सामग्री पर जाएँ
सर्वकोश
संग्रह पर लौटें

सङ्गीतपारिजात (अहोबल - वीणा के तारों पर शुद्ध व विकृत स्वर-स्थान निर्धारण का ऐतिहासिक ग्रन्थ)

Sangitaparijata of Ahobala on Indian Musicology

पण्डित अहोबल (टीकाकार: कलानिधि कलिन्द) द्वारा

DevanagariHindipublished358 पृष्ठ

ছন্দেই চর্চরী গাওয়া হোক না কেন, চর্চরীর সম্পর্কে এলেই সেই ছন্দটির নামও
চর্চরী-যুক্ত হয়ে যেতো।
চর্চরী গান মূলতঃ ছিল উদ্গ্রাহ ও ধ্রুব-যুক্ত দ্বি-ধাতুক প্রবন্ধ। কিন্তু,
আভোগ অনুষ্ঠানের দ্বারা একে ত্রি-ধাতুক করবার ব্যবস্থাও ছিল। চর্চরী
ছিল পদ ও তালযুক্ত দ্বি-অঙ্গ বিশিষ্ট প্রবন্ধ। অর্থাৎ, তারাবলী জাতীয় নির্যুক্ত
প্রবন্ধ।
আমাদের দেশে অনেক গুণীজ্ঞানী মনে করেন, প্রাচীন চর্চরী গীতির সঙ্গে
বর্তমানের চাঁচর গানের সম্বন্ধ ঘনিষ্ঠ। বলা বাহুল্য, ইতিহাসের পরিপ্রেক্ষিতে
চাঁচর গানের অস্তিত্বও অতি-প্রাচীন। প্রাচীন চর্চরীর সঙ্গে হয়তো একদা
তার ছিল সম্পর্কযুক্ত। কিন্তু, আমাদের জানিত চাঁচরের রাগ ও তালের
সঙ্গে বিলুপ্ত চর্চরীর রাগ ও তালের আপাততঃ কোন মিল দেখতে পাচ্ছি
না। । ৫৮৬/১ ।
পদৈশ্চ বিরুদৈস্তদ্বৎ স্বর পাটকৈঃ ॥ ৫৮৬।২
যে বদ্ধ গানে পদ, বিরুদ, স্বর ও পাট ব্যবহৃত হয়, তাকেই বলে হর্ষবর্ধন
প্রবন্ধ। ৫৮৬।২
টিপ্পনীঃ হর্ষবর্ধন সম্পর্কে পারিজাতকার যা বলেছেন, তার সঙ্গে
রত্নাকরের যথাযথ সামঞ্জস্য দেখা যায়। প্রবন্ধটি গাওয়া হতো তালে, অধিকন্তু,
পদ, বিরুদ, স্বর ও পাটযুক্ত ছিল। অর্থাৎ, হর্ষবর্ধন ছিল পঞ্চাঙ্গযুক্ত,
নন্দিনীজাতীয় নির্যুক্ত প্রবন্ধ। তবে, এর অঙ্গ-ব্যবস্থা সম্পর্কে রত্নাকরের
টীকাকারদ্বয়ের মধ্যে মতভেদ দৃষ্ট হয়। কল্লিনাথ বলেছেন, হর্ষবর্ধন ছিল
দ্বি-ধাতুক প্রবন্ধ। এর উদ্গ্রাহ অংশে থাকতো পদ ও বিরুদ এবং ধ্রুব অংশ
রচিত হতো স্বর ও পাট সহযোগে। অপরপক্ষে, সিংহ ভূপাল বলেছেন, হর্ষবর্ধন
ছিল কেবলমাত্র পদ ও বিরুদ যুক্ত প্রবন্ধ। সম্ভবতঃ, হর্ষবর্ধন চিরকালই নন্দিনী
জাতীয় প্রবন্ধ ছিল না। ৫৮৬।২
তাল-মানদ্বয়ং য্যাসৌ ভবেচ্ছ্রীবর্ধনাভিধঃ ॥ ৫৮৭।১
যে প্রবন্ধ গান তাল-মান সহযোগে গীত হয়, তাকেই বলে শ্রীবর্ধন
প্রবন্ধ। ৫৮৭।১
টিপ্পনীঃ শ্রীবর্ধন প্রবন্ধর পরিচয় প্রসঙ্গে পারিজাতকার কেবলমাত্র
তাল-মানের কথা বলেছেন, অঙ্গাদি সম্বন্ধে কোন কথা বলেন নি। এই অতি

৩১৬ সঙ্গীত পারিজাত
সংক্ষিপ্ত পরিচিতির কারণ দ্বিবিধ হতে পারে। হয়তো পরবর্তী কালের কোন
নকল-নবিশীর অসাবধানতার জন্য মূল সূত্রের মধ্যে থেকে কিছু অংশ বাদ পড়ে
গিয়েছে। কিংবা, প্রবন্ধটি অহোবলের আমলে এতই বেশী প্রচলিত ছিল যে,
অতি পরিচয় নিবন্ধন স্বয়ং গ্রন্থকারহ অসাবধান হয়েছিলেন। রত্নাকরে দেখা
যায়, শ্রীবর্ধন ছিল বিরুদ, পাট, পদ ও স্বরযুক্ত নন্দিনী জাতায় নিযুক্ত প্রবন্ধ।
প্রবন্ধটি ছিল দ্বি-ধাতুক। এর উদগ্রাহ অংশ রচিত হতো বিরুদ ও পাট
সহযোগে এবং ধ্রুব অংশে থাকতো পদ ও স্বর। সর্ব্বোপরি, গান শেষ করা
হতো তাল-মান বজায় রেখে।
বর্তমানে দেখা যায়, অনেক গুণীজ্ঞানী তাল-মান কথাটি অভিন্ন অর্থেই
ব্যবহার করে থাকেন। কিন্তু, আমাদের স্মরণ রাখা কর্তব্য, প্রাচীন যুগের
পণ্ডিতগণ পারতপক্ষে এমন কোন বাক্যের ব্যবহার করতেন না যার ফলে
ভ্রান্ত ধারণার সৃষ্টি হতে পারে। বাক্য হিসেবে “তাল-মান” অভিন্ন সংজ্ঞার
অন্তর্গত একটি কথা নয়—বিভিন্ন সংজ্ঞার পরিচায়ক দুটি কথা। ‘মান’ কথাটা
অবশ্য গতি-নির্দেশক, কিন্তু, সে গতি, তাল-মাত্রা-লয়-এর গতি নয় – উক্ত
তাল-মাত্রা-লয়-এর মধ্যে নিবদ্ধ মূল বাণীর নিজস্ব বৈশিষ্ট্য-জ্ঞাপক গতি—
যে গতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রক্ষা করার প্রয়োজনে, উক্ত তালেরই “মান” কে
তদনুরূপ প্রকৃতি গ্রহণ করতে হয়। যেমন, ধ্রুপদ ধামার প্রভৃতি গানের
বাঁট-উপজের গতি। আলোচ্য ক্ষেত্রে তাল-মাত্রা-লয়-বরাবর থাকে ; কিন্তু
বাণী ও বোলের গতি দ্রুত হয়ে যায়। ॥ ৮৭১ ॥
মধ্য মধ্য স্বরৈঃ র্যঃ স্যাৎ ( ? ) স্বরাঙ্গ সোঽভিধীয়তে। ॥ ৮৭২ ॥
যে প্রবন্ধ গানের মধ্য ধাতুতে অর্থাৎ ধ্রুব ধাতুতে স্বরের প্রয়োগ হয়,
তাকেই বলে স্বরাঙ্গ প্রবন্ধ। ॥ ৮৭২ ॥
টিপ্পনী : পারিজাতের স্বরাঙ্গ প্রবন্ধ সম্পর্কে আলোচ্য সূত্রের বক্তব্যটি
নিতান্তই দুর্বোধ্য। রত্নাকরে স্বরাঙ্গ নেই, স্বরাঙ্ক আছে। এবং, এই
স্বরাঙ্ক প্রবন্ধর টীকা-ভাষ্য আলোচনা করেই, আলোচ্য সূত্রের ‘মধ্য’ শব্দটিকে
আমরা মধ্যম ধাতু, অর্থাৎ, ধ্রুব ধাতুরূপে অনুমান করছি। কিন্তু, পরের
পর দুটি ‘মধ্য’ শব্দ ব্যবহার করে পারিজাতকার কী বোঝাতে চেয়েছেন,
সেটা কিছুতেই ধরতে পারছি না। একটি ‘মধ্য’ অর্থে যদি আমরা মধ্যম
ধাতুকে গ্রহণ করি, তাহলে অপর ‘মধ্য’টির অর্থ কী হতে পারে? মধ্যম

গ্রাম মধ্য (মুদারা) সপ্তক? কিংবা মধ্যম (মা) স্বর? বলাবাহুল্য,
উপরিউক্ত তিন রকম অনুমানের স্বপক্ষে ও বিপক্ষে সম্ভাব্য সকল রকম
যুক্তি প্রয়োগ করেও, আমরা এমন কিছুই পাচ্ছি না যাকে সঙ্গীত-বিজ্ঞানানুগ
তথ্যরূপে গ্রাহ্য করতে পারি। অপরপক্ষে, স্বরাঙ্কের সঙ্গে স্বরার্থ প্রবন্ধের
(স্বরপাঠৈরেব বাস্তুতোহং) গোলযোগও কল্পনা করতে পারি না যেহেতু,
পারিজাতের স্বরার্থ প্রবন্ধের উল্লেখ ও আলোচনা ইতিপূর্ব্বেই (৫৬০।১ সূত্র দ্রষ্টব্য)
করা হয়েছে। অতএব, আমরা বলতে বাধ্য যে, পূর্ব্বোল্লিখিত আরও অনেক
সূত্রের মতো পারিজাতের আলোচ্য সূত্রটিকেও বিকৃত করেছেন পরবর্তী কালের
কোন্ সঙ্গীত-অজ্ঞ লিপিকার।
রত্নাকরে স্বরাঙ্গ নেই, কিন্তু স্বরাঙ্ক প্রবন্ধ সম্পর্কে বিশদ আলোচনা স্থান
পেয়েছে। স্বরাঙ্কের অঙ্গ ছিল পদ, স্বর, বিরুদ এবং তাল তো ছিলই।
এবং স্বরাঙ্ক ছিল চতুরঙ্গবিশিষ্ট দীপনী জাতীয় নির্যুক্ত প্রবন্ধ। এতে ধাতুর
ব্যবস্থা তিনটি। কিন্তু, সেই ধাতু তিনটির মধ্যে উদ্গ্রাহ ও ধ্রুব ব্যতীত,
মেলাপক ব্যবহৃত হতো কিম্বা আভোগকে গ্রহণ করা হতো, সে সম্বন্ধে
রত্নাকর টীকাকারদ্বয়ের মধ্যে মতভেদ দৃষ্ট হয়। স্বরাঙ্ক যে ত্রিধাতুক ছিল
সে সম্বন্ধে উভয় টীকাকারই একমত। কিন্তু, তবুও, কল্লিনাথ মন্তব্য করেছেন
যে, স্বরাঙ্কের মধ্যে মেলাপক ও আভোগ উভয় ধাতুর ব্যবহার পরিলক্ষিত হলে,
প্রবন্ধটিকে চার ধাতুযুক্ত প্রবন্ধরূপে গণ্য করতে হবে। অধিকন্তু, স্বরাঙ্ক
প্রবন্ধ গাইতে হয় কেবলমাত্র মালবশ্রী রাগে। অর্থাৎ, কল্লিনাথের আমলে
স্বরাঙ্ক পাওয়া হতো কেবলমাত্র মালবশ্রী রাগে এবং প্রবন্ধটির ধাতু ব্যবস্থা ছিল
তিন কিংবা চার।
কিন্তু সেটা কী করে হতে পারে? সঙ্গীত বিজ্ঞানের সুস্পষ্ট নির্দেশ হচ্ছে
এই যে, ত্রিধাতুক প্রবন্ধ অর্থে মেলাপকহীন প্রবন্ধ বুঝতে হবে। মূলেও
আমরা পাচ্ছি, স্বরাঙ্ক ছিল ত্রিধাতুক প্রবন্ধ। কল্লিনাথের পূর্ব্ববর্তী টীকাকার
সিংহভূপালও প্রবন্ধটিকে তিন ধাতুযুক্ত প্রবন্ধরূপে উল্লেখ করেছেন। অথচ,
কল্লিনাথ আবার প্রবন্ধটির সম্ভাব্য চার ধাতুর উল্লেখ করতে গেলেন কেন?
এ কেনর উত্তর বোধহয় একটা পাওয়া যেতে পারে, উক্ত টীকাকারদ্বয়ের
টীকা ভাষ্যের দিক্টাকে লক্ষ্য করলে। আমরা দেখতে পাচ্ছি, সিংহভূপাল
যে সূত্রটিকে অবলম্বন করেছিলেন তার ভিত্তি “স্বরাঙ্ক ন্যাসবং স্বরৈঃ।” এখানে
“ন্যাসনং স্বরৈঃ” অর্থে বুঝতে হবে শেষ ধাতুর, অর্থাৎ আভোগ ধাতুর শেষ

৩১৮ সঙ্গীত পারিজাত
অংশে স্বর থাকবে এবং এখানে মালবশ্রী রাগের উল্লেখমাত্রও নেই। অপরপক্ষে,
কল্লিনাথ যে সূত্রটিকে অবলম্বন করেছিলেন তার মধ্যে স্বরাঙ্কের উল্লেখমাত্রও
নেই, পরন্তু, “মালবশ্রয়া গীয়তে” লিপিবদ্ধ রয়েছে।
স্বরাঙ্ক প্রবন্ধ গানে তালের ব্যবহার ছিল একাধিক এবং বৈশিষ্ট্যপূর্ণ।
যথা—
পদৈঃ স্তবৈশ্চ বিরুদৈরুদগ্রাহ্যাদিধ্রুবং ক্রমাৎ।
একদ্বিতৃচ তালাঃ স্যুঃ স্বরাদে ন্যাসনং স্বরে॥
অর্থাৎ, পদে উদগ্রাহ্, স্তবে ধ্রুব, বিরুদে আভোগ এবং পদে একটি তা- স্বরে
দুটি তাল বিরুদে তিনট তাল ও স্বরে সমাপ্তি বা ন্যাস।
বলাবাহুল্য স্বরাঙ্কর ধাতুগত ভাব ব্যবস্থার জন্য তার প্রয়োগ প রবেশনাও
তা ক্রমিক নিয়মানুসারে। ৫৮৭৷২
পাটৈশ্চ বিরুদৈঃপাটৈ স্তেনৈশ্চ বিলাসকঃ। ৫৮৮।১
যে প্রবন্ধ গানে পদ, বিরুদ ও তেনক ব্যবহৃত হয়, তাকেই বলা হয়-
বিলাসক প্রবন্ধ। ৫৮৮।১
টিপ্পনী : পারিজাতেব হরি-বিলাসক, এখানে হরি বিলাসকরূপে উল্লিখিত
হয়েছে। অঙ্গাদি ব্যবস্থার দিক দিয়েও উভয় গ্রন্থের মধ্যে সামঞ্জস্য আছে।
রত্নাকরের হরি বিলাসকও ছিল পঞ্চাঙ্গযুক্ত নন্দিনী জাতীব নিযুক্ত প্রবন্ধ। এর
উদগ্রাহে পদ ও বিরুদ থাকতো এবং আভোগে থাকতো পাট ও তেনক। সুতরাং
দ্বিধাতুক হলেও, প্রবন্ধটির মধ্যে অনিবদ্ধ পদ যোজনা করে আভোগ
অনুষ্ঠানেরও সুযোগ সূচনা ছিল। ৫৮৮।১
তালৈস্তু পদ যোগেন রাহড়ী সোঽভিধীয়তে॥ ৫৮৮।১
কেবলমাত্র তাল ও পদযুক্ত প্রবন্ধকেই রাহড়ী প্রবন্ধ বলে। ৫৮৮।২
টিপ্পনী : রাহড়ী সম্বন্ধে পারিজাতকার যা বলেছেন তার সঙ্গে রত্নাকরের
সামঞ্জস্য আছে। রত্নাকরের রাহড়ীও ছিল কেবলমাত্র পদ ও তালযুক্ত
তারাবলী জাতীয় নিযুক্ত প্রবন্ধ। গানের বিষয়বস্তু হতো বীররসাত্মক এবং
অসংখ্য পাদযুক্ত। যুদ্ধের সময় স্বদেশের সৈনিকদের মনে উদ্দীপনা জাগিয়ে
তোলাই ছিল রাহড়ী গানের প্রধান বৈশিষ্ট্য। কল্লিনাথের মন্তব্য পড়ে মনে
হয়, অসংখ্য পাদযুক্ত কোন রাহড়ী প্রবন্ধর সবটুকু গাওয়া বাধ্যতামূলক ছিল
না, প্রয়োজনমত পাদ নির্বাচন করে, উদগ্রাহ ও ধ্রুব ধাতুর মধ্যে যথাযথভাবে

সঙ্গীত পারিজাত ৩১৯
বণ্টন করে, প্রবন্ধটি গাওয়া হতো। দ্বিধাতুক রাগাদীকে, আভোগ অনুষ্ঠানের
দ্বারা ত্রিধাতুক করবারও ব্যবস্থা ছিল। ৫৮৮।২
শুভবাচক শব্দৈস্তু মঙ্গলাচার ঈরিতঃ। ৫৮৯।১
যে সব শব্দের সাহায্যে শুভ-কামনা বা কল্যাণ-কামনা করা হয়, সেই রকম
শব্দের দ্বারা গ্রথিত প্রবন্ধর নাম মঙ্গলাচার। ৫৮৯।১
টিপ্পনী: মঙ্গলাচার প্রবন্ধর পরিচয় প্রসঙ্গে পারিজাতকার যা বলেছেন
তা পড়ে প্রবন্ধটির সাঙ্গীতিক পরিচয় কিছুই পাওয়া যায় না। এ সম্বন্ধে
রত্নাকর বলেছেন, মঙ্গলাচার প্রবন্ধ গাওয়া হতো কৈশিকী রাগে, নিঃসারুক
তালে এবং স্বরাচরণ ছিল প্রবন্ধটির অন্যতম বৈশিষ্ট্য। নিঃসারুক তালের
লক্ষণ হচ্ছে বিরামন্তো লঘু নিঃসারকো মতঃ। অর্থাৎ, (।।') দুটি লঘুমাত্রার
সমাহার, কিন্তু শেষের লঘুমাত্ৰাটি বিরামযুক্ত। টীকাকার কল্লিনাথের
মতানুযায়ী মঙ্গলাচার প্রবন্ধটি ছিল ত্রিধাতুক এবং এর মধ্যে পৃথকভাবে
আভোগ অনুষ্ঠানের সুযোগ সুবিধা ছিল। অর্থাৎ, মূলে প্রবন্ধটি ছিল
উদগ্রাহ, মেলাপক ও ধ্রুব ধাতুযুক্ত ত্রিধাতুক প্রবন্ধ কিন্তু আভোগযুক্ত করে
একে চারধাতুযুক্তও করা যেতে পারতো। প্রবন্ধটির মধ্যে স্বরানুষ্ঠান করা
হতো গানের শেষাংশে কিংবা সম্পূর্ণ প্রবন্ধটির অন্তর্গত বিষয়বস্তুর
অন্ততপক্ষে অর্ধাংশ গীত হবার পরে। অর্থাৎ, গানের প্রথমাংশে স্বরানুষ্ঠান
করা বে-আইনী ছিল। কিন্তু, 'গানের অর্ধাংশ' অর্থে আলোচ্যক্ষেত্রে আমরা
কী বুঝবো? এখানে বিশেষভাবে লক্ষণীয় টীকাকারের মন্তব্য। ব্যবস্থাটা
ধাতুগত নয়, অংশগত। অর্থাৎ, ত্রিধাতুক প্রবন্ধের ক্ষেত্রে স্বরানুষ্ঠান আরম্ভ
হতো মেলাপক ধাতুর মাঝামাঝি অংশ থেকে ধ্রুবর সমাপ্তি পর্যন্ত, কি বা,
চারধাতুর ক্ষেত্রে স্বরানুষ্ঠান আরম্ভ হতো ধ্রুবর প্রারম্ভ থেকে আভোগের
শেষাংশ পর্যন্ত—এই রকম একটা বিশ্বাসই মনকে আচ্ছন্ন করে। কিন্তু,
ব্যাপারটা বোধহয় অত সহজ সরল ছিল না। কারণ, এই সহজ ব্যবস্থার
কথাটা টীকাকার খুব সরলভাবেই বলে যেতে পারতেন, কিন্তু তা বলেন নি।
বিশেষতঃ, “অন্ততপক্ষে অর্ধাংশে”র উদাহরণটি বিপরীত ইঙ্গিতই বহন করছে।
অপরপক্ষে, কল্লিনাথের মন্তব্যের মধ্যে পাঠান্তর গ্রহণের অবকাশ আছে।
যেমন, “প্রবন্ধটি ছিল ত্রিধাতুক, কিন্তু/এবং এর মধ্যে আভোগ অনুষ্ঠানেরও
সুযোগ সুবিধা ছিল।”—আলোচ্যক্ষেত্রে “কিন্তু/এবং”-এর স্থলে “যেহেতু”

৩২০ সঙ্গীত পারিজাত
কথাটিকে গ্রহণ করলে দেখা যাবে, মূলে, “প্রবন্ধটি উদ্গ্রাহ ও ধ্রুবযুক্ত দ্বিধাতুক
প্রবন্ধ ছিল—ত্রিধাতুকও হয়ে যেতে পারতো, যেহেতু, আভোগের অতিরিক্ত
অনুষ্ঠানকে গ্রহণ করবারও ব্যবস্থা ছিল।”
মঙ্গলাচার প্রবন্ধের অঙ্গ ছিল তিনটি,—পদ, স্বর ও তাল। সুতরাং এটি ছিল
একটি ভাবনী জাতীয় নির্যুক্ত প্রবন্ধ। ৫৮৯।১
গীতে যস্মিন্ মুখ্যং বর্ণং বদনং তৎপ্রকীর্ত্তিতম্ ॥ ৫৮৯।২
যে প্রবন্ধ গান মুখ্যতঃ বর্ণগণের সাহায্যে গীত হয়ে থাকে, তাকেই বলে বদন
প্রবন্ধ। ৫৮৯.১
টিপ্পনী : বদন প্রবন্ধর প্রধান বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে পারিজাতকার বর্ণগণের
উল্লেখ করেছেন। কিন্তু, রত্নাকরে দেখা যায় বদন প্রবন্ধ গাওয়া হতো
মাত্রাগণের মাধ্যমে। বলাবাহুল্য, বর্ণগণ ও মাত্রাগণের মাত্রা, মাত্রা হিসাবে
অভিন্ন সংজ্ঞার অন্তর্গত নয়। এ সম্বন্ধে আমরা ৫১৫-৫১৮ সূত্রের টিপ্পনীতে
কিঞ্চিৎ আলোচনার সুযোগ গ্রহণ করেছি। সুতরাং পুনরুক্তি নিষ্প্রয়োজন।
আলোচ্য সূত্রে দেখা যাচ্ছে, বদন প্রবন্ধর গণ সম্পর্কে পারিজাতকার
বর্ণগণের উল্লেখ করেছেন। অপরপক্ষে, রত্নাকর বলেছেন, বদনের গণগুলি
ছিল মাত্রাগণ। আমরা জানি না শার্ঙ্গদেব থেকে অহোবলের আমলের
মধ্যে এমন কোন সাঙ্গীতিক বিপ্লব ঘটেছিল কিনা যার ফলে, গণ-ব্যবস্থা-
বিধির দিক দিয়ে বদনের রূপান্তর ঘটেছিল। এবং, সেই কারণেই পূর্ববর্তী
রত্নাকরের আমলের মাত্রাগণযুক্ত বদন পরবর্তী কালে রচিত পারিজাত গ্রন্থের
মধ্যে বর্ণগণযুক্ত হয়ে পরিচিত হয়েছিল। তবে, এটুকু দেখতে পাচ্ছি, বদন
সম্পর্কে পারিজাতকার কেবলমাত্র বর্ণগণেরই উল্লেখ করেছেন, আর কোন
পরিচয় দেন নি। কিন্তু, রত্নাকরে বদনের সবিশেষ পরিচয় উল্লিখিত হয়েছে।
রত্নাকরের বদন ছিল মাত্রা-গণ-বিশিষ্ট একটি ত্রি-পদ দ্বিধাতুক প্রবন্ধ। এর
প্রথম পদটি ছিল তিনটি মাত্রা-গণ সমন্বিত। এই অংশটুকুই ছিল উদ্গ্রাহ;
এবং দ্বিতীয় পদটি ছিল স্বর ও পাটযুক্ত। এই অংশটুকু ছিল ধ্রুব। উদ্গ্রাহে
মাত্রা-গণের সন্নিবেশ হতো যথাক্রমে একটি ছ-গণ ( S S S = তিনটি
গুরুমাত্রা ) একটি প-গণ ( S S I = দুটি গুরু ও একটি লঘুমাত্রা ) এবং একটি
দ-গণ ( S = একটি গুরুমাত্রা )
বদনের আবার দুটি প্রকার-ভেদও পাওয়া যায়—উপবদন ও বস্তুবদন।
বলাবাহুল্য, বদন-এর এই ভেদ দুটি পরিকল্পিত হয়েছিল মুখ্যতঃ এর উদ্গ্রাহ

সঙ্গীত পারিজাত ৩২১
অংশের মাত্রা-গণ ব্যবস্থার মধ্যে কিঞ্চিৎ পরিমাণে বৈচিত্র্য সন্নিবেশিত হওয়ার
কারণেই। যেমন, কল্লিনাথের মতানুযায়ী, যে বদন-এর উদ্‌গ্রাহ অংশে দুটি
ছ-গণ ( S S S, S S S ) একটি দ-গণ ( S ) ও একটি ত-গণ ( S I )
থাকে—অর্থাৎ, তিনটি গুরুমাত্রাযুক্ত অক্ষর + তিনটি গুরুমাত্রাযুক্ত অক্ষর +
একটি গুরুমাত্রাযুক্ত অক্ষর + একটি গুরু ও একটি লঘুমাত্রাযুক্ত অক্ষর —
সাকুল্যে এই চারটি মাত্রা-গণের যথাক্রম সমাবেশ থাকে, তাকেই বলে উপবদন
প্রবন্ধ। অপরপক্ষে—
উপবদনের মাত্রা-গণ ব্যবস্থা সম্পর্কে কল্লিনাথের সঙ্গে আবার সিংহভূপালের
কিঞ্চিৎ পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। সিংহভূপালের মতানুযায়ী উপবদনের
উদ্‌গ্রাহ ছিল একটি ছ-গণ ( S S S ) একটি চ-গণ ( S S ) একটি দ-গণ ( S )
ও একটি ত-গণ ( S I ) অর্থাৎ, সাকুল্যে চারটি মাত্রা-গণের সমাবেশ হলেও,
কল্লিনাথের অনুরূপ নয়।
কল্লিনাথের মতানুযায়ী বস্তুবদনের উদ্‌গ্রাহ ছিল, দুটি ছ-গণ ( S S S,
S S S ) একটি দ-গণ ( S ) একটি চ-গণ ( S S ) ও একটি ছ-গণের ( S S S )
যথাক্রমে সমাবেশ; অপরপক্ষে—
সিংহভূপালের মতানুযায়ী বস্তুবদনের উদ্‌গ্রাহ ছিল কল্লিনাথেরই অনুরূপ,
কেবল, শেষের ছ-গণটির ( S S S ) পরিবর্তে ত-গণ ( S I ) গৃহীত হয়েছিল।
—আলোচ্যক্ষেত্রে স্মরণে রাখা দরকার যে, সিংহভূপাল ছিলেন কল্লিনাথের
পূর্ববর্তী টীকাকার।
পূর্বেই বলেছি, বদন-এর প্রকার-ভেদে যা কিছু বৈশিষ্ট্য তা তার উদ্‌গ্রাহ
অংশের মধ্যেই সীমিত; ধ্রুব অংশের মধ্যে কোন রকম পরিবর্তনই পরিকম্পিত
হয় নি। বদন, উপবদন ও বস্তুবদন মূলতঃ ছিল দ্বিধাতুক প্রবন্ধ। কিন্তু,
অতিরিক্ত পদ যোজনা করে এদের মধ্যে আভোগ অনুষ্ঠানেরও সুযোগ-
সুবিধা ছিল। সেরূপ ক্ষেত্রে প্রবন্ধগুলি হয়ে যেতো ত্রিধাতুক। প্রবন্ধগুলির
অঙ্গ ছিল চারটি—স্বর, পদ, পাট্ ও তাল। অর্থাৎ, দু'টি প্রকার-ভেদ সমেত
বদন প্রবন্ধ ছিল দীপনী জাতীয় নিযুক্ত প্রবন্ধ। ৫৮৯।২
যস্মিন্ গীতে মুনিবর্ণ্যো জ্ঞেয়া সা পদ্ধড়ী পুনঃ। ৫৯০।১
যে প্রবন্ধ-গানের বর্ণনীয় বিষয় কোন মুনি, তাকেই বলে পদ্ধড়ী
প্রবন্ধ। ৫৯০।১

৩২২ সঙ্গীত পারিজাত
টিপ্পনী : পদ্ধড়ী সম্পর্কে পারিজাতকার যা বলেছেন তা পড়ে প্রবন্ধটির
সম্বন্ধে কোন কিছুই জানা যায় না। ইতিপূর্বে চর্যা প্রবন্ধ প্রসঙ্গে আমরা
বলেছি, পদ্ধড়ী হচ্ছে একটি ছন্দের নাম—সংস্কৃতভাষায় যাকে বলে পজ্‌ঝটিকা-
ছন্দ। আলোচ্য প্রবন্ধটির ছন্দও নিরঙ্কুশ পদ্ধড়ী এবং সেই কারণেই এর
নাম হয়েছিল পদ্ধড়ী। প্রবন্ধটি ছিল তেনকহীন পঞ্চাঙ্গযুক্ত নন্দিনী জাতীয়
নির্যুক্ত প্রবন্ধ। ধাতুব্যবস্থা ছিল মূলতঃ উদ্‌গ্রাহ ও ধ্রুব। অর্থাৎ দ্বিধাতুক
প্রবন্ধ ছিল পদ্ধড়ী। এর উদ্‌গ্রাহ অংশে থাকতো পদ, বিরুদ ও স্বর এবং
ধ্রুব অংশে থাকতো পদ, বিরুদ ও পাট। গাওয়া হতো তালে। এবং,
বলাই বাহুল্য, আভোগ অনুষ্ঠানের দ্বারা প্রবন্ধটিকে ত্রিধাতুক করবারও
স্বাধীনতা ছিল। ৫৯০।১
প্রাতঃকালে তূর্য্যে গেয়ো ধবলঃ স প্রকীর্তিতঃ ॥ ৫৯০।২
যে প্রবন্ধ গান প্রাতঃকালে উচ্চ গ্রামে গীত হয়ে থাকে, তাকেই বলে ধবল
প্রবন্ধ। ৫৯০।২
টিপ্পনী : তূর্য্য কথাটির প্রচলিত আভিধানিক অর্থ অবশ্য উচ্চ গ্রামের
বাদ্য সম্পর্কিত। কিন্তু, বাদ্য-বর্জিত অনুপ্রাস হিসেবেও তূর্য্যের উল্লেখ
প্রাচীন সংস্কৃত সাহিত্যে পাওয়া যায়। অতএব, আলোচ্যক্ষেত্রে বাদ্যকে বর্জন
করে যদি আমরা 'উচ্চ গ্রাম'-এর ওপর গুরুত্ব আরোপ করি, তাহলে
দেখা যাবে, পারিজাতের ধবল গাওয়া হতো প্রাতঃকালে এবং উচ্চগ্রামে—
যেমন, মসজিদের ••তি মোল্লা-গণ তন্দ্রাচ্ছন্ন, নিদ্রামগ্ন বা দূরের মানুষদের
উদ্দেশে ‘আজান’-এর ডাক দিয়ে থাকেন। কিন্তু রত্নাকরে দেখা যায়,
ধবলের গায়নকাল সম্পর্কে কোন নির্দেশ বা আলোচনা গ্রন্থের মধ্যে স্থান
পায় নি। অপরপক্ষে, প্রবন্ধটির প্রয়োজনীয় বিষয়বস্তুর আলোচনা বিশদভাবেই
করা হয়েছে। ধবল শব্দটি আশীর্বাদসূচক। সেই কারণেই প্রবন্ধটির বক্তব্য-
বিষয়ের মধ্যে 'ধবল' বা অনুরূপ শুভ-কামনা, কল্যাণ-কামনাসূচক ভাব ও
ভাষা অবশ্যই নিহিত থাকতো। এবং, বিশেষভাবে এই বৈশিষ্ট্যটুকু থাকার
কারণেই, ধবল প্রবন্ধ গান যেমন শিল্পী-সাধারণের পক্ষে অবশ্য শিক্ষণীয় ও
প্রিয় পরিবেশনার বিষয়বস্তু হয়ে উঠেছিল তেমনি প্রবন্ধ হিসেবেও সর্বজনপ্রিয় ও
সর্বত্র প্রসিদ্ধিলাভ করেছিল। ধবল ছিল মূলতঃ উদ্‌গ্রাহ ও ধ্রুবযুক্ত দ্বিধাতুক
প্রবন্ধ। ত্রিধাতুক করা যেতে পারতো অতিরিক্ত পদ যোজনার দ্বারা

সঙ্গীত পারিজাত ৩২৩
আভোগ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে। এবং কেবলমাত্র পদ ও তাল সংযুক্ত থাকার
কারণে এটি ছিল একটি তারাবলী জাতীয় নিযুক্ত প্রবন্ধ।
ধবল প্রবন্ধর প্রকারভেদ ছিল তিনটি—কীর্তিধবল, বিজয়ধবল ও বিক্রম-
ধবল। এর ভেদ নির্ণীত হতো প্রধানতঃ প্রবন্ধটির পংক্তিগত মাত্রা-বিন্যাসের
বৈশিষ্ট্যকে ভিত্তি করেই। যেমন,
কীর্তিধবলের পংক্তি সংখ্যা ছিল চার। এর বিষম পংক্তিতে, অর্থাৎ,
প্রথম ও তৃতীয় পংক্তিতে থাকতো দুটি করে ছ-গণ (SSS+SSS) এবং
সম পংক্তিতে, অর্থাৎ, দ্বিতীয় ও চতুর্থ পংক্তিতে থাকতো, অধিকন্তু হিসাবে
আরও একটি করে ক-গণ (SSS+SSS+SI)। আলোচনার সুবিধার জন্য
যদি এর একটি গুরুমাত্রাকে (S) দুটি লঘুমাত্রা হিসাবে (।, ।) গ্রহণ করা যায়,
তাহলে প্রবন্ধটির বিষম পংক্তির মাত্রা সংখ্যা দাঁড়ায় (৩ গুরু+৩ গুরু=
৬ গুরু, = ১২ লঘুমাত্রা) এবং সম পংক্তির মাত্রা সংখ্যা দাঁড়ায় (৩ গুরু+
৩ গুরু = ৬ গুরু = ১২ লঘু)+(১ গুরু ও ১ লঘু = ৩ লঘু)= ১৫ লঘুমাত্রা।
বিজয় ধবল প্রবন্ধর পংক্তি সংখ্যা ছিল ছয়। এর প্রথম, দ্বিতীয়, চতুর্থ ও
ষষ্ঠ পংক্তির মাত্রা সংখ্যা ছিল, দুটি করে দ-গণ (SS) অর্থাৎ চারটি করে
মাত্রা। তৃতীয় ও পঞ্চম পংক্তির মাত্রা সংখ্যা ছিল দুটি করে দ-গণ (SS) ও
একটি করে ছ-গণ (SSS) অথবা প-গণ (SSI) অর্থাৎ ৪+৬=১০ মাত্রা
অথবা ৪+৫= ৯-টি করে মাত্রা। দেখা যাচ্ছে বিজয় ধবলের ছয়টি পংক্তির
মধ্যে মাত্রা থাকতো সাকুল্যে ছত্রিশটি বা পঁয়ত্রিশটি।
বিক্রম ধবল প্রবন্ধর পংক্তি সংখ্যা ছিল আটটি। এর প্রথম, চতুর্থ ও পঞ্চম
পংক্তির মাত্রা সংখ্যা ছিল তিনটি করে চ-গণ (SS, SS, SS) ও একটি করে
দ-গণ (S) অর্থাৎ চোদ্দটি করে মাত্রা। দ্বিতীয়, তৃতীয় ও সপ্তম পংক্তির
মাত্রা সংখ্যা ছিল তিনটি করে দ-গণ (SSS) অর্থাৎ ছয়টি করে মাত্রা। ষষ্ঠ ও
অষ্টম পংক্তিতে থাকতো চারটি করে দ-গণ (SSSS) অর্থাৎ আটটি করে
মাত্রা। দেখা যাচ্ছে, বিক্রম ধবলের আটটি পংক্তির মধ্যে মাত্রা থাকতো
সাকুল্যে ছেয়াত্তরটি। ।।৫০।।
বিবাহাদিক মাঙ্গল্যে যে গেয়ো মঙ্গলং ভবেৎ। ।।৫১।।
বিবাহাদি মাঙ্গলিক কার্যে যে গান গাওয়া হয়, তাকেই বলে মঙ্গল
প্রবন্ধ। ।।৫১।।

৩২৪ সঙ্গীত পারিজাত
টিপ্পনী: রত্নাকরের বক্তব্য অনুযায়ী মঙ্গল প্রবন্ধ-গান রচিত হতো মঙ্গল-
বাচক পদে কিংবা মঙ্গল-ছন্দে। গাওয়া হতো বিলম্বিত লয়ে ও কৈশিকী অথবা
বোট রাগ অবলম্বন করে। মঙ্গল প্রবন্ধ যদিও পৃথক প্রবন্ধরূপে উল্লিখিত হয়েছে,
কিন্তু, তৎপরে আলোচিত মঙ্গলাচার (৫৮৯।১ সূত্র দ্রষ্টব্য) প্রবন্ধের সঙ্গে এর
ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল নিঃসন্দেহ। ॥৫৯১
পদং শিশু সুখার্থায় লোলীজ্ঞেয়া বিচক্ষণৈঃ ॥ ৫৯১।২
যে গানের পদ শিশুদেরকেও আনন্দদান করে, তাকেই বলে লোলী
প্রবন্ধ। ৫৯১।১
টিপ্পনী: লোলী প্রবন্ধ সম্বন্ধে রত্নাকরের বিবৃতিও অতি-সংক্ষিপ্ত।
লোলী রচিত হতো প্রাকৃত ভাষায় এবং সম্ভবতঃ সেইজন্যই সংস্কৃত না-জানা,
মানুষদের কাছে যেতেতু, বিদগ্ধজনের নিকট এরা শিশু সদৃশ। লোলী গান
আনন্দদায়ক ছিল। প্রবন্ধটির মধ্যে তিনটি অংশ থাকতো এবং প্রতিটি পদের
আদ্য মধ্য অন্ত মনোহরী হয়ে উঠতো অনুপ্রাসের বৈচিত্র্যে। এই প্রবন্ধ
গানের মধ্যে অনেক রকমের ছন্দও ব্যবহৃত হতো এবং গানের শেষে
থাকতো লোলী কথাটি। লোলী প্রবন্ধর মধ্যে ধ্রুবাংশ অনুষ্ঠান করা ছিল
বে-আইনী। অর্থাৎ এটি ছিল একটি দ্বিধাতুক নির্যুক্ত প্রবন্ধ। ৫৯১।২
প্রতিপাদ্যং যত্র শৃঙ্গং বীরশ্রীঃ সুখদায়িনী। ॥৫৯২।১
যে প্রবন্ধ গানের প্রতিপাদ্য বিষয়সমূহ বীররস ভাবের প্রকাশক, তাকেই বলে
বীরশ্রী প্রবন্ধ। ৫৯২।১
টিপ্পনী: রত্নাকরের বিবৃতি অনুযায়ী বীরশ্রী ছিল একটি দ্বি ধাতুক
প্রবন্ধ, কিন্তু গানের প্রতিপাদ্য বিষয়বস্তু সম্পর্কে শার্ঙ্গদেব বা তার টীকাকারদ্বয়
কোন কিছু মন্তব্য করেন নি। বীরশ্রীর উদগ্রাহ অংশে থাকতো পদ এবং ধ্রুব
অংশে থাকতো বিরুদ। কল্লিনাথের মতানুযায়ী, বীরশ্রীকে আভোগ অনুষ্ঠানের
দ্বারা ত্রিধাতুকও করা যেতে পারতো। গাওয়া হতো তালে। সুতরাং বীরশ্রী
ছিল তিন অঙ্গযুক্ত ভাবনী জাতীয় নির্যুক্ত প্রবন্ধ। ॥৫৯২।১
সা ঢোল্লরীতি কথিতা লাটভাষা বিনির্মিতা। ॥৫৯২।২
লাট ভাষায় বিরচিত প্রবন্ধকে বলে ঢোল্লরী। ৫৯২।২
টিপ্পনী: রত্নাকরের ঢোল্লরীও লাট ভাষায় রচিত হতো। অধিকন্তু
জানা যাচ্ছে, এই প্রবন্ধ গানের ছন্দ ছিল দোধক (৫৬২।২ সূত্র দ্রষ্টব্য) এবং

সঙ্গীত পারিজাত ৩২৫
গানের শেষে যুক্ত থাকতো ঢোল্লরী কথাটি। ইতিপূর্বে আলোচিত লোলী
প্রবন্ধর মতো, ঢোল্লরী গানের মধ্যেও আভোগ অনুষ্ঠান করা ছিল বে-আইনী।
অর্থাৎ, লোলীর মতো ঢোল্লরীও ছিল একটি দ্বিধাতুক নির্যাক্ত প্রবন্ধ। গানের
পদ রচিত হতো কেবলমাত্র লাট ভাষায়। লাট দেশ ছিল, এ-কালের অন্ধ্র ও
হায়দরাবাদের কাছাকাছি একটা জায়গা। ॥৫৯২॥
ওবীস্বল্পাক্ষরৈর্বর্ণৈর্জাতা সা বহুভি স্বরৈঃ। ৫৯৩।১
যে প্রবন্ধ গানের মধ্যে বর্ণের অল্পত্ব ও স্বরের বাহুল্য পরিলক্ষিত হয়, তাকেই
বলে ওবী প্রবন্ধ। ৫৯৩।১
টিপ্পনী : ওবী গানের বর্ণর অল্পত্ব ও স্বরের বাহুল্য সম্পর্কে পারিজাতকার
যা বলেছেন, রত্নাকরে তার ইঙ্গিতমাত্রও নেই। রত্নাকরে বর্ণিত ওবী
প্রবন্ধর সব কিছুই ছিল (রত্নাকরে বর্ণিত) লোলী প্রবন্ধর মতো। কেবল,
গানের শেষে লোলীর পরিবর্তে ওবী কথাটি যুক্ত হতো। বলাবাহুল্য, লোলী ও
ঢোল্লরী প্রবন্ধর মতো ওবী প্রবন্ধর মধ্যে আভোগ অনুষ্ঠান করা ছিল
বে-আইনী। অর্থাৎ, ওবীও ছিল একটি দ্বিধাতুক নির্যাক্ত প্রবন্ধ। প্রসঙ্গক্রমে
এখানে উল্লেখযোগ্য যে, “ওবী”-র উল্লেখ ভিন্ন অর্থে অন্যত্রও পাওয়া
যায়। যেমন, সন্ত জ্ঞানেশ্বরের (১৩শ খৃষ্টাব্দের প্রথমার্ধ) পদাবলী। জ্ঞানেশ্বরের
“ওবী” ছিল মহারাষ্ট্র ভাষায় রচিত পদ, যার রাগ ও তাল কোন নিয়ম মেনে
চলতো না। ৫৯৩।১
সংজ্ঞাতং পাটবর্ণৈস্তস্তদ দম্ভীতি প্রতিষ্ঠিতম ॥ ৫৯৩।২
পাট-বর্ণের দ্বারা বিরচিত প্রবন্ধই ‘দম্ভী’ প্রবন্ধ নামে প্রখ্যাত। ৫৯৩।২
টিপ্পনী : পাট-বর্ণ বাক্যটি এখানে এমনভাবে ভণিত হয়েছে যে
বিভ্রান্ত হবার অবকাশ আছে। পাট অর্থে মৃদঙ্গাদি বাদ্যযন্ত্রের বোল-কে
বোঝায় এবং বর্ণ অর্থে বোঝায় অক্ষরকে। কিন্তু, আলোচ্যক্ষেত্রে অক্ষরটা
অর্থবহ ভাষার অক্ষর কিংবা গানের অক্ষর অথবা বাদ্যযন্ত্রের অর্থহীন
‘বোলে’র অক্ষর সেটা ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। পারিজাত পাঠক অবশ্যই
লক্ষ্য করে থাকবেন, ইতিপূর্বে পাট ও পদ (যা রচিত হয় অক্ষর বিন্যাসের
দ্বারা) সহযোগে রচিত একাধিক প্রবন্ধ-গীতির প্রতিপাদ্য বিষয় গ্রন্থের মধ্যে
আলোচিত হয়েছে। সুতরাং, ‘দম্ভী’র বর্ণ অর্থে সম্ভবতঃ এখানে অর্থবহ
ভাষার বা ‘গানে’র অক্ষর বোঝাচ্ছে না। অপরপক্ষে, বর্ণ অর্থে, ক্ষেত্রবিশেষে,

রাগের আরোহণ-অবরোহণ ক্রমের স্বর-শ্রুতি-সন্নিবেশও বোঝায়, আবার
'বোলে'-র অক্ষরকেও বোঝাতে পারে। কিন্তু, আলোচ্যক্ষেত্রে 'দন্তী' অর্থে
ত্রিবট্-তারানার মতো কোন কিছুকে বোঝাচ্ছে কিনা তা-ও বুঝতে পারা
যাচ্ছে না।
'দন্তী' প্রবন্ধর উল্লেখ রত্নাকরেও আছে, কিন্তু তার কোন রকম
বোধগম্য ব্যাখ্যা পত্রস্থ হয় নি। রত্নাকরের 'দন্তী' ছিল তিন খণ্ডে বিভক্ত
অনুপ্রাস-প্রধান গীতি এবং পূর্বোল্লিখিত 'ওবী' 'লোলী' প্রভৃতির মতো 'দন্তী'
কথাটারও উল্লেখ থাকতো গানের শেষে। কিন্তু, সমস্যা হচ্ছে অনুপ্রাস
অর্থে রত্নাকর এখানে কাব্য-গীতির অনুপ্রাস বুঝিয়েছেন কিংবা ত্রিবট-
তারানার মতো ভিন্ন প্রকার গীতির নাদ্যাত্মিক অনুপ্রাস বুঝিয়েছেন?—
আপাততঃ দেখা যাচ্ছে, তিন খণ্ডে বিভক্ত 'দন্তী'র মতো ত্রিবট্-তারানাও
তিন খণ্ডে বিভক্ত গীতি।
আলোচ্য প্রসঙ্গে 'দিণ্ডী' নামক একটি গীতি পদ্ধতির কথাও উল্লেখযোগ্য।
সন্ত জ্ঞানেশ্বরের সমধর্মী মহারাষ্ট্রদেশীয় পণ্ডিত একনাথের পদাবলীর মধ্যে
'দিণ্ডী'র উল্লেখ পাওয়া যায়। দেখা যায়, জ্ঞানেশ্বরের 'ওবী'র মতো
একনাথের 'দিণ্ডী'ও ছিল, মহারাষ্ট্র ভাষায় রচিত পদ যার রাগ ও তাল
কোন নিয়মের অধীন ছিল না। এবং বলাই বাহুল্য, রত্নাকর ও পারিজাতের
'দন্তী'র সঙ্গে একনাথের 'দিণ্ডী'র কোন দিক দিয়েও কোন রকম মিল
নেই। ৫৯৩।২
যাবদ দ্রাবিড ভাষাভি বিন্দুঃ ( চিন্দুঃ ? ) স্যাৎ সুখদায়কঃ।
সর্বৈস্তালেশ্চ যুক্তো যঃ সদা দ্রুতগতির্ভবেৎ ॥ ৫৯৪
যাবতীয় দ্রাবিড় ভাষায় রচিত শ্রুতিমধুর প্রবন্ধকে 'বিন্দু' প্রবন্ধ বলে।
এই প্রবন্ধ সর্বদাই দ্রুত-লয়ে পরিবেশিত হয় এবং সব রকম তালের মাধ্যমেই গীত
হতে পারে। ৫৯৪
টিপ্পনী: বিন্দু নামক কোন প্রবন্ধর উল্লেখ রত্নাকরে নেই। তবে, ভিন্ন
ক্ষেত্রে আমরা 'চিন্দু' নামক একটি প্রবন্ধর উল্লেখ পাই। এই 'চিন্দু' প্রবন্ধ ছিল
শৃঙ্গার-রস প্রধান গীতি। রচিত হতো তামিল ভাষায় এবং গীত হতো মিশ্র
রাগাদির মাধ্যমে মধ্য ও দ্রুত লয়ে। বলাবাহুল্য, বিন্দু বা চিন্দু নামক কোন
প্রবন্ধর পরিচিতিই রত্নাকরে স্থান পায় নি। ৫৯৪

সঙ্গীত পারিজাত ৩২৭
তৈলঙ্গ ভাষয়োৎপন্নো দরুদ্ৰ দ্রুতগতির্ভবেৎ। ৫৯৫।১
তৈলঙ্গ (বর্তমান ভারতের তেলেঙ্গানা অঞ্চল) ভাষায় বিরচিত দ্রুতগতিযুক্ত
প্রবন্ধকে 'দরু' প্রবন্ধ বলে। ৫৯৫।১
টিপ্পনী : পারিজাতের 'দরু' প্রবন্ধের পরিচিতি দুর্বোধ্য। 'দরু'-র উল্লেখ
রত্নাকরেও নেই, অন্য কোন গ্রন্থেও এর উল্লেখ পেয়েছি বলে মনে পড়ে না।
অর্থাৎ প্রবন্ধটি কোন রাগের মাধ্যমে গীত হতো; দ্রুতগতিযুক্ত কোন তালের
প্রতিপাদ্য ছিল, এবং কেমন ছিল এর ধাতু ব্যবস্থা, সে সম্বন্ধে আমরা কিছুই
জানতে পারছি না। ৫৯৫।১
অষ্টকং নিপুটের্নৈব পদৈরষ্টভিরীরিতম্ ॥ ৫৯৫।২
সর্বভাষা সমুংপন্নং ঘণ্টানাদেন সংযুতম।
তরচান্য বিশেষস্তু জ্ঞাতব্যঃ সম্প্রদায়তঃ ॥ ৫৯৬
যে প্রবন্ধ গতির পদের সংখ্যা হয় সাকুল্যে আটটি; গাইতে হয়
ত্রিপুট্ তালে ও ঘটানাদন সহযোগে তারই নাম অষ্টক প্রবন্ধ। এই
অষ্টক প্রবন্ধের পদগুলি যে কোন ভাষাতেও রচিত হতে পারে; কিন্তু এর
'গাঁচকী' প্রভৃতি জ্ঞাতব্য বিষয়গুলি জেনে নিতে হয় 'সম্প্রদায়'-পরম্পরার নিকট
থেকে। ৫৯৫।২-৫৯৬
টিপ্পনী : রত্নাকরে 'অষ্টক' নামক কোন প্রবন্ধর উল্লেখ পাওয়া যায় না।
হয়তো, এই প্রবন্ধটি রত্নাকরের পরবর্তী যুগে, তথা, অহোবলের সমসাময়িক
কালে প্রচলিত ছিল। ফলে, অষ্টক-এর পরিচয় সম্পর্কে আমরা কোন কিছুই
জানতে পারছি না—দ্বিবিধ কারণে। প্রথমতঃ পারিজাতকার নিজেই
বলছেন অষ্টক-এর জ্ঞাতব্য বিষয়গুলি জেনে নিতে হয় 'সম্প্রদায়'-পরম্পরার
নিকট থেকে, দ্বিতীয়তঃ রত্নাকরের মতো কোন প্রামাণ্য গ্রন্থে অষ্টক-এর
উল্লেখ পাওয়া যায় না। তবে, এটুকু জানা যাচ্ছে যে অষ্টক গাওয়া হতো ত্রিপুট
তালের মাধ্যমে। ত্রিপুট সম্পর্কে রত্নাকর যা বলেছেন, তা পড়ে মনে হয় ত্রিপুট
অড্ড তালের মতোই একটি সমপদী ছন্দের তাল ছিল (২৩২ ও ২৮৪ সূত্র দ্রষ্টব্য)
ত্রিপুট সম্পর্কে হরি নায়কের 'সঙ্গীত সার' গ্রন্থে আবার দেখা যায়—
ত্রিধা-স্তুতত্ প্রোক্তস্তালেন ত্রিপুটেনতু।
ধ্রুবলক্ষণকো মঠ্যলক্ষণশ্চেতি স দ্বিধা ॥
(ধ্রুব-তাল ও মঠ্য-তাল সম্পর্কে পারিজাতের ২৮০ ও ২৮১ সূত্র দ্রষ্টব্য)

অতঃপর লক্ষ্য করবার বিষয়, 'অষ্টক-এর জ্ঞাতব্য বিষয়গুলি জেনে নিতে
হয় সম্প্রদায়-পরম্পরার' নিকট থেকে, পারিজাতকার এখানে গুরু-পরম্পরার
উল্লেখ করেন নি, সম্প্রদায়ের উল্লেখ করেছেন। অর্থাৎ, বাঙলাদেশের
ক্ল্যাসিক্যাল কীর্তন ৷৷ মথুরা-বৃন্দাবন-অঞ্চলের বিঞ্চপদ এবং কৌলীন্যের সঙ্গে
যেমন সম্প্রদায় বিশেষের একটা ঐতিহ্যমণ্ডিত সম্পর্ক পরিলক্ষিত হয়, আলোচ্য-
ক্ষেত্রে অনুরূপ একটি 'সম্প্রদায়'-এর কথা বলেছেন পারিজাতকার। যেমন—
একজন ঘরোয়াণাদার মুসলমান ওস্তাদের নিকট যে কোন হিন্দু ধর্ম ত্যাগ
না করেও গান শিখতে পারেন। এ ক্ষেত্রে পরিচিতিটা হবে গুরু-পরম্পরা।
কিন্তু, বাঙলাদেশে এমন ( বৈষ্ণব ) সম্প্রদায়ের কীর্তনীয়া আজও রয়েছেন যারা
বৈষ্ণব-ধর্মাবলম্বী (মতাবলম্বী?) শিষ্য ব্যতীত স্ব সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যমণ্ডিত
'কীর্তন-বিদ্যা' দান করবার কল্পনাও করতে পারেন না।—এ-ক্ষেত্রে পরিচিতিটা
হবে সম্প্রদায়-পরম্পরা। অবশ্য, সীমিত বিদ্যা নিয়েই আমরা এই আলোচনায়
অগ্রসর হয়েছি, তবুও মনে হয়, আটটি পদযুক্ত অষ্টক প্রবন্ধর সঙ্গে মথুরা
বৃন্দাবন অঞ্চলে প্রচলিত বিঞ্চপদের একটা ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। ৫৯২-৫৯৬
উত্তরাদিক ভাষাভির্যত্তু ধ্রুবপদং স্মৃতম্।
বর্ণৈর্বেতেষু স্বল্পত্বং স্বরৈরত্র সমীরণ॥ ৫৯৭
উত্তরখণ্ডে অবস্থিত প্রদেশগুলির ভাষায় রচিত প্রবন্ধ-গীতিকে ধ্রুবপদ
বলে। এই ধ্রুবপদ প্রবন্ধে বর্ণের ব্যবস্থা অল্প এবং স্বরের প্রয়োগ হয়
বেশী। ৫৯৭
টিপ্পনী: শ্লোকটিতে ভাষার ভুল লক্ষ্য করা যাচ্ছে। মনে হয় এই
দুটি পংক্তির সঙ্গে আরও কয়েকটি পংক্তি ছিল। কিন্তু সেগুলি না পাওয়ার
জন্য ব্যাখ্যাকার্য সুসঙ্গত হচ্ছে না।
উত্তরখণ্ড অর্থে উত্তর ভারত তথা হিন্দুস্থানকে বোঝাচ্ছে। অর্থাৎ,
হিন্দুস্থানের বিভিন্ন প্রদেশের অধিকাংশ অধিবাসী যে সব ভাষা বুঝতে পারে
কিংবা যে সব ভাষায় কথাবার্তা বলতে পারে, সেই সব ভাষায় রচিত প্রবন্ধকে
ধ্রুবপদ বলে। এই ধ্রুবপদ প্রবন্ধকে অনেকে হিন্দুস্থানী ধ্রুপদ গীতি-রীতির
আদি রূপ হিসাবে কল্পনা করতে পারেন; কিন্তু, আলোচ্যক্ষেত্রে লক্ষণীয়
অহোবলের আসল বক্তব্যটি। অর্থাৎ, ধ্রুবপদ প্রবন্ধে বর্ণের ব্যবস্থা তথা
প্রয়োগ হয় অল্প এবং স্বরের প্রয়োগ হয় বেশী। কিন্তু, আমাদের পরিচিত

সঙ্গীত পারিজাত ৩২৯
ধুরপদ গীতি-পদ্ধতির মধ্যে সত্যিই কি বর্ণের তুলনায় স্বরের প্রয়োগ বেশী হয়?
অপরপক্ষে বিবেচ্য, বর্ণ ও স্বর অর্থে পারিজাতকার সঠিকভাবে কী বোঝাতে
চেয়েছেন? গীত-বর্ণ, পাট-বর্ণ, ভাষার বর্ণ কিংবা অন্য কোন বর্ণ বা অক্ষর
এবং স্বর অর্থে সরগম্-এর মতো কিছু বোঝাচ্ছেন কিংবা কাব্য-গীতির
স্বরাশ্রয়ী সুর-বিহারের কথা বোঝাচ্ছেন? বলাবাহুল্য, আজকের দিনের আমরা
যা দু' চারটি পুরোণ ধুরপদের বন্দিশ শুনতে পাই, সে বন্দিশের মধ্যে সরগম-এর
অস্তিত্ব তো নেই-ই পরন্তু, স্বরের তুলনায় ভাষা-বর্ণের ব্যবহারই অধিক বলে
মনে হয়। অধিকন্তু, ধুরপদ্ গীতি-রীতির উদ্ভবকালীন উপাখ্যানগুলিও
আলোচ্য প্রসঙ্গে প্রণিধানযোগ্য। যেমন—
(ক) রাজা মান তোমর-এর (১৪৮৬-১৫১৬ খৃঃ) পূর্ববর্তীকালে দিল্লী,
আগ্রা অঞ্চলের মেয়েরা এক রকম ঢং-এর গান গাইতো যার নাম ছিল ধুরপদ্।
প্রচলিত প্রবাদকে মর্যাদা দিলে আমাদের স্বীকার করতেই হবে, উক্ত মেয়েরা
ছিল সঙ্গীত-অজ্ঞ এবং গানগুলো ছিল ছড়া-গানের মতো কোন কিছু।
অর্থাৎ, ওই সব গানে স্বর-প্রয়োগজনিত পাণ্ডিত্য অবশ্যই প্রকাশ পেতো না।
(খ) আবুল ফজল বলেছেন, দেশের বীর পুরুষদের প্রশংসা কীর্তন করে
গোয়ালীয়র ও আগ্রা অঞ্চলে এক রকমের (চারণ গীত?) গান গাওয়া
হতো যার নাম দুরপদ্। বলা বাহুল্য, এ সব গানের মধ্যে স্বর প্রয়োগজনিত
পাণ্ডিত্য প্রকাশের অবকাশ নিশ্চয়ই থাকতো না।
(গ) রাজা মান তোমর্ যে ধুরপদ্ গীতি-রীতি উদ্ভাবন করেছিলেন তাঁর
সভা-গায়কদের (নায়ক বক্সু, মঝু, ভানু প্রভৃতি) সহায়তায়, সে ধুরপদ্
রীতির ভাষাটা গোয়ালীয়রের চলতি, উপকরণ সংগৃহীত হয়েছিল সুপ্রাচীন
সালগ-সুড়ের অন্তর্গত ধ্রুব-পদ থেকে। মতান্তরে, বিষ্ণুপদ থেকে। কিন্তু,
ধ্রুবই হোক আর বিষ্ণুই হোক, গানের পদটাই ছিল প্রধান, স্বর নয়।
তবে, তর্কের খাতিরে এখানে একটি ব্যতিক্রমের উল্লেখও করা যেতে
পারে। বীজাপুরের দ্বিতীয় আদিল শাহ্ (১৫৭৯-১৬২৬ খৃঃ) বিরচিত
‘নওরস-ই-আদিল’ গ্রন্থে যে সব গানের উল্লেখ দেখা যায়, সেই সব গানের
বন্দিশের মধ্যে হয়তো বা ভাষা-বর্ণের তুলনায় স্বরের প্রাধান্য ছিল সুর-বিহারের
কারণে—কারণ ‘তুজুক-ই-জাহাঙ্গিরী-ই’ গ্রন্থের বক্তব্য অনুযায়ী ‘নওরস-ই-
আদিল’-এর গানগুলি নিরঙ্কুশ ধুরপদ্ রীতির ছিল না—ছিল ধুরপদ ও খেয়াল
রীতির মাঝামাঝি এক রকমের ধ্রুপ-খেয়াল জাতীয় গান। অর্থাৎ, কথঞ্চিৎ
২২

৩০ সঙ্গীত পারিজাত
পরিমাণে খেয়ালের অস্তিত্ব থাকার কারণে আলোচ্য গানগুলির বন্দিশ হয়তো বা
চঞ্চল ছিল তথা স্বর-প্রয়োগের আধিক্যজনিত সুর-বিহারে আকর্ষণীয় হয়ে
উঠত। বলা বাহুল্য, 'নওরস-ই আদিল' গ্রন্থে স্বরলিপির অস্তিত্ব নেই—অর্থাৎ
গ্রন্থের গানগুলি কী ধরণের ছিল সে সম্বন্ধে কিছুই জানবার উপায় নেই আমাদের
তবুও ব্যতিক্রমের নজীর হিসাবে এই গীতি-রীতিটার উল্লেখ করা যেতে পারে,
যদিও—গানগুলি এমনই কাব্য ধর্মী যে এর বন্দিশের মধ্যে স্বরাধিক্য-নিবন্ধন
সম্ভাব্য চাঞ্চল্যকে মেনে নিতে মন চায় না।
অতঃপর বিবেচ্য, পারিজাতের পূর্ববর্তী রত্নাকবে যে ধ্রুবপদের পরিচয়
উল্লিখিত হয়েছে, তার সঙ্গে আলোচ্য স্বর-প্রধান ধ্রুবপদের কোন সামঞ্জস্য
আছে কিনা। রত্নাকরের ধ্রুবপদ 'জয়ন্ত' 'শেখর' প্রভৃতি ষোলটি প্রকার
ভেদের দ্বারা চিহ্নিত হয়েছে—অক্ষর-সংযুক্তির সংখ্যানুপাতে। অর্থাৎ,
রত্নাকরের ধ্রুবপদের প্রথম প্রকার জয়ন্ত' ছিল একাদশ অক্ষরযুক্ত প্রবন্ধ এবং
সর্বশেষ প্রকার 'ললিত' ছিল চাব্বিশ অক্ষরযুক্ত প্রবন্ধ। প্রবন্ধগুলির অক্ষরের
মতো ভাব তাল ও রসও ছিল বিভিন্ন। কিন্তু, এত অক্ষর অর্থে শাঈ দেব
ঠিক কী বোঝাতে চেয়েছেন সেটাই বিবেচ্য। অধিকন্তু বিবেচ্য রত্নাকরের
অন্যতম টীকাকার কল্লিনাথের মন্তব্য। তিনি বলে গেছেন, তার সময়ে
(১৪৫৬-১৪৭৭ খৃঃ) উক্ত ধ্রুবপদগুল প্রচলিত ছিল না। অতএব পারিজাতের
ধ্রুবপদ সম্বন্ধেও আমরা কোনরূপ সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারছিনা। ৫৯৭
ইতি গীত প্রকরণ
বাঙ্ মাতু রুচ্যতে গেয়ং ধাতু রিত্যভিধীয়তে।
বাচং গেয়ঞ্চ কুরুতে যঃ স বাগ্গেয়কারকঃ॥ ৫৯৮
গানের বাণী বা বাক্ বা শব্দকে 'মাতু' বলে এবং সেই গানের স্বর-
বিন্যাসজাত বিভিন্ন গেয় অংশকে বলে ধাতু। যিনি 'বাক্' এবং 'গেয়' রচনা
করেন তাঁকেই বলা হয 'বাগ্গেয়কাবক'। ৫৯৮
কবিতায়াং প্রসিদ্ধো যো দেশী-রাগজ্ঞোপি ভবেৎ।
রাগ-দ্বেষ পরিত্যাগী নির্দোষঃ সার্দ্রচিত্তবান্।
ত্রিস্থান-গমকেষু ক্তো যোহয়মুত্তম ঈরিতঃ॥ ৫৯৯
যিনি খ্যাতিমান কবি, রাগজ্ঞ, ক্রোধ-দ্বেষ-বর্জিত, নির্দোষ, রসাদ্র-চিত্ত

সঙ্গীত পারিজাত ৩৩৯
এবং মন্দ্র ( উদারা ) মধ্য ( মুদারা ) ও তার ( তারা ) তিন স্থানেই গমক
প্রয়োগে সমর্থ, তাঁকেই উত্তম ‘বাগগেয়কার’ বলে। ৫৯৯
বিদধানোঽধিকং ধাতুমল্পমাতুঃ স মধ্যমঃ।
প্রকুর্বন্ রম্যকাং মাতুং স্বল্পধাতুশ্চ সোঽধমঃ॥ ৬০০
যিনি অনেক রাগ সৃষ্টি করতে পারেন কিন্তু গানের মাতু বা শব্দ রচনায়
তেমন সক্ষম নন, তাঁকে বলে ‘মধ্যম বাগগেয়কার’। আর যিনি গানের
শব্দ রচনায় পারঙ্গম অথচ তেমন স্বরজ্ঞান-সম্পন্ন নন, তাঁকে বলা হয়
‘অধম বাগগেয়কার’। ৬০০
ইতি বাগগেয়কার লক্ষণ
মার্গং দেশীঞ্চ যো বেত্তি স গান্ধর্বোহভিধীয়তে।
যো বেত্তি কেবলং মার্গং স্বরাদিঃ স নিগদ্যতে।
যো বেত্তি কেবলং দেশীং পদাদিঃ স উদীরিতঃ॥ ৬০১
গান্ধর্ব উত্তমোজ্ঞেয়ঃ সঃ স্বরাদিস্তু মধ্যমঃ।
পদাদিরধমঃ প্রোক্তো ভরতাদি মুনীশ্বরৈঃ॥ ৬০২
যে ব্যক্তি মার্গ ও দেশী—এই দ্বিবিধ পদ্ধতির সঙ্গীতেই অভিজ্ঞ তাঁকে
বলা হয় ‘গান্ধর্ব’। যিনি কেবলমাত্র মার্গ পদ্ধতির সঙ্গীতে অভিজ্ঞ তাঁর নাম
‘স্বরাদি’। আর যিনি কেবলমাত্র দেশী পদ্ধতির সঙ্গীতে পারঙ্গম তিনি
অভিহিত হন ‘পদাদি’ নামে। ভরত প্রমুখ ঋষিগণের মতে, ‘গান্ধর্ব’ উত্তম,
‘স্বরাদি’ মধ্যম ও ‘পদাদি’ অধম শ্রেণীর গায়ক। ৬০১-৬০২
টিপ্পনী: আলোচ্য সূত্রে পারিজাতকার সনাতন আতিশয্যবাদেরই
পুনরুক্তি করেছেন। উত্তম, মধ্যম ও অধম শ্রেণীর সঙ্গীতজ্ঞদের সম্পর্কে
ভরতাদি ঋষিগণ যে মন্তব্য করে গিয়েছেন, ভরতাদির যুগে হয়তো তার মূল্য
ছিল;—হয়তো তখনকার সঙ্গীত শিল্পীগণ গান্ধর্ব তথা মার্গ সঙ্গীতের ক্রিয়াসিদ্ধ
অংশ সম্পর্কে কিছুটা অভিজ্ঞ ছিলেন; কিন্তু, নাট্যশাস্ত্র পরবর্তী যুগে আলোচ্য
‘উত্তম’ ও ‘মধ্যম’ শ্রেণীর সঙ্গীত শিল্পীরা লোপ পেয়ে গিয়েছিলেন নিঃসন্দেহে।
পরন্তু, যাঁরা তদানীন্তন ভারতীয় সঙ্গীত-বিজ্ঞানের ধারক ও বাহকরূপে বরেণ্য
হয়েছিলেন তাঁরা সকলেই ছিলেন কেবলমাত্র ‘দেশী’ পদ্ধতির সঙ্গীতে পারদর্শী

৩৩২ সঙ্গীত পারিজাত
”—অর্থাৎ, শাস্ত্র-নির্দিষ্ট 'অধম' শ্রেণীর সঙ্গীতবিদ্। অপরপক্ষে গান্ধর্ব তথা
•মার্গ সঙ্গীতের সুপ্রাচীন ঐতিহ্য সম্পর্কিত ঔপপত্তিক অংশ সমূহ ভরত-পরবর্তী
যুগ থেকেই গতানুগতিক পদ্ধতিতে পুঁথিগত হয়ে আসছে—অর্থাৎ শাস্ত্রকারদের
অধিকাংশই পূর্ব সূরীদেরই চর্বিত-চর্বন করেছেন, নিজেরা কোন বিলুপ্ত তথ্যের
মর্মোদ্ধার করে 'অপৌরুষেয়'-কে বিজ্ঞান সম্মত পদ্ধতিরূপে প্রতিষ্ঠা দিয়ে যেতে
পারেন নি। আলোচ্য প্রসঙ্গে 'পদাদি'-র সংজ্ঞাটি সম্পর্কেও একটা কথা বলে রাখা
প্রয়োজন মনে করি। পারিজাতকার যদিও বলেছেন 'ভরত প্রমুখ ঋষিগণের
মতে 'গান্ধর্ব' উত্তম, 'স্বরাদি' মধ্যম ও 'পদাদি' অধম শ্রেণীর গায়ক, কিন্তু,
পারিজাতের পূর্ববর্তী কোন সঙ্গীতশাস্ত্রে আমরা 'পদাদি' নামক কোন সংজ্ঞার
উল্লেখ পেয়েছি বলে মনে করতে পারছি না। 'পদাদি' সংজ্ঞার উদ্ভাবক
সম্ভবতঃ অহোবল-ই, কিন্তু, বিগত যুগের ভব্যতানুযায়ী তিনি নিজে কোন
সাঙ্গীতিক সংজ্ঞার উদ্ভাবকরূপে প্রমাণ রেখে যান নি, পূর্বসূরীদের
প্রতি শ্রদ্ধাবশতঃ নিজের আবিষ্কারটিকে তিনি 'অ-চিহ্নিত-ই' রেখে
গিয়েছেন। ৬০১-৬০২
তৎ বেত্তি যতি গীতং যো গায়কঃ স প্রকীর্তিতঃ।
শ্রুতি জাতি স্বরাভিজ্ঞো রসজ্ঞো জাতি গানবিৎ॥ ৬০৩
ভাষাঙ্গাদি পরিজ্ঞানী লয়জ্ঞ স্তালবিত্তমঃ।
প্রবন্ধগাননিষ্ণাতো বিবিধাপাল কোবিদঃ॥ ৬০৪
ত্রিস্থানগমকৈর্যুক্তো মধুর ধ্বনিভাগ্ ভবেৎ।
কম্পাদি দোষ-হীনশ্চ সাবধানো জিতশ্রমঃ॥ ৬০৫
শুদ্ধচ্ছায়ালগাভিজ্ঞঃ সর্বদাভ্যাসকো ভবেৎ।
এতদ্‌গুণবিশেষাচ্চ উত্তমং গায়নং জগুঃ॥ ৬০৬
যিনি যতি ও গীত সম্পর্কে অভিজ্ঞ তাকে 'গায়ক' বলা হয়। আর যিনি
শ্রুতি, শ্রুতির জাতি, স্বর, রস, জাতি-গান, ভাষাঙ্গ-গান, উপাঙ্গ-গান সম্বন্ধে
অভিজ্ঞ, তালজ্ঞ ও লয়জ্ঞদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ, প্রবন্ধ গান পরিবেশনে দক্ষ;
বিভিন্ন প্রকার আলাপে বিচক্ষণ, মন্দ্র, মধ্য ও তার এই তিন স্থানেই গমক
প্রয়োগে সমর্থ, সুমধুর কণ্ঠস্বরের অধিকারী; 'কম্প' প্রভৃতি গায়ক-দোষ-শূন্য;
গীতির নিপুণ প্রয়োগ সম্পর্কে সতর্ক ও অক্লান্ত পরিশ্রমী, শুদ্ধ ও ছায়ালগ

সঙ্গীত পারিজাত ৩৩৩
গীতিতে অভিজ্ঞ এবং সর্ব্বদাই অভ্যাস-পরায়ণ—এই সকল বিশেষ গুণ-সম্পন্ন
গায়ককে ‘উত্তম গায়ক’ বলা হয়। ৬০৩-৬০৬
টিপ্পনী : পারিজাতকার ‘যতি গীতং’ অর্থে কী বোঝাতে চেয়েছেন,
আমরা অনেক চেষ্টা করেও তা বুঝতে পারলাম না। মনে হয় আলোচ্য
সূত্রটির মধ্যে কোথাও একটা মারাত্মক ভুল আছে। এ সম্বন্ধে আমরা বিদগ্ধ
পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। ৬০৩-৬০৬
গুণৈঃ কতিপয়ৈহীনো নির্দোষো মধ্যমঃ স্মৃতঃ।
উক্তৈগুণৈর্বিহীনোপি সদোষো গায়নাধমঃ॥ ৬০৭
পূর্বোক্ত গায়ন-গুণসমূহের মধ্যে থেকে—মাত্র কয়েকটি গুণের অভাব যদি
কোন গায়কের মধ্যে পরিলক্ষিত হয়, তাহলে সে গায়ক ‘মধ্যম গায়ক’-রূপে
অভিহিত হন। কিন্তু কোন গায়কের মধ্যে যদি সব কটি গুণেরই অভাব
পরিলক্ষিত হয়, তাহলে তিনি অভিহিত হবেন ‘অধম গায়ক’-রূপে। ৬০৭
খালুলঃ কফধাতুঃ স্যাৎ নারাটঃ পিত্তধাতুকঃ।
বোম্বকো বাতধাতুঃ স্যাণ্ মিশ্রকো মিশ্রণাদ্ ভবেৎ॥ ৬০৮
কথ্যতে লক্ষণং তেষাং খালুলো মধুরধ্বনিঃ।
আদিল্ল এব ঋষ স্যাৎ প্রৌঢ়শ্চেন্মন্দ্র মধ্যয়োঃ॥ ৬০৯
স্থানত্রয়েহপি নারাটঃ প্রগল্ভঃ সূক্ষ্মনাদকঃ।
বোম্বক রুক্ষ-শব্দঃ স্যাৎ কঠিনোচ্চতর ধ্বনিঃ॥ ৬১০
এতে ত্রাস্রগুণাঃ সর্বে তিষ্ঠন্তি মিশ্রকে পুনঃ।
শ্রেষ্ঠশ্চ ত্রিষু মিশ্রঃ স্যাদ্ গুণবাহুল্য যুক্ততঃ॥ ৬১১
যে গায়কের ধাতু কফ-প্রধান তাকে বলে খালুল। যার ধাতু পিত্ত-প্রধান
তাকে বলে নারাট। যার ধাতু বায়ু-প্রধান তাকে বলে বোম্বক। আর যার
ধাতুতে বায়ু-পিত্ত-কফ এই তিনটিই বিদ্যমান থাকে তাকে বলে মিশ্রক।
অতঃপর এই সব গায়কের লক্ষণাদি বলা যাচ্ছে : কফ প্রাধান্য হেতু খালুল
গায়কের কণ্ঠস্বর মধুর হয়। অবশ্য, আদিল্ল নামক এক শ্রেণীর খালুল গায়ক
আছে যাদের কণ্ঠস্বর মন্দ্র ও মধ্যস্থানে উত্তমরূপে নির্গত হয়। নারাট
গায়কদের ধাতু পিত্ত-প্রধান হওয়ার জন্য তাদের কণ্ঠস্বর মন্দ্র, মধ্য ও তার—

৩৩৪ সঙ্গীত পারিজাত
এই তিন স্থানেই প্রগলভ ও সুস্থস্বরূপে বিরাজ করতে পারে। বোধক গায়কদের
ধাতু বায়ু-প্রধান হওয়ার কারণে তাদের কণ্ঠস্বর হয় তেমনি উঁচু তেমনি রূক্ষ
তেমনি কড়া। অপরপক্ষে, 'মিশ্রক' গায়কদের মধ্যে উপরোক্ত ত্রিবিধ ধাতুভাত
গুণাবলীই বিদ্যমান থাকে। অতএব, কণ্ঠস্বরের গুণবাহুল্যের কারণে 'মিশ্রক'
গায়করাই সর্বশ্রেষ্ঠ। ৬০৭--৬১১
টিপ্পনী: খালুল, নারট, মিশ্রক, প্রভৃতি গায়কদের সম্পর্কে বিস্তৃতভাবে
জানতে হলে রত্নাকরের শরণাপন্ন হওয়া কতব্য। ৬০৮ ৬১১
সংদষ্টকাদিক দোযাঃ স্যু স্ত্রিংশচ্চ গায়নেসতি।
সংদষ্টোদঘৃষ্ট সীৎকারী ভীত শঙ্কিত কম্পিতাঃ॥ ৬১২
করালী বিকলঃ কাকী বিতালঃ করভোদ্ভটৌ।
ঘোষড় স্তম্ভকী বক্রী ফুল্লগল্ল প্রসারিণৌ॥ ৬১৩
নিমীলকো হতস্বরো বিরসোহব্যক্ত মিশ্রকৌ।
অনবধানকঃ প্রোক্তঃ স্থান ভ্রষ্টান্যুনাসিকো।
বিমনাশ্চালকো দোল এক দৃষ্ট্যূর্ধগায়িনো॥ ৬১৪
অধম শ্রেণীর গায়কদের মধ্যে 'সংদষ্ট' প্রভৃতি ত্রিশ রকমের দোষ থাকতে
পারে।
যথা—
১। সংদষ্ট ২। সীৎকারী ৩। ভীত ৪। শঙ্কিত ৫। কম্পিত
৬। করালী ৭। বিকল ৮। কাকী ৯। বিতাল ১০। করভ ১১।
উদ্ভট ১২। ঘোষড় ৩। স্তম্ভকী ১৪। বক্রী ১৫। ফুল্লগল্ল ১৬।
প্রসারী ১৭। নিমীলক ১৮। হতস্বর ১৯। বিরস ২০। অব্যক্ত ২১।
মিশ্রক ২২। অনবধানক ২৩। স্থান-ভ্রষ্ট ২৪। আনুনাসিক ২৫। বিমনা
২৬। চালক ২৭। দোল ২৮। একদৃষ্টি ২৯। ঊর্ধ্বগায়ী ৩০।? ৬১১-৬১৪
টিপ্পনী: গ্রন্থকার ত্রিশ রকম দোষের কথা উল্লেখ করেছেন, কিন্তু
নাম করেছেন মাত্র ঊনত্রিশটির। অধম গায়কদের 'দোষ'-এর সংখ্যা সম্বন্ধে
বিভিন্ন গ্রন্থকার ভিন্ন ভিন্ন অভিমত পোষণ করেন। সেই কারণে পারিজাতের
ত্রিশ সংখ্যক 'দোষ'-টির সঠিক পরিচয় দেওয়া তথা অনুমানকে প্রশ্রয় দেওয়া
আমরা যুক্তিযুক্ত মনে করছি না। ৬১২-৬১৪