सङ्गीतपारिजात (अहोबल - वीणा के तारों पर शुद्ध व विकृत स्वर-स्थान निर्धारण का ऐतिहासिक ग्रन्थ)
Sangitaparijata of Ahobala on Indian Musicology
पण्डित अहोबल (टीकाकार: कलानिधि कलिन्द) द्वारा
বেদব্যাসই তো ছিলেন বেদের অষ্টবিংশতিতম সমাহারকারী। অর্থাৎ,
ব্যাসদেবের পূর্বে আরও সাতাশবার বেদ সমাহৃত হয়েছিল এবং এক যুগের
ঋক্ আর এক যুগের সাম হয়ে গিয়েছিল। অপরপক্ষে, যদিও বা দু’
চারটে বেদমন্ত্র আলোচ্য গণ্ডীর মধ্যে পড়ে যায়—সেটা যে কাকতালীয় নয় তার
প্রমাণ কী।
ইতিপূর্বে ৪২৯ সূত্রের টিপ্পনীতে আমরা বিলুপ্ত গান্ধর্ব সম্বন্ধে কিছু আলোচনা
করেছি এবং বিশেষভাবে বলেছি, গান্ধর্বের প্রতিপাদ্য আভিচারিক গীতিগুলি
রঞ্জনীশক্তি সম্পন্ন ছিল না। অনুরূপ, আলোচ্য মন্ত্র-তন্ত্রের বীজ উদগীরণের
ব্যাপারটা সঙ্গীতিক রঞ্জনীশক্তিশূন্য—এ কেবল আত্মবরণ করে বীজ-
উদ্গাতার। এমন কি, মন্ত্রবীজ জপ করার বিনিময়ে বিভূতি লাভ করার
মতো—তন্ত্রবীজ জপ করার ফলেও যে উদ্দেশ্য সিদ্ধ হয়, সে কথাও আমরা
অবিশ্বাস্য মনে করি না। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা না থাকলেও, আমরা প্রমাণ
পেয়েছি হ-বর্ণযুক্ত বীজ জপ করার ফলে, দেহের নিম্নাংশের অক্ষম যন্ত্র-বিশেষ
পুষ্টিলাভ করে ক্রিয়াশীল হয়েছে বা তামসিক প্রবৃত্তিসম্পন্ন মানুষ আধ্যাত্মবাদী
হয়েছেন ও-যুক্ত বীজ জপ করে করে। অধিকন্তু, গান গেয়ে আগুন জ্বালানো বা
বৃষ্টি নামানো সম্বন্ধেও অসংখ্য গল্প আমরা শুনেছি। অতএব, এদিক দিয়ে
চিন্তা করে দেখলে পারিজাতকার কর্তৃক অকস্মাৎ বর্ণবীজ পরিবেশনার
রহস্য সম্বন্ধে একটা সূক্ষ্ম সূত্র উপস্থাপিত করা গেলেও যেতে পারে। কিন্তু
যুক্তিবাদীর বিচারে অহোবল সম্পর্কে এ রকম মন্তব্য করা কি অশ্রদ্ধেয় বিবেচিত
হবে না?
আমাদের দেশে এমন সঙ্গীতবিদও আছেন এবং চিরকালই ছিলেন
যাঁদের বিশ্বাস—যাবতীয় সঙ্গীত পদ্ধতির জনক হচ্ছে গান্ধর্ব। কিন্তু,
অহোবলও কি এমনই পণ্ডিত ছিলেন, যিনি, ভরত, মতঙ্গ, শিব প্রমুখ সঙ্গীতজ্ঞদের
অস্তিত্ব বিস্মৃত হয়ে, দেশী গীতপদ্ধতির ক্লাসিক্যালত্ব প্রাপ্তির কারণস্বরূপ
জন্মদাতার আসনে প্রতিষ্ঠা করবেন কেবলমাত্র দুর্জ্ঞেয় গান্ধর্বকেই। অহোবল
কি সেই যুগের সঙ্গীতবিদ ছিলেন যখন “কাব্যং গীতেন হৃদ্যতে” সংজ্ঞাটি
আবিষ্কৃত হয় নি?
আমাদের বিশ্বাস, পারিজাতকার কর্তৃক অকস্মাৎ বর্ণবীজ পরিবেশনার
রহস্যটি, এ দেশের সঙ্গীতশাস্ত্র বা সঙ্গীত ইতিহাসের সঙ্গে সম্পর্কহীন। এ সমস্যার
সমাধান খুঁজে পাওয়া যেতে পারে আমাদের দেশের সংস্কৃতির ইতিহাসের মধ্যে।
২৫৮ সঙ্গীত পারিজাত
এ ইতিহাস বলে, কোন “সত্য” বিকৃত হয়ে যাবার পর বা বিলুপ্ত হয়ে গেলে,
তার অসাধারণত্ব, অলৌকিকত্ব প্রভৃতি নিয়ে প্রচারধর্মী গ্রন্থ রচনা করা আমাদের
দেশের অন্যতম সনাতন রীতি। এ রীতি সর্বদাই যে স্ব-ক্ষেত্রেই প্রযোজিত
হয়েছে তা নয়। ভিন্নক্ষেত্রেও প্রাবল্য ঘটিয়েছে। ইতিহাস বলে, সুপ্রাচীন
বেদ-ব্রাহ্মণের ওপর প্রচণ্ড আঘাত হেনে বৌদ্ধধর্ম যখন থেকে এ দেশে প্রতিষ্ঠা-
লাভ করতে আরম্ভ করে তখন থেকেই সংখ্যালঘু অ-বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের নেতৃবৃন্দ
বিলুপ্ত বৈদিক ঐতিহ্যের মহিমা প্রচারের তাড়নায়, যুক্তিবাদের তুলনায়
অলৌকিকত্ব কীর্ত্তনের ওপর অধিক প্রাধান্য দিতে আরম্ভ করেছিলেন—গণ
দেবতাকে প্ররোচিত করবার উদ্দেশ্যে। বলা বাহুল্য, উদ্দেশ্য তাদের সফল
হয়েছিল। কালের নির্দ্দেশে, বৌদ্ধধর্ম্ম তার স্বধর্ম হারিয়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে
গিয়েছিল মহাযান, হীনযান, বজ্রযান প্রভৃতি অসংখ্য শাখা-প্রশাখায় বিভক্ত
হয়ে। কিন্তু অন্তর্বর্তী কালের একটা ঘটনা আলোচ্যক্ষেত্রে কিঞ্চিৎ আলোক
পাতের অবকাশ রাখে। সপ্তম শতাব্দীতে নালান্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের খ্যাতি ও
প্রতিপত্তি চরমে উঠেছিল। এই আমলে দেশ বিদেশের অসংখ্য শিক্ষার্থী
প্রলোভিত হয়েছিল নালান্দার তন্ত্রশাস্ত্রের প্রধান অধ্যাপক কমলমিশ্রের
শিষ্যত্ব গ্রহণ করবার জন্য। এবং এই কমল মিশ্র বৌদ্ধ ছিলেন না—ছিলেন
প্রচ্ছন্ন ব্রাহ্মণ। লক্ষ্য করবার বিষয়, কমল মিশ্রের পূর্বে নালান্দার নাম-ডাক
সপ্তম শতাব্দীর মত ছিল না এবং যা-ও বা ছিল তা তন্ত্রশাস্ত্র কেন্দ্রিক ছিল না
একেবারেই।
নালান্দার ঐতিহ্য আবার ম্লান হতে আরম্ভ করে অষ্টম শতাব্দী থেকে।
অর্থাৎ, মহাজ্ঞানী দীপঙ্করের আমল থেকে—সম্ভবতঃ শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে তিনি
কমল মিশ্রের অনুগামী ছিলেন না বলেই। ফলে একাদশ শতাব্দীতে নালান্দার
অস্তিত্ব লুপ্ত হয়ে যায় চিরতরে। কিন্তু, নালান্দা বিলুপ্ত হলেও তন্ত্রবিদ্যার
বিলুপ্তি তো ঘটলই না বরং তার “ঐতিহ্য কীর্তনের” সীমারেখা আরও ব্যাপক
আরও বিস্তৃত হয়ে গেল। অর্থাৎ, তন্ত্রবীজাদির দার্শনিক তথ্য-তত্ত্ব ও অলৌকিক
বিবৃতি প্রদানের সীমা-পরিসীমা সম্পর্কিত “ঐতিহ্যের বীজ” একাকার হয়ে
গিয়ে, যথা-বিশ্বাস যত্রতত্র রোপিত হতে আরম্ভ করেছিল বিভিন্ন স্তরের
তন্ত্রাভিলাষীর বিদ্যাবুদ্ধি ও বিশ্বাসকে কেন্দ্র করে। এবং এই “ঐতিহ্য” কীর্তনের
মধ্যে সব চাইতে বেশী প্রশ্রয় পেয়েছিল, বীজগুলির আদি-গেহত্ব সম্পর্কিত
কল্পনা-বিলাস। আজকের দিনের আমরা যেমন বোম্বাই আমের সঙ্গে বোম্বাই
প্রদেশের কোন সম্পক আছে কি না বা বীজটির উৎপত্তি “কলম-প্রথায়”
হয়েছিল কি না সে সম্বন্ধে অনবহিত থেকেই একটা “বাস্তবিক” কারণে ফলটির
মহিমা কীর্তন করি বা ফলপ্রাপ্তির আশায় যত্রতত্র তার বীজ বপন করে থাকি ;
সেদিনকার শিক্ষাভিমানী শাস্ত্রাভিমানী কিছু লোকও তেমনি অনুপ্রাণিত
হয়েছিলেন তদ্বীজের ফললাভ করে, আস্বাদ-টাকে সর্বজন-বিদিত করবার
জন্য। কিন্তু, প্রেরণাটা তাদের গতিশীল সমাজ-জীবনের পক্ষে সুফল প্রসব
কবে নি, যেহেতু— এ হেন বীজেব আদি গেহতটাও যেমন মহাজন-নিদেশ
কবলিত ছিল তেমনি বাস্তবিক ফলাফলেব তথা বসাস্বাদনের প্রমাণগুলোও
দাখিল কবতেন তাঁরাই—ব্যক্তিগত নির্ভবতালাভেব মৌখিক বা লিখিত
বিবরণাদিব মাধ্যমে। অপবপক্ষে, মহাজনেরা যথাকালে গত হলেও, তাঁদের
মবদেহর সঙ্গে সঙ্গে “প্রমাণ”গুলোও বিনষ্ট হলো না, অনুগামী ভক্তবৃন্দ
নিজেদের বিদ্যাবুদ্ধি অনুযায়ী বিহিত ব্যবস্থাই অবলম্বন করেছিলেন--
গণদেবতাকে “প্রমাণেব” বসাস্বাদন করবাবে জন্য। ফলে, এ হেন বীজেব
মাহাত্ম্য যে কেবলমাত্র আমাদের ধর্মশাস্ত্র, দর্শনশাস্ত্র বা সাহিত্যকর্মের মধ্যেই
প্রভাব বিস্তার করেছিল তাই নয়—সঙ্গীতশাস্ত্রকেও কলঙ্কিত করেছিল।
প্রমাণ, পাবিজাতেব আলোচ্য সরণিগুলি। আমবা ইতিপূর্বে বলেছি, একাধিক
অহোবল ছিলেন না বটে, কিন্তু, তাব অতিভক্ত অনুগামীর সংখ্যা ছিল
একাধিক।
পরিশেষে বক্তব্য এই যে, বিভিন্ন দেশের ভাষার মধ্যে যেমন একটা সম্পর্ক
আছে তেমনি মন্ত্র-তন্ত্রাদির বীজগুলিও অব্যাধধর্মী। সুতরাং, কোন রকম বর্ণ
প্রয়োগের ক্ষেত্রেই কোন রকম পূর্ব-নির্দিষ্ট বিধি-নিষেধের আরোপ যুক্তিগ্রাহ্য
হতে পারে না। পরন্তু, যেটা গ্রাহ্য হতে পারে সেটা হচ্ছে অভিজ্ঞ ব্যক্তির বা
রসজ্ঞ স্রষ্টার উপলব্ধিগত বর্ণ—যার যথার্থ পরিচয় যথাযথভাবে ব্যাকরণ
অভিধানাদির নির্দেশ মেনে চলে না। তাই আমবা দেখতে পাই, সর্বকালের
স্বনামধন্য গীতিকারগণ সর্বদাই বর্ণ প্রয়োগের বিধি-নিষেধ—এক রকমের নিজস্ব
আইন মতো গ্রাহ্য করে এসেছেন—মৃত্যুভয় বা ধনহানির আশঙ্কায় নয়—অন্য
কারণে। গীতিকার অর্থে আমরা এখানে তাঁদের কথাই বলছি যাঁরা বুঝতেন
গান ও কবিতা অভিন্নধর্মী নয়। যাঁরা উপলব্ধি করতে পারতেন, “উদারার”
ক্ষেত্রে যে যে বর্ণযুক্ত বাণীর গ্রন্থনা সুমধুর সাঙ্গীতিক রূপ প্রকট করে তোলে, সেই
বাণীগুলিকে তারার ক্ষেত্রে প্রয়োগ করলে বিপরীত ব্যাপারও ঘটে যেতে পারে।
১৬০ সঙ্গীত পারিজাত
অর্থাৎ যাঁরা অ, আ, ও, ঔ, এ, ই প্রভৃতি ধ্বনিযুক্ত বাণী বিন্যাসের মূল রহস্যটি
সম্বন্ধে অবহিত হয়ে, রাগের প্রকৃতি বুঝে, গ্রামত্রয়ের মধ্যে বাণী যোজনা করতেন,
তাঁরা যে বর্ণ সংযোগের ব্যাপারে এক রকমের গ্রহণ-বর্জনের নীতি বা বিজ্ঞান
মেনে চলতেন সে সম্বন্ধে সন্দেহের অবকাশমাত্রও নেই। এবং এই নীতি
গ্রহণের ফলে তাঁরা যে কেবল মাত্র জীবদ্দশাতেই ধনলাভ যশোলাভ করেছিলেন
তাই নয়, বহু শতাব্দীর চর্বিত-চর্বণের পরও, আজও অসংখ্য গুণীজ্ঞানী, শিল্পী,
শিক্ষার্থীর জীবনে তাঁরা অমর স্রষ্টারূপে বিরাজ করছেন। ৫২১-৫৩০
মাত্রাভিশ্চাপিগীতং স্যাৎ তত্তৎ তালানুসারতঃ।
গীর্বাণ মার্গতালাভ্যাং গীতং দৈবত মার্গিতম।
দেশী-তালেন গীর্বাণ বাণ্যা তদ্দেব মানুষম॥ ৫৩১
মানুষং কেবলং গীতং দেশী তালেন ভাষয়া।
ভাষয়া বাপি তন্নিষ্ঠং পুনস্তদ্দেব মানুষম্॥ ৫৩২
সুপ্রসিদ্ধ তালের মাত্রা-নির্দেশ বা মাত্রা-বিভাগ অনুসারে গান রচনা করতে হয়
যে সব গান বৈদেশিক ভাষা ও মার্গতালে রচিত, তাকে “দৈবত মার্গিত” গীত
বলে। যে সব গান সংস্কৃত ভাষা ও দেশী তালে নিবদ্ধ তাকে “দেব-মানুষ” গীত
বলে। আর, যে সব গান প্রাকৃত ভাষা ও দেশী তালে নিবদ্ধ তাকে “মানুষ’
গীত বলে। অধিকন্তু—যদি কোন গান প্রাকৃত ভাষায় রচিত হয়েও মার্গতালে
গীত হয়, তাহলে, সে গানকেও “দেব মানুষ” গীতের পর্যায়ে ফেলা যেতে
পারে। ৫৩১-৩২
টিপ্পনী : ইতিপূর্বে ১২০-১২৬ সূত্রের টিপ্পনীতে আমরা দেশী তাল সম্বন্ধে
কিছু আলোচনা করেছি। আলোচ্য সূত্রে মার্গতালের কথা উল্লিখিত হয়েছে।
মার্গতাল, প্রধানতঃ জাতি-গানের ক্ষেত্রেই ব্যবহৃত হতো। এই তাল মাত্রা
বিভাগ বা কলা-বিভাগ অনুসারে চারটি মার্গে চিহ্নিত হতো। যথা, একমাত্রা
যুক্ত ধ্রুবমার্গ, দু’-মাত্রাযুক্ত চিত্রমার্গ, চারমাত্রাযুক্ত বার্ত্তিকমার্গ ও আটমাত্রাযুক্ত
দক্ষিণমার্গ। মার্গতাল সশব্দ ও নিঃশব্দ ক্রিয়ার সাহায্যেই প্রযোজিত হতো।
ক্রিয়াগুলি চিহ্নিত হতো, ধ্রুব, শম্যা, তাল ও সন্নিপাত নামক চার প্রকার তালি
ও বিভিন্ন প্রকারের হস্ত-নির্দেশ, অঙ্গুলী-সঞ্চালন, তুড়ি প্রভৃতির সাহায্যে।
মার্গতাল সম্বন্ধে বিশদভাবে জানতে হলে সঙ্গীত রত্নাকরের শরণাপন্ন হওয়া
কর্তব্য। ৫৩১-৫৩২
সঙ্গীত পারিজাত ২৬১
গীত বর্ণাশ্চ চত্বারো লঘৌ তদ্দ্বিগুণা গুরৌ।
প্লুতে দ্বাদশবর্ণাঃ স্যুর্দ্রুতে দ্বাবেব কীর্তিতৌ ॥ ৫৩৩
অনুদ্রুতে তদর্দ্ধং স্যাদেবং বর্ণমিতির্ভবেৎ।
অঙ্গান্তে পদ বিশ্রান্তর্যতি রিত্যুচ্যতে বুধৈঃ ॥ ৫৩৪
লঘু মাত্রায় চারটি গীতবর্ণ ব্যবহৃত হয়ে থাকে। গুরু মাত্রায় ব্যবহৃত হয় লঘুর
দ্বিগুণ, অর্থাৎ আটটি গীতবর্ণ। প্লুত মাত্রায় ব্যবহৃত হয় লঘুর তিন গুণ, অর্থাৎ
বারোটি গীতবর্ণ। অপর পক্ষে, দ্রুত মাত্রায় ব্যবহৃত হয় দুটি গীতবর্ণ, অর্থাৎ লঘু
মাত্রার অর্ধেক ও অনুদ্রুত মাত্রায় ব্যবহৃত হয় একটি গীতবর্ণ। অর্থাৎ লঘু মাত্রার
এক-চতুর্থ। এবং এই সব লঘু, গুরু, দ্রুত, অনুদ্রুত মাত্রাদির দ্বারা রচিত গানের
পদগুলির অন্তে যে বিশ্রাশ্তির অবকাশ থাকে, তাকে বলে যতি। ৫৩৩-৩৪
টিপ্পনী : ৫১৫-১৮ সূত্রের টিপ্পনী দ্রষ্টব্য।
প্রাসস্তুপুনরুক্তিঃ স্যাচ্ছ্বন্দতো নার্থতঃ ক্বচিৎ।
আদি-মধ্যাবসানেষু যথোক্তং প্রাস ঈরিতঃ
বিনা প্রাসেন যদ্ গীতং বিনা নারীবা ভূষণম্ ॥ ৫৩৫
শব্দের পুনরুক্তিকে প্রাস বা অনুপ্রাস বলে। কিন্তু, শব্দের পুনরুক্তির দ্বারা
অর্থের পুনরুক্তি করা দোষণীয়। অর্থের বিভিন্নতা বোঝানোর ক্ষেত্রেই শব্দের
পুনরুক্তি করে অনুপ্রাসের উদাহরণ স্থাপন করতে হয়। ভাষার প্রারম্ভে,
মধ্যস্থলে ও শেষে অনুপ্রাসের যথাযথ ব্যবহার করা কর্ত্তব্য। বস্তুতঃ রুচিসম্মত
বসনভূষণ ধারণ করার ফলে নারীদের যেমন সৌন্দর্য বৃদ্ধি পায়, তেমনি,
সুসঙ্গতভাবে অনুপ্রাস যুক্ত করার ফলে গীতও গীতধর্মী হয়ে ওঠে। ৫৩৫
টিপ্পনী : অলঙ্কারশাস্ত্রে দু’রকম শব্দালঙ্কারের কথা উল্লিখিত হয়েছে—
অনুপ্রাস ও যমক। অলঙ্কারিকগণ বর্ণ বা বর্ণসমূহের পুনরুক্তিকে বলেছেন
অনুপ্রাস এবং শব্দের পুনরাবৃত্তিকে বলেছেন যমক। এ সম্বন্ধে যথাযথভাবে
জানতে হলে অলঙ্কারশাস্ত্রের শরণ নেওয়া কর্ত্তব্য। ৫৩৫
২৬২ সঙ্গীত পারিজাত
॥ গীত-গুণাঃ ॥
ব্যক্তত্বং পূর্ণতা তত্র সৌকুমার্য্যং প্রসন্নতা।
সালঙ্কারত্বং তদ দ্বেধা স্বর-শব্দ-স্ফুটত্বতঃ॥ ৫৩৬
পূর্ণত্বমপি পূর্ণাঙ্গ গমকত্বং সমীরিতম্।
স্বর শব্দার্থ কোমলং সৌকুমার্য্যং প্রকীর্তিতম্ ॥ ৫৩৭
প্রসন্নত্বং স্ফুটার্থ ত্বং সালঙ্কারত্বমাদৃতম্।
স্বর শব্দার্থ-বৈচিত্র্যাৎ ভরতাদি মুনীশ্বরৈঃ॥ ৫৩৮
গীতের গুণ পাঁচটি। যথা, ১। ব্যক্তত্ব ২। পূর্ণতা ৩। সৌকুমার্য্য ৪। প্রসন্নতা
ও ৫। সালঙ্কারত্ব।—এর মধ্যে —
১। ব্যক্তত্ব গুণটি দু’টি সংজ্ঞায় বিভক্ত। যথা (ক) গায়কের কণ্ঠস্বরের
মাধুৰ্য্যগুণে গীতের ষড়জাদি স্বরসমূহের পরিস্ফুট প্রয়োগ কুশলতা; এবং
(খ) গায়কের সাহিত্যবোধ থাকার গুণে, গীতের শব্দসমূহের পরিস্ফুটতা।
২। যে গানের মধ্যে অঙ্গ ও গমকের প্রয়োগ যথাযথভাবে প্রযুক্ত হয়, সেই
গীতকে পূর্ণতা গুণযুক্ত বলা হয়।
৩। যে গানের স্বর, শব্দ ও তার অর্থ কোমলতা প্রভাবযুক্ত, সেই গীতকে
সৌকুমার্য্য গুণযুক্ত হিসাবে অভিহিত করা হয়।
৪। গানের অন্তর্নিহিত অর্থ যথাযথভাবে পরিস্ফুট হলে, গীতটিকে প্রসন্নতা
বা প্রসাদ গুণযুক্ত বলা হয়।
৫। গানের স্বর, শব্দ ও তার অর্থর মধ্যে উপভোগ্য আলঙ্কারিক বৈচিত্র্য
পরিলক্ষিত হলে, গীতটি সালঙ্কারঃ গুণযুক্ত হয়। ভরতাদি সঙ্গীতাচার্য্যগণের
নিকট এই গুণটি বিশেষভাবেই সমাদৃত হতো।—৫৩৬ ৩৮
মাধুৰ্য্যং স্বর শব্দার্থ লাবণ্যং তৎ প্রকীর্তিতম।
দেশকাল প্রভেদেন সম্যক্ ত্বং শ্লাঘ্যত৷ মতা ॥ ৫৩৯
সমত্বং সমকালীন সমাপ্তি স্তাল-শব্দয়োঃ।
সুরক্তত্বং সুখেনৈব গাত্র যন্ত্রোত্থ বর্ণতা ॥ ৫৪০
উচ্চৈ রুচ্চারিতত্বং যদ্ বিক্ৰুষ্টত্ব মিতীরিতম্।
অন্যান্ পঞ্চগুণান্ প্রাহুর্গীত লক্ষণ কোবিদাঃ ॥ ৫৪১
সঙ্গীত পারিজাত ২৬৩
সঙ্গীতবিদগণের মতানুযায়ী আরও পাঁচ রকমের গীত-গুণ আছে। যথা,
১ মাধুর্য ২। শ্লাঘ্যতা। ৩। সমতা ৪। সুরক্তত্ব ও ৫। বিকৃষ্টত্ব।
১। যে গানের মধ্যে স্বর, শব্দ ও তার অর্থর লালিত্য সম্যকভাবে পরিস্ফুট
হয়, সেই গীত মাধুর্য-গুণযুক্ত।
২। যে গান দেশ ও কালের উপযোগী হিসাবে গীত হয়, অর্থাৎ সমঝদারের
সম্যক্ সুখ্যাতি অর্জন করে, সেই গীতকে শ্লাঘ্যতা-গুণযুক্ত বলে।
৩। যে গানের তাল ও বাণী (শব্দ) একই জায়গায় একই সময় সমাপ্ত
হয়, তাকে সমত্ব-গুণযুক্ত গীত বলে।
৪। কণ্ঠ ও যন্ত্রর মাধ্যমে গীতবর্ণগুলি যদি অনায়াসে অতি সাবলীল ভাবে
প্রযুক্ত হয়, তাহলে সেই গীত বা গান সুরক্তত্ব-গুণযুক্ত হয়।
৫। গানের স্বরাশ্রিত বাণীগুলি যদি সুস্বরে উচ্চগ্রামে গীত হয়, তাহলে
সেই গান বিকৃষ্টত্ব গুণযুক্ত হয়। ৫৯৯-০১
টিপ্পনী: এখানে লক্ষ্য করবার বিষয়, গীত-গুণের সংখ্যা পাঁচটি হলেও,
অতিরিক্ত হিসাবে আরও পাঁচটির উল্লেখ পরিবেশিত হয়েছে। এর দ্বারা
ভাবশীল সঙ্গীত-শাস্ত্রের তথা সঙ্গীত সমাজের কালধর্মী বিবরণের পরিচয়ও
ধ্বনিত হচ্ছে। আলোচ্য পাঁচটি গীত গুণের আরও একটি রূপান্তরের পরিচয়
এখানে দেওয়া যাচ্ছে। —তবে, এর সংখ্যাটি পাঁচ নয় ছয়। যথা—১। অভিন্ন
রাগ-তালস্থ-রসত্ব ১। অভিন্ন রসাত্মক ৩। অপৌনরুক্ত। ৪, অগ্রাম্যত্ব ৫।
বিশিষ্ট-জন্যতা ও ৬। শিষ্ট-প্রতিপাদক।
১। যে রাগে ও যে তালে যে বিশেষ সঙ্গীত-রস উপযোগী —সেই রাগে ও
সেই তালে গীত গানের মধ্যে সেই বিশেষ সঙ্গীত রস, অভিন্ন একক রূপে
স্ফুটিত হলেই, গীতটি অভিন্ন-রাগ-তালস্থ-রসত্ব-গুণযুক্ত হিসাবে গ্রাহ্য হবে।
২। যে রাগের মাধ্যমে গানটি গাওয়া হচ্ছে সেই রাগের রস (virtue)
ও গানের বাণীর অর্থ সঞ্জাত রস (কাব্য-রস?) যদি যথাযথভাবে সংমিশ্রিত
হয়ে গিয়ে একটি অভিন্ন সুললিত রসের অভিব্যঞ্জক হয়, তাহলে সেই গানটি
অভিন্ন-রসাত্মক গুণযুক্ত হিসাবে মর্যাদা পাবে।
৩। যে গানের গতি-প্রকৃতির মধ্যে পুনরুক্তি পরিলক্ষিত হয় না, সেই
গীত অপৌনরুক্ত-গুণযুক্ত।
৪। বিশিষ্ট সঙ্গীতজ্ঞদের দ্বারা বিরচিত গানগুলিই বিশিষ্ট-জন্য-গুণযুক্ত
গীত। —যেমন, পরবর্তী কালের তানসেন, বৈজু, গোপাললাল, সদারঙ্গ, অদারঙ্গ
২৬৪ সঙ্গীত পারিজাত
প্রমুখ স্রষ্টা শিল্পীদের ভণিতাযুক্ত ধ্রুপদ খেয়ালগুলি বিশিষ্ট গীত হিসাবে মর্যাদা
পেয়ে থাকে।
৫। যে গানের ভাব ও ভাষার মধ্যে গ্রাম্যতা নেই তাকেই বলে অগ্ৰাম্যত্ব
গুণযুক্ত গীত। যেমন, বর্তমান সর্ব-ভারতীয় সঙ্গীত-সমাজে পল্লী-গীতির তুলনায়
ক্ল্যাসিক্যাল গান সমধিক গুণ-গরিমায়ুক্ত হিসাবে মর্যাদা পায়।
৬। যে গানের মধ্যে বিশিষ্ট ব্যক্তিদের বর্ণনা প্রযোজিত হয় তাকেই বলে
শিষ্ট-প্রতিপাদক-গুণযুক্ত গীত। যেমন, তানসেনের অনেক ধ্রুপদে রাজা রামচন্দ্র
বাঘেলা বা বাদশাহ আকবরের কীর্তি-কলাপ বর্ণিত হয়েছে এবং সদারঙ্গ
বিরচিত খেয়ালগানগুলির মধ্যে বাদশাহ মহম্মদ শাহর উদার হৃদয়ের পরিচয়
স্থান পেয়েছে। অর্থাৎ, প্রতিপালক বিশিষ্ট ব্যক্তির কীর্তি-কলাপ বা মাহাত্মার
বর্ণনা বহন করে, কৃতজ্ঞ সঙ্গীত-শিল্পীদের দ্বারা যে সব গান রচিত হয়েছে,
সেগুলি একাধিক কারণে গুণযুক্ত গীত : —স্বনামধন্য সঙ্গীত-স্রষ্টার সৃষ্টি হিসাবেও
বটে এবং প্রতিপালিত শিল্পীর প্রতিপালকের উদ্দেশে শ্রদ্ধাজ্ঞাপনের কারণেও
বটে। ৫৩৯-৪১
গীত-দোষাঃ
পূর্বোক্তানাং গুণানাং যেহভাবা দোষ সংজ্ঞিনঃ ॥ ৫৪২
যে সব গানের মধ্যে পূর্বোল্লিখিত গুণগুলির অভাব পরিলক্ষিত হয়, সেই
সব গানকে গীত-দোষযুক্ত গান বলে। ৫৪২
প্রবন্ধ ত্রৈবিধ্যম্
ত্রিবিধাঃ স্যুঃ প্রবন্ধা স্তে সূড়স্থা আলি সংশ্রয়াঃ।
বিপ্রকীর্ণা ইতি প্রাজ্ঞা স্তেষাং লক্ষণ মুচিরে ॥ ৫৪৩
প্রবন্ধ-গান বা নিবন্ধ-গান তিন রকমের হয়। যথা, ১। সূড় ২। আলি ও
৩। বিপ্রকীর্ণ। এদের লক্ষণ বলা যাচ্ছে। ৫৪৩
টিপ্পনী : আলোচ্য সূত্রে পারিজাতকার তিন রকম নিবন্ধ-গীতি বা
প্রবন্ধ-গীতির কথা বলছেন। অথচ, ৫০৪ সূত্রে পাঁচ রকম নিবন্ধ-গীতির কথা
উল্লেখ করেছেন। এ সম্বন্ধে আমরা ৫০৪ সূত্রের টিপ্পনীতে কিছু আলোচনার
সুযোগ গ্রহণ করেছি। আপাততঃ আমাদেরকে কেউ যদি প্রশ্ন করেন,
পারিজাতের কোন সূত্রটি প্রক্ষিপ্ত—৫০৪ কিংবা ৫৪৩ সংখ্যক সূত্রটি ? তাহলে,
আমরা কেবল এইটুকুই বলবো যে, পারিজাতের আলোচ্য সূত্রটি রত্নাকরের
অনুরূপ। অপরপক্ষে, প্রবন্ধ-গীতির যথাযথ পরিচয় দেবার প্রয়াস পরিলক্ষিত
হচ্ছে আলোচ্য সূত্রটিকেই ভিত্তি করে। কিন্তু, ৫০৪ সূত্রের মাধ্যমে
পরিবেশিত নিবন্ধ-গীতি সম্পর্কিত বিষয়বস্তুটা, অতি-অকস্মাৎ পৌরাণিক
উদাহরণ স্থাপনার কারণে, বিজ্ঞান-সম্মত ধারা রক্ষা করতে পারেনি।
বলাবাহুল্য, ৫০৪ ও ৫৪৩ সূত্র দুটির মধ্যে কোনটি প্রক্ষিপ্ত, সে সম্বন্ধে সঠিক
মন্তব্য করার অসুবিধা আছে। ৫৪৩
এলা করণ ঢেক্কীভির্বর্তন্যা ঝোম্বড়ে নব।
লম্ভ রাসৈকতালীভি রষ্টভিঃ সূড উচ্যতে ॥ ৫৪৪
এলা, করণ, ঢেক্কী, বর্তনী, ঝোম্বড়া, লম্ভ, রাসক ও একতালী—এই আট
রকম প্রবন্ধকে সূড প্রবন্ধ বলে। ৫৪৪
টিপ্পনী : সূড কথাটির পরিচয় প্রসঙ্গে রত্নাকরের অন্যতম টীকাকার
কল্লিনাথ বলেছেন “সূড ইতি গীত বিশেষ-সমূহ-বাচী দেশী শব্দঃ। অত্রোদ্দিষ্টানাং
মেলাদিশব্দানাং মধ্যে কেষাঞ্চিদ্ রূঢ়ৈব কেষাঞ্চিদর্থ ব্যুৎপত্তাবগন্তব্যম্।”
অর্থাৎ, সূড শব্দটি দেশজ।—এই শব্দটির দ্বারা বিশেষ এক ধরণের গানকে
সংজ্ঞাতুক্ত করা যায়। অন্যান্য প্রবন্ধ গানগুলিকেও এইরকম যোগার্থযুক্ত বা
যোগার্থশূন্য দুটি শব্দর দ্বারা চিহ্নিত করা হয়ে থাকে। রত্নাকরের অন্যতম
টীকাকার সিংহভূপাল আবার সূডকে “মার্গ-সূড” নামে অভিহিত করেছেন।
অর্থাৎ, সংজ্ঞাটি যে দুটি শব্দ সাহায্যে চিহ্নিত হচ্ছে সেটি দেশজ হলেও
স্বয়ম্ভূ নয়—মার্গিত হয়েছে প্রাক্ প্রবন্ধযুগের সঙ্গীত-বিজ্ঞান থেকে।
বলাবাহুল্য, পারিজাতের আলোচ্য সূত্রটিও অবিকল রত্নাকর থেকে গৃহীত
হয়েছে। ৫৪৪
যস্যোদ গ্রাহস্য পূর্বার্ধং দ্রুত-গত্যা সুশোভিতম্।
মন্দ-গত্যোত্তরার্ধঞ্চ ভবেদেল৷ যদা তদা ॥ ৫৪৫
যে প্রবন্ধ গানের উদগ্রাহ অংশের প্রথম খণ্ডটি দ্রুত লয়ে ও দ্বিতীয় খণ্ডটি
মধ্য লয়ে পরিবেশন করলে শ্রুতিমধুর হয়, তাকেই এলা প্রবন্ধ বলে। ৫৪৫
১৮
২৬৬ সঙ্গীত পারিজাত
টিপ্পনী : এলা প্রবন্ধ সম্বন্ধে পারিজাতকার যা বলেছেন তার সঙ্গে
রত্নাকরের সামঞ্জস্য নেই। এ সম্বন্ধে শার্ঙ্গদেবের বক্তব্য হচ্ছে—এলার
প্রতিপাদ্য বিষয়বস্তু, ত্যাগ, সৌভাগ্য, শৌর্য, ধৈর্য প্রভৃতি। এতে তাল ব্যবহৃত
হয় মণ্ঠ, দ্বিতীয়, কঙ্কাল ও প্রতিমণ্ঠ। এর উদগ্রাহ অংশটি তিনভাগে
বিভক্ত। যথা, অঙ্গি, প্রয়োগ ও পল্লব। অঙ্গি অংশটিরও আবার খণ্ডদ্বয়
ছিল। কিন্তু, খণ্ডদুটির বাক্যাংশ ভিন্ন হলেও গীতি-রীতি ছিল অভিন্ন।
প্রয়োগ অংশটি ছিল বাক্যাংশ-বর্জিত এবং গাওয়া হতো গমক ও স্বল্প পরিমাণ
আলাপযুক্ত করে। পল্লব অংশটি ছিল তিনটি পদের সমষ্টি, যার প্রথমদুটি
বিলম্বিত ও শেষেরটি দ্রুত লয়ে পরিবেশিত হতো। পরন্তু, পল্লবের শেষোক্ত
পদটি দ্রুত লয়যুক্ত হওয়ার কারণে ভিন্ন ধাতুর প্রভাবাধীন হয়ে, মতান্তরে,
মেলাপক নামও গ্রহণ করতো।
উদগ্রাহের পর এলার ধ্রুব অংশ গাওয়া হতো মধ্য বিলম্বিত লয়ে।
এই ধ্রুব অংশটিতেও তিনটি পদ থাকতো এবং পল্লবের মতোই প্রথম
দুটি পদ স্ব-ধাতুক অর্থাৎ ধ্রুব-ধাতুর ও তৃতীয়টি ভিন্ন ধাতুর প্রভাব প্রকাশ
করে তুলতো।
ধ্রুবর পর এলার আভোগের অনুষ্ঠান হতো। তারপর গান শেষ করা
হতো আর একবার ধ্রুব গেয়ে। বলাবাহুল্য, এলা ছিল ত্রি-ধাতুক,
(মতান্তরে চার ধাতুযুক্ত) প্রবন্ধ এবং এর প্রকারভেদও ছিল অসংখ্য
রকমের। যথা, লাট-এলা, গৌড়ীয়-এলা, দ্রাবিড়ী-এলা, বস্তু-এলা,
প্রভৃতি। ৫৪৫
যস্যোদ্ গ্রাহস্য পূর্বার্ধং গীয়তে দ্বিরনন্তরম্।
উত্তরার্ধং সকৃৎ পাঠ্যং তদাস্যাদ্ ঢেঙ্কীকাপুনঃ॥ ৫৪৬
যে প্রবন্ধ গানের উদগ্রাহ অংশের প্রথম খণ্ডটি দু'বার ও দ্বিতীয় খণ্ডটি
একবার—এই পদ্ধতি অনুযায়ী পরিবেশিত হয়, তাকে ঢেঙ্কী-প্রবন্ধ বলে। ৫৪৬
টিপ্পনী : এখানে লক্ষ্য করবার বিষয়, এলা প্রবন্ধর পরই, পারিজাতকার
ঢেঙ্কী-প্রবন্ধর পরিচয় দিয়েছেন—করণ প্রবন্ধটি সম্পর্কে কিছুই বলেন নি।
সম্ভবতঃ কোন নকল-নবিশীর অন্যমনস্কতার কারণেই আমাদের সংগৃহীত
পারিজাতগুলির মধ্যে "করণ” প্রবন্ধটির পরিচয় প্রসঙ্গ বাদ পড়ে গিয়েছে।
সুতরাং "করণ" প্রবন্ধর পরিচয় প্রসঙ্গে মূল রত্নাকরের বক্তব্য এখানে উল্লেখ
করা যাচ্ছে:
সঙ্গীত পারিজাত ২৬৭
অষ্টধা করণং তত্র স্বরাঙ্গং পাট-পূর্বকম্।
বন্ধাদিমং পদাঙ্গঞ্চ তেনাঙ্কং বিরুদাদিমম্ ॥
চিত্রাঙ্গং মিশ্রকরণ মিত্যেবং লক্ষ্ম কথ্যতে।
যত্রোদগ্রাহ-ধ্রুবৌ সান্দ্র স্বরবদ্ধৌ পদেঃ পুনঃ ॥
আভোগ স্তত্র নান স্যাদ্ গাতৃ নেত্রো গ্রহঃ পুনঃ।
ইষ্টস্বরেহংশে ন্যাসঃ স্যাদ্ রাস তালো দ্রুতোলয়ঃ ॥
করণং স্বর-পূর্বং তদবদন্ত্যান্যাপি স্ফুটম।
কিন্তু তেষাং স্বর স্থানে ভেদকানি প্রচক্ষম হে ॥
অর্থাৎ, করণ প্রবন্ধ আট প্রকার। যথা, স্বর-করণ, পাট-করণ, বন্ধ-করণ,
পদ-করণ, তেন-করণ, বিরুদ-করণ, চিত্র-করণ ও মিশ্র-করণ।
স্বর-করণ প্রবন্ধ গানের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এর উদগ্রাহ ও ধ্রুব ধাতুদুটি স্বরদ্বারা
নিবিড়ভাবে নিবন্ধ। আভোগ অংশটি অর্থযুক্ত বাক্য ও বাগেয়কারের
ভণিতাযুক্ত। গানটি গাইতে হয় রাস তালে ও দ্রুত লয়ে এবং গানের প্রারম্ভে
গায়ক তার মনের মতো যে কোন স্বর প্রয়োগ করবার অধিকারী হলেও,
গানটিকে শেষ করতে হয়, সঙ্গীত-বিজ্ঞান নির্দিষ্ট কোন একটি অংশ স্বরের
মাধ্যমে।—করণ ছিল ত্রিধাতুক মেদিনী জাতীয় প্রবন্ধ।
অন্যান্য করণ প্রবন্ধগুলিও মূলতঃ স্বর করণের মতোই, প্রভেদ পরিলক্ষিত
হয় কেবল স্বর প্রয়োগের ক্ষেত্রে এবং তাল-লয় প্রদর্শনের ভঙ্গিমার মধ্যে।—
এখানে উল্লেখযোগ্য যে পাট-করণ দু’ রকমের হয়। অর্থাৎ করণ প্রবন্ধর
সংখ্যাটা আসলে আট নয়, নয় এবং এই ন’টি প্রবন্ধর প্রত্যেকটির আবার
তিনটি করে প্রকারভেদ হয়। সুতরাং করণ প্রবন্ধ সাকুল্যে ২৭ রকমের হয়।
কিন্তু, বাহুল্য ভয়ে, বিস্তৃত আলোচনার সুযোগ আমরা এখানে গ্রহণ করতে
পারছি না।
প্রসঙ্গক্রমে, এখানে এ কথাও বলে রাখা উচিত বিবেচনা করি যে,
পারিজাতে উল্লিখিত প্রবন্ধ-গানের পরিচয়,—পরিচিতি হিসাবে অতি
নগণ্য। এলা ও দেশী প্রবন্ধ সম্বন্ধে ইতিপূর্বে পারিজাতকার যেটুকু বলেছেন,
তাকে অকিঞ্চিৎকর হিসাব উল্লেখ করলেও যথাসত্য বলা হয় না। এই,
সব প্রবন্ধ গানের—শাখা-প্রশাখা ভেদে—যথাযথ পরিচয় ও গায়কী সম্পর্কে
২৩৮ সঙ্গীত পারিজাত
জানতে হলে, অনুসন্ধিৎসুদের পক্ষে রত্নাকরের শরণাপন্ন হওয়া ছাড়া
গত্যন্তর নেই।
অতঃপর ঢেঙ্কী প্রবন্ধর পরিচয়—
ঢেঙ্কী সম্বন্ধে পারিজাতকার যা বলেছেন, পরিচয় হিসাবে তা অকিঞ্চিৎকর।
এ সম্বন্ধে রত্নাকরের বক্তব্য হচ্ছে—
ঢেঙ্কির উদ্গ্রাহ অংশের পূর্বার্ধ ও উত্তরার্ধ গাওয়া হতো যথাক্রমে দু'বার ও
একবার করে। পারিজাতকারের সঙ্গে রত্নাকরের কেবল এইটুকু সামঞ্জস্যই
পরিলক্ষিত হয়। কিন্তু, উদ্গ্রাহর পর গানের মধ্যে মেলাপক অনুষ্ঠানেরও
অবকাশ ছিল। শিল্পী যদি মেলাপক গাইবার সুযোগ গ্রহণ করতেন তাহলে
তাঁকে এলা প্রবন্ধর প্রয়োগ অংশের মতো, অক্ষর-বর্জিত গমকালুপ্তি
সহযোগে গাইতে হতো। অপরপক্ষে, ঢেঙ্কি প্রবন্ধর উদ্গ্রাহ ও মেলাপক
উভয় অংশকেই তালহীন অনির্ভুক্ত পদ্ধতির মাধ্যমেও পরিবেশন করবার
অবকাশ ছিল। অতঃপর ঢেঙ্কির ধ্রুব ও আভোগ অংশ গীত হতো ভিন্ন
লয়ে ও ভিন্ন তালে। লক্ষ্য করবার বিষয়, ঢেঙ্কির ধ্রুব অংশটিও ছিল
এলার মতো তিনটি খণ্ডে বিভক্ত এবং তার প্রথম খণ্ডদুটি ছিল সম-ধাতুক ও
তৃতীয় খণ্ডটি ছিল উচ্চৈঃস্বরযুক্ত ভিন্ন ধাতুর প্রভাবাধীন। অর্থাৎ, ঢেঙ্কি
প্রবন্ধটি ছিল তারাবলী জাতীয় ত্রিধাতুক (মতান্তরে চার ধাতুযুক্ত) এবং
এর প্রকার-ভেদ ছিল ত্রিশ রকম। ঢেঙ্কি প্রবন্ধ গান শেষ করা হতো
আভোগের পর আর একবার ধ্রুব গেয়ে। ৪৭০
যস্মিন্ গীতে স্বরা গেয়াঃ সা ভবেদ্ বর্তনী পুনঃ। ॥৪৭১॥
যে প্রবন্ধ গানে কেবল স্বরসমূহই গীত হয় তাকে বর্তনী প্রবন্ধ
বলে। ॥৪৭১॥
টিপ্পনী : বর্তনী প্রবন্ধর পরিচয় প্রসঙ্গে পারিজাতকার যা বলেছেন তা
পড়ে, সাধারণ বুদ্ধিতে মনে হয়, প্রবন্ধটি পরবর্তী কালের সরগম্ গীতের মতোই
কোন কিছু ছিল। কিন্তু, বর্তনী প্রসঙ্গে শার্ঙ্গদেব যা বলেছেন, তা
পারিজাতের মতো সহজ সরল সংক্ষিপ্ত নয়। শার্ঙ্গদেব বলেছেন, বর্তনীর
লক্ষণসমূহ স্বর করণ প্রবন্ধর অনুরূপ হলেও পার্থক্য পরিলক্ষিত হয় তার
তাল ও লয় প্রয়োগের ক্ষেত্রে। বর্তনী প্রবন্ধে, স্বর-করণের মতো নিরঙ্কুশ
স্বরসমূহ প্রযোজিত হলেও, এতে রাসতালও ব্যবহৃত হয় না বা দ্রুত লয়ও
সঙ্গীত পারিজাত ২৬৯
প্রযুক্ত হয় না; কোন বিলম্বিত লয়যুক্ত তালের মাধ্যমেই বর্তনীকে পরিবেশন
করতে হয়।
বর্তনীর উদ্গ্রাহ অংশটিকে দু'বার গাওয়া হতো। কিন্তু, দু'বার গাওয়ার
অর্থ এ নয় যে—অন্যান্য অনেক প্রবন্ধর মতো—উদ্গ্রাহর দ্বিতীয় খণ্ডটিকে
মেলাপক রূপে পরিবেশন করা হতো। উদ্গ্রাহটিকে হয়তো দু'বার দু'রকমভাবে
গাওয়া হতো; কিন্তু, তার মধ্যে ভিন্ন ধাতুর প্রভাব পরিলক্ষিত হতো না
নিশ্চয়ই। হলে, রত্নাকরে অবশ্যই তার নির্দেশ থাকতো।
বর্তনীর উদ্গ্রাহ অংশটি দু'বার গাওয়ার পর তার ধ্রুব ও আভোগ অংশদুটি
অনুষ্ঠিত হতো একবার করে। তারপর, আর একবার ধ্রুব অংশটি গেয়ে গান
শেষ করা হতো। অর্থাৎ বর্তনী ছিল একটি ত্রি-ধাতুক মেদিনী জাতীয় প্রবন্ধ।
এ ছাড়াও, বর্তনীর আর একটি রূপ ছিল। প্রবন্ধটি যখন কঙ্কাল,
প্রতিতাল, কুড়ুক দ্রুত-মণ্ঠক্—এই চারটি তালের কোন একটির মাধ্যমে
পরিবেশিত হতো, তখন তার নামান্তর ঘটত বি-বর্তনী প্রবন্ধরূপে। ॥ ৪৭১ ॥
যস্যোদগ্রাহঃ পঞ্চমেস্যাদ্ ধ্রুবঃ ষড়জে চ ঝোম্বডঃ।
ততঃ স্বেচ্ছানুসারেণ গতি যত্র বিলম্বিতা ॥ ৪৭২
যে প্রবন্ধ গানের উদ্গ্রাহ অংশের আরম্ভ পা স্বরে ও ধ্রুব অংশের প্রারম্ভ
সা স্বরে হয় এবং যার মধ্যে যদৃচ্ছা বিলম্বিত গতি প্রয়োগ করা যায়, তাকেই
ঝোম্বড প্রবন্ধ বলে। ॥ ৪৭২
টিপ্পনী : পারিজাতের ঝোম্বড রত্নাকরে 'ঝোম্বড়া'রূপে উল্লিখিত হয়েছে।
এই প্রবন্ধটির পরিচয় প্রসঙ্গে শার্ঙ্গদেব 'লেছেন, এর উদ্গ্রাহ অংশটির প্রথম
খণ্ড দু'বার ও দ্বিতীয় খণ্ড একবার গাইতে হয়। উদ্গ্রাহ অনুষ্ঠানের পর,
ইচ্ছা করলে উক্ত উদ্গ্রাহ অংশটিকেই আবার মেলাপকরূপেও গাওয়া যেতে
পারে। কিংবা এই মেলাপকের অনুষ্ঠানটিকে বর্জনও করা যেতে পারে। কিন্তু,
মেলাপকের অনুষ্ঠান যদি করা হয় তাহলে সেটিকে অবশ্যই গমকযুক্ত করতে
হবে। অতঃপর, অর্থাৎ উদ্গ্রাহ বা তথাকথিত মেলাপক অনুষ্ঠানের পর
ঝোম্বড়ার ধ্রুব অংশটিকে দু'বার ও আভোগ অংশটিকে একবার গেয়ে গান শেষ
করতে হবে। অর্থাৎ ঝোম্বড়া বা ঝোম্বড প্রবন্ধটি আসলে ছিল একটি ত্রি-ধাতুক
প্রবন্ধ। তবে, শিল্পী ইচ্ছা করলে তার মধ্যে আরও একটি ধাতুর প্রভাব-বৈশিষ্ট্য
পরিবেশন করতে অধিকারী ছিলেন।
২৭০ সঙ্গীত পারিজাত
ঝোম্হড়া প্রবন্ধ—নিঃসারুক, কুডুক্ক, ত্রিপুট, প্রতিমণ্ঠ, দ্বিতীয়-গারুগী, রাস,
যতি, লয়, অড্ড ও একতালী—এই দশটি তালের মধ্যে যে কোন একটির
মাধ্যমে গীত হতে পারে। কিন্তু—শার্ঙ্গদেবের মতানুযায়ী—মণ্ঠ তালে ঝোম্হড়া
গাওয়া অনুচিত।
ঝোম্হড়া প্রবন্ধও এলা জাতীয় প্রবন্ধর মতো বহু শাখা-প্রশাখায় বিভক্ত
ছিল। রত্নাকরে ৩৫০ রকম ঝোম্হড়ার পরিচয় উল্লিখিত হয়েছে। এ
ছাড়াও, সোম, শ্রীপতি, সংগত, রুচিত, মাতৃকা প্রভৃতি নামযুক্ত আরও
অনেক ঝোম্হড়া প্রবন্ধ ছিল, যার লক্ষণাদি রত্নাকরে উল্লিখিত হয়নি। ৫৪৭।২
এক খণ্ডে দ্বিখণ্ডে বা যস্যোদগ্রাহো ভবেদিহ।
গীয়তেহসৌ সকৃদ্ দ্বির্্বা ভবেদ্ যত্র ধ্রুবঃ পুনঃ।
দ্বিরাভোগো ধ্রুবে মুক্তিঃ প্রলম্ব স্তু লম্ভকঃ॥ ৫৪৮
যে প্রবন্ধ গানের উদ্গ্রাহ অংশটি একখণ্ডে কিংবা দু'খণ্ডে বিভক্ত তথা যা
একবার কিংবা দু'বার গাইতে হয় এবং যার ধ্রুব ও আভোগ অংশদুটি দু'বার
গেয়ে, গানের সমাপ্তি ঘটাতে হয় পুনরায় ধ্রুব অংশটি গেয়ে, তাকেই প্রলম্ব বা
লম্ভক প্রবন্ধ বলে। ৫৪৮
টিপ্পনী: পারিজাতের লম্ভক রত্নাকরেও লম্ভকরূপে উল্লিখিত হয়েছে।
কিন্তু লম্ভক ও প্রলম্ব অভিন্নরূপে চিহ্নিত হয়নি। লম্ভকের পরিচয় প্রসঙ্গে
শার্ঙ্গদেব বলেছেন, এর উদ্গ্রাহ, ধ্রুব ও আভোগ এই তিনটি অংশকেই একখণ্ডে
অথবা দু'খণ্ডে বিভক্ত করে একবার কিংবা দু'বার গাওয়া যায়। এবং, গান
শেষ করতে হয় আভোগের পর আবার ধ্রুব গেয়ে। অর্থাৎ, লম্ভক ছিল একটি
তারাবলী জাতীয় ত্রি-ধাতুক প্রবন্ধ।
প্রলম্ব প্রসঙ্গে শার্ঙ্গদেব বলেছেন, লম্ভকের উদ্গ্রাহ অংশটি যদি দু'টি খণ্ডে
বিভক্ত হয় এবং এই দু'টি খণ্ডের গীতি বৈশিষ্ট্য যদি অভিন্ন না হয়, অর্থাৎ,
উদ্গ্রাহর দ্বিতীয় খণ্ডটি যদি প্রথম খণ্ডর ধাতুগত বৈশিষ্ট্য বজায় না রেখে
ভিন্ন ধাতুর বৈশিষ্ট্য প্রকট করে তোলে, তাহলে, লম্ভক আর লম্ভক
থাকে না, প্রলম্ব নামে চিহ্নিত হয়। এই প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য পূর্ব সূত্রে
আলোচিত ঝোম্হড়া প্রবন্ধটির বৈশিষ্ট্য। ঝোম্হড়ার ক্ষেত্রেও লম্ভকের মতো
ব্যবস্থা আছে। তবে, ঝোম্হড়ার গীতি-ব্যবস্থার মধ্যে শিল্পীর ইচ্ছাটাকে
( option ) ভিন্ন নামে অভিহিত করা হয়নি। বলাবাহুল্য, প্রলম্ব প্রবন্ধের
সঙ্গীত পারিজাত ২৭১
মধ্যে—দ্বিখণ্ডে বিভক্ত উদ্গ্রাহ অংশটি দুটি ধাতুর বৈশিষ্ট্য প্রকট করে
তুললেও,—অর্থাৎ, সাকুল্যে চারটি ধাতুর বৈশিষ্ট্য পরিলক্ষিত হলেও প্রলম্ভ
মূলতঃ লম্ভকের মতোই ত্রিধাতুক।
লম্ভক প্রবন্ধর আরও অনেক রকম প্রকার ভেদের পরিচয় রত্নাকরে
উল্লিখিত হয়েছে। যেমন, ত্রিধাতুক আলাপ-লম্ভক ও ভাগলম্ভ। দ্বিধাতুক
লম্ভপদ, অনুলম্ভ ও উপলম্ভ। এবং কেবলমাত্র উদ্গ্রাহযুক্ত এক ধাতুক
বিলম্ব। আলোচ্যক্ষেত্রে, এই এক ধাতুযুক্ত বিলম্ব প্রবন্ধটির উদাহরণ স্থাপন
করে প্রশ্ন উঠতে পারে,—এটা কী করে সম্ভব? প্রবন্ধ-সঙ্গীত-বিজ্ঞানে তো
এক ধাতুযুক্ত গানের অস্তিত্ব স্বীকৃত হয় না! অবশ্যই হয় না। সুতরাং, বুঝে
নিতে হবে, বিলম্বের উদ্গ্রাহ অংশটিকেই ভিন্ন ধাতুর বৈশিষ্ট্য যুক্ত করে
পরিবেশন করা হতো—তার নিজস্ব প্রকার-ভেদ-জনিত বৈশিষ্ট্যগুলিকে বজায়
রেখেই। ৫৪৮
ঝোম্বড়ো রাসতালেন রাসঃ স এব সঙ্গতঃ। ৫৪৯।১
ঝোম্বড়া প্রবন্ধই রাসতালের মাধ্যমে পরিবেশিত হলে, রাস-প্রবন্ধ নাম গ্রহণ
করে। ৫৪৯।১
টিপ্পনী: পারিজাতের “রাস” রত্নাকরে “রাসকরূপে” উল্লিখিত হয়েছে।
প্রবন্ধটির পরিচয় প্রসঙ্গেও উভয় গ্রন্থকারই অভিন্ন মত পোষণ করেছেন।
অর্থাৎ, ঝোম্বড়া প্রবন্ধই রাস তালের মাধ্যমে পরিবেশিত হলে “রাস” বা
“রাসক” প্রবন্ধরূপে সূচিহ্নিত হয়: অধিকন্তু, রত্নাকর বলেছেন, রাসক প্রবন্ধ
গমকস্থান বর্জিত। অর্থাৎ, ঝোম্বড়া প্রবন্ধর ক্ষেত্রে, শিল্পীর ইচ্ছানুযায়ী,
গমকযুক্ত মেলাপক অনুষ্ঠানের যে ব্যবস্থা ( option ) আছে, রাসক প্রবন্ধর
ক্ষেত্রে সে ব্যবস্থা নেই। অতএব বোঝা যাচ্ছে, রাসক প্রবন্ধটি ছিল মেলাপক
বর্জিত ত্রিধাতুক তারাবলী জাতীয় প্রবন্ধ। বলাবাহুল্য, রাসক প্রবন্ধর প্রকার-
ভেদের সংখ্যাও, গণ, বর্ণ ও মাত্রাভেদে অসংখ্য ছিল। শার্ঙ্গদেব অপ্রসিদ্ধ
ভেদগুলি সম্বন্ধে আলোচনা করেন নি; মাত্র ৮২টি প্রকার-ভেদের পরিচয়
দিয়েছেন। ৫৪৯।১
লম্ভঃ সর্বৈকতাল স্যাদ্ দ্রুতা গতৈকতালিকা ॥ ৫৪৯।২
লম্ভ প্রবন্ধই যখন একতালি তালে ও দ্রুত লয়ে গীত হয়, তখন তার নাম
হয় একতালিকা প্রবন্ধ। ৫৪৯।২
ताल, वाद्य, प्रबन्ध एवं सङ्गीतपारिजात उपसंहार (अध्याय ६-८)
২১২ সঙ্গীত পারিজাত
টিপ্পনী : এই প্রবন্ধটির পরিচয় প্রসঙ্গে পারিজাতকার যা বলেছেন তা
রত্নাকরের অনুরূপ হলেও কথঞ্চিৎ পরিমাণে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের অবকাশ
রাখে। মূল রত্নাকরের বক্তব্য হচ্ছে, একতালিকা প্রবন্ধর উদগ্রাহ, ধ্রুব ও
আভোগ অংশ দু’বার করে গাইতে হয় এবং শেষে আর একবার ধ্রুব গেয়ে
গান শেষ করতে হয়। কিন্তু, লক্ষ্য করবার বিষয়, লম্ভক প্রবন্ধর ধাতুগুলি
সম্পর্কে রত্নাকরে একবার বা দু’বার গাইবার যে স্বাধীনতা স্বীকৃত হয়েছে,
একতালিকার ক্ষেত্রে সে রকম কোন ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে না। অপরপক্ষে,
একতালিকার ধাতুগুলির পরিবেশনা সম্পর্কে এমন সব মতান্তরের দৃষ্টান্তও
রত্নাকরে পাওয়া যায় যা পারিজাতের পরিচিতির পরিপন্থী। যেমন, একতালিকা
প্রবন্ধর উদগ্রাহ অংশটি কেবলমাত্র আলাপ দ্বারাও অনুষ্ঠিত হতে পারে। কিন্তু,
এই মতান্তরের দৃষ্টান্ত অনুধাবন করে আমাদের পক্ষে কোন সিদ্ধান্তে উপনীত
হওয়া সম্ভবপর? আলোচ্যক্ষেত্রে, “লম্ভক প্রবন্ধ দ্রুত লয়যুক্ত একতালি তালে
গীত হবার” প্রমাণ বহন করছে না, যেহেতু, আলাপের ক্ষেত্রে দ্রুত লয়যুক্ত
একতালির অস্তিত্বই থাকতে পারে না। অপরপক্ষে, লম্ভক প্রবন্ধর উদগ্রাহ
অংশটিকে যদি আলাপযুক্ত করে পরিবেশন করা হয় তাহলে তার নাম হয়ে যায়
আলাপ-লম্ভক। অথচ, আলোচ্যক্ষেত্রে সে রকম কোন প্রকার-ভেদ-এর
ইঙ্গিতও পাওয়া যাচ্ছে না।
এ ছাড়াও, টীকাকার সিংহ ভূপাল আবার মন্তব্য করেছেন, একতালিকার
উদগ্রাহ ও ধ্রুব অংশ দু’বার করে গাইতে হয়। তারপর, আভোগ ও ধ্রুব
আর একবার করে গেয়ে গানের সমাপ্তি ঘটাতে হয় উদগ্রাহে। অর্থাৎ
একতালিকার অনুষ্ঠান ঠিক কোন ধাতুটিকে অবলম্বন করে সমাপ্ত হতো, সে
সম্বন্ধেও মতান্তর ছিল টীকাকারদের মধ্যে। বাস্তবিকপক্ষে, একতালিকা দ্বি-
মেলাপক বর্জিত তারাবলী জাতীয় প্রবন্ধ। ৫৪৯।২
ধ্রুবাদি সপ্তভিস্তালৈঃ সূড ইত্যভিধীয়তে ৷৷ ৫৫০
অপরপক্ষে, যে সব প্রবন্ধ ধ্রুবাদি সাতটি তালের মাধ্যমে গীত হয়, সেগুলিকে
সূড জাতীয় প্রবন্ধরূপে অভিহিত করা যেতে পারে। ৫৫০
টিপ্পনী : ধ্রুবাদি সাতটি তাল হচ্ছে ধ্রুব, মণ্ঠ, প্রতিমণ্ঠ, নিঃস্বার, অড্ড,
একতালি ও রাসক। কেউ কেউ নিঃস্বার তালের পরিবর্তে ত্রিপুট তালেরও
উল্লেখ করেছেন। আলোচ্য সূত্রে পারিজাতকার বলছেন, ইতিপূর্বে আলোচিত
আটটি সূড প্রবন্ধ ছাড়াও আরও এমন অনেক প্রবন্ধগীতি ছিল যেগুলি উপরোক্ত
সঙ্গীত পারিজাত ২৭৩
সাতটি তালের মাধ্যমে গীত হলে, সূড প্রবন্ধর অনুরূপ সাঙ্গীতিক বৈশিষ্ট্য প্রকট
করে তুলতো। বলাবাহুল্য, সূডাঙ্কগ্ প্রবন্ধ ও সূডালিক্রম প্রবন্ধ অভিন্ন নয়।
সূডালিক্রম প্রবন্ধগীতির পরিচয় পরবর্তী সূত্রাদিতে আলোচিত হয়েছে, এখানে
সূডাঙ্কগ্ প্রবন্ধাদির কথা বলা হচ্ছে। সূড অর্থে এখানে শুদ্ধ সূড প্রবন্ধ
বোঝাচ্ছে—যার সংখ্যা হচ্ছে মাত্র আটটি। এর সঙ্গে সূডাঙ্কগ প্রবন্ধাদির সম্পর্ক
ঘনিষ্ঠ হলেও তারা সবতোভাবে অভিন্নধর্মী ছিল না। অর্থাৎ ব্যাপারটা ছিল
পরবর্তীকালের ধ্রুপদ গানের ঘরোয়ানা কৌলীন্যর মতো। তানসেন বিরচিত
কোন চৌতালী-ধ্রুপদের সঙ্গে অপর কোন গুণীর চৌতালী-ধ্রুপদের পার্থক্য
নির্ণয় করা সাধারণ সমজদারের পক্ষে সম্ভবপর হয় না। অনেকেই গানের
ভণিতার ওপর নির্ভর করেই বুঝে নেন কোন গানটি কার রচনা। কিন্তু,
ধ্রুপদ-সঙ্গীত-বিজ্ঞান সম্বন্ধে ধ্যান-ধারণা যাঁর ভণিতার ওপর নির্ভরশীল নয়,
অর্থাৎ যিনি ধ্রুপদ গীতি-রীতি ও বিভিন্ন মহাজনের বাক্য-বিন্যাসের বৈশিষ্ট্য-
বৈচিত্র্য সম্বন্ধে ওয়াকিফ হাল তিনি অনায়াসেই বলে দিতে পারবেন, অমুক গানটি
তানসেনের ভণিতাযুক্ত হলেও আসলে বৈজু-রচিত। কিংবা ভণিতার মধ্যে
"বিলাস" থাকলেই বিলাস খাঁকে বোঝায় না। বাণীবিলাসও একজন ছিলেন।
অথচ, সব গানগুলিই আসলে ভাল চালের গান। তবুও, সেনী-রীতির অনুকরণ
ও সেনী-রীতির কৌলীন্য অভিন্ন নয়। আলোচ্যস্থলে পারিজাতকারও শুদ্ধসূড
ও সূডাঙ্কগ্ প্রবন্ধ গীতি সম্পর্কে এই ধরণের বক্তব্যই পরিবেশন করতে
চেয়েছেন। ৫৫০
বর্ণো বর্ণস্বরো গদ্যং কৈবাডশ্চাঙ্কচারিণী।
কন্দুকস্তুরঙ্গলীলাচ গজলীলা দ্বিপদ্যপি ॥ ৫৫১
চক্রবালঃ স্বরার্থশ্চ গাথা ক্রৌঞ্চ পদস্তথা।
কলহংসো দ্বিপথক আর্যাচ ধ্বনিকুট্টনী ॥ ৫৫২
ঘট্টোরুত্তং মাতৃকাচ তোটকো রাগমশ্রিকঃ।
তালার্ণব স্তথা পঞ্চতাল ইত্যাদি সংশ্রয়াঃ ॥ ৫৫৩
১। বর্ণ ২। বর্ণস্বর ৩। গদ্য ৪। কৈবাড ৫। অঙ্কচারিণী ৬। কন্দুক
৭। তুরঙ্গলীলা ৮। গজলীলা ৯। দ্বিপদী ১০। চক্রবাল ১১। স্বরার্থ
১২। গাথা ১৩। ক্রৌঞ্চপদ ১৪। কলহংস ১৫। দ্বিপথক ১৬। আর্যা
১৭। ধ্বনিকুট্টনী ১৮। ঘট্ট ১৯। বৃত্ত ২০। মাতৃকা ২১। তোটক
২৭৪ সঙ্গীত পারিজাত
২২। রাগমিশ্রক ২৩। তালার্ণব ২৪। পঞ্চতাল—প্রভৃতি প্রবন্ধগুলি
আলি-সংজ্ঞায় জাতীয় প্রবন্ধ। ৫৫১-৫৫৩
টিপ্পনী : রত্নাকর ও পারিজাত উভয় গ্রন্থেই আলি জাতীয় প্রবন্ধর সংখ্যা
উল্লিখিত হয়েছে ২৪। নামের দিক দিয়েও কোন অসামঞ্জস্য পরিলক্ষিত হয়
না। তবে, রত্নাকরের কন্দ, ঘট, বাগকদম্বক ও পঞ্চতালেশ্বর নামক প্রবন্ধ
চারটি পারিজাতে কন্দুক, ঘট্ট, বাগমিশ্রক ও পঞ্চতালরূপে উল্লিখিত হয়েছে। এ
ছাড়া, পারিজাতের ৫৫৩ সূত্রের শেষে “ইত্যাদি সংশ্রয়াঃ” যুক্ত হওয়ার ফলে,
আমরা যেমন আলোচ্য ২৪টি প্রবন্ধ ছাড়াও আরও অনেক অনুল্লিখিত আলি-
জাতীয় প্রবন্ধর অস্তিত্ব কল্পনা করবার সুযোগ পাচ্ছি, রত্নাকরে তেমন কোন
কিছু অনুমান করবার অবকাশ নেই। পরন্তু, রত্নাকরে সঠিক ২৪টি আলি
জাতীয় প্রবন্ধর কথাই উল্লিখিত হয়েছে—“ইত্যাদির” অবকাশ আছে বিপ্রকীর্ণ
প্রবন্ধর সংখ্যা সম্পর্কে। এ সম্বন্ধে, আমরা যথাস্থানেই আলোচনা করবো।
৫৫১—৫৫৩
কর্ণাট ভাষয়োৎপন্নঃ প্রবন্ধো বর্ণ সংজ্ঞকং।
স এব স্বরতালাভ্যাং বর্ণপরোঽপি কথ্যতে ॥ ৫৫৪
যে সকল প্রবন্ধ কর্ণাটিক ভাষায় বিরচিত তাকেই বলে বর্ণ প্রবন্ধ। এবং উক্ত
প্রবন্ধগুলিই যখন আবার স্বর ও তালভুক্ত হয়ে গাত হয়, তখন তার নাম হয়ে
যায় বর্ণস্বর প্রবন্ধ। ৫৫৪
টিপ্পনী : বর্ণ প্রবন্ধ সম্পর্কে পারিজাতকার যা বলেছেন তাতে মনে হয়,
এই প্রবন্ধগুলি অন্ধ্র, মদ্র, তামিল, তেলেগু প্রভৃতি দক্ষিণদেশীয় ভাষায় রচিত
হতো এর পরিবেশিত হতো অনিযুক্ত পদ্ধতির মাধ্যমে। কিন্তু, বর্ণ প্রবন্ধ
প্রসঙ্গে রত্নাকর যা বলেছেন তার সঙ্গে পারিজাতের সামঞ্জস্য নেই। শার্ঙ্গদেব
বলেছেন, বর্ণ প্রবন্ধে বিরুদ অপরিহার্য এবং প্রবন্ধগুলি গাওয়া হয়ে থাকে বর্ণ-
তালের মাধ্যমে। অর্থাৎ রত্নাকরের আমলে বর্ণ প্রবন্ধ রীতিমত তালযুক্ত হয়েই
গীত হতো এবং প্রবন্ধর মধ্যে কোন ধাতুর উল্লেখ না থাকলেও বিরুদের প্রয়োগ
ছিল অপরিহার্য। ব্যাপারটা বিশ্লেষণ করে টীকাকার কল্লিনাথ মন্তব্য করেছেন,
বর্ণ প্রবন্ধ ছিল ভাবনী জাতীয় ত্রি-ধাতুক প্রবন্ধ। অর্থাৎ, ধাতুর উল্লেখ না
থাকলেও গানের পদগুলিকে ধাতু ব্যবস্থানুযায়ী পরের পর পরিবেশন করা
হতো। সর্বোপরি, বর্ণ তাল আবার ছিল তিন রকমের। যথা—
সঙ্গীত পারিজাত ২৭৫
ত্র্যস্রবর্ণ ( ২ লঘু+২ দ্রুত+২ লঘু মাত্রা )
মিশ্রবর্ণ ( ১৪ দ্রুত+২ প্লুত+২ দ্রুত+১ প্লুত+১ লঘু+১ প্লুত+১ লঘু মাত্রা )
চতুরস্রবর্ণ ( ১ প্লুত+১ লঘু+২ দ্রুত+১ প্লুত+১ লঘু মাত্রা )
বর্ণস্বর প্রবন্ধ সম্পর্কে পারিজাতকার বলেছেন, পূর্বোক্ত বর্ণ প্রবন্ধকেই যখন
আবার স্বর ও তালযুক্ত করে নিযুক্ত পদ্ধতির মাধ্যমে পরিবেশন করা হয়, তখন
তার নাম হয়ে যায় বর্ণস্বর প্রবন্ধ। নিযুক্ত অনির্ভুক্তর প্রয়োগ ব্যবস্থাটা দুর্বোধ্য
নয় ; কিন্তু, প্রবন্ধটির মধ্যে স্বরযুক্ত করা অর্থে পারিজাতকার কী বলতে চেয়েছেন
সেটা ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। বর্ণস্বর নামটির দিকে লক্ষ্য করলে বোঝা যায়,
ব্যাপারটা একালের সরগম-গীতির মতো নিরঙ্কুশ ছিল না। কিন্তু, তেলেনা
চতুরঙ্গ প্রভৃতি গানের অন্তর্গত “স্বরগ্রাম” অংশবিশেষরূপেও গ্রাহ্য হতো কিনা
সন্দেহ। কারণ, তেলেনা চতুরঙ্গ প্রভৃতি গানের বৈশিষ্ট্য অর্থহীন বাণীর মাধ্যমেই
প্রকট হয়ে ওঠে, তার মধ্যে কথঞ্চিৎ পরিমাণে অর্থযুক্ত বর্ণর অস্তিত্ব
থাকলেও সেটা এমনই অকিঞ্চিৎকর যে গীতি-পদ্ধতির নামকরণের সহায়ক হতে
পারে না।
অপরপক্ষে, পারিজাতের “তাল”-কে যদি “তাল-অক্ষর” হিসাবে গ্রাহ্য করা
হয় ; অর্থাৎ পাট্ হিসাবেই অনুমান করে নেওয়া যায়, তাহলে দেখা যাবে বর্ণস্বর
প্রবন্ধ প্রসঙ্গে রত্নাকরের বক্তব্য কথঞ্চিৎ পরিমাণে পারিজাতেরই অনুরূপ।
শার্ঙ্গদেব বলেছেন, স্বর, পাট্, পদ ও তেন-যুক্ত গীতিকেই বর্ণস্বর প্রবন্ধ বলে।
গানের মধ্যে স্বর, পাট্ প্রভৃতির বিন্যাসভেদে প্রবন্ধটির চারটি ভেদও হতে
পারে। ৫৫৪
গদ্যং নিগদ্যতে ছন্দোহীনং পদ-কদম্বকম্।
উদ্গ্রাহধ্রুবকৌ যস্য পাটৈরেব বিনির্মিতৌ।
পদৈঃ ক্বতান্তরাভোগৌ কৈবাড়োহত্যন্ত শোভিতঃ॥ ৫৫৫
যে প্রবন্ধর পদগুলি ছন্দহীন তাকে গদ্য প্রবন্ধ বলে। যে প্রবন্ধর উদ্গ্রাহ ও
ধ্রুব অংশ পাট্ দ্বারা এবং অন্তর ও আভোগ অংশ পদ দ্বারা রচিত, সেই অতি
সুন্দর প্রবন্ধকে কৈবাড় প্রবন্ধ বলে। ৫৫৫
টিপ্পনী : গদ্য প্রবন্ধর পরিচয় প্রসঙ্গে পারিজাতকার যা বলেছেন তার সঙ্গে
রত্নাকরের সামঞ্জস্য আছে, কিন্তু আংশিক। গদ্য প্রবন্ধর উদ্গ্রাহ অংশটি অবশ্য
ছন্দহীন তথা অ-তালে গীত হতো। কিন্তু অ-তালের পরে ধ্রুব ও আভোগ অংশ
২৭৬ সঙ্গীত পারিজাত
দুটি গীত হতো স-তালে। এবং, এই স-তাল অনুষ্ঠানের মধ্যে ছয় রকম লয়ের
কাজ যুক্ত করবার অবকাশ ছিল। যথা, দ্রুতা, বিলম্বিতা, মধ্যা, দ্রুত-মধ্যা,
দ্রুত-বিলম্বা ও মধ্যা-বিলম্বিতা। গদ্য প্রবন্ধর কৌলীন্য প্রসঙ্গে রত্নাকর বলেছেন,
গদ্যগুলি সামবেদ থেকে উৎপন্ন (গৃহীত?) হয়েছে এবং এর গেয় বস্তুর
প্রকারভেদ হচ্ছে ন'টি। এর মধ্যে ছন্দশাস্ত্রসম্মত ছয়টি প্রকার হচ্ছে :—
বীর-রসে গেয়—উৎকলিকা,
শান্ত-রসে গেয়—চূর্ণ ও বৃত্তগন্ধি।
শৃঙ্গার-রসে গেয়—ললিতা ও চিত্র।
হাস্য-রসে গেয়—খণ্ড।
এই ছয়টি প্রকার-ভেদকে, মতান্তরে, আবার দুইটিমাত্র প্রকারভেদের মধ্যে
গণ্ডীবদ্ধ করা যেতে পারতো। যথা, বেণী ও মিশ্র।
বলাবাহুল্য পারিজাত পাঠ করে গদ্য প্রবন্ধর ধাতু-ব্যবস্থা সম্বন্ধে কিছুই জানা
যাচ্ছে না। রত্নাকরের মতানুযায়ী, গদ্য ছিল একটি ত্রি-ধাতুক প্রবন্ধ।
কৈবাড় প্রবন্ধ সম্পর্কে পারিজাতকার যা বলেছেন তার সঙ্গে রত্নাকরের
সামঞ্জস্য নেই যদিও উভয় গ্রন্থেই প্রবন্ধটি কৈবাড নামেই উল্লিখিত হয়েছে।
রত্নাকর বলছেন, কৈবাড প্রবন্ধর উদ্গ্রাহ ও ধ্রুব অংশের অনুষ্ঠান হয় পাট ও
অক্ষর সহযোগে। শেষে, আর একবার উদ্গ্রাহ গেয়ে (ধ্রুব নয়) গান শেষ
করতে হয়। এদিক দিয়ে দেখলে কৈবাড ছিল দ্বি-ধাতুক প্রবন্ধ। কিন্তু,
টীকাকার কল্লিনাথ মন্তব্য করেছেন “নেতা ও গায়কের” ভণিতাযুক্ত করে
কৈবাড়ের মধ্যে আভোগের অনুষ্ঠানও করা বক্তব্য। অর্থাৎ, কল্লিনাথের
মতানুযায়ী এটিকে ত্রি-ধাতুক প্রবন্ধরূপেও গ্রহণ করবার অবকাশ রয়েছে।
অপরপক্ষে, পারিজাতকার বলছেন, কৈবাডের উদ্গ্রাহ ও ধ্রুব অংশ কেবলমাত্র
পাট্ (অক্ষর নয়) দ্বারা রচিত এবং অন্তর ও আভোগ অংশ পদদ্বারা রচিত—
যার উল্লেখ রত্নাকরে নেই।
রত্নাকর আরও বলেছেন, কৈবাড প্রবন্ধ দু' রকমের হয়। যথা, সার্থক ও
অনর্থক। কিন্তু, পাট্-এর ক্ষেত্রে 'অনর্থোক্তি বা অর্থহীনতার তাৎপর্য কী হতে
পারে সে সম্বন্ধে শার্ঙ্গদেব ও তার টীকাকারদ্বয় কোন রকম আলোকপাত
করেন নি। তবে, কৈবাড প্রসঙ্গে রত্নাকরে আরও দু'টি ভেদের উল্লেখ দেখা
যায়—শুদ্ধ ও মিশ্র। টীকাকার সিংহভূপাল এ সম্বন্ধে মন্তব্য করেছেন, যা
কেবলমাত্র পাট্ দ্বারা বিরচিত তাকে বলে শুদ্ধ-কৈবাড় এবং শুদ্ধ-কৈবাড়ের মধ্যে