सङ्गीतपारिजात (अहोबल - वीणा के तारों पर शुद्ध व विकृत स्वर-स्थान निर्धारण का ऐतिहासिक ग्रन्थ)
Sangitaparijata of Ahobala on Indian Musicology
पण्डित अहोबल (टीकाकार: कलानिधि कलिन्द) द्वारा
বিবেচনা করে রত্নাকরের অন্যতম টীকাকার কল্লিনাথ মন্তব্য করে গেছেন,
“অনাদি সম্প্রদায়” কথাটির প্রয়োগ দ্বারা প্রমাণিত হচ্ছে, এই গান্ধর্ব-গীতির
ব্যাপারটা বেদের মতোই অপৌরুষেয়। অর্থাৎ অপৌরুষেয় বেদের মতো এই
গান্ধর্ব-গীতিপদ্ধতিও কোন কিছু পরিবর্তন করবার অধিকার কারুর নেই।
অথচ, এই রত্নাকরের মধ্যেই আবার ভরত, মতঙ্গ, পরমর্দি প্রমুখ সঙ্গীত-
শাস্ত্রকারদের মন্তব্য এমনভাবে উল্লিখিত হয়েছে যার সাহায্যে নিশ্চিতভাবেই
প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে, গান্ধর্ব-গীতিপদ্ধতি ইতিমধ্যে একাধিকবার সমাদৃত তথা
সুসংস্কৃত হয়েছিল। অপর পক্ষে—
প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে, সুপ্রাচীন গান্ধর্ব-গীতিপদ্ধতি এবং গান্ধর্ব থেকে মার্গিত
হয়ে যে মার্গ-সঙ্গীত রত্নাকরের পূর্ববর্তী আমলে প্রতিষ্ঠালাভ করেছিল, সেই
গান্ধর্ব এবং মার্গপদ্ধতি দুটি রত্নাকরের আমলেই নিঃশেষে বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল।
কিন্তু, তদানীন্তনকালে প্রচলিত দেশী পদ্ধতির “আলপ্তি”র কোন কোন অংশ
বিলুপ্ত গান্ধর্ব ও মার্গপদ্ধতির “আলাপ” বা “অনিবদ্ধ” (?) অংশ থেকে মার্গিত
হয়েছে, সে সম্বন্ধে গ্রন্থকারের তথা তাঁর টীকাকারদ্বয়ের ভাষ্য দুর্বোধ্য। বিশেষতঃ
বিলুপ্ত গান্ধর্বের অনিবদ্ধ অংশ কোন অজুহাতে, কী কী স্থান দান করে দেশী
পদ্ধতির মধ্যে প্রতিষ্ঠালাভ করল, তার তথ্য-তত্ত্বাদি যেমনি সংক্ষিপ্ত তেমনি
দুর্বোধ্য। অর্থাৎ, ভারতীয় সঙ্গীতের ঐতিহাসিক তথ্য আহরণের ক্ষেত্রে
প্রত্যক্ষভাবে বিপর্যয় ঘটিয়েছে প্রাচীন সঙ্গীত গ্রন্থ রচয়িতাদের কালধর্ম সম্পর্কে
সচেতনতার অভাব এবং পরোক্ষে বাদ সেধেছে প্রাচীন তথ্য-তত্ত্বাদি সম্পর্কে
তাঁদের অহেতুক শ্রদ্ধাবোধ। যার ফলে, আমাদের দেশের সঙ্গীত গ্রন্থগুলি
সংকলন গ্রন্থরূপেই গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছে, ইতিহাস হিসাবে প্রামাণ্য হয়ে
ওঠেনি।
আমরা যদি আমাদের দেশের প্রাচীন ইতিহাস জানবার চেষ্টা করি, তাহলে,
প্রথমেই যে সত্যটার সঙ্গে পরিচিত হয়ে পড়ি সেটা হচ্ছে “দ্যো পিতা পৃথিবী
মাতা”। পৃথিবী অর্থে এখানে সেই দেশটাকেই বোঝাচ্ছে, পরবর্তী কালে যার
নাম হয়েছিল ভারতবর্ষ এবং আজকের মতো সেদিনও যার আয়তন ছিল
“তাবৎ ত্রিকোণা”। অর্থাৎ, এ দেশটা হচ্ছে আমাদের মাতৃভূমি—পিতৃদেবরা
এসেছিলেন কোন একটা “দ্যো” নামক জায়গা থেকে। বর্তমানে আমরা যেমন
মার্কিনী নাগরিকত্ব গ্রহণ করেও বাঙ্গালী থেকে যাই, তেমনি সেদিন দ্যো নামক
স্থানের আদিম অধিবাসী হিসাবে আমাদের ভারতীয় পিতৃদেবরাও ছিলেন
২২৬ সঙ্গীত পারিজাত
“দেবতা”। এই দেবতারা বিজয়ীর ভূমিকা গ্রহণ করে এদেশে আধিপত্য বিস্তার
করেছিলেন বলেই তাঁরা আর্য বা প্রভুরূপে প্রখ্যাত এবং বলাই বাহুল্য, বিজিত
হয়েছিলেন যাঁরা তাঁরাই বেদ পুরাণাদিতে কুখ্যাত হয়েছেন অনার্যরূপে।
আর্যগণ কর্তৃক বিজিত হয়ে এদেশের রক্ষ, যক্ষ, দ্রাবিড়, কিন্নর, গন্ধর্ব, শবর,
কিরাত প্রভাত যেখানে যত সম্প্রদায় ছিল, সকলেই তাদের রাজনৈতিক
স্বাধীনতার সঙ্গে সঙ্গে কুলগত ঐতিহ্যও বিসর্জন দিতে আরম্ভ করে নূতন কালের
নতুন দেবতাদের সমগোত্রীয় হবার প্রলোভনে বা বাধ্য হয়ে। এই সব কুলগত
ঐতিহ্যের মধ্যে গন্ধর্বদের গীতি-পদ্ধতি ছিল অন্যতম। যতদূর মনে হয়, তখনকার
প্রাক্-বৈদিক ভারতবর্ষে গন্ধর্বদের এই গীতি-পদ্ধতিটাই ছিল ক্লাসিক্যাল কলা-
বিজ্ঞান হিসাবে একমাত্র মান্য ও প্রামাণ্য। অবশ্য, বাজার-চালু সাধারণ গান-
বাজনার অভাব ছিল না সে সময়; কিন্তু, গন্ধর্বদের সাঙ্গীতিক ঐতিহ্যটা
সর্বজন-শ্রদ্ধেয় ছিল এই কারণে যে এই গীতি-পদ্ধতি আদৌ গণদেবতার
মনোরঞ্জনের জন্য ব্যবহৃত হতো না, নানাবিধ অভ্যুদয়প্রদ: আভিচারিক উদ্দেশ্য
সাধনের ক্ষেত্রেই প্রযোজিত হতো। এবং বলাই বাহুল্য, কার্যোদ্ধারের
প্রয়োজনে বিজয়ী আর্যরা বিজিত গন্ধর্বদের এই সাঙ্গীতিক নৈপুণ্যটাকে আত্মসাৎ
করবার চেষ্টা করেছিলেন। অর্থাৎ তদানীন্তন আর্যাবর্তের ইন্দ্র বরুণ উপাধিধারী
দেশ-শাসকরা নিজেদের স্ফটিক প্রাসাদাদি নির্মাণের জন্য যেমন অনার্য
ময়দানবদের কাজে লাগাতেন, বংশবৃদ্ধির নিগূঢ় কারণে বিশেষভাবে বহন
করতেন অনার্য নারীদের, তেমনি তন্ত্রত্ব রক্ষাকামী আর এক শ্রেণীর চিন্তাশীল
সম্প্রদায়, তাঁদের নতুন ধর্মমতকে ফলপ্রসূ করবার উদ্দেশ্যে গন্ধর্বদের কুলগত
ঐতিহ্যটাকে কাজে লাগিয়েছিলেন। প্রমাণ, সাম-বেদ।
সেকালের মন্ত্রশক্তি একালের যন্ত্রশক্তির তুলনায় ক্ষীণ হয়তো ছিল, কিন্তু
হীন যে ছিল না তার প্রমাণ পাওয়া যায় বৈদিক ঋষিদের উদ্দেশ্য-প্রণোদিত
মন্ত্র সৃষ্টির ক্রমবর্ধমান সংখ্যা লক্ষ্য করলে। বৈদিক মন্ত্রদ্রষ্টারা গ্রামগেয়,
অরণ্যগেয় উহ এবং ঊহ্য নামক চারটি গীতি-পদ্ধতির সাহায্যে যজ্ঞ সম্পাদন
করতেন এবং বলাই বাহুল্য এই পদ্ধতি চতুষ্টয়ের মূল উপকরণ সংগ্রহ করেছিলেন
তাঁরা বিজিত গন্ধর্বদের নিকট থেকেই। ফলে, এদেশের সর্বজনমান্য ক্লাসিক্যাল
গীতি-পদ্ধতিরূপে এতকাল গন্ধর্বদের যে ঐতিহ্য ছিল সেটা সামগদের প্রাপ্য হয়ে
গেল এবং কপাল, কম্বল প্রভৃতি যে সব গান্ধর্ব-পদ্ধতির কল্যাণে সামগরা পথের
সন্ধান পেয়েছিলেন, সেই পদ্ধতিগুলো তদানীন্তন গীর্বাণ ভাষার মাধ্যমে পুঁথিগত
হয়ে বা সনাতনপন্থী কয়েকজন সঙ্গীতবিদের স্মৃতির ভাণ্ডারে কিছুকাল উজ্জীবিত
থেকে নিঃশেষে নির্বাণলাভ করল। বহু পরবর্তী কালের রত্নাকর প্রভৃতি সঙ্গীত
গ্রন্থাদিতে আমরা “ঝন্টুং ঝন্টুং খটাঙ্গধবং” প্রভৃতি যে সব ‘কপালের’ উল্লেখ
দেখতে পাই, সেগুলি নিতান্তই যে নকল-নবিশীর উদাহরণ, ‘কপালের’ নায়কী
এবং গায়কী, কোন কিছু সম্বন্ধেই যে গ্রন্থকারদের কোন রকম প্রত্যক্ষ ধারণা
ছিল না, তার সব চাইতে বড় প্রমাণ, নিবন্ধ পদ্ধতির বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের
প্রসঙ্গে অনিবদ্ধ পদ্ধতির অতি সংক্ষিপ্ত পরিচিতি। এই পরিচিতির মধ্যে
অনিবদ্ধ কেবলমাত্র নিবন্ধর বিপরীত পদ্ধতিরূপেই উদ্ধৃত হয়েছে—বৈজ্ঞানিক
বিশ্লেষণের মাধ্যমে যুক্তিগ্রাহ্য হয়ে বিন্দুমাত্রও আলোকপাত করেনি।
কিন্তু, এই সব সংকলন গ্রন্থের সাহায্যে, সামগদের আমলের সঙ্গীত কলা-
বিজ্ঞান যে কী পরিমাণ প্রগতিশীল ছিল, সে সম্বন্ধে অনেক কিছুই জানা যায়।
সামগরা ইতিপূর্বে গন্ধর্বদের নিকট থেকে যে সপ্তক পেয়েছিলেন তার স্বর এবং
শব্দ ছিল অভিন্ন, চিহ্নিত হতো উদাত্ত, অনুদাত্ত ও স্বরিত, এই তিনটি সংজ্ঞার
মাধ্যমে। যথোচিত অনুশীলনের ফলে, সংজ্ঞার সংখ্যাটা তিনের পরিবর্তে সাত
হয়ে গিয়ে নামান্তরগত হয় জাত্য, অভিনিহিত, ক্ষৈপ্র, প্রশ্লিষ্ট, তৈরোব্যঞ্জন,
তৈরোবিরাম এবং পাদবৃত্ত। কিন্তু, এই সাম-গানের কতটুকু অংশ অনিবদ্ধ ছিল
আর কতটুকু অংশ নিবন্ধ ছিল সে সম্বন্ধে আমরা কিছুই জানতে পারছি না।
কেবল জানতে পারছি, এই সময়কার সাম-গানের মধ্যে ধাতু, ছন্দ ও তালের
অস্তিত্ব বেশ ভালোভাবে ছিল।
যে পদ্ধতি একবার মার্গিত হয়, তার পক্ষে একাধিকবার মার্গিত হবার
সম্ভাবনা থাকেই। ফলে, কালক্রমে দেখা গেল, সুপ্রাচীন গান্ধর্বের মতো
সামগানের ঐতিহ্যও নষ্ট হবার উপক্রম করেছে। অর্থাৎ, সাম-গানের সঙ্গে সঙ্গে
যে নন্-ক্লাসিক্যাল সাধারণ গান-বাজনা চলে আসছিল এতদিন শিব, হূহু,
তম্বুরু প্রমুখ কয়েকজন প্রতিভাধর ব্যক্তির চেষ্টায়, সেই সাধারণ গান-বাজনা
অসাধারণের পর্যায় উন্নীত হবার উপক্রম করেছে প্রধানত ক্লাসিক্যাল সাম-
গানের গুপ্ত-ভাণ্ডার থেকে অনেক কিছু সাঙ্গীতিক বৈজ্ঞানিক উপকরণ আহরণ
করার ফলে। অতএব, সাম-গানের ঐতিহ্য যথাযথভাবে বজায় রাখবার সঙ্কল্প
গ্রহণ করে তদানীন্তনকালের গুণীজ্ঞানীরা একটা অভিনব পন্থা গ্রহণ করলেন।
ক্লাসিক্যাল-প্রয়াসী, জনসাধারণকে যদৃচ্ছা সাম অনুকরণের মোহ থেকে নিবৃত্ত
করবার সদুদ্দেশ্যে তাঁরা এক রকমের আধা-ক্লাসিক্যাল গীতি-পদ্ধতি উদ্ভাবন
২২৮ সঙ্গীত পারিজাত
করলেন এবং নারদ উপাধিধারী জনৈক বিশেষজ্ঞের ওপর দায়িত্ব অর্পণ করলেন
সেই নতুন পদ্ধতির গান গন্ধর্বদেরও শিক্ষা দেবার জন্য। অর্থাৎ, নারদের নিকট
থেকে শিক্ষাগ্রহণ করে গন্ধর্বরা যাতে সেই নতুন পদ্ধতির গান জনসাধারণের
মধ্যে প্রচলিত করে দেয় তারই ব্যবস্থা গৃহীত হলো।
ফল হলো কিঞ্চিৎ গোলমেলে। এই নতুন পদ্ধতির গান সামের মতো
ক্লাসিক্যাল তো ছিলই না, পরন্তু পরিকল্পিত হয়েছিল গণদেবতার সাঙ্গীতিক
প্রয়াস ভিন্নপথে পরিচালিত করবার নিগূঢ় উদ্দেশ্যে। প্রচারকদের ভূমিকায়
গন্ধর্বদের নিয়োগ ব্যবস্থাটাও ছিল অনুরূপ কূটনৈতিক উদ্দেশ্য-প্রণোদিত।
কিন্তু, ফল হলো একবারে আশাতীত। অর্থাৎ গন্ধর্বদের দ্বারা প্রচলিত হওয়ার
কল্যাণে এই আধা-লৌকিক আধা-ক্লাসিক্যাল গীতি-পদ্ধতিটাও গান্ধর্ব মর্যাদা
পেয়ে গেল। উপরন্তু, এই নতুন পদ্ধতির অতি-প্রচলনটা সাম-গানের সুষ্ঠু
স্বর-শব্দ ব্যবস্থার মধ্যেও একটা গণ্ডগোল পাকিয়ে দিল। ফলে, সাম রক্ষকদের
মধ্যে একটা সামাল-সামাল রব উঠল—যার নকল-নবিশীভূত উদাহরণ আমরা
বহু পরবর্তী যুগের মতঙ্গ প্রমুখ সঙ্গীত গ্রন্থকারদের রচনার মধ্যেও সাঙ্গীতিক
স্লোগানরূপে পাচ্ছি। যেমন—“ন স্ববুদ্ধ্যা গীয়তে, গুরু-শিষ্য-পরম্পরয়া গায়তে,
ঐহিক সুখস্য স্বর্গাপবর্গ রূপস্য হেতুঃ”। ইত্যাদি।
কিন্তু, এত সব চেষ্টা সত্ত্বেও, সাম-গান্ধর্বব বিশুদ্ধতা রক্ষা করা সম্ভবপর
হলো না। জাত্য, অভিনিহিত প্রভৃতি বনেদী সপ্তকের স্থানে লৌকিক
উপকরণের দ্বারা পরিকল্পিত ক্রুষ্ট, প্রথমা, দ্বিতীয়া, তৃতীয়া, চতুর্থ, মন্দ্র ও
অতিস্বর—এই সাতটি সংজ্ঞা নিরঙ্কুশ স্বররূপেই প্রতিষ্ঠালাভ করল।
এর পরই দেখা যাচ্ছে, ব্রহ্মা উপাধিধারী জনৈক রাষ্ট্রপালকের নির্দেশে ভরত
উপাধিধারী জনৈক বিশেষজ্ঞ, কয়েকজন সমধর্মীর সাহায্যে আমাদের নাট্য-
সঙ্গীতকে নিরঙ্কুশ করবার চেষ্টা করছেন গান্ধর্ব থেকে উপকরণ গ্রহণ করে।
সম্ভবতঃ পূর্বতন সাম-গানের মতো এদেশের নাট্য-সঙ্গীতের মধ্যেও ইতোমধ্যে
লৌকিক গানের প্রভাব প্রতিপত্তি বিস্তারলাভ করেছিল। কিন্তু, এই নাট্য-
সঙ্গীতকে নিরঙ্কুশ করতে গিয়ে ভরত কোন্ গান্ধর্ব থেকে উপকরণ সংগ্রহ
করেছিলেন সেটা বিশেষভাবেই বিবেচ্য। উপকরণগুলো যে সুপ্রাচীন গান্ধর্ব
থেকে মার্গিত হয়নি, পরন্তু, সাম-পরবর্তী গান্ধর্ব থেকেই গৃহীত হয়েছিল তার
প্রমাণ, সুপ্রাচীন গান্ধর্বব অপরিহার্য অঙ্গ গান্ধার গ্রামের প্রসঙ্গ সম্পূর্ণরূপে
এড়িয়ে গিয়ে ভরত লৌকিক সঙ্গীতের অবদান ষড়জ ও মধ্যম গ্রামদুটিকেই
সঙ্গীত পারিজাত ১২৯
বিষয়বস্তু পরিবেশনার ভিত্তি হিসাবে গ্রহণ করেছিলেন। অর্থাৎ, এই গ্রহণ
বর্জনের উদাহরণ দ্বারা নিশ্চিতরূপেই প্রমাণিত হয়ে যাচ্ছে, নাট্যশাস্ত্রের আমলে
সুপ্রাচীন গান্ধর্ব তার গান্ধার গ্রামটিকে নিয়ে বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল কালের
অতলে।
আমাদের বিশ্বাস, সুপ্রাচীন "অনিবদ্ধ রীতি"র ব্যাপারটাও, দুর্বোধ্য হয়ে
ওঠার কারণে, এই সময় থেকেই গুরু-গম্ভীর অনুপ্রাসযুক্ত হয়ে পুঁথিগত হতে
আরম্ভ করে।
নাট্যশাস্ত্রের (২০০।৪০০ খৃঃ পূঃ) পর আমরা প্রামাণ্য হিসাবে বৃহদ্দেশীকে
(৩০০।৭০০ খৃঃ অঃ) পাচ্ছি। বলা বাহুল্য, ইতিমধ্যে অবরোহণ গতির ক্রুষ্ট, প্রথমা,
দ্বিতীয়া প্রভৃতি স্বর-ব্যবস্থা বানচাল হয়ে গিয়ে লৌকিক ষড়জ, ঋষভ প্রভৃতি
স্বর আরোহণ গতিতে প্রতিষ্ঠালাভ করে দেশী পদ্ধতির সঙ্গীতকে প্রগতিশীল
করে তুলেছিল। অপরপক্ষে মতঙ্গর প্রাচীন সঙ্গীত সম্বন্ধীয় উদ্ধৃতিগুলি
বিশ্লেষণ করে এমন কথা আমরা জানতে পারছি না,—তাঁর আমলে, আদি-
গান্ধব থেকে মার্গিত সাম-গান, সাম-গান থেকে মার্গিত পরবর্তী গান্ধর্ব রীতি
এবং শেষোক্ত গান্ধর্ব থেকে মার্গিত নাট্য-গান্ধর্ব বেঁচে ছিল কি না। পরন্তু,
মার্গিত সঙ্গীত বা মার্গ-সঙ্গীতপদ্ধতি সম্বন্ধে তিনি এবং তাঁর পরবর্তী
গ্রন্থকারবৃন্দ এমনভাবে উদ্ধৃতি পরিবেশন করে গেছেন যা অনুধাবন করে ধারণা
জন্মায়, মতঙ্গর আমলে একমাত্র দেশী পদ্ধতির সঙ্গীত ব্যতীত আর কোন
রকমের প্রাচীন ক্ল্যাসিক্যাল শ্রেণীর সঙ্গীত প্রচারিত ছিল না এবং ছিল না
বলেই তাঁরা গান্ধব তথা মার্গপদ্ধতির অপরিবর্তনীয় আইন-কানুন সম্পর্কে অত
বিধিনির্দেশের পুনরুক্তি করে গেছেন।
এই বৃহদ্দেশীতেই আমরা পাচ্ছি “আলাপাদি নিবন্ধ যঃ স চ মার্গঃ প্রকীর্তিতঃ”
এবং “আলাপাদি বিহীনস্ত স চ দেশী প্রকীর্তিতঃ”। অথচ, সঙ্গে সঙ্গেই আবার
আমরা পাচ্ছি আলাপাদি নিবন্ধ মার্গপদ্ধতির মধ্যে পদ-তাল-ছন্দ প্রভৃতির
অস্তিত্ব রক্ষিত হয়েছে এবং আলাপবিহীন দেশী সঙ্গীতের মধ্যে প্রকট হয়ে
উঠেছে আলপ্তির অস্তিত্ব। সর্বোপরি, দেশী সঙ্গীতপদ্ধতির পরিচয় প্রসঙ্গে
“বণ্টেলা” নামক একটি গীতি-রীতির পরিচয়ও আমরা পাচ্ছি যা তালহীন
অবস্থায় পরিবেশিত হতো। অতএব বিবেচ্য, নিঃশেষে বিলুপ্ত গীতিপদ্ধতির
অন্তর্গত অনিবদ্ধ কথাটিকে, এইভাবে, দেশী পদ্ধতির পরিচয় প্রসঙ্গে ক্রমাগত
ব্যবহার করে যাওয়ার সার্থকতা ও তাৎপর্য কী এবং অত সব উদ্ধৃতির মধ্য
২৩০ সঙ্গীত পারিজাত
থেকে অনিবদ্ধ রীতির সঠিক স্বরূপ সম্বন্ধে আমরা আদৌ কিছু জানতে
পারলাম কি না।
প্রাচীন অনিবদ্ধ পদ্ধতির সঙ্গে পরবর্তী কালের রাগ-আলপ্তি ও রূপক-
আলপ্তির কোন সম্পর্ক আছে কি না এবং থাকলেও তার রূপান্তরের ধারাটা কী
পরিমাণ যুক্তিগ্রাহ্য, সে সম্বন্ধে এতক্ষণ আমরা যা বললাম,—আমরা জানি,
অনেকের নিকটেই তা “ধান ভানতে শিবের গীতের” মতোই গ্রাহ্য হবে; কিন্তু,
আজকের দিনেও যাঁরা রাগালাপকে অনিবদ্ধরূপে অভিহিত করে থাকেন,
তাঁদের কথা স্মরণ করে, রাগালাপ সম্বন্ধে দু-একটি কথা বলা বাঞ্ছনীয় মনে
করছি :
তানসেনের আমলের শুদ্ধবাণী ডাঙ্গুরবাণী প্রভৃতি গীতিপদ্ধতি সুপ্রাচীন শুদ্ধা
ভিন্না প্রভৃতি অনিবদ্ধ রীতির অনুকরণে পরিকল্পিত হয়েছিল—এ মন্তব্যের
বিরুদ্ধে তর্ক চলে না। কিন্তু কেউ যদি বলেন উক্ত শুদ্ধা ভিন্নার সঙ্গে শুদ্ধবাণী
ডাঙ্গুরবাণী প্রভৃতির একটা নিগূঢ় সাঙ্গীতিক সম্পর্ক আছে, তাহলে, ওই নিগূঢ়
তত্ত্বটি সম্বন্ধে স্বাভাবিক কারণেই প্রশ্ন জাগবে। অনুরূপ যুক্তি আলপ্তি ও
পূর্ববর্তী যুগের অনিবদ্ধ এবং আলাপের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। প্রবন্ধ গীতি-পদ্ধতির
অঙ্গ হিসাবে, মতঙ্গের বহু পরবর্তী কালের গ্রন্থকার পার্শ্বদেব আলপ্তির যে ছক
এঁকে গেছেন, তার বিভাগটা ছিল—
আলপ্তি
┌───────────────┴───────────────┐
বিষম প্রাঞ্জল
┌───────┴───────┐ ┌───────┴───────┐
স-অক্ষর অনক্ষর স-অক্ষর অনক্ষর
┌──┴──┐ ┌──┴──┐ ┌──┴──┐ ┌──┴──┐
স-তাল অ-তাল স-তাল অ-তাল স-তাল অ-তাল স-তাল অ-তাল
দেখা যাচ্ছে, ধাতু-ছন্দ-তালহীন ব্যবস্থা ও ধাতু-ছন্দ-তালবদ্ধ ব্যবস্থা
মিলিয়ে সাকুল্যে ১৬টি বিভাগে বিভক্ত ছিল আলপ্তির সামগ্রিক রূপ।
পার্শ্বদেবের প্রায় সমসাময়িককালেই রচিত সঙ্গীত রত্নাকরে (১২১০-
১২৪৭ খৃঃ অঃ) দেখা যাচ্ছে, এই আলপ্তি প্রধানতঃ চারটি স্বস্থানে বিভক্তিকৃত
হয়ে অধিকতর আলঙ্কারিক রূপ পরিগ্রহ করেছে।
সঙ্গীত পারিজাত ২৩১
এখানে লক্ষ্য করবার বিষয়, একই যুগের দুজন গ্রন্থকার দু’ রকমভাবে
আলপ্তির পরিচয় প্রদান করেছেন। পার্শ্বদেব সংক্ষিপ্ত—রত্নাকর ব্যাপক।
সুতরাং, এই আলপ্তির যথার্থ প্রচলন কোন্ সময় ছিল সে সম্বন্ধে একটা প্রশ্ন
থেকে যাচ্ছে।
রত্নাকরের পরে আড়াই শ’ বছর অন্ধকার। তারপর আমরা রাজা মান
তোমার (১৪৮৬-১৫১৬ খৃঃ অঃ) প্রবর্তিত ধ্রুপদ গীতি-পদ্ধতির সঙ্গে পরিচিত
হচ্ছি। অর্থাৎ, এই সময় প্রবন্ধ গীতি-পদ্ধতি লোপ পেয়ে গিয়েছিল এবং
আলপ্তি আবার নামান্তরিত হয়েছিল আলাপ-এ। এই আলাপের গতি-প্রকৃতি
ও প্রয়োগ-পরিবেশনার বৈশিষ্ট্য সম্বন্ধে তানসেন-বংশীয়দের খাতা-পত্রে যা লেখা
আছে, তা বিশ্লেষণ করে আমরা জানতে পারি--রবাবিয়া-বাজ ও বীণকারী-
বাজের মাধ্যমে এই আলাপের মূল রূপ ছিল দ্বিবিধ। মূল আবার বৈচিত্র্য-
প্রয়াসী হয়ে নাম গ্রহণ করেছিল রাগালাপ, রূপ-আলাপ, সোম-আলাপ বা
সমোচার-আলাপ, কয়েদ-আলাপ ও বন্ধান-আলাপ। এই সব আলাপের বিস্তার,
জোড়, তার-পরণ, ঝালা, লড়ি, লড়গূথা, দুয়া-মাঠী প্রভৃতি বিভিন্ন অংশ
যথাযথভাবে বিশ্লেষিত হয়ে চিহ্নিত হয়েছিল। বস্তুতঃ এই আমলের আলাপ-
পদ্ধতি রত্নাকর-বিবৃত আলপ্তির আলঙ্কারিক অংশসমূহের তুলনায় সংক্ষিপ্ত
হলেও, উপকরণগুলি যে সে আলপ্তি থেকেই সংগ্রহ করেছিল তাতে সন্দেহ
নেই। কিন্তু, আলপ্তি আলাপ-এ নামান্তরিত হলেও, এর সঙ্গে অনিবদ্ধর কী
সম্পর্ক থাকতে পাবে সে সম্বন্ধে ‘ঘরানা’ ঐতিহ্যও নীরব।
এই প্রসঙ্গে সঙ্গীত পারিজাত গ্রন্থখানির রচনাকাল সম্পর্কিত রহস্যও
অনুধাবনযোগ্য। পারিজাত রত্নাকরের পরবর্তী কালে রচিত হয়েছিল সন্দেহ
নেই; কিন্তু তার মধ্যে অনিবদ্ধ, নিবন্ধ, আলপ্তি প্রভৃতি তানসেন-পূর্ব-যুগের
বিষয়বস্তুই পরিবেশিত হয়েছে, আলাপ বা ধ্রুপদের মতো কোন কিছু স্থান
পায়নি। সুতরাং, অহোবল তানসেনের পূর্ববর্তী আমলের গ্রন্থকার ছিলেন
বলা চলে;—বিশেষতঃ পারিজাতের ঋষভ-যুক্ত ভৈরবীর অস্তিত্বটাকে কোন
অজুহাতেই তুচ্ছ করা যেতে পারে না। কিন্তু, যেহেতু তিনি আলোচ্য
অনিবদ্ধ পদ্ধতির মতো গুটিকতক সাঙ্গীতিক সংজ্ঞা সম্বন্ধে পূর্বসূরীদের মতোই
নকল-নবিশী করে গেছেন, অতএব তাঁর অস্তিত্বকালটা তানসেনের পরবর্তী
হিসাবেও গ্রাহ্য হতে পারে।
পরিশেষে বক্তব্য এই যে, সুপ্রাচীন অনিবদ্ধ রীতির রহস্য সন্ধানে রত হয়ে
২৩২ সঙ্গীত পারিজাত
আমরা সর্বশেষ তথ্য হিসাবে যা সংগ্রহ করতে পেরেছি, তা আমাদের ক্ষেত্রে
নৈরাশ্যজনক হলেও, অপর কোন গুণীজ্ঞানীর প্রচেষ্টাকে সাফল্যমণ্ডিত করলেও
করতে পারে।
ব্যাপারটা এই যে, দেশী সঙ্গীতের আমলে বীণা যন্ত্রটির যেমন কৌলীন্য
ছিল, পূর্ববর্তী গান্ধর্ব আমলে তেমনি কৌলীন্য অর্জন করেছিল বেণু।
সুপ্রাচীন বিশ্বাবসু তাঁর আমলের শ্রুতি-সংখ্যা নির্ণয় করেছিলেন এই বেণুর
সাহায্যেই। সে কালে কত রকমের কত ছিদ্রযুক্ত বেণু প্রচলিত ছিল বর্তমানে
তা আর জানবার উপায় নেই, কিন্তু, আজকের দিনেও, অসংখ্য অসভ্য
অশিক্ষিত সম্প্রদায়ের মধ্যে এমন সব অদ্ভুত ধরনের অবৈজ্ঞানিক ছিদ্রযুক্ত বাঁশী
প্রচলিত রয়েছে যার স্বর-বৈচিত্র্য আমাদেরকে বিভ্রান্ত করে;—বিশেষ চেষ্টা
করেও তার গ্রাম, ঠাট, সপ্তক ও অ তাল অনক্ষর ধ্বনির রূপ-রহস্য বুঝতে
পারা যায় না। যেমন—
অনার্য মনসাদেবীর কয়েকজন বনেদী সেবকের সাহচর্য করে আমরা জানতে
পেরেছি—যে বিশেষ ধরনের সঙ্গীতের প্রভাবে প্রভাবান্বিত হয়ে অহিকুল তাদের
নিশ্চিন্ত বিশ্রাম বা দুর্ভেদ্য আশ্রয় ছেড়ে বেরিয়ে আসতে বাধ্য হয়, সে সঙ্গীত
তারা গুরু-পরম্পরাক্রমে শিক্ষা করেছে। এই সঙ্গীত মন্ত্রপাঠ ও বংশীধ্বনির
মাধ্যমেই উদ্গত হয়, কিন্তু, কী তার স্বর-ব্যবস্থা, গ্রাম-মূর্ছনা বা ছন্দ-
তালহীন গতির পরিমাপ সে সম্বন্ধে প্রয়োগকারীরা কিছুই জানে না কিংবা
জানলেও বলে না যেহেতু কুলগত বিধি-নিষেধ লঙ্ঘন করার মহাপাপকে তারা
গুরুহত্যা ও মাতৃহত্যার সমান বলে মনে করে। এই চির-দরিদ্র সম্প্রদায়কে
অর্থের প্রলোভন দেখিয়ে মারণ-উচাটন প্রভৃতি জীবন-মরণের খেলাতেও নিযুক্ত
করা সম্ভবপর হয়, কিন্তু, সম্প্রদায়-বহির্ভূত কোন মানুষের কৌতূহল চরিতার্থ
করানো কিছুতেই সম্ভবপর হয় না।—আমাদের কে বলে দেবেন এই সঙ্গীতের
সংজ্ঞা কী! ৪৯৯
নিবদ্ধং গীত-রূপং যৎ তস্য লক্ষণমুচ্যতে।
সুস্বরৈর্গীয়মানত্বাৎ গীতমিত্যাভিধীয়তে॥ ৫০০
নিবদ্ধ সঙ্গীতের লক্ষণাদি বলা যাচ্ছে। সুবিন্যস্ত স্বরের সাহায্যে যা গীত
হয় তাকেই বলে নিবদ্ধ গীত। ৫০০
সঙ্গীত পারিজাত ২৩৩
সাম-বেদাদিদং শাস্ত্রং সংজহার পিতামহঃ।
নারদেন তু তৎপ্রাপ্য বীণয়া বাদনং কৃতম্ ॥ ৫০১
গণতালস্বরৈঃ কৃত্বা মাত্রাভিশ্চ সুশোভিতম।
তচ্চ গীতং পৃথিব্যাঞ্চ নারদেন প্রতিষ্ঠিতম্ ॥ ৫০২
তেন গীতেন হৃষ্যন্তে দেবাশ্চ মুনয়ো নরাঃ
তস্য গীতস্য মাহাত্ম্যং বক্তুং কো বা ক্ষমো ভবেৎ ॥ ৫০৩
এই সঙ্গীত-শাস্ত্র লোকপিতামহ ব্রহ্মা সামবেদ থেকে সংকলন করেন।
তদনন্তর, নারদগণ এই সঙ্গীত-শাস্ত্র ব্রহ্মার নিকট থেকে শিক্ষা করে পৃথিবীতে
প্রচলিত করেন বীণাযন্ত্রের সাহায্যে। নারদগণ কর্তৃক তাল, স্বর ও মাত্রাদির
দ্বারা সুশোভিত এই সঙ্গীত শ্রবণ করে, দেবতা, মুনি ও সাধারণ মানুষ—সকলেই
ইষ্টলাভ করে থাকেন। সুতরাং, কার সাধ্য এ হেন সঙ্গীতের মাহাত্ম্য বর্ণনা
করে। ৫০১-৫০৩
টিপ্পনী : পূর্ব্ব কোনো টিপ্পনীতে আমরা নাট্য-গান্ধর্ব্ব পুর্ব্ববর্তী গান্ধর্ব
উৎপত্তি প্রসঙ্গে যা বলেছি তার সঙ্গে অহোবলের আলোচ্য মাহাত্ম্য বর্ণনার কিছু
সামঞ্জস্য আছে। মনে হয়, এই আখ্যানটি গৃহীত হয়েছে পুরাণ থেকে—
প্রাতিশাখ্য থেকে নয়। পুরাণে এই ধরনের গল্প আরও আছে। যেমন, নারদ
একবার বিকলাঙ্গ রাগ-রাগিণী পুনর্গঠনে সচেষ্ট হয়েছিলেন। কিন্তু, প্রচেষ্টাটা
গান্ধর্ব অথবা দেশী কোন পদ্ধতির সঙ্গীতের জন্য হয়েছিল; রাগ অর্থে তখন
জাতি বোঝাত কি না, কিংবা "সঙ্গীত" নামক কথাটার উৎপত্তি আদৌ
হয়েছিল কি না, সে সম্পর্কে পুরাণ থেকে কিছুই জানবার উপায় নেই, কারণ,
পুরাণ সঙ্গীত-গ্রন্থ নয়। নারদ যে একটা উপাধিমাত্র এবং নারদ-মুনি, নারদ-
ঋষি, দেবর্ষি নারদ, শিক্ষাকার নারদ, সংহিতাকার নারদ এবং আরও পরবর্তী
কালের জনকয়েক নারদ যে অভিন্ন নন ভিন্ন সে সংবাদ পরিবেশন করবার
দায়িত্ব পুরাণকারগণ গ্রহণ করেন নি। ফলে, সঙ্গীত কথাটার মতো নারদ
ভরতরাও সব একাকার হয়ে গিয়েছেন। ৫০১-৫০৩
গীতেঽস্মিন্ পঞ্চনামানি প্রসিদ্ধান্যুদিতানি হি।
রূপঞ্চ রূপকং বস্তু প্রবন্ধো গেয়মিত্যপি ॥ ৫০৪
এই নিবন্ধ গীত পাঁচটি প্রসিদ্ধ নামে অভিহিত হয়ে থাকে। যথা, ১। রূপ,
২। রূপক, ৩। বস্তু, ৪। প্রবন্ধ ও ৫। গেয়।
১৬
২০৪ সঙ্গীত পারিজাত
টিপ্পনী : পারিজাতকার নিবন্ধ সঙ্গীতের সংখ্যা নির্দেশ করেছেন, পাঁচ।
কিন্তু, রত্নাকর বলছেন, নিবন্ধ গীতের সংখ্যা হচ্ছে তিন। যথা, রূপক, বস্তু ও
প্রবন্ধ। তাহলে, রূপ এবং গেয় নামক অতিরিক্ত দুটি নিবন্ধ-গীতিকে অহোবল
পেলেন কোথায়? তাঁর সময় কি রূপ এবং গেয় নামক আরও দুটি নিবন্ধ-
গীতি-পদ্ধতি অতিরিক্ত হিসাবে প্রচলিত হয়েছিল?
দামোদর বিরচিত সঙ্গীত-দর্পণ (১৬১০ খৃঃ অঃ) একখানি প্রামাণ্য গ্রন্থ।
দামোদরও তাঁর প্রবন্ধাধ্যায়ের চতুর্থ সংখ্যক সূত্রে বলেছেন :
গীতঞ্চরূপকংবস্তু প্রবন্ধোঙ্গেয়মিত্যপি।
গীতং পঞ্চবিধাপ্রোক্তা গ্রন্থেস্মিন্পূর্বসূরিভিঃ॥
এখানেও নিবন্ধ গীতির সংখ্যা পাঁচ এবং “গীত” কথাটাকেই দুবার ব্যবহার
করেছেন দামোদর দু’ রকম অর্থে। ফলে, অহোবলের তুলনায় এঁর বক্তব্য-
বিষয়ট। আরও দুর্বোধ্য হয়ে উঠেছে।
দামোদরের অস্তিত্বকালটা অহোবলের মতো রহস্যারুত নয়। অর্থাৎ
দামোদরের সম-সাময়িককালে এ দেশে কোন কোন পদ্ধতির সঙ্গীত প্রচলিত
ছিল তার প্রমাণ পাওয়া কঠিন নয়। এই আমলে প্রবন্ধ-গীতি-পদ্ধতি বিলুপ্ত
হয়ে গিয়েছিল এবং প্রচলিত ছিল ধ্রুপদ্ পদ্ধতি, দরবারী সঙ্গীত রূপে।
অপরপক্ষে, আমীর খসরো প্রবর্তিত নক্শগুল তথা কাওয়াল পদ্ধতি ও
পরবর্তী কালে যা খেয়াল পদ্ধতিরূপে প্রতিষ্ঠালাভ করেছিল, সেই পদ্ধতির আদিম
রূপটিও সঙ্গীত-রসিক সমাজে প্রচলিত ছিল অ-দরবারী পদ্ধতিরূপে। এখন
আলোচ্য ক্ষেত্রে আমাদের বিবেচ্য—সঙ্গীত দর্পণ প্রণেতা এই দরবারী ও
অ-দরবারী পদ্ধতি দুটিকে দুটি নূতন গীতি-পদ্ধতির মর্যাদা দিয়ে গ্রন্থভুক্ত
করেছিলেন কি না। কিংবা—
দামোদর তার আলোচ্য সূত্রের প্রারম্ভিক “গীত” কথাটিকে গান্ধর্ব অর্থেই
স্থাপন করেছিলেন এবং পরবর্তী “গীত” কথাটিকে “গান্ধর্ব এবং গান”-এর
“গান”—অর্থাৎ দেশী পদ্ধতির গীত অর্থেই সংকলন করেছিলেন কি না সেটাও
বিচার্য। বিচার্য, নিবন্ধ পদ্ধতির প্রবন্ধ সঙ্গীতের পরিচয় দিতে গিয়ে, কোন
প্রাচীন গ্রন্থকারের পক্ষে, দেশী পদ্ধতির সঙ্গীতকে পৃথক সংজ্ঞায় ভূষিত করবার
মতো বুদ্ধি-বিবেচনা থাকা সম্ভবপর কি না।
অহোবলের উদ্ধৃত অতিরিক্ত সংজ্ঞা দুটি দামোদরের তুলনায় কথঞ্চিৎ
সরল। অর্থাৎ একই সঙ্গে দু’ রকম “গীতির” উল্লেখ না করে ইনি রূপ ও গেয়
কথা দুটি ব্যবহার করেছেন। কিন্তু, আসলে কী বোঝাতে চেয়েছেন সেটা
দুর্বোধ্য। দেখা যায়, তানসেনের পরবর্তী যুগে অনেকে রূপক আলাপকে
“রূপ-আলাপ” নামেও অভিহিত করেছেন। কিন্তু, অহোবলের “রূপ” যে ওই
ধরনের কোন অপভ্রংশ সংজ্ঞার উদ্ধৃতি এমন অনুমান করবার উপায় নেই।
কারণ, পারিজাতের মধ্যে রূপ ও রূপক নামক দুটি সংজ্ঞাই স্বনামে অস্তিত্ব
রক্ষা করছে। “গেয়” সম্বন্ধেও অনুরূপ সমস্যার উদ্ভব হয়। এই “গেয়”
সংজ্ঞাটাকে প্রাচীন গান্ধর্বের গেয়-রূপেও গ্রহণ করা যেতে পারে অথবা কোন
অর্বাচীন গীতি-পদ্ধতির গেয়-রূপেও কল্পনা করা যেতে পারে। এই প্রসঙ্গে
উল্লেখযোগ্য যে সঙ্গীত পারিজাত উত্তর-ভারতীয় সঙ্গীত গ্রন্থ হলেও,
কর্ণাটক তথা দক্ষিণ-ভারতীয় সঙ্গীত বিজ্ঞানের ওপর অহোবলের অধিকার
যে অল্প ছিল না তার অসংখ্য প্রমাণ পারিজাতের মধ্যেই আছে। সুতরাং,
“রূপ” ও “গেয়” অর্থে তিনি কোন স্বল্পকাল প্রচলিত কর্ণাটিক প্রবন্ধদ্বয়ের
উদাহরণ স্থাপন করে গেছেন—এমনও হতে পারে। হতে পারে, এই কর্ণাটিক্
পদ্ধতি দুটি হিন্দুস্তানেও প্রচলিত হয়েছিল কিছুকালের জন্যে; পরে বিলুপ্ত
হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু আসলে যে কী হয়েছিল, তা আমাদের পক্ষে জানা
সম্ভবপর হচ্ছে না। ৫০৪
পঞ্চধা কথিতো ভাগো গীতেঽস্মিন্ পূর্বসূরিভিঃ।
আদ্য উদ্গ্রাহকো জ্ঞেয়ো মেলাপকস্তদুত্তরঃ॥ ৫০৫
তৃতীয়ো ধ্রুবসংজ্ঞঃ স্যাদন্তরঃ স্যাচ্চতুর্থকঃ।
আভোগঃ পঞ্চমোভাগঃ পঞ্চানাং লক্ষণং ব্রুবে॥ ৫০৬
প্রাচীন সঙ্গীতাচার্যদের মতানুযায়ী, এই গীতি-পদ্ধতি পাঁচটি ভাগে বিভক্ত।
এর প্রথম ভাগের নাম, উদ্গ্রাহ। দ্বিতীয় ভাগের নাম মেলাপক। তৃতীয়
ভাগের নাম ধ্রুব। চতুর্থ ভাগের নাম অন্তর। এবং পঞ্চম ভাগের নাম
আভোগ। অতঃপর এই বিভাগ পাঁচটির লক্ষণাদি বলা যাচ্ছে। ৫০৫-৫০৬
আদাবুদ্গৃহ্যতে গীতং তস্মাদুদ্গ্রাহ সংজ্ঞকঃ।
মেলাপকঃ স বিজ্ঞেয়ো ধ্রুবকোদ্গ্রাহ মেলনাৎ॥ ৫০৭
ধ্রুবত্বাদ্ ধ্রুব-সংজ্ঞোঽয়ং ধ্রুবা ভোগান্তরোঽন্তরঃ।
আভোগো গীত পূর্ণার্থমিতি ভাগাঃ প্রকীর্তিতাঃ॥ ৫০৮
২৬৬ সঙ্গীত পারিজাত
১। যে ভাগটিকে অবলম্বন করে গান আরম্ভ করা হয়, সেই প্রথম ভাগটির
নাম উদগ্রাহ।
২। যে ভাগটি মধ্যবর্তী হয়ে প্রথম ভাগটির সঙ্গে তৃতীয় ভাগটিকে মিলিয়ে
দেয়, সেই দ্বিতীয় ভাগটির নাম মেলাপক।
৩। যে ভাগটি প্রত্যেক গীতের মধ্যেই অপরিহার্যরূপে বিরাজ করে, সেই
তৃতীয় ভাগটির নাম ধ্রুব।
৪। ধ্রুবের পরবর্তী চতুর্থ ভাগটির নাম অন্তর।
৫। গীতের সমাপ্তির ক্ষেত্রে যে ভাগটি প্রযোজিত হয় সেই পঞ্চম বা
শেষ ভাগটির নাম আভোগ। —৫০৭-৫০৮।
টিপ্পনী : আলোচ্য সূত্রদুটির মধ্যে পারিজাতকার গীত কথাটিকে ব্যবহার
করেছেন। গীত অর্থে এখানে প্রবন্ধ গীত বোঝাচ্ছে।
প্রবন্ধ গীতির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য পাঁচটি বিভাগ—সাঙ্গীতিক ভাষায় যার নাম
ধাতু—সেই পাঁচটি ধাতুর সংক্ষিপ্ত পরিচয়মাত্র আলোচ্য সূত্রদুটির মধ্যে
পরিবেশিত হয়েছে। কিন্তু, এই পঞ্চধাতুর পরিচয়কে পঞ্চ ধাতুর যথারূপ স্থাপনা
হিসাবে গ্রহণ করলে অত্যন্ত ভুল করা হবে। বর্তমানে, ধ্রুপদ পদ্ধতির গানের
মধ্যে সাধারণতঃ আমরা যে চারটি ধাতুর পরিচয় পাই, সেই ধাতু চারটি
যথাক্রমে, স্থায়ী, অন্তরা, সঞ্চারী ও আভোগরূপে ধ্রুপদ গানের মধ্যে পরের পর
অস্তিত্ব বজায় রাখে। কিন্তু, প্রবন্ধ গীতির ক্ষেত্রে, উদগ্রাহ, মেলাপক, ধ্রুব,
অন্তর ও আভোগ নামক পাঁচটি ধাতু—ধ্রুপদ গানের মতো—পরের পর যে
স্থাপিত হতোই, এমন কথা মনে করলে অত্যন্ত ভুল করা হবে। এখানে
বিশেষভাবেই স্মরণ রাখতে হবে, বর্তমানের ধ্রুপদ গানের মতো সেকালের
প্রবন্ধ গানের মধ্যেও চারটির বেশী ধাতু থাকতো না।
কিন্তু তাই যদি হবে, তাহলে প্রবন্ধ গীতের পরিচয় প্রসঙ্গে গ্রন্থকার চারটির
পরিবর্তে পাঁচটি ধাতুর নামোল্লেখ করলেন কেন?
এ প্রশ্নের উত্তর পারিজাতে নেই। কিন্তু, রত্নাকরে আছে। রত্নাকরের
প্রবন্ধাধ্যায়ের ৯১০ সূত্রে গ্রন্থকার বলেছেন—"ধ্রুবাভোগান্তরেজাতো
ধাতুস্তোন্তস্ত্বভাবিধঃ স তু সালগসূড়স্থ রূপকেম্বেবদৃশ্যতে।” অর্থাৎ, কেবলমাত্র
সালগ-সূড জাতীয় প্রবন্ধগুলির রূপান্তরিত গীতি-পদ্ধতির মধ্যে, ধ্রুব ও
আভোগের মধ্যবর্তী হিসাবে 'অন্তর' ধাতুটিকে পাওয়া যায়।—
এখানে লক্ষ্য করবার বিষয় প্রাচীন সঙ্গীত গ্রন্থাদির মধ্যে যে অসংখ্য
সঙ্গীত পারিজাত ২৩৭
রকমের প্রবন্ধ গীতির পরিচয় লিপিবদ্ধ আছে, তার মধ্যে কেবলমাত্র সালগ-সূড
জাতীয় প্রবন্ধ গীতির একটি রূপান্তরিত প্রকার ব্যতীত অন্য কোন রকম প্রবন্ধ
গীতির মধ্যে 'অন্তর' নামক ধাতুটির ব্যবহার হতো না। কিন্তু, আলোচ্য
বক্তব্যের তাৎপর্য্য এ-ও নয় যে, সালগ্-সূড জাতীয় এই রূপান্তরিত প্রবন্ধ
গীতিগুলি পাঁচটি ধাতুর মাধ্যমে গীত হতো। এখানে আমাদের স্মরণ রাখতে
হবে, যে কোন জাতের প্রবন্ধ গীতিই হোক না কেন, কোন প্রবন্ধই কখনও
পাঁচটি ধাতুযুক্ত হয়ে গীত হতো না। বর্তমানে প্রচলিত ধ্রুপদ, ধামার, সাদ্রা,
খেয়াল প্রভৃতি গানের ধাতুর মতো, সেকালের প্রবন্ধ গীতিগুলিও, জাতি ও
প্রকারভেদে,—দ্বিধাতুযুক্ত, ত্রিধাতুযুক্ত ও চার ধাতুযুক্ত হতো, কিন্তু, কোন
অজুহাতেই পাঁচ ধাতুযুক্ত হতে পারতো না। সুতরাং বলাই বাহুল্য, আলোচ্য
সালগ্-সূড জাতীয় রূপান্তরিত প্রবন্ধগুলির ক্ষেত্রেও চারটির অধিক পাঁচটি
ধাতুযুক্ত করবার উপায় ছিল না। কিন্তু তাই যদি হয়, তাহলে অহোবল,
শার্ঙ্গদেব প্রমুখ গ্রন্থকারেরা 'অন্তর' ধাতুটির উল্লেখ করলেন কেন? কেনই বা
বিষয়বস্তুর পরিবেশনটা এমনভাবে করলেন, যার ফলে, সাধারণ বুদ্ধিতে, পাঁচটি
ধাতুযুক্ত প্রবন্ধ গীতির অস্তিত্বটাই মনকে আচ্ছন্ন করে?
এ প্রশ্নের উত্তর দিয়ে গেছেন, রত্নাকরের অন্যতম টীকাকার কল্লিনাথ। তিনি
বলছেন, “অয়মন্তরো লৌকিকরূপান্তর ইত্যাচ্যতে।” অর্থাৎ, আলোচ্য সালগ-
সূড জাতির রূপান্তরিত প্রবন্ধ গীতিগুলির মধ্যে যে “অন্তর” ধাতুটিকে পাওয়া
যায়, সে “অন্তর” ধাতু হিসাবে নিরঙ্কুশ নয়, ধ্রুব ধাতুরই লৌকিক রূপান্তর
মাত্র। এবং, এই “অন্তর” কে 'ধ্রুবখণ্ড' হিসাবেই গ্রাহ্য করা কর্তব্য। অর্থাৎ—
আলোচ্য প্রবন্ধ গীতিগুলির ক্ষেত্রে “অন্তর” নামক ধাতুটি, অন্যান্য ধাতুর
মতো, ধাতু হিসাবে গণ্য নয়। পরন্তু, সব সালগ-সূড জাতীয় প্রবন্ধর মধ্যেই
যে “অন্তর”কে পাওয়া যাবে তা-ও নয়। অর্থাৎ, কোন কোন সালগ-সূড
জাতীয় প্রবন্ধর রূপান্তরিত গীতি-পদ্ধতির ক্ষেত্রে “অন্তর”কে পাওয়া যায়। এবং,
যে ক্ষেত্রে পাওয়া যায়, সে ক্ষেত্রে গানের মধ্যে থেকে ধাতু হিসাবে “ধ্রুব ধাতুর”
উল্লেখটা পরিত্যক্ত হয়, কারণ, “অন্তর” এখানে “ধ্রুবখণ্ড” হিসাবেই গ্রাহ্য হচ্ছে।
অপরপক্ষে, ধ্রুব ধাতুর উল্লেখ বজায় রেখে যদি আবার “অন্তর”কে ধাতু হিসাবে
উল্লেখ করতে হয়, তাহলে, আলোচ্য প্রবন্ধ গীতির ধাতু সংখ্যাটা হয়ে যায়
চারের পরিবর্তে পাঁচ। পাঁচ ধাতুযুক্ত গীতির অস্তিত্ব, সাঙ্গীতিক ব্যাভিচারেরই
নামান্তর মাত্র।
এখানে ‘ধ্রুবখণ্ডর’ তাৎপর্যটাও প্রণিধানযোগ্য। ধ্রুবখণ্ড অর্থে এখানে
ধ্রুবধাতুর খণ্ড বা অংশ বিশেষকেই বোঝাচ্ছে। ব্যাপারটা হচ্ছে এই যে, প্রাচীন
প্রবন্ধ গীতির অন্তর্গত উদগ্রাহ, ধ্রুব ও আভোগ নামক ধাতু তিনটি, সাধারণতঃ,
দুটি ভাগে বিভক্ত থাকতো। আলোচ্য ক্ষেত্রে, ধ্রুব ধাতুর প্রথম অংশটিকে
ধ্রুব-ধাতুর অনুরূপ রেখে, দ্বিতীয় অংশটিকে রূপান্তরিত করা হতো কিঞ্চিৎ
“উচ্চস্বর” যুক্ত করে। ধ্রুব ধাতুর এই রূপান্তর সম্বন্ধে রত্নাকরের অন্যতম
টীকাকার সিংহ ভূপাল বলে গেছেন, “কিঞ্চিদ্দুচ্চং খণ্ডং অন্তরাখ্যং কর্তব্যম্”।
প্রসঙ্গ ক্রমে এখানে উল্লেখযোগ্য যে, মূল রত্নাকরের “রূপকেষু” কথাটির
ওপর নির্ভর করে, ‘অন্তরার’ অস্তিত্বটাকে সালগ-সূড় জাতীয় রূপক প্রবন্ধর
ক্ষেত্রেও গ্রাহ্য করা যেতে পারে। কারণ, রূপক প্রবন্ধও রূপান্তরিত গীতি
পদ্ধতিরই প্রমাণ বহন করে। কিন্তু, আমাদের মনে হয়, আলোচ্য সূত্রের
ব্যাখ্যায় কল্লিনাথ যে “লৌকিক রূপান্তর” কথাটি ব্যবহার করেছেন সেটি
সমধিক গুরুত্বপূর্ণ। মনে হয়, রত্নাকরের “রূপকেষু” আলোচ্য ক্ষেত্রে রূপক
প্রবন্ধ অর্থে ব্যবহৃত হয় নি, সালগ-সূড় প্রবন্ধর একটি বিশিষ্ট রূপ তথা
রূপান্তরিত গীতি-পদ্ধতি অর্থেই উল্লিখিত হয়েছে।
পূর্বেই বলেছি, যে কোন জাতের প্রবন্ধ গানই হোক না কেন, কোন গানের
মধ্যেই চারটির বেশী ধাতু ব্যবহারের স্বাধীনতা ছিল না। অপরপক্ষে, অনেক
প্রবন্ধ গান আবার দ্বি-ধাতু ও ত্রি-ধাতুযুক্তও ছিল। এই দ্বিধাতু ও ত্রিধাতুযুক্ত
প্রবন্ধগুলির ধাতু স্থাপনার বিধি-নিদেশ সম্বন্ধে যথাযথ আলোচনার অবকাশ
আপাততঃ আমাদের নেই, কারণ, ব্যাপারটা ছিল যেমন বৈচিত্র্যপূর্ণ তেমনি
ব্যাপক। সেই জন্য, এখানে অতি-সংক্ষেপে কেবল এইটুকুই বলা যেতে পারে
যে, যে কোন প্রবন্ধ গানই হোক না কেন, তার মধ্যে ধ্রুব ধাতুর প্রতিপাদ্য
ছিল অপরিহার্য। বর্তমানে, স্থায়ী ধাতুর অস্তিত্ব ব্যতীত যেমন কোন রকম
গান-বাজনার অস্তিত্ব কল্পনাও করা যায় না, তেমনি দ্বিধাতু, ত্রিধাতু বা
চার ধাতুযুক্ত যে কোন প্রবন্ধ গীতির ক্ষেত্রেও ধ্রুব ছিল অপরিহার্য। কিন্তু,
ধ্রুব ধাতুর প্রতিপাদ্য বিষয়টা যে সব প্রবন্ধর মধ্যে “ধ্রুব” ধাতু নামযুক্ত হয়েই
অস্তিত্ব বজায় রাখতো তা নয়—ক্ষেত্র বিশেষে উদগ্রাহর মধ্যেও অন্তর্নিহিত
থাকতে পারতো। এই অন্তর্নিহিত থাকার ব্যবস্থাটা বিশেষভাবে প্রচলন ছিল
দ্বিধাতু ও ত্রিধাতুযুক্ত প্রবন্ধ গানগুলির ক্ষেত্রে। অধিকন্তু, দ্বিধাতু ও ত্রিধাতুযুক্ত
অনেক প্রবন্ধ গানের মধ্যে আবার “আভোগ আচরণে”রও অবকাশ থাকতো।
[Page-Header: সঙ্গীত পারিজাত ২৩৯]
অর্থাৎ—নির্দিষ্ট ব্যবস্থা নয়, অবকাশ থাকতো মাত্র। ফলে, আভোগ ধাতুর
প্রতিপাদ্যকে গ্রহণ করেও অনেক দ্বিধাতু ও ত্রিধাতুযুক্ত গান ত্রিধাতু ও
চার ধাতুর গান হিসাবে গ্রাহ্য হতো না—দ্বিধাতু ও ত্রিধাতুযুক্ত গান হিসাবেই
পরিচিত থাকতো। কিন্তু, সব গানের মধ্যেই ধ্রুব ধাতুর অস্তিত্ব তথা প্রতিপাদ্য
ছিল বর্তমানের স্থায়ী ধাতুর মতো অপরিহার্য। অথচ—
ধাতু স্থাপনার দিক দিয়ে দেখতে গেলে, ধ্রুবকে প্রবন্ধ গানের মধ্যে প্রথম
ধাতু হিসাবে পাওয়া যায় না, তৃতীয় ধাতুরূপে পাওয়া যায়। এখানে প্রশ্ন
উঠতে পারে সেকালের ধ্রুব ও একালের স্থায়ী যদি ধাতু হিসাবে অভিন্নধর্মী হয়
তাহলে, ধ্রুবর পূর্ববর্তী উদগ্রাহ ও মেলাপক ধাতুদুটিকে কোন্ উদ্দেশ্য সাধনের
জন্য ব্যবহার করা হতো?
মেলাপক কথাটির অর্থ খুব অস্পষ্ট নয়। এই ধাতুটি পূর্ববর্তী উদগ্রাহকে
পরবর্তী ধ্রুবর সঙ্গে মিলিয়ে দেবার জন্য সেতুবন্ধর কাজ করতো। কিন্তু,
উদগ্রাহর ব্যাপারটা কী হতে পারে?
বর্তমানে, গান ধরবার পূর্বে, অর্থাৎ গানের স্থায়ির প্রকাশের পূর্বে, আলাপ
করবার একটা রীতি প্রচলিত আছে। কিন্তু, উদগ্রাহকে আলাপাংশ হিসাবেও
গণ্য করা চলে না যেহেতু, প্রবন্ধ গীতির আমলেও অনেক রকমের আলাপ
ব্যাপ্তি প্রচলিত ছিল। তাহলে, উদগ্রাহর প্রতিপাদ্য ছিল কী?
প্রাচীন উদগ্রাহ ধাতুর প্রতিপাদ্য যা ছিল তা বর্তমানের স্থায়ী ধাতুটির প্রায়
বিপরীত ধর্মী। উদগ্রাহর প্রকাশ-পরিবেশনটা ছিল কখনও নিরঙ্কুশ স্বরযুক্ত,
কখনও অর্থবোধক বাণীযুক্ত, কখনও, একাধারে দ্রুত-মধ্য-বিলম্বিত গতির
ছন্দ-বৈচিত্র্যযুক্ত, কখনও বা স-চমক স-গমক দ্রুত পরিবর্তনশীল সাঙ্গীতিক
ক্রিয়াযুক্ত। অর্থাৎ, উদগ্রাহের প্রতিপাদ্যটা ছিল, কতকটা, প্রতিমার প্রাণ-
প্রতিষ্ঠার পূর্বে যথোচিত নিষ্ঠার সঙ্গে আনুষঙ্গিক ব্যবস্থাদি অবলম্বনের তৎপরতার
মতো। আজকের দিনে, ধ্রুবপদাঙ্গ, খেয়াল-অঙ্গ গীতি পদ্ধতির মধ্যে প্রাচীন
উদগ্রাহ ধাতুর প্রতিপাদ্যের মতো কোন কিছুরই প্রমাণ মেলে না। কিন্তু, আজও
তবলা পাখোয়াজের লহরা বাজানোর সময়, তার 'মুখ-চাল' প্রভৃতি প্রারম্ভিক
ক্রিয়াকাণ্ডের মধ্যে প্রাচীন উদগ্রাহের প্রতিপাদ্য কথঞ্চিৎ পরিমাণে প্রকট হয়ে
ওঠে। উচ্চাঙ্গ নৃত্যকলার 'উঠান সালামী' নামক অপরিহার্য ক্রিয়াকাণ্ডটিও
প্রাচীন উদগ্রাহর প্রতিপাদ্য রীতি ব্যতীত আর কিছুই নয়। অপরপক্ষে,
যাঁরা বাংলাদেশের উচ্চাঙ্গ কীর্তন গানের সঙ্গে পরিচিত, তাঁরা অবশ্যই
| ২৪০ | সঙ্গীত পারিজাত |
|---|
“আপস্তন” নামক প্রারম্ভিক সাঙ্গীতিক ক্রিয়াকাণ্ডটির সঙ্গে সুপরিচিত।
“আপস্তন” ও উদ্গ্রাহ অভিন্নধর্মী। অধিকন্তু, ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রদেশে
আজও এমন অনেক লোক-সঙ্গীত ও লোক-নৃত্য প্রচলিত আছে, যার প্রারম্ভিক
ক্রিয়াদির মধ্যে প্রাচীন উদ্গ্রাহ ধাতুর প্রতিপাদ্যকে খুঁজে পাওয়া যায়।
বলা বাহুল্য, প্রবন্ধ গীতি পদ্ধতি লুপ্ত হয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার উদ্গ্রাহ
ধাতুটিও ধাত হিসাবে লুপ্ত হয়ে গেছে। কিন্তু, অন্যান্য ধাতুগুলি আজও বেঁচে
আছে ধ্রুপদাঙ্গ ও খেয়াল-অঙ্গ গান বাজনার মধ্যে। যেমন—
প্রাচীন উদ্গ্রাহের স্থান গ্রহণ করেছে স্থায়ী। এই স্থায়ী ধাতুটি, প্রাচীন
ধ্রুব ধাতুর মতো, বর্ত্তমানে প্রচলিত সব রকম গান-বাজনার মধ্যেই প্রথম ধাতু
হিসাবে বর্ত্তমান থাকে। এখানে স্মরণ রাখা দরকার, এই স্থায়ীর সঙ্গে স্থায়ী
বর্ণের কোন সম্পর্ক নেই। রত্নাকর বর্ণিত “রাগস্থায়াবয়বং স্থায়”—অর্থাৎ “স্থায়”-
এর মধ্যেই রাগের স্বরূপ বর্ত্তমান থাকে— এই সত্যটিকেই গ্রহণ করেছিলেন
ধ্রুপদ গীতি পদ্ধতির স্রষ্টাগণ। উদ্গ্রাহ বর্ত্তমানে বিলুপ্ত তথা অস্বীকৃত।
প্রাচীন মেলাপক ধাতুটি পরবর্তী কালে নামান্তরিত হয়েছে “সানঝা-মানঝা”
বা “মানঝা” নামে। প্রাচীন মেলাপকের মতো পরবর্তী কালের মানঝাও দ্বিতীয়
ধাতুরূপে চিহ্নিত। কিন্তু, এই মানঝার ব্যবহার, বর্তমানে, কোন রকম কণ্ঠ
সঙ্গীতের মধ্যেই প্রযোজ্য হয় না, কেবলমাত্র সেতার, শরদ প্রভৃতি যন্ত্রের
মাধ্যমে পরিবেশিত খেয়াল-অঙ্গ গৎ-এর মধ্যেই মানঝাকে ধাতু হিসাবে ব্যবহৃত
হতে দেখা যায়। কিন্তু সব গৎ-এর মধ্যেই যে মানঝার অস্তিত্ব থাকে তা-ও
নয়—কোন কোন গৎ-এর মধ্যে থাকে। অর্থাৎ, প্রাচীন প্রথম ধাতু উদ্গ্রাহের
মতো পরবর্তী কালের প্রথম ধাতু স্থায়ীও মূলতঃ দুটি অংশে বিভক্ত। কণ্ঠ
সঙ্গীতের ক্ষেত্রে মানঝাকে বিলুপ্ত করা হয়েছে স্থায়ীর দ্বিতীয় অংশের মধ্যে।
কিন্তু, যন্ত্র সঙ্গীতের মাধ্যমে খেয়ালাঙ্গ বাজনা পরিবেশন কবার ক্ষেত্রে—কোন
কোন গৎ এর স্থায়ী ধাতুর দ্বিতীয় অংশটিকে মানঝা নামে চিহ্নিত করা হয়ে
থাকে। বলা বাহুল্য, প্রাচীন মেলাপক ধাতুটি নামান্তরিত হয়েও আজও
‘ধাতুনাম’ হিসাবে অস্তিত্ব বজায় রেখেছে খেয়ালাঙ্গ পদ্ধতির যন্ত্র-সঙ্গীতের মধ্যে।
প্রাচীন ধ্রুব ধাতুটিও, প্রাচীন উদ্গ্রাহ ধাতুর মতো বর্তমানে বিলুপ্ত।
কিন্তু, ধাতুনাম হিসাবে ধ্রুবর অস্তিত্ব বিলুপ্ত হলেও তার প্রতিপাদ্য বিষয়সমূহ
অস্বীকৃত নয়। বর্তমানের স্থায়ী ধাতুটির প্রতিপাদ্য প্রাচীন ধ্রুবেরই অনুরূপ।
পার্থক্য কেবল এই যে, প্রাচীন ধ্রুব ছিল প্রবন্ধ গীতি-পদ্ধতির তৃতীয় ধাতু
সঙ্গীত পারিজাত
২৪১
বর্তমানের স্থায়ী হচ্ছে ধ্রুপদ গীতি পদ্ধতির প্রথম ধাতু। এখানে, স্বাভাবিক
ভাবেই একটা প্রশ্ন উঠতে পারে—ধ্রুপদাঙ্গ পদ্ধতির মধ্যে, ধাতু নাম হিসাবে
ধ্রুবর নামটি পরিত্যক্ত হলো কেন।
ইতিপূর্বে, অন্তর তথা ধ্রুবখণ্ডর আলোচনা প্রসঙ্গে এ সম্বন্ধে আমরা কিছু
বলেছি। বলেছি, রত্নাকরের প্রবন্ধাধ্যায়ের প্রারম্ভে “অন্তর” ধাতুর প্রয়োগ
বৈশিষ্ট্য সম্বন্ধে সুস্পষ্ট নির্দেশ আছে। সেই সুস্পষ্ট নির্দেশ আবার সুস্পষ্ট
উদাহরণের মাধ্যমেও চিহ্নিত হয়েছে প্রবন্ধাধ্যায়ের শেষের দিকে। শার্ঙ্গদেব
এখানে সালগ-সূড় প্রবন্ধ-গীতির পরিচয় দান প্রসঙ্গে যে সাতটি প্রবন্ধ-গীতির
উদাহরণ স্থাপনা করেছেন, তার প্রথমটি হচ্ছে ধ্রুব প্রবন্ধ।
আলোচ্য ক্ষেত্রে ধ্রুব প্রবন্ধ অবশ্য মূল রত্নাকরের মধ্যে “রূপান্তরিত সালগ-
সূড়” হিসাবে চিহ্নিত হয়নি, কিন্তু, 'অন্তর' ধাতুর পরিচিতিটাকে গ্রহণ
করেছে। এর টীকাকার কল্লিনাথ আলোচ্য ক্ষেত্রেই 'অন্তর' তথা ধ্রুবখণ্ডের
বার্তাটি সুস্পষ্টভাবে প্রাঞ্জল করেছেন। অর্থাৎ, যে ধ্রুব প্রবন্ধকে আমরা এখানে
বিশুদ্ধ ধ্রুব প্রবন্ধ হয়তো সাঙ্গীতিক গীতি-পদ্ধতির মাধ্যমে পরিবেশিত হতো
না বিবেচনা হতো, কিন্তু সালগ-সূড় জাতীয় প্রবন্ধর অন্যতম ছিল। এবং তার
মধ্যে “অন্তর” ধাতুর অস্তিত্ব থাকার কারণে, ধাতু নাম হিসাবে ধ্রুবর নামটি
যুক্ত হলো না।
ধ্রুব-ধাতুহীন এই ধ্রুব তখন পর্যায়-ভুক্ত ছিল ষোল রকম এবং তার মধ্যে
উদগ্রাহ ধাতুরও অস্তিত্ব ছিল। কিন্তু যা ছিল কল্লিনাথের (১৪৫৬-১৪৭৭ খৃঃ অঃ)
আমলে, তা হয়তো ক্ষুণ্ণ হয়ে এসেছিল বা বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল গোয়ালীয়রের
রাজা মান তোমর (১৪৮৬-১৫১৬ খৃঃ অঃ) প্রমুখ ধ্রুপদ গীতি-পদ্ধতি স্রষ্টাদের
সময়। বলা বাহুল্য, প্রবন্ধ-পরবর্তী যুগের এই সব সঙ্গীত-বিজ্ঞানী কালধর্মের
মর্যাদা রক্ষা করেই তাদের সৃষ্টিকার্যে সাফল্যলাভ করেছিলেন, কিন্তু নূতন
সৃষ্টির মোহে তারা পূর্বসূরীদের অবদানগুলাকেও অগ্রাহ্য করেন নি। সৃষ্টি
কার্যে তারা যথোচিতভাবেই গ্রহণ-বর্জনের নীতিটাকে গ্রহণ করেছিলেন,
কিন্তু, মূল আধারটি সম্বন্ধে তাঁরা ছিলেন একান্তভাবেই সচেতন। প্রাচীন
ধ্রুব-ধাতুহীন অথচ অন্তর-যুক্ত ধ্রুব-প্রবন্ধ সমসাময়িককালে ধ্রুবগীতি, ধ্রুবক্-গীতি
এবং ধ্রুবপদ রূপেও উল্লিখিত হতো। তাই, ধ্রুবপদ-পদ্ধতির স্রষ্টাগণ তাঁদের
সৃষ্টিকে সৃষ্টি হিসাবে অভিহিত না করে, মূলাধারের নামেই স্মরণীয় করে রাখা,
সার্থক বিবেচনা করেছিলেন।
২৪২ সঙ্গীত পারিজাত
প্রাচীন ‘অন্তর’ প্রবন্ধ-পরবর্তী যুগ থেকে অন্তরা নামে প্রচলিত হয়েছে।
বর্তমানে সব রকম সঙ্গীতের মধ্যেই অন্তরাকে দ্বিতীয় ধাতুরূপে পাওয়া যায়।
তবে, সেতার, শরদ প্রভৃতি যন্ত্রের মাধ্যমে পরিবেশিত কিছু কিছু খেয়ালাঙ্গ
গৎ-এর মধ্যে—অন্ততঃ ধাতুনাম হিসাবে অন্তরার অস্তিত্ব গ্রাহ্য না হতে দেখা
যায়। কিন্তু, ধ্রুপদাঙ্গ সঙ্গীতের মধ্যে অন্তরা অপরিহার্য ধাতুরূপেই বর্তমান
থাকে।
প্রাচীন আভোগ আজও অস্তিত্ব বজায় রেখেছে, কেবলমাত্র ধ্রুপদাঙ্গ
সঙ্গীতের মধ্যে; কিন্তু, দ্বি-খণ্ডিত হয়ে। ধ্রুপদ গীতি-পদ্ধতির স্রষ্টাগণ, প্রাচীন
সালগ-সূড় প্রবন্ধর দুইভাগে বিভক্ত ধ্রুব ধাতুকে (রূপান্তরিত গায়কীর ক্ষেত্রে?)
যেমন স্থায়ী ও অন্তরা ধাতু হিসাবে গ্রহণ করেছিলেন, তেমনি প্রাচীন
আভোগের দুটি ভাগকেও ব্যবহার করেছিলেন সঞ্চারী ও আভোগ ধাতুরূপে।
আলোচ্য ক্ষেত্রে ধাতু ব্যবস্থার পার্থক্য এই যে, প্রাচীন সালগ-সূড় জাতীয়
প্রবন্ধর মধ্যে অন্তরাকে ‘অন্তর’ ধাতু হিসাবে পাওয়া যায়, কিন্তু, সঞ্চারী নামক
কোন ধাতুর অস্তিত্ব—স্থায়ী ধাতুর মতো—প্রবন্ধ গীতি-পদ্ধতির মধ্যে ছিল না।
বলা বাহুল্য, স্থায়ী ধাতুর পরিকল্পনার মতোই, নিগূঢ় বৈজ্ঞানিক যুক্তিতেই,
সঞ্চারী ধাতুর পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছিল ধ্রুপদাঙ্গ পদ্ধতির মধ্যে। এবং,
এখানে এ কথাও উল্লেখযোগ্য যে, স্থায়ী ধাতুর সঙ্গে যেমন স্থায়ী বর্ণের কোন
সম্পর্ক নেই তেমনি সঞ্চারী ধাতুটিরও সঞ্চারী বর্ণের সঙ্গে সম্পর্কহীন। ধাতুনাম
হিসাবে স্থায়ী ও সঞ্চারীর পরিকল্পনাটা গ্রহণ করা হয়েছিল, প্রবন্ধ যুগের
রাগালাপের স্থায়ী ও সঞ্চার নামক ক্রিয়াসিদ্ধ অংশের সংজ্ঞা থেকে।
“রাগস্থায়ত্বব স্থায়ঃ”— এর মতো রাগালাপের ‘সঞ্চার’ অংশটিও একটি বিশিষ্ট রূপ
প্রকাশ করতো। অর্থাৎ, বোঝা যাচ্ছে, অধিকাংশ ঘরোয়ানা ধ্রুপদের সঞ্চারীর
মতো প্রাচীন আভোগ ধাতুর প্রথম অংশটিও একই অবরোহণ আরোহণযুক্ত
মিশ্র গতির ছন্দে স-গমক মুদারা সপ্তকের বাদী-সম্বাদীকে কেন্দ্র করে পরিক্রমণ
করতো এবং এই পরিক্রমণ সমাধা করেই সোজা তারার সপ্তককে আশ্রয়
করতো আভোগের দ্বিতীয় অংশটিকে অবলম্বন করে। কিন্তু, প্রাচীন আভোগের
এই দ্বিতীয় অংশটি অন্তরার পুনরাবৃত্তি ছিল না। স্থায়ীর প্রতিপাদ্যের সঙ্গে যেমন
সঞ্চারীর কোন সম্পর্ক নেই, তেমনি অন্তরা ও আভোগের প্রতিপাদ্যও
অভিন্নধর্মী নয়। প্রাচীন ‘অন্তর’ ধাতুর গতিটা ছিল নিরঙ্কুশ আরোহণ
প্রভাবযুক্ত। প্রাচীন আভোগ ধাতুর মধ্যে আবার অন্তরের তুলনায় আরও
[Page Header]
সঙ্গীত পারিজাত ২৪৩
বেশী “উচ্চস্বর” নিযুক্ত করা হতো; কিন্তু, তার গতিটা ছিল মূলতঃ অবরোহণ
প্রভাবযুক্ত। অর্থাৎ আভোগের স্বরূপ প্রকাশের মধ্যে, স্ব-স্থানে প্রত্যাবর্তন
করার একটা প্রচেষ্টা পরিলক্ষিত হতো মিশ্রগতির মাধ্যমে। প্রসঙ্গক্রমে এখানে
একথাও উল্লেখযোগ্য যে, প্রবন্ধ গীতি-পদ্ধতির মধ্যে আভোগ নামক ধাতুটির
অস্তিত্ব সম্ভবতঃ উদগ্রাহ, ধ্রুব প্রভৃতি ধাতুর মতো সুপ্রাচীন নয়। সঙ্গীত
রত্নাকরের কিছুকাল পূর্বে বিরচিত সঙ্গীত-সময়সার গ্রন্থে, গ্রন্থকার পার্শ্বদেব
স্পষ্টই উল্লেখ করেছেন, আভোগ নামক ধাতুটির স্রষ্টা পরমর্দি। পরমর্দি ছিলেন
একাদশ শতাব্দীর সঙ্গীত-বিজ্ঞানী।
বিলুপ্ত প্রবন্ধ গীতি-পদ্ধতির মতো ধ্রুবপদ গীতি-পদ্ধতিও আজ আসন্ন মৃত্যুর
সম্মুখীন। এবং, পদ্ধতিটা অচিরেই যে প্রবন্ধ গীতি-পদ্ধতির মতো অতীতের
অতলে তলিয়ে যাবে সে সম্বন্ধে অবহিত হয়েই এই পদ্ধতিটি সম্পর্কিত
ব্যতিক্রমের নজীরগুলোও এখানে উল্লেখ করা যুক্তিযুক্ত মনে করছি।
ধ্রুবপদ পদ্ধতির মধ্যে ধাতু হিসাবে স্থায়ী, অন্তরা, সঞ্চারী, আভোগের
যথাযথ প্রয়োগ প্রায় সর্বজনপরিচিত। কিন্তু, উত্তর ভারতীয় সঙ্গীত সমাজে,
৩০।৪০ বছর পূর্বেও, এমন ধ্রুপদী ‘ঘরও’ ছিল, যে ঘরের শিল্পীরা সঞ্চারীর
পরিবর্তে ভোগ কথাটিকে ব্যবহার করতেন। প্রাচীন সঙ্গীত শাস্ত্রে এই “ভোগ”
কথাটির স্বরূপ কী ছিল সে প্রসঙ্গ আপাততঃ অপ্রাসঙ্গিক, কিন্তু, আলোচ্য ঘরের
শিল্পীরা নজীর হিসাবে যে সব খাতাপত্র দাখিল করতেন, তার ওপর নির্ভর করে
স্পষ্টই ধারণা জন্মাতো—সঞ্চারী আভোগের স্থলে “ভোগাভোগের” প্রচলনটা
প্রায় তানসেনের আমল থেকেই চলে আসছে। অপরপক্ষে, তানসেন বংশীয়
ওস্তাদদের মধ্যে ভোগাভোগের পরিবর্তে সঞ্চারী আভোগের ব্যবস্থাটাই একমাত্র
ব্যবস্থারূপে গ্রাহ্য হতে দেখা যায়। প্রখ্যাত আল্লাদিয়া খাঁ সাহেবের 'ঘরে'
ভোগাভোগ প্রচলিত ছিল। কিন্তু, আগ্রা ঘরের মুজফ্ফর খাঁ, ফৈয়াজ খাঁ প্রমুখ
ওস্তাদরা সঞ্চারী আভোগের নামকরণটাকেই শাস্ত্রসম্মত মনে করতেন।
ধ্রুপদ গানের মতো বীণকারী বাজের মধ্যেও সঞ্চারী আভোগের প্রয়োগ
ব্যবস্থার ব্যতিক্রম পরিলক্ষিত হতো। বর্তমানে, রেডিও যন্ত্রটির মাধ্যমে, মাঝে
মাঝে যা দু'একটা বীণাবাদনের প্রোগ্রাম শোনা যায়, তা শুনে, বীণকারী বাজ
সম্বন্ধে কোন রকম ধারণায় উপনীত হওয়া কারুর পক্ষেই সম্ভবপর নয়। কিন্তু,
৩০।৪০ বছর পূর্বে, উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতটা যখন আজকের মতো মাস্-এর সম্পত্তি না
হয়ে গিয়ে ক্লাশ-এর মধ্যেই গণ্ডীবদ্ধ ছিল, তখন বীণকারী বাজের বিভিন্ন
২৪৪ সঙ্গীত পারিজাত
ঘরোয়ানা সম্বন্ধে অনেক কিছু বৈশিষ্ট্যই লক্ষ্য করবার সুযোগ সুবিধা ঘটতো
তখনকার আমলে, প্রাচীন দ্বি-ধাতুযুক্ত প্রবন্ধ-গীতির অনুরূপ ধাতুব্যবস্থা কোন
বীণ্কারের বাজের মধ্যে ছিল না। কিন্তু, চার ধাতুযুক্ত বাজের মধ্যে ধাতু-
ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য পরিলক্ষিত হতো। এবং, বৈশিষ্ট্যগুলি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই
পরিলক্ষিত হতো রবাব্ জাতীয় যন্ত্রের ক্ষেত্রে—পর্দাযুক্ত বীণার ক্ষেত্রে নয়।
এমনও দেখা যেতো যে, যে বীণ্কারের “সাজ” রুদ্রবীণা, তিনি শিষ্যবর্গকে
সারস্বত বীণ্ শিক্ষা দেবার সময় যথাযথভাবে স্থায়ী, অন্তরা, সঞ্চারী ও আভোগ
ধাতুর প্রয়োগ পরিবেশনার তালিম দিচ্ছেন। কিন্তু, রুদ্রবীণা তথা রবাব্
জাতীয় বীণার মাধ্যমে তালিম দেবার সময় ধাতুনাম হিসাবে, আভোগের পর
সঞ্চারীকে গ্রাহ্য করছেন। প্রশ্ন করে উত্তর পেয়েছি—এ সঞ্চারী ‘অলগ’,
অর্থাৎ এ সঞ্চারী সে সঞ্চারী নয়। এবং সেই আভোগ-পরবর্তী সঞ্চারী ধাতুটি
সত্যই আভোগ-পূর্ববর্তী সঞ্চারী ধর্মী ছিল না।
বলা বাহুল্য, সঞ্চারী ধাতু-ব্যবস্থার এই অসঙ্গতি সম্পর্কে তারা আর কিছুই
[