো অবরোহী বর্ণ। ৪র্থ পদে, সঞ্চারী বর্ণে,
তেনকের অনুষ্ঠান করা হতো।
চতুর্মুখ প্রবন্ধে চারটি বর্ণের যথাযথ প্রয়োগ লক্ষ্য করবার মতো। হয়তো,
চারটি বর্ণের দ্বারা গঠিত ছিল বলেই প্রবন্ধটি চতুর্মুখ নামে প্রচলিত হয়েছিল।
চতুর্মুখের প্রথম পাদ দুটি ছিল উদ্গ্রাহ ও শেষের পাদ দুটি ছিল ধ্রুব ধাতুর
অন্তর্গত। সুতরাং এটি ছিল একটি দ্বিধাতুক আনন্দিনী জাতীয় নির্যুক্ত
প্রবন্ধ। ইচ্ছে করলে আভোগ অনুষ্ঠানের দ্বারা চতুর্মুখকে ত্রিধাতুকও করা
যেতে পারতো। কিন্তু, সম্পূর্ণ প্রবন্ধটি গাইবার পর গান শেষ করতে হতো
উদ্গ্রাহে। ৫৮১
পদৈশ্চ বিরুদৈ স্তেনৈঃ সুদর্শনো নিগদ্যতে। ৫৮২।
বিরুদ ও তেনক দ্বারা নিবদ্ধ এবং অনেকগুলি পদের সাহায্যে সুশোভিত
প্রবন্ধকে সুদর্শন প্রবন্ধ বলে। ৫৮২।
সঙ্গীত পারিজাত ৩০৯
টিপ্পনী : সুদর্শন প্রবন্ধর পরিচয় প্রসঙ্গে পারিজাতকার যা বলেছেন তার
সঙ্গে রত্নাকরের সামঞ্জস্য আছে। পারিজাতে অনেকগুলি পদের কথা উল্লিখিত
হয়েছে; কিন্তু রত্নাকরে উল্লিখিত হয়েছে তিনটি “খণ্ড”র কথা। অর্থাৎ এই
খণ্ডত্রয়ের উল্লেখ দ্বারা বহুপদের অস্তিত্ব প্রমাণিত হচ্ছে। কিন্তু, এই খণ্ডত্রয়ের
মধ্যে কতগুলি করে পদ বর্তমান থাকতো; অথবা, শিল্পী তার ইচ্ছানুযায়ী
পদের সংখ্যা বাড়াতে বা কমাতে পারতেন কিনা সে সম্বন্ধে রত্নাকরে কিছু
আলোচিত হয়নি। সুদর্শনের প্রথম খণ্ডটি ছিল নিরঙ্কুশ বাক্যাংশযুক্ত পদ;
দ্বিতীয় খণ্ডটি ছিল বিরুদযুক্ত এবং তৃতীয় খণ্ডের প্রতিপাদ্য ছিল তেনক।
প্রবন্ধর প্রথম খণ্ডটি হতো উদ্গ্রাহ এবং দ্বিতীয় ও তৃতীয় খণ্ড মিলে হতো
ধ্রুব। সুতরাং, সুদর্শন ছিল একটি দ্বিধাতুক দীপনী জাতীয় নির্যুক্ত প্রবন্ধ।
সম্ভবতঃ, আভোগ অনুষ্ঠানের দ্বারা একে ত্রিধাতুক করবারও ব্যবস্থা
ছিল। ॥৮২১॥
ত্রিভি রাগৈস্ত্রিভিস্তালৈ স্ত্রিভঙ্গী স্যাৎ ষড়ঙ্গকঃ ॥ ৮২২॥
যে প্রবন্ধর অঙ্গ হচ্ছে ছয়টি এবং যা তিনটি রাগ ও তিনটি তালের দ্বারা
বিরচিত হয়ে থাকে, তাকেই বলে ত্রিভঙ্গি প্রবন্ধ। ॥৮২২॥
টিপ্পনী : ত্রিভঙ্গি প্রবন্ধর পরিচয় প্রসঙ্গে পারিজাতকার যা বলেছেন
তার সঙ্গে রত্নাকরের পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। অহোবলের বক্তব্য অনুযায়ী
ত্রিভঙ্গি ছিল ছয় অঙ্গযুক্ত প্রবন্ধ। কিন্তু রত্নাকরে, এটিকে স্বর, পাট্ ও
পদযুক্ত তিন অঙ্গের দীপনী জাতীয় নির্যুক্ত প্রবন্ধরূপে চিহ্নিত করা হয়েছে।
অপরপক্ষে, পারিজাতকার বলেছেন ত্রিভঙ্গিতে তিনটি রাগ ও তিনটি তাল
ব্যবহৃত হয়, কিন্তু রত্নাকর বলেছেন, ত্রিভঙ্গি পাঁচটি প্রকার ভেদের মধ্যে
একটিতে তিনটি রাগ ও তিনটি তালের প্রয়োগ হয়ে থাকে। ত্রিভঙ্গির পাঁচটি
প্রকার ভেদের পরিচয় হচ্ছে, যথাক্রমে—
১। যে প্রবন্ধ ত্রিভঙ্গি তালে গীত হয়। ত্রিভঙ্গি তালের লক্ষণ হচ্ছে
ত্রিভঙ্গিঃ স-গণাদ্ গুরুঃ। অর্থাৎ, ( IISS ) পরের পর দুটি লঘু ও দুটি
গুরুমাত্রার প্রয়োগ।
২। যে প্রবন্ধ ত্রিভঙ্গি ছন্দে গীত হয়। এই ছন্দটি ছিল গাথা ছন্দের
অসংখ্য প্রকার ভেদের অন্যতম।
৩। যে প্রবন্ধে তিন রকম রাগ ও তিন রকম তাল প্রযুক্ত থাকে।
৪। যে প্রবন্ধ যে কোন তিন রকম ছন্দের মাধ্যমে গীত হয়ে থাকে।
৩১০ সঙ্গীত পারিজাত
৫। যে প্রবন্ধর মধ্যে যে কোন তিনটি দেবতার স্তুতি সংযুক্ত থাকে।
ত্রিভঙ্গির এই প্রকারটির আরও একটা বৈশিষ্ট্য ছিল—“তালদৈগুণ্য মুক্তকঃ”।
অর্থাৎ, গানটিকে দ্রুত লয় থেকে মধ্য লয়ে নামিয়ে এনে কিংবা মধ্য লয় থেকে
বিলম্বিত লয়ে নামিয়ে এনে শেষ করতে হতো।
ত্রিভঙ্গির ধাতু ব্যবস্থা কেমন ছিল, সে সম্বন্ধে সঠিক কিছু জানা
যায় না। । ৫৮২।
ত্রিপথঃ সতুবিজ্ঞেয়ো যস্মিন্ সন্তি গতিত্রয়ম্। ৫৮৩
যে প্রবন্ধর তিনটি পদে তিন গতি (লয়) বর্তমান থাকে তাকেই
বলে ত্রিপথ প্রবন্ধ। ৫৮৩
টিপ্পনী: পারিজাতের ত্রিপথ রত্নাকরে ত্রিপথক-রূপে উল্লিখিত হয়েছে
এবং বলাই বাহুল্য, উভয়ের পরিচিতির মধ্যে সামঞ্জস্য নেই। রত্নাকরে
ত্রিপথ-এর গতি সম্বন্ধে কোন আলোচনা স্থান পায়নি। পরন্তু, ত্রিপথক-এর
তিনটি পদকে পরিচিত করা হয়েছে, যথাক্রমে,—প্রথম পদে পাট্, দ্বিতীয়
পদে বিরুদ এবং তৃতীয় পদের প্রতিপাদ্য স্বরানুষ্ঠান। কল্লিনাথের মতানুযায়ী
ত্রিপথকের প্রথম দুটি পদ ছিল উদ্গ্রাহ এবং শেষের পদটি ছিল ধ্রুব ধাতুর
অন্তর্গত। অর্থাৎ, পদ ও তেনকহীন চতুরঙ্গ বিশিষ্ট দীপনী জাতীয় দ্বিধাতুক
নিযুক্ত প্রবন্ধ ছিল ত্রিপথ। তবে, এর মধ্যে পদ যোজনা করে আভোগ
অনুষ্ঠানেরও অবকাশ ছিল। সেরূপ ক্ষেত্রে ত্রিপথক হয়ে যেত তেনক-হীন
পঞ্চাঙ্গযুক্ত নন্দিনী বা আনন্দিনী জাতীয় ত্রিধাতুক নিযুক্ত প্রবন্ধ। ৫৮৩
নাস্তি যস্যান্তরং যস্মিন্ দণ্ডকঃ স নিগদ্যতে ॥ ৫৮৪
দণ্ডক ছন্দে নিবন্ধ হওয়ার কারণে যে পবন্ধর মধ্যে কোন রকম অন্তর বা
“ছেদ” থাকবার অবকাশ থাকে না, তাকেই বলে দণ্ডক প্রবন্ধ। ৫৮৪
টিপ্পনী: দণ্ডক প্রবন্ধর পরিচয় প্রসঙ্গে পারিজাতকার যা বলেছেন, তার
সঙ্গে রত্নাকরের সামঞ্জস্য আছে। রত্নাকরও বলেছেন, এই প্রবন্ধটি পদ ও স্বর
সহযোগে দণ্ডক ছন্দে রচিত হতো। কিন্তু আলোচ্য সূত্রে পারিজাতকার
'অন্তর' বা 'ছেদ'-হীন প্রবন্ধর উল্লেখ করে ঠিক কী বোঝাতে চেয়েছেন, সেটা
বুঝতে পারা যাচ্ছে না।
দণ্ডক ছন্দে অনেক রকম ভেদ হতো। যেমন—
চণ্ড-বৃষ্টি-প্রপাত-দণ্ডক। এর লক্ষণ ছিল দণ্ডকো নৌ রঃ। অর্থাৎ,
সঙ্গীত পারিজাত ৩১১
প্রথমে দুটি ন-গণ ও তার পরে সাতটি র গণের পদের পর প্রয়োগ। বর্ণগণের
আইন অনুযায়ী এই দণ্ডক ছন্দের বর্ণ বা অক্ষরের সংখ্যা দাঁড়ায় ( 111 × ২+
SIS × ৭ ) ছয়টি লঘু অক্ষরের পর গুরু-লঘু গুরু যুক্ত একুশটি অক্ষর এবং
( ৬+২১ = ২৭ ) এই লঘু-গুরু যুক্ত সাতাশটি অক্ষরের প্রয়োগ হতো একটি
আবৃত্তির মধ্যে। সাধারণ দণ্ডক প্রবন্ধ এই ছন্দেই গীত হতো।
আবার এই সাতাশটি অক্ষরের প্রয়োগ অন্যভাবেও দেখানো হতো।
যেমন, ছাব্বিশটি অক্ষরের সঙ্গে একটি অতিরিক্ত অক্ষর যুক্ত করে, সাতাশ
অক্ষরযুক্ত দণ্ডক ছন্দের আবৃত্তি পূর্ণ করা হতো।
কখনও আবার উক্ত সাতাশটি অক্ষরের সঙ্গে আরও একটি র-গণ যুক্ত
করে অর্থাৎ ( 111 × ২ + SIS × ৭ + SIS ) ত্রিশটি অক্ষরের মাধ্যমে দণ্ডক
প্রবন্ধের অন্তত একটি পদের ছেদন দেখানো হতো প্রস্তারের সাহায্যে।
কখনও র-গণের পরিবর্তে য-গণ ( ISS ) যুক্ত করে, অর্থাৎ র-গণের
গুরু-লঘু-গুরু বর্ণের একুশটি অক্ষরের পরিবর্তে য-গণের লঘু গুরু গুরু বর্ণের
একুশটি অক্ষর যুক্ত করে প্রত্যেক দণ্ডক ছন্দের প্রয়োগও দেখানো হতো।
এইভাবে দণ্ডক ছন্দের নানা প্রকার প্রকারভেদ দেখানো হতো। এবং
বলা বাহুল্য যে এই জাতীয় ছন্দের মধ্যে সাধারণতঃ "চ্ছেদ"
থাকে না। সুতরাং সঙ্গীত পারিজাতকার কেন ‘পদ’ বা ‘চ্ছেদ’-হীন
প্রবন্ধের কথা বলেছেন।
পূর্বে বলা হয়েছে, দণ্ডক ছন্দ ও স্বরযুক্ত দ্বিধাতুক প্রবন্ধ। গাওয়া
হতো তালে সুতরাং এটি ছিল একটি ভাবনী জাতীয় নির্যাত প্রবন্ধ।
এর পদযুক্ত প্রথমাংশটি ছিল উদ্গ্রাহ এবং স্বরযুক্ত শেষাংশটি ছিল ধ্রুব।
দণ্ডকের মধ্যে আরও পদ যোজনা করে আভোগ অনুষ্ঠানেরও অবকাশ
ছিল। সেরূপ ক্ষেত্রে দণ্ডক হয়ে যেতো ত্রিধাতুক প্রবন্ধ। এই প্রবন্ধ-গান
শেষ করা হতো উদ্গ্রাহে। ৫৮৩
শম্পাতালে যো গেয়ো ঝম্পটঃ সোঽভিধীয়তে। ৫৮৪।১
যে প্রবন্ধ শম্পাতালে গীত হয়, তাকেই বলে ঝম্পট প্রবন্ধ।
টিপ্পনী: ঝম্পট প্রবন্ধ প্রসঙ্গে পারিজাতকার যা বলেছেন, তার সঙ্গে
রত্নাকরের সামঞ্জস্য নেই। রত্নাকরের বিবৃতি অনুযায়ী ঝম্পট প্রবন্ধটি গাওয়া
হতো ঝম্পট ছন্দে এবং ক্রীড়া তালে—শম্পা তালে নয়। ঝম্পট ছন্দটি ছিল
গাথা ছন্দেরই একটি প্রকারভেদ এবং ক্রীড়া তালের লক্ষণ হচ্ছে, ক্রীডা দ্রুতৌ
৩১২ সঙ্গীত পারিজাত
বিরামান্তে। অর্থাৎ (০'০') দুটি বিরামযুক্ত দ্রুতমাত্রার প্রয়োগ। ঝম্পট
ছিল ত্রিপদৈঃ প্রাঞ্চঃ। অর্থাৎ পূর্ব বর্ণিত ত্রিপদী প্রবন্ধর মতো তিন পাদযুক্ত
প্রবন্ধ। এর প্রথম পাদ দুটি ছিল উদগ্রাহ ও শেষের পাদটি ছিল ধ্রুব।
ঝম্পটের মধ্যে কেবলমাত্র পদের অস্তিত্ব ছিল এবং সে পদগুলি পাওয়া হতো
তালে। সুতরাং ঝম্পট ছিল একটি দ্বিধাতুক তারাবলী জাতীয় নির্যুক্ত
প্রবন্ধ। এর মধ্যে আভোগ পরিকল্পনারও অবকাশ ছিল। সেরূপ ক্ষেত্রে
ঝম্পট হয়ে যেতো ত্রিধাতুক। ঝম্পট প্রবন্ধ-গানও শেষ করা হতো
উদগ্রাহে। । ৫৮১।
তালেন কন্দুকেনৈব কন্দুক, স নিগদ্যতে ॥ ৫৮১।২
যে প্রবন্ধ কন্দুক তালে গীত হয় তারই নাম কন্দুক প্রবন্ধ। । ৫৮১।২
টিপ্পনী : পারিজাতকার কন্দুক তালের কথা বলেছেন। কিন্তু রত্নাকর
বলেছেন কন্দুক ছন্দে গীত প্রবন্ধর নাম কন্দুক। সঙ্গীত শাস্ত্রে ছন্দ এবং
তাল অভিন্ন অর্থের অন্তর্গত বিষয়বস্তু নয়। তবে লিপিকার-প্রমাদ বশতঃ
ছন্দেন র স্থলে তালেন হয়ে যাওয়াও বিচিত্র নয়। যাহা হোক, পূর্ব বর্ণিত
ত্রিপদী ও ঝম্পট ছন্দের মতো কন্দুক ছন্দটিও ছিল গাথা ছন্দেরই প্রকারভেদ,
এবং এটিও ছিল ত্রিপাদযুক্ত প্রবন্ধ। কন্দুকের প্রথম পাদে থাকতো পদ,
দ্বিতীয় পাদে থাকতো পাট্ এবং তৃতীয় পাদের বিষয়বস্তু ছিল পদ।
ঝম্পটের মতো কন্দুকের ও প্রথম দুটি পাদ ছিল উদগ্রাহ ধাতুর অন্তর্গত এবং
শেষের পাদটি ছিল ধ্রুব। এই প্রবন্ধর প্রতিপাদ্য ছিল পদ, পাট্ ও পদ
এবং গাওয়া হতো তালে। সুতরাং এটি ছিল একটি দ্বিধাতুক তারাবলী জাতীয়
নির্যুক্ত প্রবন্ধ। কন্দুক প্রবন্ধ-গানও শেষ করা হতো উদগ্রাহে।
পারিজাত-পাঠক লক্ষ্য করবেন, প্রবন্ধ-গীতি-শাস্ত্রের প্রচলিত বিধি লঙ্ঘন
করে, পূর্ববর্ণিত সিংহনাদ, হংসলীল, দণ্ডক, ঝম্পট এবং আলোচ্য কন্দুক
এই পাঁচটি প্রবন্ধ-গীত ধ্রুবর পরিবর্তে উদগ্রাহে পরিসমাপ্তি ঘটাবার নির্দেশ
বহন করছে। বক্তব্য এই যে, এই নির্দেশ মূল রত্নাকরের নয়, টীকাকার
কল্লিনাথের। । ৫৮১।২
পদৈঃ পাটৈস্তথা চযা চর্চ্চাথাদ্যন্তকৈঃ পদৈঃ ॥ ৫৮২।১
পদ ও পাটযুক্ত প্রবন্ধকে চযা প্রবন্ধ বলে এবং যে প্রবন্ধের মধ্যে আদ্যন্ত—
অর্থাৎ, প্রথম থেকে শেষ পাদ-এর মধ্যে কেবলমাত্র পদ ব্যবহৃত হয়, তাকেই
বলে চর্চরী প্রবন্ধ। । ৫৮২।১
সঙ্গীত পারিজাত ৩১৩
টিপ্পনী : চয্যা ও চচ্চরী প্রবন্ধ সম্পর্কে পারিজাতকার যা বলেছেন তার
সঙ্গে রত্নাকরের অসামঞ্জস্য ও সামঞ্জস্য দুইই আছে।
চয্যা সম্পর্কে পারিজাতকার বলেছেন, এতে পদ ও পাট ব্যবহৃত হতো,
এ ছাড়া তাল তো ছিলই। অতএব পারিজাতের চয্যা ছিল ত্রি-অঙ্গযুক্ত
ভাবনাকাতীয় নিযুক্ত প্রবন্ধ। কিন্তু, রত্নাকরের চয্যা ছিল দ্বি-धातুক এবং
কেবলমাত্র তাল ও পদযুক্ত ভাবাবলী জাতীয় নিযুক্ত প্রবন্ধ। রত্নাকরে
দেখা যায় চৰ্যা রচিত হতো প্রধানতঃ পদ্ধটিকা ছন্দে—প্রাকৃত ভাষায়
যার নাম পদ্ধড়ী। এই গানের বিষয়বস্তু গ্রথিত হতো আধ্যাত্মিক তত্ত্ব ও
তথ্য অবলম্বনে। প্রতি পাদের শেষ অক্ষরে মিল রক্ষা করা হতো এবং গাওয়া
হতো—প্রধানতঃ দ্বিতীয় তালে। দ্বিতীয় তালের লক্ষণ হচ্ছে (০০।) দুটি
দ্রুত এবং একটি লঘু মাত্রার সমাবেশ। অন্যান্য অনেক প্রবন্ধের মতো চয্যারও
দুটি প্রকারভেদ ছিল—পূর্ণা ও অপূর্ণা। গানের ছন্দ ছন্দবিজ্ঞান অনুযায়ী
যথাযথভাবে পূর্ণ থাকলে তবেই তাকে পূর্ণা চৰ্যা বলা হতো। অন্যথা, সে গান
অপূর্ণা চয্যার অন্তর্গত হয়ে যেতো। চয্যা গানের অপরিহার্য্য অঙ্গ ছিল "ধুয়া"।
পূর্ণা-চয্যা ও অপূর্ণা-চয্যাও আবার দুটি শ্রেণীতে বিভক্ত থাকতো—সমধ্রুবা
ও বিষমধ্রুবা। এই সম ও বিষম ধ্রুবার পরিচিতি সম্পর্কে রত্নাকরের টীকাকার-
দ্বয়ের মধ্যে মতান্তর পরিলক্ষিত হয়।
যা হোক এক্ষেত্রে লক্ষ্য করবার বিষয় এই যে, রত্নাকর আমলের পাটহীন
চয্যা পারিজাতের আমলে পাটযুক্ত রূপ ধারণ করেছিল। এই রূপান্তরটা যে
অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সে কথা বলা বাহুল্য কারণ, চয্যা-গীত হচ্ছে এ দেশে
প্রচলিত প্রাচীনতম প্রবন্ধগুলির অন্যতম। প্রমাণ পাওয়া যায়, দ্বাদশ শতাব্দীর
মধ্যভাগেও চৰ্যার অনুশীলন প্রচলিত ছিল, আবার আজকের দিনের অনেক
গুণীজ্ঞানীও—বিশেষতঃ বাঙালী সাহিত্যসেবী, চৰ্যার প্রতিপাদ্য নিয়ে আলাপ
আলোচনা করে থাকেন। অবশ্য, এ হেন আলোচনার উদ্দেশ্য আদৌ
সাঙ্গীতিক নয়, এদেশের গতিশীল কাব্য-সাহিত্যের মূল্যায়ন তথা তার
প্রাচীনতম রূপ সম্বন্ধে সঠিক সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়ার আকাঙ্ক্ষাই চর্যালোচনার
অন্যতম কারণ। কিন্তু, এতাবৎকালের মধ্যে, কখনও কোন প্রামাণ্য চৰ্যার
মধ্যে পাটের অস্তিত্ব পরিলক্ষিত হয়নি। তৎপরবর্ত্তী যুগের চর্য্যার
পরবর্তী কালে বিরচিত পারিজাতের মধ্যে, চৰ্যা পাটযুক্ত প্রবন্ধরূপে উল্লিখিত
হলো কেন?
২১
আলোচ্যক্ষেত্রে, চর্চার পাটযুক্ত রূপ গ্রাহ্য হতে পারে না যেহেতু, পূর্বেই
বলেছি, প্রামাণ্য চর্যার মধ্যে পাটের অস্তিত্ব পরিলক্ষিত হয় না। কিন্তু,
এ কথাও স্বীকার্য যে আমাদের দেশে এমন পদ্ধতির আধ্যাত্মিক গান প্রচলিত
ছিল এবং আজও রয়েছে, যার লিখিত পরিচয়ের মধ্যে পাটের অস্তিত্ব না
থাকলেও, প্রয়োগের ক্ষেত্রে পাটের অস্তিত্ব প্রকট হয়ে ওঠে। আমরা এখানে
উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের জবাবী বাজনার কথা বলছি না, বিভিন্ন প্রদেশের ভিন্ন ভিন্ন
সম্প্রদায়ের মধ্যে এমন গান প্রচলিত ছিল এবং আজও রয়েছে যার পদযুক্ত
গীতাংশ শেষ হলে, চর্মবাদ্যের বোল বাজতো। যথা', গানের কিছুটা অংশ
গেয়ে গায়ক বা গায়কগণ নিবৃত্ত হতেন, তখন বাদ্যকার আরম্ভ করতেন ত ব
বাজনা। আবার বাজনা থামলে গায়ক বা গায়কগণ গানের বাকি অংশ
গাইতে আরম্ভ করতেন। এবং এইভাবে চলতো থাকতো এই পদ্ধতির
গান। ইতিহাসের দিক দিয়েও, এ রকম গীতি-রীতির উল্লেখ পাওয়া যায়।
আকবরের সমসাময়িক বদাউনীও তাঁর গ্রন্থের মধ্যে অনুরূপ গীতি-রীতির
পরিচয় দিয়ে গিয়েছেন দরবেশ সম্প্রদায়ের গীতি রীতির আলোচনা প্রসঙ্গে।
সুতরাং এমন অনুমানকে প্রশ্রয় দেওয়া বোধহয় অসঙ্গত হবে না যে,
পারিজাতের আমলের চর্চরী-গীতের মধ্যে পাটের অস্তিত্ব লিখিতভাবে না
থাকলেও প্রয়োগ-সাপেক্ষ ছিল। এবং সেই কারণেই চর্চাকে আমরা দ্বি-অঙ্গের
পরিবর্তে ত্রি-অঙ্গ-যুক্ত প্রবন্ধরূপে দেখতে পাচ্ছি।
চর্চরী প্রবন্ধ সম্পর্কে পারিজাতকার যা বলেছেন তার সঙ্গে রত্নাকরের
সামঞ্জস্য আছে। পারিজাতের চর্চরী ‘স্বাদ্বন্ত’ পদ দ্বারা সুশোভত থাকতো।
রত্নাকরও বলছেন, চর্চরীতে অসংখ্য পদ থাকে এবং যথাযথভাবে দুটি পাদের
শেষ অক্ষরে মিলও রক্ষা করা হয়। চর্চরী প্রবন্ধ গাওয়া হতো সাধারণতঃ
চর্চরী তালে এবং কেবলমাত্র হিন্দোল রাগে। চর্চরী তালের লক্ষণ হচ্ছে
( ০০’ ০০’ ০০’ ০০’ ০০’ ০০’ ০০’ ০০’ । ) বিরামান্ত দুটি দ্রুত মাত্রার আটটি
সমাবেশ এবং শেষে একটি লঘু মাত্রা। অপরপক্ষে, সেদিনকার হিন্দোল
রাগটিও বর্তমানের হিন্দোলের মতো ছিল না। পারিজাতের আমলে প্রচলিত
হিন্দোলের রূপ ছিল রে-পা বর্জিত জ্ঞ-দ-ণ। অর্থাৎ, ঔড়ব জাতীয় আশাব্বারী
ঠাটের রাগ ছিল হিন্দোল।
চর্চরী গান চর্চরী তাল ছাড়া ক্রীড়াতালেও গাওয়া যেতে পারতো এবং
ধত্তা-ছন্দ বা অনুরূপ যে কোন ছন্দে গাইবার ব্যবস্থাও ছিল। কিন্তু, যে কোন
ছন্দেই চর্চরী গাওয়া হোক না কেন, চর্চরীর সম্পর্কে এলেই সেই ছন্দটির নামও
চর্চরী-যুক্ত হয়ে যেতো।
চর্চরী গান মূলতঃ ছিল উদ্গ্রাহ ও ধ্রুব-যুক্ত দ্বি-ধাতুক প্রবন্ধ। কিন্তু,
আভোগ অনুষ্ঠানের দ্বারা একে ত্রি-ধাতুক করবার ব্যবস্থাও ছিল। চর্চরী
ছিল পদ ও তালযুক্ত দ্বি-অঙ্গ বিশিষ্ট প্রবন্ধ। অর্থাৎ, তারাবলী জাতীয় নির্যুক্ত
প্রবন্ধ।
আমাদের দেশে অনেক গুণীজ্ঞানী মনে করেন, প্রাচীন চর্চরী গীতির সঙ্গে
বর্তমানের চাঁচর গানের সম্বন্ধ ঘনিষ্ঠ। বলা বাহুল্য, ইতিহাসের পরিপ্রেক্ষিতে
চাঁচর গানের অস্তিত্বও অতি-প্রাচীন। প্রাচীন চর্চরীর সঙ্গে হয়তো একদা
তার ছিল সম্পর্কযুক্ত। কিন্তু, আমাদের জানিত চাঁচরের রাগ ও তালের
সঙ্গে বিলুপ্ত চর্চরীর রাগ ও তালের আপাততঃ কোন মিল দেখতে পাচ্ছি
না। । ৫৮৬/১ ।
পদৈশ্চ বিরুদৈস্তদ্বৎ স্বর পাটকৈঃ ॥ ৫৮৬।২
যে বদ্ধ গানে পদ, বিরুদ, স্বর ও পাট ব্যবহৃত হয়, তাকেই বলে হর্ষবর্ধন
প্রবন্ধ। ৫৮৬।২
টিপ্পনীঃ হর্ষবর্ধন সম্পর্কে পারিজাতকার যা বলেছেন, তার সঙ্গে
রত্নাকরের যথাযথ সামঞ্জস্য দেখা যায়। প্রবন্ধটি গাওয়া হতো তালে, অধিকন্তু,
পদ, বিরুদ, স্বর ও পাটযুক্ত ছিল। অর্থাৎ, হর্ষবর্ধন ছিল পঞ্চাঙ্গযুক্ত,
নন্দিনীজাতীয় নির্যুক্ত প্রবন্ধ। তবে, এর অঙ্গ-ব্যবস্থা সম্পর্কে রত্নাকরের
টীকাকারদ্বয়ের মধ্যে মতভেদ দৃষ্ট হয়। কল্লিনাথ বলেছেন, হর্ষবর্ধন ছিল
দ্বি-ধাতুক প্রবন্ধ। এর উদ্গ্রাহ অংশে থাকতো পদ ও বিরুদ এবং ধ্রুব অংশ
রচিত হতো স্বর ও পাট সহযোগে। অপরপক্ষে, সিংহ ভূপাল বলেছেন, হর্ষবর্ধন
ছিল কেবলমাত্র পদ ও বিরুদ যুক্ত প্রবন্ধ। সম্ভবতঃ, হর্ষবর্ধন চিরকালই নন্দিনী
জাতীয় প্রবন্ধ ছিল না। ৫৮৬।২
তাল-মানদ্বয়ং য্যাসৌ ভবেচ্ছ্রীবর্ধনাভিধঃ ॥ ৫৮৭।১
যে প্রবন্ধ গান তাল-মান সহযোগে গীত হয়, তাকেই বলে শ্রীবর্ধন
প্রবন্ধ। ৫৮৭।১
টিপ্পনীঃ শ্রীবর্ধন প্রবন্ধর পরিচয় প্রসঙ্গে পারিজাতকার কেবলমাত্র
তাল-মানের কথা বলেছেন, অঙ্গাদি সম্বন্ধে কোন কথা বলেন নি। এই অতি
৩১৬ সঙ্গীত পারিজাত
সংক্ষিপ্ত পরিচিতির কারণ দ্বিবিধ হতে পারে। হয়তো পরবর্তী কালের কোন
নকল-নবিশীর অসাবধানতার জন্য মূল সূত্রের মধ্যে থেকে কিছু অংশ বাদ পড়ে
গিয়েছে। কিংবা, প্রবন্ধটি অহোবলের আমলে এতই বেশী প্রচলিত ছিল যে,
অতি পরিচয় নিবন্ধন স্বয়ং গ্রন্থকারহ অসাবধান হয়েছিলেন। রত্নাকরে দেখা
যায়, শ্রীবর্ধন ছিল বিরুদ, পাট, পদ ও স্বরযুক্ত নন্দিনী জাতায় নিযুক্ত প্রবন্ধ।
প্রবন্ধটি ছিল দ্বি-ধাতুক। এর উদগ্রাহ অংশ রচিত হতো বিরুদ ও পাট
সহযোগে এবং ধ্রুব অংশে থাকতো পদ ও স্বর। সর্ব্বোপরি, গান শেষ করা
হতো তাল-মান বজায় রেখে।
বর্তমানে দেখা যায়, অনেক গুণীজ্ঞানী তাল-মান কথাটি অভিন্ন অর্থেই
ব্যবহার করে থাকেন। কিন্তু, আমাদের স্মরণ রাখা কর্তব্য, প্রাচীন যুগের
পণ্ডিতগণ পারতপক্ষে এমন কোন বাক্যের ব্যবহার করতেন না যার ফলে
ভ্রান্ত ধারণার সৃষ্টি হতে পারে। বাক্য হিসেবে “তাল-মান” অভিন্ন সংজ্ঞার
অন্তর্গত একটি কথা নয়—বিভিন্ন সংজ্ঞার পরিচায়ক দুটি কথা। ‘মান’ কথাটা
অবশ্য গতি-নির্দেশক, কিন্তু, সে গতি, তাল-মাত্রা-লয়-এর গতি নয় – উক্ত
তাল-মাত্রা-লয়-এর মধ্যে নিবদ্ধ মূল বাণীর নিজস্ব বৈশিষ্ট্য-জ্ঞাপক গতি—
যে গতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রক্ষা করার প্রয়োজনে, উক্ত তালেরই “মান” কে
তদনুরূপ প্রকৃতি গ্রহণ করতে হয়। যেমন, ধ্রুপদ ধামার প্রভৃতি গানের
বাঁট-উপজের গতি। আলোচ্য ক্ষেত্রে তাল-মাত্রা-লয়-বরাবর থাকে ; কিন্তু
বাণী ও বোলের গতি দ্রুত হয়ে যায়। ॥ ৮৭১ ॥
মধ্য মধ্য স্বরৈঃ র্যঃ স্যাৎ ( ? ) স্বরাঙ্গ সোঽভিধীয়তে। ॥ ৮৭২ ॥
যে প্রবন্ধ গানের মধ্য ধাতুতে অর্থাৎ ধ্রুব ধাতুতে স্বরের প্রয়োগ হয়,
তাকেই বলে স্বরাঙ্গ প্রবন্ধ। ॥ ৮৭২ ॥
টিপ্পনী : পারিজাতের স্বরাঙ্গ প্রবন্ধ সম্পর্কে আলোচ্য সূত্রের বক্তব্যটি
নিতান্তই দুর্বোধ্য। রত্নাকরে স্বরাঙ্গ নেই, স্বরাঙ্ক আছে। এবং, এই
স্বরাঙ্ক প্রবন্ধর টীকা-ভাষ্য আলোচনা করেই, আলোচ্য সূত্রের ‘মধ্য’ শব্দটিকে
আমরা মধ্যম ধাতু, অর্থাৎ, ধ্রুব ধাতুরূপে অনুমান করছি। কিন্তু, পরের
পর দুটি ‘মধ্য’ শব্দ ব্যবহার করে পারিজাতকার কী বোঝাতে চেয়েছেন,
সেটা কিছুতেই ধরতে পারছি না। একটি ‘মধ্য’ অর্থে যদি আমরা মধ্যম
ধাতুকে গ্রহণ করি, তাহলে অপর ‘মধ্য’টির অর্থ কী হতে পারে? মধ্যম
গ্রাম মধ্য (মুদারা) সপ্তক? কিংবা মধ্যম (মা) স্বর? বলাবাহুল্য,
উপরিউক্ত তিন রকম অনুমানের স্বপক্ষে ও বিপক্ষে সম্ভাব্য সকল রকম
যুক্তি প্রয়োগ করেও, আমরা এমন কিছুই পাচ্ছি না যাকে সঙ্গীত-বিজ্ঞানানুগ
তথ্যরূপে গ্রাহ্য করতে পারি। অপরপক্ষে, স্বরাঙ্কের সঙ্গে স্বরার্থ প্রবন্ধের
(স্বরপাঠৈরেব বাস্তুতোহং) গোলযোগও কল্পনা করতে পারি না যেহেতু,
পারিজাতের স্বরার্থ প্রবন্ধের উল্লেখ ও আলোচনা ইতিপূর্ব্বেই (৫৬০।১ সূত্র দ্রষ্টব্য)
করা হয়েছে। অতএব, আমরা বলতে বাধ্য যে, পূর্ব্বোল্লিখিত আরও অনেক
সূত্রের মতো পারিজাতের আলোচ্য সূত্রটিকেও বিকৃত করেছেন পরবর্তী কালের
কোন্ সঙ্গীত-অজ্ঞ লিপিকার।
রত্নাকরে স্বরাঙ্গ নেই, কিন্তু স্বরাঙ্ক প্রবন্ধ সম্পর্কে বিশদ আলোচনা স্থান
পেয়েছে। স্বরাঙ্কের অঙ্গ ছিল পদ, স্বর, বিরুদ এবং তাল তো ছিলই।
এবং স্বরাঙ্ক ছিল চতুরঙ্গবিশিষ্ট দীপনী জাতীয় নির্যুক্ত প্রবন্ধ। এতে ধাতুর
ব্যবস্থা তিনটি। কিন্তু, সেই ধাতু তিনটির মধ্যে উদ্গ্রাহ ও ধ্রুব ব্যতীত,
মেলাপক ব্যবহৃত হতো কিম্বা আভোগকে গ্রহণ করা হতো, সে সম্বন্ধে
রত্নাকর টীকাকারদ্বয়ের মধ্যে মতভেদ দৃষ্ট হয়। স্বরাঙ্ক যে ত্রিধাতুক ছিল
সে সম্বন্ধে উভয় টীকাকারই একমত। কিন্তু, তবুও, কল্লিনাথ মন্তব্য করেছেন
যে, স্বরাঙ্কের মধ্যে মেলাপক ও আভোগ উভয় ধাতুর ব্যবহার পরিলক্ষিত হলে,
প্রবন্ধটিকে চার ধাতুযুক্ত প্রবন্ধরূপে গণ্য করতে হবে। অধিকন্তু, স্বরাঙ্ক
প্রবন্ধ গাইতে হয় কেবলমাত্র মালবশ্রী রাগে। অর্থাৎ, কল্লিনাথের আমলে
স্বরাঙ্ক পাওয়া হতো কেবলমাত্র মালবশ্রী রাগে এবং প্রবন্ধটির ধাতু ব্যবস্থা ছিল
তিন কিংবা চার।
কিন্তু সেটা কী করে হতে পারে? সঙ্গীত বিজ্ঞানের সুস্পষ্ট নির্দেশ হচ্ছে
এই যে, ত্রিধাতুক প্রবন্ধ অর্থে মেলাপকহীন প্রবন্ধ বুঝতে হবে। মূলেও
আমরা পাচ্ছি, স্বরাঙ্ক ছিল ত্রিধাতুক প্রবন্ধ। কল্লিনাথের পূর্ব্ববর্তী টীকাকার
সিংহভূপালও প্রবন্ধটিকে তিন ধাতুযুক্ত প্রবন্ধরূপে উল্লেখ করেছেন। অথচ,
কল্লিনাথ আবার প্রবন্ধটির সম্ভাব্য চার ধাতুর উল্লেখ করতে গেলেন কেন?
এ কেনর উত্তর বোধহয় একটা পাওয়া যেতে পারে, উক্ত টীকাকারদ্বয়ের
টীকা ভাষ্যের দিক্টাকে লক্ষ্য করলে। আমরা দেখতে পাচ্ছি, সিংহভূপাল
যে সূত্রটিকে অবলম্বন করেছিলেন তার ভিত্তি “স্বরাঙ্ক ন্যাসবং স্বরৈঃ।” এখানে
“ন্যাসনং স্বরৈঃ” অর্থে বুঝতে হবে শেষ ধাতুর, অর্থাৎ আভোগ ধাতুর শেষ
৩১৮ সঙ্গীত পারিজাত
অংশে স্বর থাকবে এবং এখানে মালবশ্রী রাগের উল্লেখমাত্রও নেই। অপরপক্ষে,
কল্লিনাথ যে সূত্রটিকে অবলম্বন করেছিলেন তার মধ্যে স্বরাঙ্কের উল্লেখমাত্রও
নেই, পরন্তু, “মালবশ্রয়া গীয়তে” লিপিবদ্ধ রয়েছে।
স্বরাঙ্ক প্রবন্ধ গানে তালের ব্যবহার ছিল একাধিক এবং বৈশিষ্ট্যপূর্ণ।
যথা—
পদৈঃ স্তবৈশ্চ বিরুদৈরুদগ্রাহ্যাদিধ্রুবং ক্রমাৎ।
একদ্বিতৃচ তালাঃ স্যুঃ স্বরাদে ন্যাসনং স্বরে॥
অর্থাৎ, পদে উদগ্রাহ্, স্তবে ধ্রুব, বিরুদে আভোগ এবং পদে একটি তা- স্বরে
দুটি তাল বিরুদে তিনট তাল ও স্বরে সমাপ্তি বা ন্যাস।
বলাবাহুল্য স্বরাঙ্কর ধাতুগত ভাব ব্যবস্থার জন্য তার প্রয়োগ প রবেশনাও
তা ক্রমিক নিয়মানুসারে। ৫৮৭৷২
পাটৈশ্চ বিরুদৈঃপাটৈ স্তেনৈশ্চ বিলাসকঃ। ৫৮৮।১
যে প্রবন্ধ গানে পদ, বিরুদ ও তেনক ব্যবহৃত হয়, তাকেই বলা হয়-
বিলাসক প্রবন্ধ। ৫৮৮।১
টিপ্পনী : পারিজাতেব হরি-বিলাসক, এখানে হরি বিলাসকরূপে উল্লিখিত
হয়েছে। অঙ্গাদি ব্যবস্থার দিক দিয়েও উভয় গ্রন্থের মধ্যে সামঞ্জস্য আছে।
রত্নাকরের হরি বিলাসকও ছিল পঞ্চাঙ্গযুক্ত নন্দিনী জাতীব নিযুক্ত প্রবন্ধ। এর
উদগ্রাহে পদ ও বিরুদ থাকতো এবং আভোগে থাকতো পাট ও তেনক। সুতরাং
দ্বিধাতুক হলেও, প্রবন্ধটির মধ্যে অনিবদ্ধ পদ যোজনা করে আভোগ
অনুষ্ঠানেরও সুযোগ সূচনা ছিল। ৫৮৮।১
তালৈস্তু পদ যোগেন রাহড়ী সোঽভিধীয়তে॥ ৫৮৮।১
কেবলমাত্র তাল ও পদযুক্ত প্রবন্ধকেই রাহড়ী প্রবন্ধ বলে। ৫৮৮।২
টিপ্পনী : রাহড়ী সম্বন্ধে পারিজাতকার যা বলেছেন তার সঙ্গে রত্নাকরের
সামঞ্জস্য আছে। রত্নাকরের রাহড়ীও ছিল কেবলমাত্র পদ ও তালযুক্ত
তারাবলী জাতীয় নিযুক্ত প্রবন্ধ। গানের বিষয়বস্তু হতো বীররসাত্মক এবং
অসংখ্য পাদযুক্ত। যুদ্ধের সময় স্বদেশের সৈনিকদের মনে উদ্দীপনা জাগিয়ে
তোলাই ছিল রাহড়ী গানের প্রধান বৈশিষ্ট্য। কল্লিনাথের মন্তব্য পড়ে মনে
হয়, অসংখ্য পাদযুক্ত কোন রাহড়ী প্রবন্ধর সবটুকু গাওয়া বাধ্যতামূলক ছিল
না, প্রয়োজনমত পাদ নির্বাচন করে, উদগ্রাহ ও ধ্রুব ধাতুর মধ্যে যথাযথভাবে
সঙ্গীত পারিজাত ৩১৯
বণ্টন করে, প্রবন্ধটি গাওয়া হতো। দ্বিধাতুক রাগাদীকে, আভোগ অনুষ্ঠানের
দ্বারা ত্রিধাতুক করবারও ব্যবস্থা ছিল। ৫৮৮।২
শুভবাচক শব্দৈস্তু মঙ্গলাচার ঈরিতঃ। ৫৮৯।১
যে সব শব্দের সাহায্যে শুভ-কামনা বা কল্যাণ-কামনা করা হয়, সেই রকম
শব্দের দ্বারা গ্রথিত প্রবন্ধর নাম মঙ্গলাচার। ৫৮৯।১
টিপ্পনী: মঙ্গলাচার প্রবন্ধর পরিচয় প্রসঙ্গে পারিজাতকার যা বলেছেন
তা পড়ে প্রবন্ধটির সাঙ্গীতিক পরিচয় কিছুই পাওয়া যায় না। এ সম্বন্ধে
রত্নাকর বলেছেন, মঙ্গলাচার প্রবন্ধ গাওয়া হতো কৈশিকী রাগে, নিঃসারুক
তালে এবং স্বরাচরণ ছিল প্রবন্ধটির অন্যতম বৈশিষ্ট্য। নিঃসারুক তালের
লক্ষণ হচ্ছে বিরামন্তো লঘু নিঃসারকো মতঃ। অর্থাৎ, (।।') দুটি লঘুমাত্রার
সমাহার, কিন্তু শেষের লঘুমাত্ৰাটি বিরামযুক্ত। টীকাকার কল্লিনাথের
মতানুযায়ী মঙ্গলাচার প্রবন্ধটি ছিল ত্রিধাতুক এবং এর মধ্যে পৃথকভাবে
আভোগ অনুষ্ঠানের সুযোগ সুবিধা ছিল। অর্থাৎ, মূলে প্রবন্ধটি ছিল
উদগ্রাহ, মেলাপক ও ধ্রুব ধাতুযুক্ত ত্রিধাতুক প্রবন্ধ কিন্তু আভোগযুক্ত করে
একে চারধাতুযুক্তও করা যেতে পারতো। প্রবন্ধটির মধ্যে স্বরানুষ্ঠান করা
হতো গানের শেষাংশে কিংবা সম্পূর্ণ প্রবন্ধটির অন্তর্গত বিষয়বস্তুর
অন্ততপক্ষে অর্ধাংশ গীত হবার পরে। অর্থাৎ, গানের প্রথমাংশে স্বরানুষ্ঠান
করা বে-আইনী ছিল। কিন্তু, 'গানের অর্ধাংশ' অর্থে আলোচ্যক্ষেত্রে আমরা
কী বুঝবো? এখানে বিশেষভাবে লক্ষণীয় টীকাকারের মন্তব্য। ব্যবস্থাটা
ধাতুগত নয়, অংশগত। অর্থাৎ, ত্রিধাতুক প্রবন্ধের ক্ষেত্রে স্বরানুষ্ঠান আরম্ভ
হতো মেলাপক ধাতুর মাঝামাঝি অংশ থেকে ধ্রুবর সমাপ্তি পর্যন্ত, কি বা,
চারধাতুর ক্ষেত্রে স্বরানুষ্ঠান আরম্ভ হতো ধ্রুবর প্রারম্ভ থেকে আভোগের
শেষাংশ পর্যন্ত—এই রকম একটা বিশ্বাসই মনকে আচ্ছন্ন করে। কিন্তু,
ব্যাপারটা বোধহয় অত সহজ সরল ছিল না। কারণ, এই সহজ ব্যবস্থার
কথাটা টীকাকার খুব সরলভাবেই বলে যেতে পারতেন, কিন্তু তা বলেন নি।
বিশেষতঃ, “অন্ততপক্ষে অর্ধাংশে”র উদাহরণটি বিপরীত ইঙ্গিতই বহন করছে।
অপরপক্ষে, কল্লিনাথের মন্তব্যের মধ্যে পাঠান্তর গ্রহণের অবকাশ আছে।
যেমন, “প্রবন্ধটি ছিল ত্রিধাতুক, কিন্তু/এবং এর মধ্যে আভোগ অনুষ্ঠানেরও
সুযোগ সুবিধা ছিল।”—আলোচ্যক্ষেত্রে “কিন্তু/এবং”-এর স্থলে “যেহেতু”
৩২০ সঙ্গীত পারিজাত
কথাটিকে গ্রহণ করলে দেখা যাবে, মূলে, “প্রবন্ধটি উদ্গ্রাহ ও ধ্রুবযুক্ত দ্বিধাতুক
প্রবন্ধ ছিল—ত্রিধাতুকও হয়ে যেতে পারতো, যেহেতু, আভোগের অতিরিক্ত
অনুষ্ঠানকে গ্রহণ করবারও ব্যবস্থা ছিল।”
মঙ্গলাচার প্রবন্ধের অঙ্গ ছিল তিনটি,—পদ, স্বর ও তাল। সুতরাং এটি ছিল
একটি ভাবনী জাতীয় নির্যুক্ত প্রবন্ধ। ৫৮৯।১
গীতে যস্মিন্ মুখ্যং বর্ণং বদনং তৎপ্রকীর্ত্তিতম্ ॥ ৫৮৯।২
যে প্রবন্ধ গান মুখ্যতঃ বর্ণগণের সাহায্যে গীত হয়ে থাকে, তাকেই বলে বদন
প্রবন্ধ। ৫৮৯.১
টিপ্পনী : বদন প্রবন্ধর প্রধান বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে পারিজাতকার বর্ণগণের
উল্লেখ করেছেন। কিন্তু, রত্নাকরে দেখা যায় বদন প্রবন্ধ গাওয়া হতো
মাত্রাগণের মাধ্যমে। বলাবাহুল্য, বর্ণগণ ও মাত্রাগণের মাত্রা, মাত্রা হিসাবে
অভিন্ন সংজ্ঞার অন্তর্গত নয়। এ সম্বন্ধে আমরা ৫১৫-৫১৮ সূত্রের টিপ্পনীতে
কিঞ্চিৎ আলোচনার সুযোগ গ্রহণ করেছি। সুতরাং পুনরুক্তি নিষ্প্রয়োজন।
আলোচ্য সূত্রে দেখা যাচ্ছে, বদন প্রবন্ধর গণ সম্পর্কে পারিজাতকার
বর্ণগণের উল্লেখ করেছেন। অপরপক্ষে, রত্নাকর বলেছেন, বদনের গণগুলি
ছিল মাত্রাগণ। আমরা জানি না শার্ঙ্গদেব থেকে অহোবলের আমলের
মধ্যে এমন কোন সাঙ্গীতিক বিপ্লব ঘটেছিল কিনা যার ফলে, গণ-ব্যবস্থা-
বিধির দিক দিয়ে বদনের রূপান্তর ঘটেছিল। এবং, সেই কারণেই পূর্ববর্তী
রত্নাকরের আমলের মাত্রাগণযুক্ত বদন পরবর্তী কালে রচিত পারিজাত গ্রন্থের
মধ্যে বর্ণগণযুক্ত হয়ে পরিচিত হয়েছিল। তবে, এটুকু দেখতে পাচ্ছি, বদন
সম্পর্কে পারিজাতকার কেবলমাত্র বর্ণগণেরই উল্লেখ করেছেন, আর কোন
পরিচয় দেন নি। কিন্তু, রত্নাকরে বদনের সবিশেষ পরিচয় উল্লিখিত হয়েছে।
রত্নাকরের বদন ছিল মাত্রা-গণ-বিশিষ্ট একটি ত্রি-পদ দ্বিধাতুক প্রবন্ধ। এর
প্রথম পদটি ছিল তিনটি মাত্রা-গণ সমন্বিত। এই অংশটুকুই ছিল উদ্গ্রাহ;
এবং দ্বিতীয় পদটি ছিল স্বর ও পাটযুক্ত। এই অংশটুকু ছিল ধ্রুব। উদ্গ্রাহে
মাত্রা-গণের সন্নিবেশ হতো যথাক্রমে একটি ছ-গণ ( S S S = তিনটি
গুরুমাত্রা ) একটি প-গণ ( S S I = দুটি গুরু ও একটি লঘুমাত্রা ) এবং একটি
দ-গণ ( S = একটি গুরুমাত্রা )
বদনের আবার দুটি প্রকার-ভেদও পাওয়া যায়—উপবদন ও বস্তুবদন।
বলাবাহুল্য, বদন-এর এই ভেদ দুটি পরিকল্পিত হয়েছিল মুখ্যতঃ এর উদ্গ্রাহ
সঙ্গীত পারিজাত ৩২১
অংশের মাত্রা-গণ ব্যবস্থার মধ্যে কিঞ্চিৎ পরিমাণে বৈচিত্র্য সন্নিবেশিত হওয়ার
কারণেই। যেমন, কল্লিনাথের মতানুযায়ী, যে বদন-এর উদ্গ্রাহ অংশে দুটি
ছ-গণ ( S S S, S S S ) একটি দ-গণ ( S ) ও একটি ত-গণ ( S I )
থাকে—অর্থাৎ, তিনটি গুরুমাত্রাযুক্ত অক্ষর + তিনটি গুরুমাত্রাযুক্ত অক্ষর +
একটি গুরুমাত্রাযুক্ত অক্ষর + একটি গুরু ও একটি লঘুমাত্রাযুক্ত অক্ষর —
সাকুল্যে এই চারটি মাত্রা-গণের যথাক্রম সমাবেশ থাকে, তাকেই বলে উপবদন
প্রবন্ধ। অপরপক্ষে—
উপবদনের মাত্রা-গণ ব্যবস্থা সম্পর্কে কল্লিনাথের সঙ্গে আবার সিংহভূপালের
কিঞ্চিৎ পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। সিংহভূপালের মতানুযায়ী উপবদনের
উদ্গ্রাহ ছিল একটি ছ-গণ ( S S S ) একটি চ-গণ ( S S ) একটি দ-গণ ( S )
ও একটি ত-গণ ( S I ) অর্থাৎ, সাকুল্যে চারটি মাত্রা-গণের সমাবেশ হলেও,
কল্লিনাথের অনুরূপ নয়।
কল্লিনাথের মতানুযায়ী বস্তুবদনের উদ্গ্রাহ ছিল, দুটি ছ-গণ ( S S S,
S S S ) একটি দ-গণ ( S ) একটি চ-গণ ( S S ) ও একটি ছ-গণের ( S S S )
যথাক্রমে সমাবেশ; অপরপক্ষে—
সিংহভূপালের মতানুযায়ী বস্তুবদনের উদ্গ্রাহ ছিল কল্লিনাথেরই অনুরূপ,
কেবল, শেষের ছ-গণটির ( S S S ) পরিবর্তে ত-গণ ( S I ) গৃহীত হয়েছিল।
—আলোচ্যক্ষেত্রে স্মরণে রাখা দরকার যে, সিংহভূপাল ছিলেন কল্লিনাথের
পূর্ববর্তী টীকাকার।
পূর্বেই বলেছি, বদন-এর প্রকার-ভেদে যা কিছু বৈশিষ্ট্য তা তার উদ্গ্রাহ
অংশের মধ্যেই সীমিত; ধ্রুব অংশের মধ্যে কোন রকম পরিবর্তনই পরিকম্পিত
হয় নি। বদন, উপবদন ও বস্তুবদন মূলতঃ ছিল দ্বিধাতুক প্রবন্ধ। কিন্তু,
অতিরিক্ত পদ যোজনা করে এদের মধ্যে আভোগ অনুষ্ঠানেরও সুযোগ-
সুবিধা ছিল। সেরূপ ক্ষেত্রে প্রবন্ধগুলি হয়ে যেতো ত্রিধাতুক। প্রবন্ধগুলির
অঙ্গ ছিল চারটি—স্বর, পদ, পাট্ ও তাল। অর্থাৎ, দু'টি প্রকার-ভেদ সমেত
বদন প্রবন্ধ ছিল দীপনী জাতীয় নিযুক্ত প্রবন্ধ। ৫৮৯।২
যস্মিন্ গীতে মুনিবর্ণ্যো জ্ঞেয়া সা পদ্ধড়ী পুনঃ। ৫৯০।১
যে প্রবন্ধ-গানের বর্ণনীয় বিষয় কোন মুনি, তাকেই বলে পদ্ধড়ী
প্রবন্ধ। ৫৯০।১
৩২২ সঙ্গীত পারিজাত
টিপ্পনী : পদ্ধড়ী সম্পর্কে পারিজাতকার যা বলেছেন তা পড়ে প্রবন্ধটির
সম্বন্ধে কোন কিছুই জানা যায় না। ইতিপূর্বে চর্যা প্রবন্ধ প্রসঙ্গে আমরা
বলেছি, পদ্ধড়ী হচ্ছে একটি ছন্দের নাম—সংস্কৃতভাষায় যাকে বলে পজ্ঝটিকা-
ছন্দ। আলোচ্য প্রবন্ধটির ছন্দও নিরঙ্কুশ পদ্ধড়ী এবং সেই কারণেই এর
নাম হয়েছিল পদ্ধড়ী। প্রবন্ধটি ছিল তেনকহীন পঞ্চাঙ্গযুক্ত নন্দিনী জাতীয়
নির্যুক্ত প্রবন্ধ। ধাতুব্যবস্থা ছিল মূলতঃ উদ্গ্রাহ ও ধ্রুব। অর্থাৎ দ্বিধাতুক
প্রবন্ধ ছিল পদ্ধড়ী। এর উদ্গ্রাহ অংশে থাকতো পদ, বিরুদ ও স্বর এবং
ধ্রুব অংশে থাকতো পদ, বিরুদ ও পাট। গাওয়া হতো তালে। এবং,
বলাই বাহুল্য, আভোগ অনুষ্ঠানের দ্বারা প্রবন্ধটিকে ত্রিধাতুক করবারও
স্বাধীনতা ছিল। ৫৯০।১
প্রাতঃকালে তূর্য্যে গেয়ো ধবলঃ স প্রকীর্তিতঃ ॥ ৫৯০।২
যে প্রবন্ধ গান প্রাতঃকালে উচ্চ গ্রামে গীত হয়ে থাকে, তাকেই বলে ধবল
প্রবন্ধ। ৫৯০।২
টিপ্পনী : তূর্য্য কথাটির প্রচলিত আভিধানিক অর্থ অবশ্য উচ্চ গ্রামের
বাদ্য সম্পর্কিত। কিন্তু, বাদ্য-বর্জিত অনুপ্রাস হিসেবেও তূর্য্যের উল্লেখ
প্রাচীন সংস্কৃত সাহিত্যে পাওয়া যায়। অতএব, আলোচ্যক্ষেত্রে বাদ্যকে বর্জন
করে যদি আমরা 'উচ্চ গ্রাম'-এর ওপর গুরুত্ব আরোপ করি, তাহলে
দেখা যাবে, পারিজাতের ধবল গাওয়া হতো প্রাতঃকালে এবং উচ্চগ্রামে—
যেমন, মসজিদের ••তি মোল্লা-গণ তন্দ্রাচ্ছন্ন, নিদ্রামগ্ন বা দূরের মানুষদের
উদ্দেশে ‘আজান’-এর ডাক দিয়ে থাকেন। কিন্তু রত্নাকরে দেখা যায়,
ধবলের গায়নকাল সম্পর্কে কোন নির্দেশ বা আলোচনা গ্রন্থের মধ্যে স্থান
পায় নি। অপরপক্ষে, প্রবন্ধটির প্রয়োজনীয় বিষয়বস্তুর আলোচনা বিশদভাবেই
করা হয়েছে। ধবল শব্দটি আশীর্বাদসূচক। সেই কারণেই প্রবন্ধটির বক্তব্য-
বিষয়ের মধ্যে 'ধবল' বা অনুরূপ শুভ-কামনা, কল্যাণ-কামনাসূচক ভাব ও
ভাষা অবশ্যই নিহিত থাকতো। এবং, বিশেষভাবে এই বৈশিষ্ট্যটুকু থাকার
কারণেই, ধবল প্রবন্ধ গান যেমন শিল্পী-সাধারণের পক্ষে অবশ্য শিক্ষণীয় ও
প্রিয় পরিবেশনার বিষয়বস্তু হয়ে উঠেছিল তেমনি প্রবন্ধ হিসেবেও সর্বজনপ্রিয় ও
সর্বত্র প্রসিদ্ধিলাভ করেছিল। ধবল ছিল মূলতঃ উদ্গ্রাহ ও ধ্রুবযুক্ত দ্বিধাতুক
প্রবন্ধ। ত্রিধাতুক করা যেতে পারতো অতিরিক্ত পদ যোজনার দ্বারা
সঙ্গীত পারিজাত ৩২৩
আভোগ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে। এবং কেবলমাত্র পদ ও তাল সংযুক্ত থাকার
কারণে এটি ছিল একটি তারাবলী জাতীয় নিযুক্ত প্রবন্ধ।
ধবল প্রবন্ধর প্রকারভেদ ছিল তিনটি—কীর্তিধবল, বিজয়ধবল ও বিক্রম-
ধবল। এর ভেদ নির্ণীত হতো প্রধানতঃ প্রবন্ধটির পংক্তিগত মাত্রা-বিন্যাসের
বৈশিষ্ট্যকে ভিত্তি করেই। যেমন,
কীর্তিধবলের পংক্তি সংখ্যা ছিল চার। এর বিষম পংক্তিতে, অর্থাৎ,
প্রথম ও তৃতীয় পংক্তিতে থাকতো দুটি করে ছ-গণ (SSS+SSS) এবং
সম পংক্তিতে, অর্থাৎ, দ্বিতীয় ও চতুর্থ পংক্তিতে থাকতো, অধিকন্তু হিসাবে
আরও একটি করে ক-গণ (SSS+SSS+SI)। আলোচনার সুবিধার জন্য
যদি এর একটি গুরুমাত্রাকে (S) দুটি লঘুমাত্রা হিসাবে (।, ।) গ্রহণ করা যায়,
তাহলে প্রবন্ধটির বিষম পংক্তির মাত্রা সংখ্যা দাঁড়ায় (৩ গুরু+৩ গুরু=
৬ গুরু, = ১২ লঘুমাত্রা) এবং সম পংক্তির মাত্রা সংখ্যা দাঁড়ায় (৩ গুরু+
৩ গুরু = ৬ গুরু = ১২ লঘু)+(১ গুরু ও ১ লঘু = ৩ লঘু)= ১৫ লঘুমাত্রা।
বিজয় ধবল প্রবন্ধর পংক্তি সংখ্যা ছিল ছয়। এর প্রথম, দ্বিতীয়, চতুর্থ ও
ষষ্ঠ পংক্তির মাত্রা সংখ্যা ছিল, দুটি করে দ-গণ (SS) অর্থাৎ চারটি করে
মাত্রা। তৃতীয় ও পঞ্চম পংক্তির মাত্রা সংখ্যা ছিল দুটি করে দ-গণ (SS) ও
একটি করে ছ-গণ (SSS) অথবা প-গণ (SSI) অর্থাৎ ৪+৬=১০ মাত্রা
অথবা ৪+৫= ৯-টি করে মাত্রা। দেখা যাচ্ছে বিজয় ধবলের ছয়টি পংক্তির
মধ্যে মাত্রা থাকতো সাকুল্যে ছত্রিশটি বা পঁয়ত্রিশটি।
বিক্রম ধবল প্রবন্ধর পংক্তি সংখ্যা ছিল আটটি। এর প্রথম, চতুর্থ ও পঞ্চম
পংক্তির মাত্রা সংখ্যা ছিল তিনটি করে চ-গণ (SS, SS, SS) ও একটি করে
দ-গণ (S) অর্থাৎ চোদ্দটি করে মাত্রা। দ্বিতীয়, তৃতীয় ও সপ্তম পংক্তির
মাত্রা সংখ্যা ছিল তিনটি করে দ-গণ (SSS) অর্থাৎ ছয়টি করে মাত্রা। ষষ্ঠ ও
অষ্টম পংক্তিতে থাকতো চারটি করে দ-গণ (SSSS) অর্থাৎ আটটি করে
মাত্রা। দেখা যাচ্ছে, বিক্রম ধবলের আটটি পংক্তির মধ্যে মাত্রা থাকতো
সাকুল্যে ছেয়াত্তরটি। ।।৫০।।
বিবাহাদিক মাঙ্গল্যে যে গেয়ো মঙ্গলং ভবেৎ। ।।৫১।।
বিবাহাদি মাঙ্গলিক কার্যে যে গান গাওয়া হয়, তাকেই বলে মঙ্গল
প্রবন্ধ। ।।৫১।।
৩২৪ সঙ্গীত পারিজাত
টিপ্পনী: রত্নাকরের বক্তব্য অনুযায়ী মঙ্গল প্রবন্ধ-গান রচিত হতো মঙ্গল-
বাচক পদে কিংবা মঙ্গল-ছন্দে। গাওয়া হতো বিলম্বিত লয়ে ও কৈশিকী অথবা
বোট রাগ অবলম্বন করে। মঙ্গল প্রবন্ধ যদিও পৃথক প্রবন্ধরূপে উল্লিখিত হয়েছে,
কিন্তু, তৎপরে আলোচিত মঙ্গলাচার (৫৮৯।১ সূত্র দ্রষ্টব্য) প্রবন্ধের সঙ্গে এর
ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল নিঃসন্দেহ। ॥৫৯১
পদং শিশু সুখার্থায় লোলীজ্ঞেয়া বিচক্ষণৈঃ ॥ ৫৯১।২
যে গানের পদ শিশুদেরকেও আনন্দদান করে, তাকেই বলে লোলী
প্রবন্ধ। ৫৯১।১
টিপ্পনী: লোলী প্রবন্ধ সম্বন্ধে রত্নাকরের বিবৃতিও অতি-সংক্ষিপ্ত।
লোলী রচিত হতো প্রাকৃত ভাষায় এবং সম্ভবতঃ সেইজন্যই সংস্কৃত না-জানা,
মানুষদের কাছে যেতেতু, বিদগ্ধজনের নিকট এরা শিশু সদৃশ। লোলী গান
আনন্দদায়ক ছিল। প্রবন্ধটির মধ্যে তিনটি অংশ থাকতো এবং প্রতিটি পদের
আদ্য মধ্য অন্ত মনোহরী হয়ে উঠতো অনুপ্রাসের বৈচিত্র্যে। এই প্রবন্ধ
গানের মধ্যে অনেক রকমের ছন্দও ব্যবহৃত হতো এবং গানের শেষে
থাকতো লোলী কথাটি। লোলী প্রবন্ধর মধ্যে ধ্রুবাংশ অনুষ্ঠান করা ছিল
বে-আইনী। অর্থাৎ এটি ছিল একটি দ্বিধাতুক নির্যুক্ত প্রবন্ধ। ৫৯১।২
প্রতিপাদ্যং যত্র শৃঙ্গং বীরশ্রীঃ সুখদায়িনী। ॥৫৯২।১
যে প্রবন্ধ গানের প্রতিপাদ্য বিষয়সমূহ বীররস ভাবের প্রকাশক, তাকেই বলে
বীরশ্রী প্রবন্ধ। ৫৯২।১
টিপ্পনী: রত্নাকরের বিবৃতি অনুযায়ী বীরশ্রী ছিল একটি দ্বি ধাতুক
প্রবন্ধ, কিন্তু গানের প্রতিপাদ্য বিষয়বস্তু সম্পর্কে শার্ঙ্গদেব বা তার টীকাকারদ্বয়
কোন কিছু মন্তব্য করেন নি। বীরশ্রীর উদগ্রাহ অংশে থাকতো পদ এবং ধ্রুব
অংশে থাকতো বিরুদ। কল্লিনাথের মতানুযায়ী, বীরশ্রীকে আভোগ অনুষ্ঠানের
দ্বারা ত্রিধাতুকও করা যেতে পারতো। গাওয়া হতো তালে। সুতরাং বীরশ্রী
ছিল তিন অঙ্গযুক্ত ভাবনী জাতীয় নির্যুক্ত প্রবন্ধ। ॥৫৯২।১
সা ঢোল্লরীতি কথিতা লাটভাষা বিনির্মিতা। ॥৫৯২।২
লাট ভাষায় বিরচিত প্রবন্ধকে বলে ঢোল্লরী। ৫৯২।২
টিপ্পনী: রত্নাকরের ঢোল্লরীও লাট ভাষায় রচিত হতো। অধিকন্তু
জানা যাচ্ছে, এই প্রবন্ধ গানের ছন্দ ছিল দোধক (৫৬২।২ সূত্র দ্রষ্টব্য) এবং
সঙ্গীত পারিজাত ৩২৫
গানের শেষে যুক্ত থাকতো ঢোল্লরী কথাটি। ইতিপূর্বে আলোচিত লোলী
প্রবন্ধর মতো, ঢোল্লরী গানের মধ্যেও আভোগ অনুষ্ঠান করা ছিল বে-আইনী।
অর্থাৎ, লোলীর মতো ঢোল্লরীও ছিল একটি দ্বিধাতুক নির্যাক্ত প্রবন্ধ। গানের
পদ রচিত হতো কেবলমাত্র লাট ভাষায়। লাট দেশ ছিল, এ-কালের অন্ধ্র ও
হায়দরাবাদের কাছাকাছি একটা জায়গা। ॥৫৯২॥
ওবীস্বল্পাক্ষরৈর্বর্ণৈর্জাতা সা বহুভি স্বরৈঃ। ৫৯৩।১
যে প্রবন্ধ গানের মধ্যে বর্ণের অল্পত্ব ও স্বরের বাহুল্য পরিলক্ষিত হয়, তাকেই
বলে ওবী প্রবন্ধ। ৫৯৩।১
টিপ্পনী : ওবী গানের বর্ণর অল্পত্ব ও স্বরের বাহুল্য সম্পর্কে পারিজাতকার
যা বলেছেন, রত্নাকরে তার ইঙ্গিতমাত্রও নেই। রত্নাকরে বর্ণিত ওবী
প্রবন্ধর সব কিছুই ছিল (রত্নাকরে বর্ণিত) লোলী প্রবন্ধর মতো। কেবল,
গানের শেষে লোলীর পরিবর্তে ওবী কথাটি যুক্ত হতো। বলাবাহুল্য, লোলী ও
ঢোল্লরী প্রবন্ধর মতো ওবী প্রবন্ধর মধ্যে আভোগ অনুষ্ঠান করা ছিল
বে-আইনী। অর্থাৎ, ওবীও ছিল একটি দ্বিধাতুক নির্যাক্ত প্রবন্ধ। প্রসঙ্গক্রমে
এখানে উল্লেখযোগ্য যে, “ওবী”-র উল্লেখ ভিন্ন অর্থে অন্যত্রও পাওয়া
যায়। যেমন, সন্ত জ্ঞানেশ্বরের (১৩শ খৃষ্টাব্দের প্রথমার্ধ) পদাবলী। জ্ঞানেশ্বরের
“ওবী” ছিল মহারাষ্ট্র ভাষায় রচিত পদ, যার রাগ ও তাল কোন নিয়ম মেনে
চলতো না। ৫৯৩।১
সংজ্ঞাতং পাটবর্ণৈস্তস্তদ দম্ভীতি প্রতিষ্ঠিতম ॥ ৫৯৩।২
পাট-বর্ণের দ্বারা বিরচিত প্রবন্ধই ‘দম্ভী’ প্রবন্ধ নামে প্রখ্যাত। ৫৯৩।২
টিপ্পনী : পাট-বর্ণ বাক্যটি এখানে এমনভাবে ভণিত হয়েছে যে
বিভ্রান্ত হবার অবকাশ আছে। পাট অর্থে মৃদঙ্গাদি বাদ্যযন্ত্রের বোল-কে
বোঝায় এবং বর্ণ অর্থে বোঝায় অক্ষরকে। কিন্তু, আলোচ্যক্ষেত্রে অক্ষরটা
অর্থবহ ভাষার অক্ষর কিংবা গানের অক্ষর অথবা বাদ্যযন্ত্রের অর্থহীন
‘বোলে’র অক্ষর সেটা ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। পারিজাত পাঠক অবশ্যই
লক্ষ্য করে থাকবেন, ইতিপূর্বে পাট ও পদ (যা রচিত হয় অক্ষর বিন্যাসের
দ্বারা) সহযোগে রচিত একাধিক প্রবন্ধ-গীতির প্রতিপাদ্য বিষয় গ্রন্থের মধ্যে
আলোচিত হয়েছে। সুতরাং, ‘দম্ভী’র বর্ণ অর্থে সম্ভবতঃ এখানে অর্থবহ
ভাষার বা ‘গানে’র অক্ষর বোঝাচ্ছে না। অপরপক্ষে, বর্ণ অর্থে, ক্ষেত্রবিশেষে,
রাগের আরোহণ-অবরোহণ ক্রমের স্বর-শ্রুতি-সন্নিবেশও বোঝায়, আবার
'বোলে'-র অক্ষরকেও বোঝাতে পারে। কিন্তু, আলোচ্যক্ষেত্রে 'দন্তী' অর্থে
ত্রিবট্-তারানার মতো কোন কিছুকে বোঝাচ্ছে কিনা তা-ও বুঝতে পারা
যাচ্ছে না।
'দন্তী' প্রবন্ধর উল্লেখ রত্নাকরেও আছে, কিন্তু তার কোন রকম
বোধগম্য ব্যাখ্যা পত্রস্থ হয় নি। রত্নাকরের 'দন্তী' ছিল তিন খণ্ডে বিভক্ত
অনুপ্রাস-প্রধান গীতি এবং পূর্বোল্লিখিত 'ওবী' 'লোলী' প্রভৃতির মতো 'দন্তী'
কথাটারও উল্লেখ থাকতো গানের শেষে। কিন্তু, সমস্যা হচ্ছে অনুপ্রাস
অর্থে রত্নাকর এখানে কাব্য-গীতির অনুপ্রাস বুঝিয়েছেন কিংবা ত্রিবট-
তারানার মতো ভিন্ন প্রকার গীতির নাদ্যাত্মিক অনুপ্রাস বুঝিয়েছেন?—
আপাততঃ দেখা যাচ্ছে, তিন খণ্ডে বিভক্ত 'দন্তী'র মতো ত্রিবট্-তারানাও
তিন খণ্ডে বিভক্ত গীতি।
আলোচ্য প্রসঙ্গে 'দিণ্ডী' নামক একটি গীতি পদ্ধতির কথাও উল্লেখযোগ্য।
সন্ত জ্ঞানেশ্বরের সমধর্মী মহারাষ্ট্রদেশীয় পণ্ডিত একনাথের পদাবলীর মধ্যে
'দিণ্ডী'র উল্লেখ পাওয়া যায়। দেখা যায়, জ্ঞানেশ্বরের 'ওবী'র মতো
একনাথের 'দিণ্ডী'ও ছিল, মহারাষ্ট্র ভাষায় রচিত পদ যার রাগ ও তাল
কোন নিয়মের অধীন ছিল না। এবং বলাই বাহুল্য, রত্নাকর ও পারিজাতের
'দন্তী'র সঙ্গে একনাথের 'দিণ্ডী'র কোন দিক দিয়েও কোন রকম মিল
নেই। ৫৯৩।২
যাবদ দ্রাবিড ভাষাভি বিন্দুঃ ( চিন্দুঃ ? ) স্যাৎ সুখদায়কঃ।
সর্বৈস্তালেশ্চ যুক্তো যঃ সদা দ্রুতগতির্ভবেৎ ॥ ৫৯৪
যাবতীয় দ্রাবিড় ভাষায় রচিত শ্রুতিমধুর প্রবন্ধকে 'বিন্দু' প্রবন্ধ বলে।
এই প্রবন্ধ সর্বদাই দ্রুত-লয়ে পরিবেশিত হয় এবং সব রকম তালের মাধ্যমেই গীত
হতে পারে। ৫৯৪
টিপ্পনী: বিন্দু নামক কোন প্রবন্ধর উল্লেখ রত্নাকরে নেই। তবে, ভিন্ন
ক্ষেত্রে আমরা 'চিন্দু' নামক একটি প্রবন্ধর উল্লেখ পাই। এই 'চিন্দু' প্রবন্ধ ছিল
শৃঙ্গার-রস প্রধান গীতি। রচিত হতো তামিল ভাষায় এবং গীত হতো মিশ্র
রাগাদির মাধ্যমে মধ্য ও দ্রুত লয়ে। বলাবাহুল্য, বিন্দু বা চিন্দু নামক কোন
প্রবন্ধর পরিচিতিই রত্নাকরে স্থান পায় নি। ৫৯৪
সঙ্গীত পারিজাত ৩২৭
তৈলঙ্গ ভাষয়োৎপন্নো দরুদ্ৰ দ্রুতগতির্ভবেৎ। ৫৯৫।১
তৈলঙ্গ (বর্তমান ভারতের তেলেঙ্গানা অঞ্চল) ভাষায় বিরচিত দ্রুতগতিযুক্ত
প্রবন্ধকে 'দরু' প্রবন্ধ বলে। ৫৯৫।১
টিপ্পনী : পারিজাতের 'দরু' প্রবন্ধের পরিচিতি দুর্বোধ্য। 'দরু'-র উল্লেখ
রত্নাকরেও নেই, অন্য কোন গ্রন্থেও এর উল্লেখ পেয়েছি বলে মনে পড়ে না।
অর্থাৎ প্রবন্ধটি কোন রাগের মাধ্যমে গীত হতো; দ্রুতগতিযুক্ত কোন তালের
প্রতিপাদ্য ছিল, এবং কেমন ছিল এর ধাতু ব্যবস্থা, সে সম্বন্ধে আমরা কিছুই
জানতে পারছি না। ৫৯৫।১
অষ্টকং নিপুটের্নৈব পদৈরষ্টভিরীরিতম্ ॥ ৫৯৫।২
সর্বভাষা সমুংপন্নং ঘণ্টানাদেন সংযুতম।
তরচান্য বিশেষস্তু জ্ঞাতব্যঃ সম্প্রদায়তঃ ॥ ৫৯৬
যে প্রবন্ধ গতির পদের সংখ্যা হয় সাকুল্যে আটটি; গাইতে হয়
ত্রিপুট্ তালে ও ঘটানাদন সহযোগে তারই নাম অষ্টক প্রবন্ধ। এই
অষ্টক প্রবন্ধের পদগুলি যে কোন ভাষাতেও রচিত হতে পারে; কিন্তু এর
'গাঁচকী' প্রভৃতি জ্ঞাতব্য বিষয়গুলি জেনে নিতে হয় 'সম্প্রদায়'-পরম্পরার নিকট
থেকে। ৫৯৫।২-৫৯৬
টিপ্পনী : রত্নাকরে 'অষ্টক' নামক কোন প্রবন্ধর উল্লেখ পাওয়া যায় না।
হয়তো, এই প্রবন্ধটি রত্নাকরের পরবর্তী যুগে, তথা, অহোবলের সমসাময়িক
কালে প্রচলিত ছিল। ফলে, অষ্টক-এর পরিচয় সম্পর্কে আমরা কোন কিছুই
জানতে পারছি না—দ্বিবিধ কারণে। প্রথমতঃ পারিজাতকার নিজেই
বলছেন অষ্টক-এর জ্ঞাতব্য বিষয়গুলি জেনে নিতে হয় 'সম্প্রদায়'-পরম্পরার
নিকট থেকে, দ্বিতীয়তঃ রত্নাকরের মতো কোন প্রামাণ্য গ্রন্থে অষ্টক-এর
উল্লেখ পাওয়া যায় না। তবে, এটুকু জানা যাচ্ছে যে অষ্টক গাওয়া হতো ত্রিপুট
তালের মাধ্যমে। ত্রিপুট সম্পর্কে রত্নাকর যা বলেছেন, তা পড়ে মনে হয় ত্রিপুট
অড্ড তালের মতোই একটি সমপদী ছন্দের তাল ছিল (২৩২ ও ২৮৪ সূত্র দ্রষ্টব্য)
ত্রিপুট সম্পর্কে হরি নায়কের 'সঙ্গীত সার' গ্রন্থে আবার দেখা যায়—
ত্রিধা-স্তুতত্ প্রোক্তস্তালেন ত্রিপুটেনতু।
ধ্রুবলক্ষণকো মঠ্যলক্ষণশ্চেতি স দ্বিধা ॥
(ধ্রুব-তাল ও মঠ্য-তাল সম্পর্কে পারিজাতের ২৮০ ও ২৮১ সূত্র দ্রষ্টব্য)