सामग्री पर जाएँ
सर्वकोश
संग्रह पर लौटें

सङ्गीतपारिजात (अहोबल - वीणा के तारों पर शुद्ध व विकृत स्वर-स्थान निर्धारण का ऐतिहासिक ग्रन्थ)

Sangitaparijata of Ahobala on Indian Musicology

पण्डित अहोबल (टीकाकार: कलानिधि कलिन्द) द्वारा

DevanagariHindipublished358 पृष्ठ

प्रारंभिक मंगलाचरण, नाद-उत्पत्ति एवं स्वर-परिभाषा (अध्याय १)

পণ্ডিতপ্রবর অহোবলকৃত
সঙ্গীত পারিজাত
অখণ্ড সংস্করণ
ভাষ্যকার
শ্রীশচীন্দ্রনাথ মিত্র
781
M 684
S (8)
এম. সি. সরকার অ্যাণ্ড সন্স প্রাইভেট্ লিমিটেড
কলিকাতা-১২

প্রকাশক—
শ্রীসুপ্রিয় সরকার
এম. সি. সরকার অ্যান্ড সন্স প্রাঃ লিঃ
১৪, বঙ্কিম চাটুজ্যে স্ট্রীট, কলিকাতা ১২
প্রচ্ছদপঃ —
শ্রীমৃণাল চক্রবর্ত্তী
মুদ্রক—
শ্রীকালিপদ নাথ
নাথ ব্রাদার্স প্রিন্টিং ওয়ার্কস্
৬, চালতাবাগান লেন, কলিকাতা-৬
মূল্য—দশ টাকা

ডাঃ বিমল রায়, এম. বি.
বন্ধুবরেষু

এই লেখকেরই—
ভারতীয় সঙ্গীত পরিচিতি
ভজন গীতি-গুচ্ছ
ভজন গীতি-মালিকা
ভজন গীতি-লেখা

ভূমিকা
হিন্দুস্থানী পদ্ধতির সঙ্গীত-রসিকদের নিকট পণ্ডিতপ্রবর অহোবল বিরচিত
সঙ্গীত পারিজাত একটি অতি প্রয়োজনীয় সঙ্গীতশাস্ত্র।
সঙ্গীত পারিজাত গ্রন্থটি যে ঠিক কবে লেখা হয়েছিল সে সম্বন্ধে আলোচনার
অবকাশ আছে। অহোবল নিজে এ সম্বন্ধে নীরব। ফলে, অনেক গুণীজ্ঞানী
অনুমান করেন, পারিজাত লেখা হয়েছিল সপ্তদশ শতাব্দীর অপরাদ্ধে; যেহেতু,
পারিজাতের অনেক কিছু বক্তব্য বিষয়ের সঙ্গে চতুর্দশ শতকের শেষভাগে
রচিত লোচন-পণ্ডিত-কৃত রাগ-তরঙ্গিণী ও ১৬১০ খৃষ্টাব্দে বিরচিত
সোমনাথ-কৃত রাগ-বিবোধ গ্রন্থদুটির অনেক কিছু বিষয়বস্তুর সামঞ্জস্য আছে।
এ ছাড়া, Oriental Collection ( Vol. I ) গ্রন্থে দেখা যায় Sir W. Ousley
বলছেন : ১৭২৪ খৃষ্টাব্দে জনৈক বাসুদেবের পুত্র পণ্ডিত দীননাথ কর্তৃক
সঙ্গীত পারিজাত ফার্সী ভাষায় অনুবাদিত হয়। এই অনুবাদকার্য্য সংঘটিত
হয়েছিল, সম্ভবতঃ, হিন্দুস্থানের অন্যতম সঙ্গীতজ্ঞ সম্রাট মহম্মদ শাহর নির্দেশে ;
কারণ, ফার্সী ভাষায় অনুবাদিত যে সঙ্গীত পারিজাতটি আজও রামপুর
নবাবের রাজকীয় গ্রন্থাগারে সযত্নে রক্ষিত রয়েছে, তাতে সম্রাট মহম্মদ
শাহর খোদ গ্রন্থাধ্যক্ষর শীলমোহর মুদ্রিত রয়েছে দেখা যায়। বলা বাহুল্য,
মহম্মদ শাহ সিংহাসন গ্রহণ করেছিলেন ১৭১৯ খৃষ্টাব্দে এবং সঙ্গীত পারিজাত
ফার্সী ভাষায় অনুবাদিত হয়েছিল ১৭২৪ খৃষ্টাব্দে।
কিন্তু আমাদের মনে হয়, সঙ্গীত পারিজাতের সম্ভাব্য রচনাকাল নির্ণয়
করবার জন্য যতটুকু আলাপ-আলোচনা হওয়া প্রয়োজন, আজও তা হয় নি।
কারণ, যে যে বিষয়বস্তুর সামঞ্জস্য লক্ষ্য করে পারিজাতকে রাগ-তরঙ্গিণী ও
রাগ-বিবোধের পরবর্ত্তীকালে রচিত গ্রন্থ বলে অনুমান করা হয়েছে, ঠিক সেই
সেই কারণেই, পারিজাতকে খৃষ্টীয় চতুর্দশ শতকেরও পূর্ববর্ত্তীকালে রচিত
গ্রন্থরূপে যুক্তি দেখানোর অবকাশ আছে। যেমন, পারিজাতকার ভৈরবী
রাগ সম্বন্ধে বলছেন, এই রাগে গা-ধা-নি কোমল ব্যবহৃত হয়। অপরপক্ষে,
রাগ-তরঙ্গিণী বলছেন, ভৈরবী রাগে কেবলমাত্র কোমল গা-নি ব্যবহৃত
হওয়া উচিত; যাঁরা অধিকন্তু হিসাবে কোমল ধা ব্যবহার করেন তাঁরা

[ চ ]

ভ্রান্ত। অর্থাৎ, রাগ-বিবর্তনের বিজ্ঞান অনুযায়ী তরঙ্গিনীর আমলের গা-নি
কোমলযুক্ত ভৈরবী পারিজাতের আমলে গা-ধা-নি কোমলযুক্ত ভৈরবীতে
পরিণত হয়েছিল। এদিক দিয়ে দেখতে গেলে পারিজাত তরঙ্গিনীর
পরবর্তীকালে রচিত গ্রন্থ। অপরপক্ষে, আমরা দেখতে পাচ্ছি পারিজাতে
কোন নতুন রাগের উল্লেখ নেই; কিন্তু তরঙ্গিনীতে রয়েছে। পারিজাতে
দীপক রাগের পরিচয় রয়েছে, কিন্তু রাগ-তরঙ্গিনী বলছেন, এসো পণ্ডিতবর্গ
মিলে বিলুপ্ত দীপকের সত্য-স্বরূপ নির্ণয় করবার চেষ্টা করা যাক। অর্থাৎ,
দীপক তখন অপ্রচলিত হয়ে গিয়েছিল। সর্বপরি, রাগ-তরঙ্গিনীর প্রাচীনত্ব ( ? )
সম্বন্ধেও অনেক কিছু ইঙ্গিত দেওয়া যেতে পারে। গ্রন্থকার লোচন-কবি
নিজে বলছেন, এই গ্রন্থ একাদশ শতাব্দীতে রচিত। অথচ, গ্রন্থের মধ্যে
বিদ্যাপতির উল্লেখ বর্তমান। বিদ্যাপতি ছিলেন চতুর্দশ শতাব্দীর শেষ ভাগের
কবি। অধিকন্তু, রাগ-তরঙ্গিনীর শেষাংশে এমন অনেক কিছু বিষয়ের
আলোচনা আছে যার স্বাভাবিক অস্তিত্ব কিছুতেই সপ্তদশ শতাব্দীর
পরবর্তীকালে সম্ভবপর নয়। ফলে, অনেক পণ্ডিত ব্যক্তিও সন্দেহ করেন
রাগ-তরঙ্গিনী একটিমাত্র লোচন-কবির দ্বারা রচিত হয় নি, আমাদের
পুরাণগুলির মতো, এই রাগ-তরঙ্গিনীর মধ্যেও বিভিন্ন কালের ভিন্ন ভিন্ন
সাঙ্গীতিক অভিজ্ঞতা সংযোজিত করা হয়েছে।
রাগ-বিবোধ গ্রন্থটি যে ১৬১০ খৃষ্টাব্দে সোমনাথ কর্তৃক রচিত হয়েছিল
তাতে সন্দেহের অবকাশমাত্রও নেই। এটি দক্ষিণী সঙ্গীত-পদ্ধতি সংক্রান্ত
গ্রন্থ। কিন্তু, পারিজাতকে রাগ-বিবোধের পরবর্তীকালে রচিত গ্রন্থরূপে কেন
উল্লেখ করা হয় সে সম্বন্ধে আমরা অনেক চেষ্টা করে আজও যথোচিতভাবে
অবহিত হতে পারিনি। পারিজাতেও কিছু দক্ষিণী রাগের আলোচনা আছে।
কিন্তু, এই রাগ-নাম-সামঞ্জস্যের ওপর ভিত্তি করে পারিজাতকে রাগ-বিবোধ-এর
পরবর্তীকালে রচিত গ্রন্থ হিসাবে মেনে নেওয়াটা আমরা যুক্তিযুক্ত মনে করি
না। একথা সর্বজনবিদিত যে, আজকের মতো সেদিনও ভারতবর্ষের বিভিন্ন
প্রদেশের মধ্যে সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান অব্যাহত ছিল। আজকের মতো
সেদিনকার অনেক হিন্দুস্থানী ওস্তাদও হিন্দুস্থানী ঢংয়ে কর্ণাটিক রাগ পরিবেশন
করে বৈচিত্র্যের সৃষ্টি করতেন এবং অহোবল-এর মতো অনেক হিন্দুস্থানী
পদ্ধতির গ্রন্থকারও নিজেদের গ্রন্থের মধ্যে হিন্দুস্থানে প্রচলিত রাগগুলির সঙ্গে সঙ্গে
সমসাময়িক কালের ওস্তাদগণ কর্তৃক ঐভাবে পরিবেশিত কিছু কর্ণাটিক রাগেরও

[ ছ ]

পরিচয় লিপিবদ্ধ করে গিয়েছেন। সুতরাং, পারিজাতের রচনাকাল সম্পর্কে স্বর্গগত
ভাতখণ্ডে প্রমুখ পণ্ডিত ব্যক্তিরা যা মন্তব্য করে গিয়েছেন, তার সঠিকত্ব সম্বন্ধে
কিছু আলাপ-আলোচনার অবকাশ আছে বলেই আমরা মনে করি।
অতঃপর, গ্রন্থকার অহোবলের পরিচয়। ইনি যে কোথাকার লোক
ছিলেন, সে সম্বন্ধেও মতভেদ আছে। সঙ্গীত রত্নাকর প্রণেতা শার্ঙ্গদেব
প্রমুখ প্রাচীন সঙ্গীতশাস্ত্রজ্ঞরা গ্রন্থারম্ভে নিজেদের বংশপরিচয়, আদি নিবাস
প্রভৃতির উল্লেখ করে গিয়েছেন। প্রাচীনকালের প্রচলিত রীতিই ছিল এই
রকম। কিন্তু, অহোবল এ সম্বন্ধে একেবারে নীরব। পারিজাত পাঠ করে
এইটুকু শুধু জানতে পারা যায় যে, কৃষ্ণ-পণ্ডিত-তনয় পণ্ডিতপ্রবর অহোবল
এই গ্রন্থের রচয়িতা। অনেকে অনুমান করেন, তিনি উত্তর ভারতেরই
অধিবাসী ছিলেন, কারণ, পারিজাতের বিষয়বস্তু উত্তর ভারতীয় হিন্দুস্থানী
পদ্ধতিরই বিষয়বস্তু। আবার কেউ অনুমান করেন, সদ্রাগচন্দ্রোদয় প্রণেতা
পুণ্ডরীক বিঠ্ঠল কর্ণাট কীর (?-১৫৭৯) মতো অহোবলও আসলে ছিলেন
দক্ষিণ ভারতেরই লোক, একাধারে কর্ণাটক ও হিন্দুস্তানী উভয় পদ্ধতির
সঙ্গীত-বিজ্ঞান সম্বন্ধেই অভিজ্ঞতা ছিল তার, কিন্তু, গ্রন্থ লিখে গেছেন
বিশেষভাবে হিন্দুস্থানী পদ্ধতির সঙ্গীত রসিকদের সুবিধার জন্যই। পারিজাতে
বর্ণিত শ্রুতি-বিভাগের বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করে আমাদেরও মনে হয় অহোবল
কর্ণাটক সঙ্গীত-বিজ্ঞানে বিশেষভাবে অভিজ্ঞ ছিলেন।
সঙ্গীত পারিজাত কবে ও কোথায় সর্বপ্রথম গ্রন্থাকারে আত্মপ্রকাশ
করেছিল বলা মুস্কিল। স্বৰ্গ্তঃ ব্রজেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী (গৌরীপুর) মহাশয়
আমাদেরকে বলেছিলেন: তার এক সহযোগীর নিকট দেবনাগরী অক্ষরে
মুদ্রিত একখানি অসম্পূর্ণ পারিজাত ছিল। এই অসম্পূর্ণ পুস্তকটির কোন
টাইটেল পেজ ছিল না। অর্থাৎ কে, কবে, কোথায় গ্রন্থটি প্রকাশ করেছিলেন
তা জানবার কোন উপায় ছিল না এবং সহযোগী সেটা কিনেছিলেন
কোলকাতার ফুটপাথের হকারের নিকট থেকে। এর পরই বোধহয়
উল্লেখযোগ্য স্বৰ্গ্তঃ কাশীশ্বর বেদান্তবাগীশ ও সারদাপ্রসাদ ঘোষ কর্তৃক
সম্পাদিত একখানি পারিজাত। এই গ্রন্থের সম্পাদনা-কাল ১৮৭৯ খৃষ্টাব্দ
এবং এর ভূমিকা লিখিত হয়েছিল ইংরাজী ভাষায়। অতঃপর ১৮৮৫ খৃষ্টাব্দে
স্বর্গতঃ জীবানন্দ বিদ্যাসাগর কর্তৃক সরস্বতী প্রেস থেকে একটি পারিজাত
প্রকাশিত হয়। এর পর ১৮৯৭ খৃষ্টাব্দে (১৮১৯ শকাব্দ) পুণা থেকে প্রকাশিত

[ জ ]
হয় একখানি পারিজাত। এর পর, অর্থাৎ ১৮৯৭ খৃষ্টাব্দ থেকে ১৯১২ খৃষ্টাব্দের
মধ্যে কোন সময়, জ্যোতিষ-তন্ত্রাদি শাস্ত্রগ্রন্থ প্রণেতা, ঢাকা জেলার বুতুনী
গ্রাম নিবাসী স্বৰ্গতঃ রসিকমোহন চট্টোপাধ্যায় ‘অরুণোদয়’ নামক একটি মাসিক
পত্রিকায় পারিজাতের ৪১৭টি সূত্র বাঙলা হরফের সংস্কৃত ভাষায় প্রকাশ
করেন এবং উক্ত সূত্রগুলিকে পৃথক পুস্তিকাকারেও প্রচার করেন ‘শিব-তন্ত্র’
নামক পুস্তিকার সংযোজিত অংশরূপে। এই আমলেই, অর্থাৎ ১৯১২ খৃষ্টাব্দে
পূণার স্বৰ্গতঃ ভালচন্দ্র সীতারাম সুকথনকার এম. এ, কর্তৃক নির্ণয় সাগর
প্রেস থেকে একখান পারিজাত মহারাষ্ট্রীয় ভাষার অনুবাদসহ প্রকাশিত হয়।
অতঃপর আমরা দেখতে পাই, হাথরাস এর সঙ্গীত কাৰ্য্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত
হিন্দী অনুবাদসহ একখানি ৫০০ সূত্র সমন্বিত পারিজাত। হিন্দী গ্রন্থটি
প্রকাশিত হয় ১৯৪১ খৃষ্টাব্দে এবং অনুবাদকের নাম হচ্ছে সঙ্গীত কলাকোবিদ
পণ্ডিত কালিন্দজী। কিন্তু, বাঙলা-ভাষাভাষাদের সুবিধার জন্য আজও পর্যন্ত
পারিজাতের কোন বঙ্গানুবাদ তথা টীকা-ভাষ্য গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয় নি।
সঙ্গীত পারিজাতের বঙ্গানুবাদ গ্রন্থাকারে প্রকাশিত না হলেও পত্রিকায়
প্রকাশিত হয়েছিল। ১৩৪৩ বঙ্গাব্দের বৈশাখ থেকে ১৩৪৫ বঙ্গাব্দের জ্যৈষ্ঠ
পর্যন্ত সঙ্গীত বিজ্ঞান প্রবেশিকা পত্রিকায় স্বৰ্গতঃ ব্রজেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
(গৌরীপুর) কর্তৃক পারিজাতের প্রথম কাণ্ডটি বাঙলা ভাষায় অনুবাদিত হয়ে
প্রকাশিত হয়েছিল। এই অনুবাদ কার্যে চৌধুরী মহাশয়কে সহায়তা
করেছিলেন কয়েকজন সঙ্গীত-তত্ত্বজ্ঞ সংস্কৃতজ্ঞ পণ্ডিত। কিন্তু, শেষ পর্যন্ত এই
অনুবাদ কার্যটিকে রায়চৌধুরী মহাশয় গ্রন্থাকারে প্রকাশ করা অনুচিত বিবেচনা
করেছিলেন—বিশেষ বিবেচনা করেই।
এ ছাড়াও, পারিজাতের বিষয়বস্তু সম্পর্কে কিছু ভাল-মন্দ প্রবন্ধও আমরা
পাঠ করবার সুযোগ পেয়েছি বিভিন্ন সাহিত্য ও সঙ্গীত বিষয়ক পত্র-পত্রিকার
কল্যাণে। কিন্তু, পারিজাতের বঙ্গানুবাদের সঙ্গে সঙ্গে তার যথোচিত টীকা-
ভাষ্য করবার প্রচেষ্টা এবং সেই প্রচেষ্টাকে গ্রন্থাকারে প্রকাশ করবার বিড়ম্বনা
ইতিপূর্বে আর কেউ ভোগ করেছেন কিনা, আজও পর্যন্ত তা জানতে
পারি নি।
পারিজাত-পাঠক লক্ষ্য করবেন, অহোবল তাঁর পূর্ববর্তী সঙ্গীত-রত্নাকর
প্রভৃতি শাস্ত্রগ্রন্থাদির অভিমত প্রামাণ্যরূপে গ্রহণ করেও, বিকৃত-স্বর, শ্রুতি,
মেল প্রভৃতি সম্বন্ধে এমন কিছু অভিনব ইঙ্গিত দিয়ে গিয়েছেন যার স্বরূপ জানা

[ ঝ ]

আধুনিক যুগের সঙ্গীত অনুসন্ধিৎসুদের পক্ষে একান্তভাবেই প্রয়োজন। এই
অভিনবত্ব সম্বন্ধে আমরা যথাস্থানেই আলোচনা করবার চেষ্টা করেছি। কিন্তু,
আলোচ্য প্রসঙ্গে এ কথাও উল্লেখযোগ্য যে, পারিজাত পাঠ করবার সময়
অনেকের নিকটেই, কয়েকটি সূত্রের বক্তব্য বিষয় সম্পর্কে কিছু সংশয় উপস্থিত
হবে। এই সংশয়গুলির নিরসনের কোন ইঙ্গিত বা নির্দেশ কোথাও না থাকার
জন্য—অন্ততঃ যে কয়খানি মুদ্রিত গ্রন্থ আমাদের সংগ্রহে আছে তার মধ্যে না
থাকায়, আমরা এখানে সেই সংশয়গুলি সম্পর্কে কথঞ্চিৎ আলোচনার সুযোগ
গ্রহণ করা কর্তব্য মনে করছি। যথা—

১৪ পৃষ্ঠার ৭০ সংখ্যক সূত্রে আমরা পাচ্ছি “তদা তীব্রতমাখ্যাঙ্ক” ইত্যাদি।
কিন্তু এটি হওয়া উচিত “তদাতিব্রতমাপ্যাঙ্ক” ইত্যাদি। কারণ, তীব্রতম
গা সম্পর্কে যথাস্থানে যথাযথ ব্যাখ্যাই দেওয়া হয়েছে।

৩০ পৃষ্ঠার ১০৮ সংখ্যক সূত্রে বিকৃত স্বর-মূর্চ্ছনা ষাডব ও ঔড়ব হয় বলে
লেখা আছে। কিন্তু, প্রকৃতপক্ষে এই স্বর-মূর্চ্ছনা সম্পূর্ণ, ষাডব ও ঔড়ব এই
তিন প্রকারেরই হতে পারে!

৩৯ পৃষ্ঠায় ১১৯ সংখ্যক সূত্রে অহোবল বিকৃত মূর্চ্ছনার বিভিন্ন সংখ্যা
দিয়েছেন। এই সংখ্যা বার করবার সময় তিনি কোথাও কোথাও ১-রে ও
৪-গা, ৪-ধা ও ৪-নি ইত্যাদি গ্রহণ করেছেন। কিন্তু, প্রকৃতপক্ষে ৪-টি বিকৃত
গা গ্রহণ করলে ৪-টি বিকৃত রে-কে গ্রহণ করা সম্ভবপর নয়, কারণ, যার
নাম তীব্রতর রে তারই অপর নাম শুদ্ধ গা এবং তাকে গ্রহণ করলে পূর্ব্ব-গা-কে
বাদ দেওয়া চলে না যেহেতু যার নাম পূর্ব্ব-গা তারই অপর নাম শুদ্ধ রে।
তা' ছাড়া তীব্র-রে ও কোমল-গা-ও স্বর হিসাবে অভিন্ন। সুতরাং এদের একত্র
ব্যবহার কিছুতেই সম্ভবপর নয়। অপরপক্ষে, ধা ও নি-র ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা
একই রকমের।

৩৯ পৃষ্ঠার ১২০ সংখ্যক সূত্রে অহোবল “পূর্ব্ব-কোমলৌ” শব্দটি ব্যবহার
করেছেন।—আমরা জানি, তীব্র রে ও তীব্র-ধা যথাক্রমে কোমল-গা ও
কোমল-নি থেকে অভিন্ন, কিন্তু, পূর্ব্ব-গা ও পূর্ব্ব-নি তো এদের থেকে ভিন্ন।
তাহলে, রে-ধা তীব্র ব্যবহৃত হলে পূর্ব্ব-গা-নি ব্যবহার করা যাবে না কেন?—
মনে হয় আলোচ্য সূত্রটি মূলে এ রকম ছিল না; পরবর্তী কালের কোন
নকল নবিশের অসাবধানতায় বিকৃত হয়ে গিয়েছে!

[ [ ঞ ] ]

১০-১৪ পৃষ্ঠায় ২৮০-২৮৫ সূত্রগুলির মাধ্যমে অহোবল ধ্রুব, মঠ্য প্রভৃতি
তালের বর্ণনা দিয়েছেন। আমরা ঐ তালগুলি সম্বন্ধে, সাধারণভাবে,
সঙ্গীত-রত্নাকরের মতেই উল্লেখ করেছি। কিন্তু, অহোবলের গ্রন্থরচনার
কাল-কে বিচার করলে দেখতে পাবো—ঐ আমলে ধ্রুবতাল ছিল ১৪ মাত্রার,
মঠ্যতাল ছিল ১০ মাত্রার, ত্রিপুট তাল ছিল ৭ মাত্রার, রূপক-তাল ছিল
৬ মাত্রার, ঝম্পতাল ছিল ৯ মাত্রার, অড্ডতাল ছিল ১১ অথবা ১৪ মাত্রার
এবং আদিতাল ছিল ৪ মাত্রার।—অহোবলের ছন্দ-অলঙ্কার সম্পর্কিত বর্ণনা
পড়লে মনে হয়, তিনি তাঁর আমলের মাত্রা-হিসাবই গ্রহণ করেছেন,—
পূর্ববর্তী কালের নয়।

বলা বাহুল্য, আমাদের পূর্বেও একাধিক ব্যক্তি পারিজাত অনুবাদ
করেছেন, কিন্তু লক্ষ্য করবার বিষয় এই যে, পারিজাতের সব চাইতে
প্রয়োজনীয় কথাটির প্রতি কেউই প্রায় সচেতন থাকতে পারেন নি।
অর্থাৎ, পারিজাতের গ্রাম-মূর্চ্ছনা ও রাগ-মূর্চ্ছনার মূলগত পার্থক্য সম্বন্ধে
তাঁরা কেউ বা নীরব থেকেছেন কেউ বা বে-ঠিক তথ্য পরিবেশন করে
গিয়েছেন। পারিজাতের ষোলোশ' রাগটির স্বর-ব্যবস্থা সম্পর্কে স্বর্গত ভাতখণ্ডেজী
যা বলে গেছেন—গ্রাম মূর্চ্ছনার মর্যাদা রক্ষা করে, অমন বক্তব্য যে তিনি
কোন যুক্তিতে পরিবেশন করতে পারলেন আমরা তা বুঝতে পারি না।
এ সম্বন্ধে আমরা যথাস্থানেই আলোচনা করেছি। অপরপক্ষে, পারিজাতের
শুদ্ধ ঠাটকে বর্তমানের বেলাবলের অনুরূপ কল্পনা করেও অনেকে পাণ্ডিত্য
প্রকাশ করেছেন। হাথরাসের কলাকোবিদ পণ্ডিত কলিন্দজী তাদের
অন্যতম। শুনছি, এই ধরণের অনুবাদিত পারিজাত অনেক সরকারী
সাহায্যপ্রাপ্ত প্রখ্যাত সঙ্গীত মহাবিদ্যালয়ের অবশ্যপাঠ্য গ্রন্থরূপে মনোনীত
হয়েছে।

এতাবৎ কালের মধ্যে আমরা যতগুলি পারিজাতের সন্ধান পেয়েছি তার
সবগুলিই অহোবলের রচিত নয়। মনে হয়, সঙ্গীত পারিজাত নামক গ্রন্থটির
খ্যাতি এক সময় এমনই বিস্তারলাভ করেছিল যে অনেকেই স্বরচিত গ্রন্থের
নামকরণ করেছিলেন, ‘সঙ্গীত পারিজাত’। এমন কি জনৈক দক্ষিণী
সঙ্গীতবেত্তাও সঙ্গীত পারিজাত নাম দিয়ে দক্ষিণী সঙ্গীত-পদ্ধতি সম্পর্কিত
পুস্তক রচনা করে গিয়েছেন। অপরপক্ষে, অহোবল বিরচিত সঙ্গীত

[ ৮ ]

পারিজাত-রূপে যে গ্রন্থটির সঙ্গে আমরা পরিচিত, তারও শেষাংশের কতকগুলি
সূত্র অহোবল-রচিত আর কতকগুলি সূত্র প্রক্ষিপ্ত, সে সম্বন্ধে বিশদ আলোচনার
অবকাশ আছে। এতাবৎকালের মধ্যে আমরা যতগুলি অহোবল-রচিত
পারিজাতের সন্ধান পেয়েছি তার ৪৯৭ সূত্র পর্য্যন্ত অভিন্ন লেখকেরই রচনা—
নিঃসন্দেহ। কিন্তু এর পরবর্তী কয়েকটি সূত্রের মৌলিকতা সম্পর্কে কেউ যদি
প্রশ্ন তোলেন, আমরা বোধহয় যথাযথ প্রমাণ দাখিল করে আত্মপক্ষ সমর্থন
করতে পারবো না। বলা বাহুল্য, আলোচ্য গ্রন্থের টীকা-ভাষ্য করবার সময়
আমরা অসম্পূর্ণ ও প্রক্ষিপ্ত দোষে দুষ্ট সূত্রগুলি সম্পর্কে যথাস্থানে যথাযথ ভাবেই
আলোচনা করবার চেষ্টা করেছি।
পূর্ব্বেই বলেছি, হাথরাস সঙ্গীত কাৰ্য্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত পারিজাতের
অনুবাদক কলাকোবিদ কলিন্দজী পারিজাতের শুদ্ধ ঠাটকে বর্তমানের
বেলাবল ঠাটের অনুরূপ কল্পনা করে গ্রন্থ রচনা করেছেন। এই গ্রন্থটির
মধ্যে দেখা যায় নীট ৫০০-টি সূত্র স্থান পেয়েছে এবং রাগাধ্যায়ের মধ্যে
এমন তিনটি সূত্রকে সংযোজিত করা হয়েছে যার পূর্ব্বাপর পরিচিতি
বিশ্লেষণ করে জানতে পারা যায় আলোচ্য সূত্র তিনটি এমনই একজন
পণ্ডিতের রচনা যিনি—কলাকোবিদ কলিন্দজীর মতোই জানতেন না
পারিজাতের শুদ্ধ ঠাট্ ছিল কাফি—একালের বেলাবল নয়। পরন্তু,
আলোচ্য সূত্র তিনটিকে প্রমাণরূপে দাখিল করবার অজুহাতে উক্ত
সূত্র-রচয়িতা অহোবলের মূল সূত্রটিকে (সূত্রসংখ্যা ৪৮৮, যার ব্যতিক্রম
হাথরাস-প্রকাশিত পারিজাত ছাড়া আর কোথাও দেখা যায় নি) পর্য্যন্ত
বিকৃত করে ছেড়ে দিয়েছেন। সাধারণভাবে পারিজাত আলোচনা করে আমরা
দেখতে পাই, রাগাধ্যায়ের মধ্যে অহোবল সাকুল্যে ১২২-টি রাগের পরিচয়
দিয়েছেন। কিন্তু, হাথরাসের পারিজাতে দেখা যাচ্ছে, যথাক্রমে, ৪৮৮,
৪৮৯ ও ৪৯০ সূত্রের অন্তর্গত হয়ে শুদ্ধ কৈশিক, তেরঙ্গ ও ভীমপলাসিকা
নামক অতিরিক্ত তিনটি রাগ স্থান পেয়েছে এবং রাগের সংখ্যা ১২২-এর স্থানে
১২৫-টি হয়ে যাওয়ার ফলে ৪৯৭ সংখ্যক সূত্রটিও পরিণত হয়েছে ৫০০-এ।
আমাদের সংগৃহীত পারিজাতগুলির ৪৮৮ সূত্রে দেখা যায়—
অনেনৈব প্রকারেণ রাগা অপামিতা মতাঃ।
দ্বাবিংশত্যা শতং তে চ প্রোক্তা লোকসুখায় চ॥

[ ঙ ]
কিন্তু, হাথরাসের পারিজাতের ( ৪৮৮+৩= ) ৪৯১ সূত্রে দেখা যাচ্ছে
“দ্বাবিংশত্যা শতং তে চ”-এর স্থলে “শতঞ্চ পঞ্চবিংশত্যা” উল্লিখিত হয়েছে।
বলা বাহুল্য, এই অতিরিক্ত সূত্র তিনটিকে আমরা যথাস্থানে তারকা-চিহ্নিত
করেই পত্রস্থ করেছি।
পুণা থেকে মুদ্রিত পারিজাতখানি প্রকাশ করেছিলেন রাওজী শ্রীধর
গোন্দলেকর, এম. এ., এল. এল. বি., মহাশয়। এঁর প্রকাশিত পারিজাতখানি
দু’টি কাণ্ডে বিভক্ত। প্রথম কাণ্ডটি সমাপ্ত হয়েছে গায়কের দোষ-গুণ বিচার-
বিশ্লেষণ করে এবং দ্বিতীয় কাণ্ডটির বিষয়বস্তু হচ্ছে বাদ্যাধ্যায় ও তালাধ্যায়।
কিন্তু, দ্বিতীয় কাণ্ডটিকে অনেক পণ্ডিত ব্যক্তি প্রামাণ্যরূপে গ্রাহ্য করতে
অনিচ্ছুক। কেউ কেউ স্পষ্টই বলেছেন, এই দ্বিতীয় কাণ্ডটি আদৌ
অহবলের রচনা নয়। সুতরাং আমরাও এই দ্বিতীয় কাণ্ডটির ওপর কোন
রকম গুরুত্ব আরোপ না করে, প্রথম কাণ্ডর অন্তর্গত সূত্রগুলিকেই ৬৩১-টি
সূত্রের মাধ্যমে পত্রস্থ করে টীকা-ভাষ্য করেছি। কিন্তু, আলোচ্য প্রসঙ্গে
এ কথা বিশেষভাবেই উল্লেখযোগ্য যে পণ্ডিতপ্রবর অহোবল অবশ্যই তাঁর
সঙ্গীত পারিজাতের মধ্যে বাদ্যাধ্যায়, তালাধ্যায় ও নৃত্যাধ্যায় সম্পর্কে
আলাপ-আলোচনা পত্রস্থ করে গিয়েছিলেন, কারণ, সেকালের গ্রন্থ-রচনার
রীতিও ছিল ওই প্রকার। কিন্তু, পুণা থেকে প্রকাশিত দ্বিতীয় কাণ্ডটির ভাব,
ভাষা ও বিষয়বস্তুর পরিবেশন-পদ্ধতি লক্ষ্য করে সন্দেহ জাগে—এই দ্বিতীয়
কাণ্ডর রচয়িতা অহোবল নন।
এটা বাতুলতা, সীমাবদ্ধ জ্ঞান নিয়েই আমরা পারিজাতের টীকা-ভাষ্য
করবার চেষ্টা করেছি। এ কাজে প্রবৃত্ত হয়েছিলাম আজ থেকে প্রায়
২২।২৩ বৎসর পূর্বে স্বর্গগত ব্রজেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী (গৌরীপুর) মহাশয়ের
আগ্রহে। স্বর্গগত রায়চৌধুরী মহাশয় ছিলেন আমাদের অন্যতম সঙ্গীতগুরু,
পারিজাত সম্পর্কে একটা অদ্ভুত রকমের দুর্বলতা ছিল তাঁর মনে; এবং
বস্তুতঃ সেই কারণেই আমরা তাঁর ইচ্ছার অমর্য্যাদা করতে পারি নি,
না’হলে, আজকের দিনে এ হেন গ্রন্থ নিয়ে পরিশ্রম করার একমাত্র পরিণাম যে
পণ্ডশ্রম মাত্র সে কথা আমরা ভাল করেই জানতাম।
বিগত বিশ বৎসরের মধ্যে পারিজাতের এই বাঙ্গলা-ভাষ্য বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায়
প্রকাশিত হয়েছে পৃথক পৃথক প্রবন্ধাকারে। এর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য

[ ঙ ]

সুরচ্ছন্দা পত্রিকাটি। এই পত্রিকায় গত ১৯৫৫ সালের মার্চ মাস থেকে
১৯৬৪ সালের ফেব্রুয়ারী মাস পর্যন্ত পারিজাতের কিছু অংশ ধারাবাহিকভাবে
প্রকাশিত হয়েছিল। বলা বাহুল্য, পারিজাত প্রকাশনার ব্যাপারে আমাদেরকে
এমন সব অবাঞ্ছিত পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়েছে যার ফলে আমরা
একাধিকবার চেষ্টা করেছি এই পণ্ডশ্রম থেকে নিরস্ত হতে। ইতিমধ্যে
আচার্য ব্রজেন্দ্রকিশোর দেহত্যাগ করেছিলেন—১৯৫৭ সালের ২৯শে নভেম্বর
তারিখে; কিন্তু, অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কে ঘনিষ্ঠ হয়ে পড়েছিলেন—এ দেশের অন্যতম
সঙ্গীতশাস্ত্রজ্ঞ কলাকোবিদ্ ডাক্তার বিমল রায় এম. বি.। সত্যি কথা বলতে
কি, ডাক্তার বিমল রায়ের মতো বন্ধুর সঙ্গে যদি আমরা ঘনিষ্ঠ না হতাম,—
ক্রমাগত তাড়না করে তিনি যদি আমাদেরকে উদ্ব্যস্ত না করে তুলতেন,
তাহলে সঙ্গীত পারিজাতের আলোচ্য সংস্করণটি প্রকাশ করবার কল্পনা বহুকাল
পূর্বেই ত্যাগ করতাম।
পারিজাতের আলোচ্য সংস্করণটিকে গ্রন্থাকারে প্রকাশ করবার ‘সংস্করণ-স্বত্ব’
প্রথম গ্রহণ করেছিলেন ‘পুস্তক প্রকাশক’—১৯৫৬ সালে। ব্যবস্থা ছিল,
তিন মাসের মধ্যে আলোচ্য সংস্করণটিকে তাঁরা দু’টি খণ্ডে বিভক্ত করে
প্রকাশ করবেন। কিন্তু, নিগূঢ় কারণে তাঁরা আলোচ্য সংস্করণের প্রথম খণ্ড
প্রকাশ করেন ১ থেকে ৩৭০ পর্য্যন্ত সূত্র গ্রথিত করে; কিন্তু পরবর্তী
তিন মাসের মধ্যে তাঁরা গ্রন্থের দ্বিতীয় খণ্ড প্রকাশ করতে পারেন নি।
ফলে, প্রথম খণ্ডের বিক্রয় বন্ধ করে দিয়ে আমরা তাঁদের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ করতে
বাধ্য হই।
এবার পারিজাতের অখণ্ড সংস্করণ প্রকাশনার দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন
বাঙ্গালাদেশের প্রাচীনতম পুস্তক ব্যবসায়ীদের অন্যতম, এম. সি. সরকার এণ্ড
সন্স। গ্রন্থটির মুদ্রণকার্য যাতে সুষ্ঠুভাবে নিষ্পন্ন হয় তার জন্য আমাদের
তরফে আন্তরিকতার অভাব ছিল না; কিন্তু, শেষ পর্যন্ত দেখা গেল
বেশ কিছু ভুল-ভ্রান্তি রয়ে গিয়েছে। আমাদের বিশ্বাস, যাঁদের জন্য এই
গ্রন্থ, অকিঞ্চিৎকর ভাষার ভুলের জন্য তাঁদের কোন অসুবিধা হবে
না। তবুও, আমরা একটি শুদ্ধিপত্র দেওয়া কর্তব্য বিবেচনা করলাম
গ্রন্থের শেষে।

[ ঢ ]
পরিশেষে আবার বলি, সীমিত জ্ঞান-বুদ্ধি নিয়েই আমরা আলোচ্য গ্রন্থটির
টীকা-ভাষ্য করেছি। এই গ্রন্থ পাঠ করে যদি কেউ উপকৃত হ'ন তাহলে
পরিশ্রম করা সার্থক হয়েছে বিবেচনা করবো। এবং বলাই বাহুল্য যাঁদের
অকুণ্ঠ সহযোগিতার ফলে আলোচ্য অখণ্ড সংস্করণটি গ্রন্থাকারে আত্মপ্রকাশ
করতে পারল তাঁদের উদ্দেশে ধন্যবাদ বা কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করতে সঙ্কোচবোধ
করছি। অলমিতি—
১১৪।১, হাজরা রোড
কলিকাতা-২৬ শ্রীশচন্দ্রনাথ মিত্র
২৮শে নভেম্বর ১৯৬৫

সূচীপত্ৰ
বিষয়বস্তু সূত্র সংখ্যা পৃষ্ঠা সংখ্যা
ভূমিকা
গ্রন্থ রচনার উদ্দেশ্য ১—৩৩ ১—৭
স্বর, শ্রুতি ও নাদ প্রসঙ্গ ৩৪—৯৬ ৮—২৩
গ্রাম ৯৭—১০২ ২৪—২৫
মূর্চ্ছনা ১০৩—২০৩ ২৬—৬৩
কূটতান ও স্বর-প্রস্তার ২০৪—২০৯।১ ৬৩—৬৫
নষ্টোদ্দিষ্ট ( খণ্ডমেরু ) ২০৯।২—২১৮ ৬৫—৭১
বর্ণ ২১৯—২২০ ৭১—৭১
অলঙ্কার ২২১—২৯৬ ৭১—৯৭
জাতি ২৯৭—২৯৯।১ ৯৭—১০০
অংশস্বর, ন্যাসস্বর ও গ্রহস্বর ২৯৯।২—৩০০ ১০০—১০৪
গমক প্রকরণ ৩০০—৩১২ ১০৪—১০৮
স্বর-শ্রুতির স্থান ৩১৩—৩২৭ ১০৮—১১৯
শুদ্ধ ও বিকৃত মেল্ ৩২৮—৩৩৮ ১১৭—১১৯
গীতি পদ্ধতি • ৩৩৮—৩৩৮ ১১৯—১২৫
রাগাদির পরিবেশনা-কাল ৩৩৯—৩৫৪ ১২৫--১২৮
রাগাদির বৈশিষ্ট্য ৩৫৫—৩৫৬ ১২৮—১২৯
রাগাদির পরিচয় ৩৫৭--৪৬০ ১২৯—২১৬
বিভিন্ন রসের অভিব্যঞ্জক স্বর-শ্রুতির জাতি ৪৬১—৪৬৩ ২১৬—২১৮
বিকৃত স্বরাদির নাম ও নামান্তর ৪৬৪—৪৯৮ ২১৮—২২০
নিবন্ধ ও অনিবন্ধ প্রবন্ধ-গীতির লক্ষণাদি ৪৯৯—৫০৩ ২২১—২৩১
পাঁচ প্রকার প্রবন্ধ-গীতির পরিচয় ৫০৪—৫০৪ ২৩৩—২৩৫
প্রবন্ধ-গীতির পাঁচটি ধাতুর পরিচয় ৫০৫—৫০৮ ২৩৫—২৪৫
প্রবন্ধ-গীতির ছয়টি অঙ্গের পরিচয় ৫০৯—৫১১।১ ২৪৫—২৪৬
প্রবন্ধ-গীতির পাঁচটি জাতির পরিচয় “৫১১।২—৫১৩।১ ২৪৬—২৪৮

[ ৩ ]
বিষয়বস্তু সূত্র সংখ্যা পৃষ্ঠা সংখ্যা
নির্যুক্ত ও অনিযুক্ত প্রবন্ধ-গীতির
পরিচয় ৫১৩।২—৫১৪।১ ২৪৮—২৫০
গণ ও বর্ণাদির পরিচয় ৫১৫—৫১৮ ২৫০—২৫২
অ-ক-চ প্রভৃতি বর্গের পরিচয় ৫১৯—৫২১ ২৫৩—২৫৪
বায়ু, অগ্নি, ভূমি প্রভৃতি বীজের
ব্যবহার-বিধি ৫২২—৫২৬ ২৫৪—২৫৫
বীজ-বর্ণ ব্যবহারের ফলাফল ৫২৭—৫৩০ ২৫৫—২৬০
দৈবত-মার্গিত প্রভৃতি গীতের পরিচয় ৫৩১—৫৩২ ২৬০—২৬০
গ্রাস বা অনুপ্রাসের প্রয়োগ-বিধি ৫৩৩—৫৩৫ ২৬১—২৬১
গীতের পাঁচ প্রকার গুণের পরিচয় ৫৩৬—৫৪১ ২৬২—২৬৪
গীতের দোষ ৫৪২—৫৪২ ২৬৪—২৬৪
তিন প্রকার প্রবন্ধ গানের লক্ষণ ৫৪৩—৫৪৩ ২৬৪—২৬৫
আট প্রকার সূড-প্রবন্ধের পরিচয় ৫৪৪—৫৫০ ২৬৫—২৭৩
চব্বিশ প্রকার আলি-সংশ্রয় প্রবন্ধের পরিচয় ৫৫১—৫৬৭ ২৭৩—২৯৭
ছত্রিশ প্রকার বিপ্রকীর্ণ প্রবন্ধের পরিচয় ৫৬৮—৫৯৭ ২৯৭—৩৩০
ধাতু, মাতু ও বাগ্গেয়কারক-এর পরিচয় ৫৯৮—৬০০ ৩৩০—৩৩১
গান্ধর্ব, স্বরাদি ও পদাদি গায়কের পরিচয় ৬০১—৬০২ ৩৩১—৩৩২
উত্তম, মধ্যম ও অধম গায়কের পরিচয় ৬০৩—৬৩১ ৩৩২—৩৩৮
শুদ্ধিপত্র ৩৩৯—৩৪৪

ছন্দোময়ং গরুত্মন্তমারূঢ়ং সত্যয়া সহ।
স্তূয়মানং দিবৌকোর্ভিঃ পারিজাতহরিং ভজে ॥ ১
যিনি গরুড়ারোহী ও (গায়ত্রী-আদি সপ্তছন্দ স্বরূপ) শাশ্বত সত্যের সঙ্গে
ছন্দোময় বা অভিন্ন ; যিনি দেবকুল কর্তৃক নিয়ত পূজিত ; পারিজাত-হরণকারী
সেই শ্রীহরিকে আমিও ভজনা করছি !
টিপ্পনী : শ্রীহরি যেমন স্বর্গের পারিজাত মর্ত্যে এনেছিলেন মানুষের কল্যাণের
জন্য, তেমনি, অহোবলও সাধারণের অবগতির জন্যই এই সঙ্গীত-কলা-বিজ্ঞান
গ্রন্থাকারে পরিবেশন করছেন। ১
সঙ্গীতপারিজাতোহয়ং সৰ্ব্বকামপ্রদো নৃণাম্।
অহোবলেন বিদুষা ক্রিয়তে সৰ্ব্বসিদ্ধয়ে ॥ ২
‘জনসাধারণকে (ধর্ম্ম-অর্থ-কাম-মোক্ষ স্বরূপ) সৰ্ব্বসিদ্ধি লাভের পন্থা নির্দেশের
জন্যই পণ্ডিতবর অহোবল এই সর্ব্বকল্যাণপ্রদ সঙ্গীত-পারিজাত রচনা
করছেন। ২
সঙ্গীতং বৈদিকৈর্ব্বাক্যৈর্ব্বাধিতং ব্রাহ্মণাঃ সদা।
কৃত্বৈহিকং তথা মোক্ষং প্রাপ্নুবন্তি ত্বরান্বিতাঃ ॥ ৩
বৈদিক শাস্ত্র-গ্রন্থাদির মধ্যে এই সঙ্গীত-বিদ্যা সম্বন্ধে অনেক কিছু বিধি-নির্দেশ
আছে বলেই, ব্রাহ্মণগণ এই বেদ-বর্ণিত সঙ্গীত অনুশীলন ক’রে অচিরেই মোক্ষ
লাভ ক’রে থাকেন ! ৩
অগ্নিহোত্রং যথা কাৰ্য্যং গানকার্য্যং তথৈব হি।
বেদোক্তত্বাৎ স্মৃতিপ্রোক্তকর্ত্তব্যত্বান্মনীষিভিঃ ॥ ৪
বেদ-এ যেমন নিত্য অগ্নিহোত্র যজ্ঞ করবার বিধান আছে, তেমনি, (সঙ্গীত
রসিক) মনীষিদেরও কর্তব্য নিয়মিতভাবে সঙ্গীত-অনুশীলন করা। কারণ,
সঙ্গীত ও শ্রুতি-স্মৃতির বিধানে নিত্যকৃত্য ! ৪

২ সঙ্গীত পারিজাত
বিষ্ণুনামানি পুণ্যানি সুস্বরৈরন্বিতানি চেৎ।
ভবন্তি সামতুল্যানি কীর্ত্তিতানি মনীষিভিঃ॥ ৫
মনীষিগণ বলেন : সুমার্জ্জিত কণ্ঠে সুপবিত্র বিষ্ণু নাম গীত হলে, সে গান
সামগানেরই সমতুল্য হয়। ৫
স্বাশ্রয়া মোহিনী মায়া যা স্বয়া সংবৃতাশ্চ যে।
ব্রহ্মবিষ্ণুমহেশাঃ স্যুঃ সঙ্গীতোত্থ-সুখস্পৃহাঃ॥ ৬
এমন কি, যাঁরা পরার্থে মোহিনী মায়ার সৃষ্ট করেছিলেন, সেই ব্রহ্মা, বিষ্ণু,
মহেশ্বরও সঙ্গীত-রস উপভোগ করবার বাসনায়, নিজেদেরই সৃষ্ট মোহিনী মায়ার
আশ্রিত হয়ে পড়েন। ৬
ঐহিকামুষ্মিকে ত্যক্ত্বা দেবর্ষির্নারদঃ সদা।
ব্রহ্মানন্দোহপি বীণায়াং বাদনে নিয়তোহভবৎ॥ ৭
দেবর্ষি নারদও যাবতীয় ঐহিক-পারলৌকিক ক্রিয়া-কর্ম্মে অবিচলিত থেকেও,
সর্ব্বদা ব্রহ্মানন্দে বীণা বাজিয়ে থাকেন। ৭
দৈত্যসংহারিণী দুর্গা সঙ্গীতেহভিরতা সদা
মতঙ্গকশ্যপাবাস্তাং সঙ্গীতাভিরুচী মুনী। ৮
দৈত্যকুল-নির্মূলকারিণী দুর্গাও সর্ব্বদা সঙ্গীত উপভোগে উন্মুখ। মতঙ্গ, কশ্যপ
প্রমুখ মুনী-ঋষিরাও সাঙ্গীতিক রুচি সম্পন্ন ছিলেন। ৮
কর্ত্তা সঙ্গীতশাস্ত্রস্য হনূমাংশ্চ মহাকপিঃ।
শার্দ্দূলকোহলাবেতৌ সঙ্গীতগ্রন্থকারিণৌ॥ ৯
মহাকপি হনুমানও প্রণয়ন করেছিল সঙ্গীতশাস্ত্র। শার্দ্দূল ও কোহল নামক
মুনিদ্বয়ও সঙ্গীত গ্রন্থাদি রচনা করেছিলেন। ৯
কম্বলাশ্বতরৌ বায়ুর্হাহা হূহুশ্চ রাবণঃ।
রম্ভা বাণসুতা চোষা ফাল্গুনঃ ফণিনাং পতিঃ॥ ১০

সঙ্গীত পারিজাত ৩
ইতোয়েতেহন্যেহপি সঙ্গীতশাস্ত্র ব্যাখ্যানকারিণঃ।
সঙ্গীতপারিজাতাখ্যমহং কুর্বেহনুসৃত্য তান্ ॥ ১১
কম্বল, অশ্বতর নামক দুজন নাগ, বায়ু, হাহা, হূহু, রাবণ, বাণরাজ-দুহিতা
ঊষা, অর্জুন, নাগরাজ অনন্ত প্রমুখ সঙ্গীতজ্ঞগণ ছাড়াও আরও অসংখ্য
জ্ঞানী-গুণী সঙ্গীত শাস্ত্রের বিশ্লেষণ ক’রে গিয়েছেন এবং আমিও ( অহোবল )
সেই সব মহাজনদের পথানুসরণ করেই এই সঙ্গীত পারিজাত রচনা
করছি। ১০-১১
দোলায়াং শায়িতো বালো রুদন্নাস্তে যদা ক্বচিৎ।
তদা গীতামৃতং পীত্বা হর্ষোৎকর্ষং প্রপদ্যতে ॥ ১২
দোলায় শায়িত শিশু যখন ক্ষুধার তাড়নায় কাঁদতে আরম্ভ করে, তখন
তাকে স্তন দুগ্ধের পরিবর্ত্তে সঙ্গীতামৃত পান করালেও, সে ক্ষুধা ভুলে আনন্দ
প্রকাশ করে। ১২
মৃগঃ সোহপি তৃণাহারো বিচরন্নটবীং সদা।
লুব্ধকাদপি সঙ্গীতং শ্ৰুত্বা প্রাণান্ প্রয়চ্ছতি ॥ ১৩
তৃণভোজী বনচারী হরিণও শিকারীর সঙ্গীত-জালে প্রলুব্ধ হয়ে অবলীলাক্রমে
প্রাণদান করে। ১৩
ক্রুদ্ধো বিষংবমন্ সর্পঃ ফণামান্দোলয়ন্মুহুঃ।
গানং জাঙ্গুলীকাচ্ছ্ৰুত্বা হর্ষোৎকর্ষং প্রপদ্যতে ॥ ১৪
ক্রুদ্ধ সর্প, বিষোদগারের সন্ধিক্ষণে উদ্যত-ফণা হয়েও, দংশনের পরিবর্ত্তে আনন্দ
উপভোগ করে ফণা নাচিয়ে নাচিয়ে—যদি সাপুড়ে বা জঙ্গুলী শিকারীদের
সঙ্গীত শুনতে পায়। ১৪
দেবস্য মানবো গানং বাদ্যং নৃত্যমতন্দ্রিতঃ।
কুর্য্যাদ্বিষ্ণোঃ প্রসাদার্থমিতি শাস্ত্রে প্রকীর্ত্তিতম্ ॥ ১৫
আমাদের শাস্ত্রেরও বিধান এই যে, শ্রীবিষ্ণুর কৃপালাভের জন্য মানবজাতি আলস্য
ত্যাগ ক’রে নৃত্য-গীত ও বাদ্য অনুশীলন করবে। ১৫

্ ॥ ২০"
Wait, "সঙ্গীতমিতীরিতম্" or "সঙ্গীতমিতীর্"?
Look at the last word:
স-ঙ্গ-ী-ত-ম-ি-ত-ী-র-ি-ত-ম-্ = সঙ্গীতমিতীরিতম্.
॥ ২০ (double danda, 20).

:
"গীত, বাদ্য ও নৃত্য, এই তিনটির সম্মিলিত পরিবেশনকেই সঙ্গীত বলে। এর"

:
"মধ্যে প্রধান হ’চ্ছে কণ্ঠ-সঙ্গীত। তাই, অনেকে কণ্ঠ-সঙ্গীতকেও সঙ্গীত বলে"

:
"থাকেন। ২০"

Let's re-verify all lines and line breaks against the original image.

Top header:
Left: ৪
Center: সঙ্গীত পারিজাত
Wait, in markdown:
৪ \s+ সঙ্গীত পারিজাত
Let's write:
৪ সঙ্গীত পারিজাত

Then:
নাহং বসামি বৈকুণ্ঠে যোগিনাং হৃদয়ে ন চ।
মদ্ভক্তা যত্র গায়ন্তি তত্র তিষ্ঠামি নারদ॥ ১৬
ভগবান নিজেই বলছেন—হে নারদ, আমার বসবাস বৈকুণ্ঠেও নয়, যোগী-
ঋষিদের মনের গহনেও নয়; আমি থাকি শুধু সেইখানেই, যেখানে আমার
ভক্তগণ নাম-গান ক'রে থাকেন! ১৬