सामग्री पर जाएँ
सर्वकोश
संग्रह पर लौटें

सङ्गीतपारिजात (अहोबल - वीणा के तारों पर शुद्ध व विकृत स्वर-स्थान निर्धारण का ऐतिहासिक ग्रन्थ)

Sangitaparijata of Ahobala on Indian Musicology

पण्डित अहोबल (टीकाकार: कलानिधि कलिन्द) द्वारा

DevanagariHindipublished358 पृष्ठ

ভাবে গাইবার পর দেখা যাবে, গানটি শেষ হচ্ছে সা স্বরকে অবলম্বন
ক'রে। হয়তো গানের সম থাকবে পা স্বরের ওপর; কিন্তু, সামগ্রিক
বিচারে গানটির বা রাগটির বৈশিষ্ট্য বজায় থাকবে,—ন্যাসস্বররূপে সা-কে
অবলম্বন করলে।
অপন্যাসস্বর হচ্ছে,—ন্যাসস্বর বলতে যেমন সমগ্র ভাবে গানের চারটি
পাদ বা তুক-এর শেষ স্বরকে বোঝায়, অপন্যাসস্বর বলতে তেমনি বোঝায়
গানের প্রতিটি পাদের বা তুক-এর শেষ স্বরকে। যেমন, বেহাগের স্থায়ীতে
ন্। সা গা মা পা-র পা স্বর হচ্ছে অপন্যাস স্বর।
সন্ন্যাস স্বর হচ্ছে—অপন্যাস বলতে যেমন পাদ-এর শেষ স্বরকে বোঝায়
সন্ন্যাস বলতে তেমনি বোঝায় পাদেরই পদ বিশেষেব অর্থাৎ পংক্তি
বিশেষের শেষ স্বরকে। (গানের ক্ষেত্রে পদ বলতে যেমন পংক্তি বোঝায়
নিরঙ্কুশ রাগালাপের ক্ষেত্রে পদ বলতে তেমনি বিদারী বোঝায়) অপন্যাস
প্রসঙ্গে, বেহাগের স্থায়ী পাদ-এর শেষস্বর হিসাবে যে পা স্বরটিব ব্যবহার
দেখিয়েছি, সেই পা স্বরটির সঙ্গে যদি গা স্বরের সংবাদ বা সঙ্গতি পরিলক্ষিত
হয়, তাহলে উক্ত গা স্বরটিই হবে সন্ন্যাস। যেমন, পা-মগা।
বিন্যাস স্বর হচ্ছে,—সন্ন্যাসের মধ্যে কথঞ্চিৎ পরিমাণে অলঙ্করণের
আভাষ পরিস্ফুট হলেই, সন্ন্যাস স্বরটি বিন্যাসে পরিণত হয়। যেমন,
বেহাগের পা-ম-গমপমগা। ৩০০।২
একস্ফালন সংজাতশ্চাবিতঃ স্বর উচ্যতে।
চ্যবনং জায়তে যেষু তস্মাত্তে চ্যাবিতা মতাঃ॥ ৩০১
শারীরোঽপি স বিজ্ঞেয়ো স্থানত্যাগেন সংস্বতঃ।। ৩০২।১
একবার মাত্র আস্ফালন দ্বারা কণ্ঠ থেকে যে স্বর নির্গত হয় বা একটি
মাত্র আঘাতের দ্বারা (সঙ্গীত-যন্ত্রের তন্ত্রী থেকে) যে স্বর উদ্ভূত হয়,
তাকে চ্যবিত স্বর বলে। যে স্বর তার নিজের শ্রুতি থেকে বিচ্যুত বা
স্থানভ্রষ্ট হয়ে নির্গত হয় তারই নাম চাবিত স্বর। এই স্ব-স্থানচ্যুত
স্বরগুলি আবার “শারীর” নামেও অভিহিত হয়ে থাকে: ৩০১-৩০২।১
টিপ্পনী : পারিজাতকার এখানে গমকের পরিচয় দিচ্ছেন। কিন্তু এই
চ্যবিত গমকের উল্লেখ রত্নাকরে নেই। প্রসঙ্গক্রমে এখানে একথাও

[Header] সঙ্গীত পারিজাত ১০৫

উল্লেখযোগ্য যে, হাথরাস সঙ্গীত কার্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত পারিজাতের
টীকাকার কলিন্দজী “শারীর” স্থানে “আরীর” করেছেন, মূলে এবং ব্যাখ্যায়।
অথচ, এই “আরীর” শব্দটির উল্লেখ আমরা আর কোথাও পাচ্ছিনা; না
পারিজাতে না অন্য কোন সঙ্গীত গ্রন্থে। ৩০১-৩০২।১
একত্র কম্পিতো জ্ঞেয়ো হননাভ্যাং স্বরদ্বয়ম্ ॥ ৩০২।২
একই স্থানে দু’বার আঘাত করলে যে দু’টি স্বরের উদ্ভব হয়, তাকে কম্পিত
গমক বলে। ৩০২।২
টিপ্পনী : কম্পিত গমকের পরিচয় রত্নাকরে আছে। যথা—
দ্রুতার্দ্ধ মান বেগেন কম্পিতং গমকং বিদুঃ।
অর্থাৎ, দ্রুত মাত্রার অর্দ্ধ পরিমাণ বেগে নির্গত স্বরকে কম্পিত গমক
বলে।
প্রত্যাহত ইতি খ্যাতো হস্তৈকয়া স্বরদ্বয়ম্।
একত্র হন্যতে যস্তু দ্বিবারং স দ্বিরাহতঃ ॥ ৩০৩
(সঙ্গীত যন্ত্রে) একবার আঘাতের ফলে আহত হয়ে যে দু’টি স্বর নির্গত
হয়, তাকে প্রত্যাহত গমক বলে। এবং, একই স্থানে দু’বার আঘাতের ফলে
উদ্ভূত স্বরকে বলে দ্বিরাহত গমক!
স্ফুরিতো গমকো জ্ঞেয়ো হস্ত্যাহত্যাস্তং স্বরদ্বয়ম্।
যত্র চ হননাদূর্দ্ধং তত্রৈবানাহতঃ স্বরঃ ॥ ৩০৪
গমকঃ শান্তসংজ্ঞোহসাবিতি সূরিবিনির্ণয়ঃ।
চতুর্থাংশাহপরেভ্যোহসৌ দ্রুতস্য তিরিপো মতঃ ॥ ৩০৫
দু’টি স্বরে জোরে আঘাত করার ফলে যে গমকের উৎপত্তি হয়, তাকে স্ফুরিত
গমক বলে। একবার আঘাতের পর, পুনরায় আহত না হয়ে, যদি কোন
স্বর তার নিজের উৎপত্তিস্থানে ফিরে এসে লীন্ হয়ে যায়, তাহলে তাকে
শান্ত গমক বলে। এবং, যদি কোন স্বর দ্রুত মাত্রার এক চতুর্থাংশ বেগে
নির্গত হয়, তাহলে তাঁকে তিরিপ গমক বলে। ৩০৪-৩০৫
টিপ্পনী : স্ফুরিত ও তিরিপ গমক সম্বন্ধে রত্নাকর বলছেন—
বেগে দ্রুত তৃতীয়াংশ সম্মিতে স্ফুরিতো মতঃ।

আকর্ষণ (যেমন ন্ সা)
Wait, look at line 22:
"( যেমন ন্ সা )" with spaces inside parentheses.
ও আকর্ষণ অর্থে অবরোহী আকর্ষণ ( যেমন স ন্ ) বোঝাতো। ৩০৭।২
অগ্রে গত্বা নিবৃত্তোঽসৌ পুনঃ স্বস্থান উচ্যতে।
পশ্চাদগত্বা নিবৃত্তোঽসাবগ্রস্বস্থানসংজ্ঞকঃ ॥ ৩০৮
Wait, in line 25:
"নিবৃত্তোঽসাবগ্রস্বস্থানসংজ্ঞকঃ" - look at the text:
প শ্চা দ্ গ ত্ ত্বা নি ব ৃ ত্ তো ঽ সা ব গ্র স্ব স্থা ন সং জ্ঞ কঃ ॥ ৩০৮
Yes! "পশ্চাদগত্বা নিবৃত্তোঽসাবগ্রস্বস্থানসংজ্ঞকঃ ॥ ৩০৮"
কোন স্বর যখন তার পরবর্তী স্বরে পৌঁছেই আবার স্বস্থানে ফিরে আসে
তখন তাকে “পুনঃ স্বস্থান” গমক বলে। যেমন, ন্সন্।

Wait, let's re-verify line 27:
"তখন তাকে “পুনঃ স্বস্থান” গমক বলে। যেমন, ন্সন্।"
Quotes: “পুনঃ স্বস্থান”
Wait, look at the quotes:
Left quote: “ (double quote)
Right quote: ” (double quote)
Yes!

Line 20:
"বিক

of line 6: circle on left, curve up, loop. That's ৯.
Now look at line 9: it has a loop on left, and a tail dropping down... wait, it looks like ৭ or an incomplete ৯?
Wait, 308 was previous, verse is 309, why would it be 307? It's a misprint in the book for ৩০৯ or it's ৩০৭?
Wait, look at ৭ in ১০৭ (top right page number): loop on left, tail curves right.
In line 9: loop at top left, vertical line going down-right: it looks like ৭! But wait, let's look really closely at line 9:
It has ৩, ০, and then ৭ or ৯? The tail goes down, without the bottom loop of ৯. It is printed as ৩০৭ or ৩০৯?
Wait, let's preserve what is printed: looks like ৩০৭ (or ৩০৯). Actually, let's look at line 10: টিপ্পনী: ... অভিন্ন। ৩০৯. There it is clearly ৩০৯.
In line 9, it's ৩০৭ or ৩০৯? Wait, the top of the digit is a loop, but the right side has no loop, it goes down like ৭. So it's probably misprinted as

১০৮ সঙ্গীত পারিজাত
জানতে পারছিনা। সুতরাং, মূল পারিজাতের গমক অধ্যায়ের কিছু সূত্র
বিলুপ্ত হয়েছে নিঃসন্দেহ। ৩১১
এবং লক্ষণসংযুক্তা গমকা বহবো মতাঃ।
ন তে ময়োদিতাঃ সর্ব্বা গ্রন্থবিস্তারভীতিনা ॥ ৩১২
এই রকম, পৃথক পৃথক লক্ষণযুক্ত আরও অনেক রকমের গমক আছে।
গ্রন্থের কলেবর বৃদ্ধির ভয়ে, আমরা সব রকম গমকের নাম ও লক্ষণ বর্ণনায়
নিবৃত্ত হলাম। ৩১২
ইতি গমকাঃ
স্বরস্য হেতুভূতায়া বীণায়াশ্চাক্ষুষত্বতঃ।
তত্র স্বরবিবোধার্থং স্থানলক্ষণমুচ্যতে ॥ ৩১৩
স্বরের পরিচায়াদি জানবার পক্ষে বীণা (সেতার নয়) প্রভৃতি সঙ্গীত যন্ত্রের
উদাহরণ অপরিহার্য্য, যেহেতু এই যন্ত্রগুলি দৃষ্টি-গোচরীভূত পদার্থ। সুতরাং,
এই যন্ত্রের মাধ্যমেই স্বরের স্থান-লক্ষণাদি বোঝাবার চেষ্টা করছি। ৩১৩
টিপ্পনী : বোঝবার সুবিধার জন্য এখানে একটি (কাল্পনিক ৩৬ অঙ্গুলী
মাপযুক্ত) বীণা তন্ত্রীর চিত্র দেওয়া হলো। ৩১৩

সঙ্গীত পারিজাত ১০৯
[বীণাতন্ত্রী চিত্র ও বিবরণ]
মেরু
সা ও শুদ্ধ রে-র প্রথম ১/২ ভাগের শেষ প্রান্তে পারিজাতের কোমল রে বসছে।
মুদারার সা ও পা-র ৩ ভাগের প্রথম ভাগের প্রান্তে পারিজাতের শুদ্ধ রে বসছে।
মুদারার সা ও ধা-র ঠিক মধ্যবর্তী স্থানে পারিজাতের তীব্র গা বসছে।
মুদারার সা ও পা-র ঠিক মধ্যবর্তী অংশে পারিজাতের শুদ্ধ গা বসছে। (পারিজাতের শুদ্ধ গা = আধুনিক জ্ঞা)
সা ও র্সা-র ঠিক মধ্যবর্তী স্থলে মা বসছে।
পারিজাতের তীব্র গা ও র্সা-র প্রথম ১/২ ভাগের শেষ প্রান্তে পারিজাতের তীব্র মা বসছে। (পারিজাতের তীব্র মা = আমাদের ক্ষা)
মা ও র্সা-র ৩ ভাগের প্রথম ভাগের শেষ প্রান্তে পা বসছে।
পা ও র্সা-র ৩ অংশের প্রথম ভাগের শেষ প্রান্তে পারিজাতের কোমল ধা বসছে।
পা ও র্সা-র ঠিক মধ্যবর্তী অংশে ধা বসছে।
ধা ও র্সা-র ৩ ভাগের পূর্ব্ব-দ্বিতীয় অংশে বা প্রথম ভাগের শেষ প্রান্তে পারিজাতের শুদ্ধ নি বসছে। (আধুনিক নি = পারিজাতের শুদ্ধ নি)
ধা ও র্সা-র ১/২ অংশের প্রান্তে পারিজাতের তীব্র নি বসছে। (পারিজাতের তীব্র নি = আমাদের শুদ্ধ নি)
কাল্পনিক ৩৬ অঙ্গুলি মাপের অর্দ্ধেক ১৮ অঙ্গুলীতে তারার র্সা বসছে।
[তন্ত্রীস্থিত স্বরচিহ্নসমূহ (মেরু হইতে র্সা পর্যন্ত)]:
মেরু — সা — ঋা — শ্রা — জ্ঞা — গা — ম্রা — ত্মা — পা — দা — ধা — ণ্বা — না — স্রা
[পার্শ্ববর্তী মন্তব্য]:
আজকের দিনেও এই পদ্ধতিতেই বীণার স্বর বাঁধা হয়। তবে, পারিজাতের ঋা-রা তীব্র গা ও ধা-ধা-র সঙ্গে আমাদের প্রচলিত ঋা-রা শুদ্ধ গা ও ধা-ধা-র কিঞ্চিৎ পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়।
৩৬ অঙ্গুলীর মেরু—কাল্পনিক মাপযুক্ত বীণাতন্ত্রী।

১১০ সঙ্গীত পারিজাত
ধ্বন্যবচ্ছিন্নবীণায়াং মধ্যে তারক-সঃ স্থিতঃ।
উভযোঃ ষড্‌জয়োর্মধ্যে মধ্যমং স্বরমাচরেৎ ॥ ৩১৪
ধ্বনিবিশিষ্ট, অর্থাৎ, তন্ত্রীবিশিষ্ট বীণাযন্ত্রের ঠিক মাঝখানে তারার সাঁ
বসাতে হবে। এবং, তারার সাঁ ও মুদারার সা-র মাঝখানে বসাতে হবে
মা-কে। ৩১৪
ত্রিভাগাত্মকবীণায়াং পঞ্চমঃ স্যাত্তদগ্রিমে।
ষড়্‌জপঞ্চময়োর্মধ্যে গান্ধারস্য স্থিতির্ভবেৎ ॥ ৩১৫
বীণার দুই প্রান্তের মধ্যবর্তী স্থানকে, অর্থাৎ মা ও সা-র অংশটিকে, তিনভাগে
বিভক্ত ক’রে, প্রথম তৃতীয়াংশের প্রান্তভাগে, মা-র ঠিক সম্মুখে পা-কে
বসাতে হবে। এবং মুদারার সা ও পা-র মাঝখানে বসাতে হবে
গা-কে। ৩১৫
টিপ্পনী : এখানে “অগ্রিমে” কথাটি ব্যবহৃত হয়েছে “পূর্ব্ব” কথাটির
পরিবর্ত্তে। “পূর্ব্ব” কথাটির অর্থ হচ্ছে, তিন ভাগের প্রথম বা অগ্রিম
প্রান্ত। ৩১৫
স-পয়োঃ পূর্ব্বভাগে চ স্থাপনীয়োহথ রি-স্বরঃ।
স-পয়োর্মধ্যদেশে ( প-সয়োর্মধ্যদেশে ? ) তু ধৈবতং
স্বরমাচরেৎ ॥ ৩১৬
মুদারার সা থেকে পা পর্যন্ত স্থানটিকে তিনভাগে বিভক্ত করে, প্রথম
তৃতীয়াংশের প্রান্তে বসাতে হবে রে-কে। পা ও তারার সাঁ-র ঠিক মধ্যবর্তী
অংশে ধা বসছে। ৩১৬
টিপ্পনী : এখানে “মধ্যদেশে” অর্থে মধ্য কথাটিকেই বোঝাচ্ছে। মধ্য
এখানে দুই ভাগের মধ্যবর্তী অংশ মাত্র। কিন্তু “মধ্য” যেখানে “ভাগত্রয়”
অর্থাৎ তিন ভাগের প্রসঙ্গে উল্লিখিত হয়, সেখানে, তিনভাগের দ্বিতীয়
ভাগটিকে—অর্থাৎ মধ্যভাগটিকেই “মধ্য”-রূপে গ্রহণ করতে হয়। ৩১৬
তত্রাংশদ্বয়সন্ত্যাগান্নিষাদস্য স্থিতির্ভবেৎ ॥ ৩১৭
ধা ও তারার সাঁ-র মধ্যবর্তী স্থানকে তিন ভাগে ভাগ ক’রে, পূর্ব্ব-
দ্বিতীয় ভাগের প্রান্তে বসাতে হবে নি-কে। ৩১৭

টিপ্পনী : এখানে স্মরণ রাখতে হবে, পারিজাতের শুদ্ধ সপ্তক বর্তমানের
কাফির মতো। অর্থাৎ, পারিজাতের শুদ্ধ গা-নি বর্তমানের কোমল
জ্ঞা-নি। ৩১৭
ইতি শুদ্ধস্বরাঃ।
ভাগত্রয়ান্বিতে মধ্যে মেরো ঋষভসংজ্ঞিতাৎ
ভাগদ্বয়োত্তরং মেরোঃ কুর্য্যাৎ কোমল-রি-স্বরম্ ॥ ৩১৮
মেরু ধৈবতয়োর্ম্মধ্যে তীব্রগান্ধারমাচরেৎ ॥ ৩১৯
ভাগত্রয়বিশিষ্টেঽস্মিন্ তীব্র গান্ধার-ষড়্জয়োঃ।
পূর্ব্বভাগোত্তরং মধ্যে মং তীব্রতমমাচরেৎ ॥ ৩২০
ভাগদ্বয়ান্বিতে মধ্যে পঞ্চমোত্তরষড়্জয়োঃ।
কোমল ধৈবতঃ স্থাপ্যঃ পূর্ব্বভাগে মনীষিভিঃ ॥ ৩২১
তথৈব ধ-সয়োর্ম্মধ্যে ভাগত্রয়সমন্বিতে।
পূর্ব্বভাগদ্বয়াদূর্দ্ধং নিষাদং তীব্রমাচরেৎ ॥ ৩২২
ঋষভঃ শুদ্ধ এবাসৌ পূর্ব্বগান্ধার ইষ্যতে।
গান্ধারঃ শুদ্ধ এবাসৌ রিস্তীব্রতর ইষ্যতে ॥ ৩২৩
অতিতীব্রতমো গঃ স্যান্মধ্যমঃ শুদ্ধ এব হি।
ধৈবতঃ শুদ্ধ এবাসৌ নিষাদঃ পূর্ব্বসংজ্ঞকঃ।
নিষাদঃ শুদ্ধ এবাসৌ ধস্তীব্রতর ইষ্যতে ॥ ৩২৪
এবং স্যাৎ সর্ব্বযন্ত্রেষু স্বরস্থানস্য লক্ষণম্ ॥ ৩২৫
মেরু বা সা ও শুদ্ধ রে-র মধ্যবর্তী অংশকে তিনভাগে ভাগ ক'রে, প্রথম
ভাগের শেষ প্রান্তে বসাতে হবে কোমল রে (ঋ)। ৩১৮
মেরু বা সা এবং ধা-য়ের ঠিক মাঝখানে তীব্র গান্ধার বসাতে হবে। ৩১৯
টিপ্পনী : পারিজাতের তীব্র গা হচ্ছে বর্তমানের শুদ্ধ গা। ৩১৯
তীব্র গা ও তারার সা-র মধ্যবর্তী স্থানকে তিনভাগে ভাগ ক'রে, প্রথম
তৃতীয়াংশের প্রান্তে তীব্র মা [ বর্তমানের কড়ি মা ] বসাতে হবে। ৩২০

১১২ সঙ্গীত পারিজাত
পা ও তারার সা-র মধ্যবর্তী স্থানকে তিনভাগে ভাগ ক'রে, প্রথম
তৃতীয়াংশের প্রান্তে কোমল ধা বসাতে হবে। ৩২১
ধা ও তারার সা-র মধ্যবর্তী স্থানকে তিনভাগে ভাগ ক'রে, দ্বিতীয়
তৃতীয়াংশের প্রান্তভাগে তীব্র নি (বর্তমানের শুদ্ধ নি) বসাতে হবে। ৩২২
শুদ্ধ রে স্বরকেই পূর্ব্ব-গা বলে।
শুদ্ধ গা স্বরকেই তীব্রতর রে বলে। (পারিজাতের শুদ্ধ গা=বর্তমানের
কোমল জ্ঞা)।
শুদ্ধ মা স্বরকেই অতি-তীব্রতম গা বলে।
শুদ্ধ ধা স্বরকেই পূর্ব্ব-নি বলে।
শুদ্ধ নি স্বরকেই তীব্রতর ধৈবত বলে।
বলাবাহুল্য, সব যন্ত্রেই, এই ভাবেই স্বরাদির স্থান নির্ণীত হয়ে থাকে। (২৩
পৃষ্ঠার শ্রুতি-মণ্ডল চিত্র ও ৭৩-৭৮ সূত্রের টিপ্পনী দ্রষ্টব্য)। ৩২৪-৩২৫
ইতি বিকৃত স্বরাঃ।
স্বরজ্ঞানবিহীনেভ্যো মার্গোহয়ং বোধিতো ময়া।
স্বরসম্বাদি হাঁজ্ঞানাং স্বরস্থাপনকারণম্॥ ৩২৬
যাদের স্বর-বিজ্ঞান সম্বন্ধে কোন জ্ঞান নেই, তাদের জন্যই আমি এই
স্বর-স্থাপনের (মার্গ=পন্থা) পন্থা নির্দেশ করছি। কোন স্বরের সমবাদী কে,
সে সম্বন্ধে জ্ঞান থাকলে, সহজেই এই পন্থায় স্বর-স্থাপন করা যায়। ৩২৬
টিপ্পনী : স্বরাদির স্থান নির্ণয় করে পারিজাতকার অতি সংক্ষেপে যে
মন্তব্যটি করেছেন, সে সম্বন্ধে আজকের দিনেও কিন্তু বিতর্কের অন্ত নেই।
আজও অনেক সঙ্গীতবিদ্কে পারিজাতের স্বর-শ্রুতি বিভাগের যৌক্তিকতা
নিয়ে, অর্থাৎ "মধ্য" কথাটির সম্ভাব্য অর্থ নিয়ে সুচিন্তিত প্রবন্ধাদি লিখতে
দেখা যায়।
বিতর্কের বিষয়ট। হচ্ছে, ২২ শ্রুতির ভিত্তিতে সা-র্সা-র মধ্যস্বর অর্থাৎ ১/২
ভাগ মা স্বর হয় কী করে? ২২ শ্রুতির হিসাব অনুযায়ী ২২শের অর্দ্ধেক
১১ শ্রুতিতে তাহলে মা-য়ের স্থান হওয়া উচিত। অথচ, স্বর-শ্রুতি-মণ্ডল
চিত্রে দেখা যাচ্ছে, মা-য়ের স্থান ১৩ শ্রুতিতে। অনুরূপ, পায়ের স্থান ৩/৪
ভাগেই বা পড়ে কী করে?

সঙ্গীত পারিজাত ১১৩
আমাদের মনে হয়, শ্রুতি বিভাগের অঙ্কশাস্ত্রটাকে মুখ্য করে এ সমস্যার
সমাধান কিছুতেই হতে পারে না। আপাতত: ২২ শ্রুতির কথাটি ভুলে
গিয়ে, আমরা যদি অহোবল বর্ণিত তন্ত্রী বিভাগটির ওপর গুরুত্ব আরোপ
করি, তাহলে, স্বরাদি সংস্থাপনের শেষ ফল হিসাবে, অতি প্রাচীন এই
২২ শ্রুতিরও একটা স্বাভাবিক অস্তিত্ব উপলব্ধি করতে পারি। অবশ্য, বীণার
তন্ত্রীর মাপটা যে আসলে কত, সে কথা পারিজাতকার লেখেন নি।
কিন্তু, এই মাপের কথা অহোবলের পূর্ব্ববর্ত্তী শাস্ত্রকাররা অনেকেই বলে
গেছেন। মাপটা হচ্ছে ৩৬ আঙ্গুল। এই ৩৬ আঙ্গুলের অর্দ্ধেক ১৮
আঙ্গুলে তারার সাঁ বসাতে হবে। কিন্তু, এই সা-সাঁ, সা-মা, সাঁ-পা,
ধা-ণা প্রভৃতি স্বরগুলিকে পারিজাতকার কখনও ১/২, কখনও ১/৩ কখনও
বা ১/৪ ভগ্নাংশের ভাগে ভাগ করলেন কেন? এটা কি তাঁর নিজস্ব আবিষ্কার
কিংবা তাঁর পূর্ব্ববর্ত্তীরাও এই আইন অনুযায়ী স্বরের স্থান নির্দেশ
করতেন? আইনটা যে বহু পুরাতন তার প্রমাণ পাওয়া যায় প্রাচীন বৈদিক
ও তামিল সঙ্গীত গ্রন্থাদির পৃষ্ঠায়। দেখা যায়, সেকালের ২২ শ্রুতির অন্তর্গত
স্বর সপ্তকটা ছিল, পরবর্ত্তীকালের কর্ণাটিক্ শুদ্ধ সপ্তকের অনুরূপ। যথা—
প্রাচীন বৈদিক ও তামিল সপ্তক—
সা ঋা রা মা পা দা ধা সাঁ
প্রাচীন কর্ণাটিক্ শুদ্ধ সপ্তক—
সা রা গা মা পা ধা না সাঁ
পারিজাতের শুদ্ধ সপ্তক—
সা রা গা মা পা ধা না সাঁ
বর্ত্তমান হিন্দুস্থানী ১২ স্বর—
সা ঋা রা জ্ঞা গা মা ক্ষা পা দা ধা ণা না সাঁ
দেখা যাচ্ছে, অন্যান্য স্বরের পরিবর্তন ঘটলেও, অতি প্রাচীন মা ও পা
স্বর দু’টি আজকের দিনের মতোই স্বয়ম্ভূ ছিল। ( ৮৬-৮৭ সূত্রের টিপ্পনী
দ্রষ্টব্য ) এবং, এই স্থায়িত্বটা, দীর্ঘস্থায়ী হয়ে শেষ পর্য্যন্ত চিরস্থায়িত্বে পরিণত
হয়েছিল, যেহেতু, প্রাচীন শাস্ত্রকারগণও পরবর্ত্তীকালের অহোবলের মতো,
সকলের আগে সা-সাঁ, সাঁ-মা-সা, ও সাঁ-পা-মা এই তিনটি ভাগকে বার
ক’রে নিতেন এবং তার পরে, সমসাময়িককালে প্রচলিত বাকি শুদ্ধ ও বিকৃত

১১8 সঙ্গীত পারিজাত

স্বরগুলিকে (যেমন কর্ণাটিক্ শুদ্ধ রে-ধা = আমাদের কোমল ঋ-দা এবং
পারিজাতের শুদ্ধ গ!-নি = আমাদের কোমল জ্ঞ! নি) ১/২ ১/৩ ১/৪ প্রভৃতি ভগ্নাংশের
ভাগ দ্বারা নির্ণয় করতেন। এবং তারপরে, সপ্তকের সমস্ত স্বরগুলির স্থান
যথাযথ ভাবে নির্ণীত হয়ে যাবার পর দেখা যেত, সপ্তকটির মধ্যে ২২টি শ্রুতি
বিরাজ করছে।
কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, কী ভাবে ২২টি শ্রুতি সপ্তকের মধ্যে বিরাজ করছে
তার বিভাগ নির্ণয় করা। বিভাগটী কি সমান সমান হবে? বস্তুত, প্রাচীন
শাস্ত্রাদি অধ্যয়নের ফলে অনুরূপ সমান সমান বিভাগের কথাই মনে আসে।
যেমন, রত্নাকর বলছেন, বীণা যন্ত্রের স্বরাদির মধ্যে যব বসিয়ে বসিয়ে ২২
শ্রুতির অস্তিত্ব চাক্ষুষ করা যেতে পারে। কিন্তু সে সব যবের মাপ কী?
ছোট বড় না মাঝারি? অপরপক্ষে, আধুনিকযুগের বৈজ্ঞানিকগণ, ধ্বনি-
নিরীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে cent বা যতির যা হিসাব পাচ্ছেন তার সঙ্গে
২২ শ্রুতির অসামঞ্জস্যই পরিলক্ষিত হয়। অর্থাৎ, স্বরের স্বাভাবিক বিভাগ
অনুযায়ী শ্রুতির সংখ্যাটা, হয় ২২শের বেশী হয়ে যায় কিংবা কম হয়ে যায়;
সঠিক ২২ শ্রুতি কিছুতেই হয় না। ফলে—
এই সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে কেউ হেলেম্হোল্শ প্রমুখ পাশ্চাত্য
সঙ্গীতবিদ্দের থিয়োরী অবলম্বন ক'রে আরও দুর্ব্বোধ্য ক'রে তুলেছেন
ব্যাপারটাকে, কেউ সাধনায় বিফল হয়ে ব্যাপারটাকে স্রেফ একটা বাজে
উদাহরণ বলে মন্তব্য করেছেন, কেউ অর্থহীন অঙ্কশাস্ত্র-অসম্মত শ্রুতিচিত্র
এঁকে আত্মবঞ্চনা করছেন, কেউ বা কিছুতেই নিরস্ত না হয়ে, আজও মস্তিষ্ক
চালনা ক'রে চলেছেন সনিষ্ঠ অধ্যবসায়।
বলাবাহুল্য অতি প্রাচীন, অতীব প্রচলিত ২২ শ্রুতির ব্যাপারটা যে
নিছক একটা অবৈজ্ঞানিক কষ্ট-কল্পনা, এ কথা মেনে নিতে, সত্যকার
ভারতবাসী মাত্রেই লজ্জিত হবেন। অপরপক্ষে এ কথাও সত্য যে, নাট্য-
শাস্ত্রকার ভরত থেকে আরম্ভ ক'রে, নন্দিকেশ্বর, দত্তিল, মতঙ্গ, পার্শ্বদেব,
শার্ঙ্গদেব প্রমুখ সে যুগের কোন সঙ্গীতশাস্ত্রকারই এই ২২ শ্রুতির পরিকল্পনা
ও তার বৈজ্ঞানিক বিভাগ সম্বন্ধে এমন কিছুই বলে যান্ নি, যার
ওপর নির্ভর ক'রে কোন রকম সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায়। ব্যতিক্রম
কেবল রত্নাকর-পরবর্ত্তী যুগের অহোবল। কারণ, পারিজাত পাঠ করেই
সর্ব্বপ্রথম আমরা ২২ শ্রুতির স্বাভাবিক বিভাগ নির্ণয়-করণ সম্বন্ধে একটা

সুস্পষ্ট ইঙ্গিত পাই—বীণা-তন্ত্ৰীর মাধ্যমে দূরত্ব স্থিরীকরণের উল্লেখে।
কিন্তু, ইঙ্গিতটা সুস্পষ্ট হলেও তার সমাধান সহজসাধ্য নয়। বস্তুত, ২২
শ্রুতির সম্ভাব্য অস্তিত্ব সম্বন্ধে এতাবৎকালের মধ্যে আমরা যত কিছু পড়েছি
বা আলাপ আলোচনা শুনেছি, তার মধ্যে প্রখ্যাত সঙ্গীতবিদ্ ডাঃ বিমল
রায়ের হিসাবটাই যেন একটা সুষ্ঠু সমাধানের পন্থা নির্দেশ করে। ব্যাপারটা
হচ্ছে :—
শ্রুতির জন্ম হয়েছে তারের বিভাগ থেকেই। যে কোন মাপের একটি
তারের দু'ই ষড়্‌জ অর্থাৎ সা-র্সা-র মাঝখানে অর্দ্ধেক ( ১/২ ) ও এক
তৃতীয়াংশে ( ১/৩ ) মা ও পা স্বর দু'টিকে পাওয়া যায়। অতঃপর, পা-কে
যদি সা হিসাবে গ্রহণ করা যায়, তাহলে তার মা হয়ে যায় তারার
র্সা। অর্থাৎ সা-মা = পা-র্সা এবং এই সা-মা বা পা-র্সা-র Ratio ( অনুপাত )
হচ্ছে ৩/৪। অতঃপর অবরোহণ ( আবোহন গতি নয় ) গতির র্সা-মা
ও পা-র্সা-র পূর্ব্বোক্ত ১/২ ও ১/৩ বিভাগের ভিত্তিতে যে সপ্তকটি তৈরি হয়,
তার স্বরগুলির আনুপাতিক ( Ratio ) সম্পর্ক দাঁড়ায়, যথাক্রমে, সা-রে =
১১/১ , রে-গা = ২২/২১, গা-মা = ৭/৬, মা-পা = ৯/৮, পা-ধা = ১২/১১,
ধা-নি = ২১/২১ ও নি-সা = ৭/৬।
অর্থাৎ, সা-রে = পা-ধা = ১২/১১
রে-গা = ধা-নি = ২২/২১
গা-মা = নি-র্সা = ৭/৬
এবং মা-পা = ৯/৮
অতঃপর দেখতে হবে, এই Ratioগুলির সাহায্যে কতগুলি শ্রুতির
অস্তিত্ব সম্ভবপর। সুতরাং Ratioগুলির লসাগু গ্রহণ করতে হবে।
ফল হবে, ২৭৭২। এর পর দেখতে হবে, এই বিরাট সংখ্যাটিকে গ্রহণ-
যোগ্য করা যেতে পারে কী উপায়ে। উপায়টা হচ্ছে গুণনীয়কের সাহায্য
গ্রহণ করা। অর্থাৎ, দেখতে হবে ২৭৭২ সংখ্যাটার গুণনীয়ক হতে পারে
কোন কোন সংখ্যা। গুণনীয়ক হতে পারে, যথাক্রমে, ১২, ১৮, ২১,
২২, ২৮, ৩৩ এবং ৬৬ সংখ্যা। অর্থাৎ, এই সাতটি সংখ্যার মধ্যে যে
কোন একটিই আমাদের সপ্তকের শ্রুতিসংখ্যা হিসাবে গ্রহণযোগ্য হতে
পারে। দেখা যাচ্ছে, এই সংখ্যাগুলির মধ্যে ২২ সংখ্যাটিও রয়েছে। অপর-
পক্ষে, আমাদের শাস্ত্রকারগণ সকলেই ২২ শ্রুতির কথা বলে গেছেন।

/২৪৩ হচ্ছে। অর্থাৎ, মা-পা-র ৯/৮ দিয়ে সা-মা-র ৪/৩
Wait, line 10 has ২৫৬/২৪৩, not ``! Make sure it's ২৫৬/২৪৩.
কে ভাগাভাগি করলে ফল হবে ৪/৩ × ৮/৯ = ৩২/২৭ এবং আবার ভাগ করলে
দাঁড়াবে ৩২/২৭ × ৮/৯ = ২৫৬/২৪৩ অর্থাৎ, সা-মা বা ৪/৩ Ratioটির মাঝখানে দু’টি
মা/পা বা ৯/৮ এবং একটি মাত্র ২৫৬/২৪৩ Ratio আছে। কিন্তু, মা/পা বা
৯/৮ হচ্ছে ২৫৬/২৪৩ সংখ্যাটির প্রায় আড়াই গুণ। অপরপক্ষে, শ্রুতির মধ্যে
২ ১/২-এর মতো কোন ভাঙ্গা সংখ্যার অস্তিত্ব অবাস্তব। অর্থাৎ, শ্রুতির
মধ্যে কোন ভাঙ্গা সংখ্যার অস্তিত্ব প্রকট হয়ে উঠলে, সংখ্যাটাকে, অবস্থা
অনুযায়ী, দ্বিগুণ, ত্রিগুণ, এমন কি চারগুণ করেও ধরে নেওয়া যেতে
পারে। কিংবা, একটিকে ২ ধরে অপরটিকে ৫, অথবা, একটিকে ৪ ধরে
অপরটিকে ৯ ধরাও চলে। এক্ষেত্রে, ১/২ ধরলে, সপ্তকের স্বর-অন্তরের
মূল্যবান হয়ে যায় ১২। কিন্তু ১২-তে অন্তরগুলি খুব বড় হয়ে যায়।
[L

সঙ্গীত পারিজাত ১১৭
প্রবর্ত্তন্তে স্বরাঃ সর্ব্বে সদা সম্বাদিরূপিণঃ।
ষড়্জ-পঞ্চম-ভাবেন ষড়্জে জ্ঞেয়াঃ স্বরাবুধৈঃ।
গ-নি-ভাবেন গান্ধারে ম স-ভাবেন মধ্যমে ॥ ৩২৭
সব স্বরই, সর্ব্বদা তাদের সমবাদী স্বরের সঙ্গে সামঞ্জস্য রক্ষা ক'রে ব্যবহৃত
হয়ে থাকে। ষড়জের ক্ষেত্রে সা পা-য়ের সঙ্গে মিলিত হয়, গান্ধারের
ক্ষেত্রে গা নি-য়ের সঙ্গে সঙ্গতি রক্ষা করে, এবং মধ্যমের ক্ষেত্রে মা সা-য়ের
সঙ্গে সমবাদিত্ব করে। ৩২৭
ইতি স্বরস্থানলক্ষণম্।
অথ শুদ্ধৈঃ স্বরৈৰ্মেলাঃ কথ্যন্তে বিকৃতৈরপি।
তেষাং মিতিঃ খ-বেদৌ চ বহ্নিশ্চন্দ্রদ্বয়ং তথা ॥ ৩২৮
অতঃপব শুদ্ধ ও বিকৃত স্বরের মেল সম্বন্ধে আলোচনা করা যাচ্ছে। শুদ্ধ
ও বিকৃত ভেদে মেল-এর সমষ্টি সংখ্যা হচ্চে ২১,৩৪০ ।—৩২৮
মেলঃ স্বরসমূহঃ স্যাদ্রাগব্যঞ্জনশক্তিমান্।
শ্লিষ্টোচ্চারণমেবাণ স তূদারঃ প্রকীর্তিতঃ ॥ ৩২৯
রাগ প্রকাশ করবার মতো শক্তি সম্পন্ন স্বরসমূহকে মেল্ বলে। এই
স্বরসমূহের উচ্চারণ বা প্রয়োগ যদি সামঞ্জস্যপূর্ণ ও লোকরঞ্জক হয় তাহলে,
সেই মেল্-এর স্বরূপটিকে উদার বলা হয়। ৩২৯
আদ্যাদ্যমূর্চ্ছনাভিশ্চ মেলা জ্ঞেয়া বিচক্ষণৈঃ ॥ ৩৩০
বিচক্ষণ সঙ্গীতবিদদের মতানুসারে, প্রত্যেক গ্রামের প্রথম মূর্চ্ছনার দ্বারাই
এক একটি মেল্ রচিত হয়। ৩৩০
টিপ্পনীঃ প্রথম বা আদি মূর্চ্ছনা অর্থে পারিজাতকার এখানে, ষড়্জ
গ্রামের উত্তরমন্দ্রা, মধ্যম গ্রামের সৌবীরী ও গান্ধার গ্রামের নন্দা মূর্চ্ছনার
কথা বলছেন। অবশ্য, আরও ছয়টি ক'রে মূর্চ্ছনা হয় তিনটি গ্রামেরই ;

১১৮ সঙ্গীত পারিজাত
কিন্তু আদি মূর্চ্ছনা ব্যতীত অন্য কোন মূর্চ্ছনাকে মেলরূপে গণ্য করা হয় না।
এ সম্বন্ধে ১০৩-১০৭ সূত্রের ব্যাখ্যা দ্রষ্টব্য। ৩৩০
সপ্তভিশ্চ স্বরৈঃ পূর্ণঃ ষড়্ ভিস্তৈঃ ষাড়বো মতঃ।
ঔড়ু বঃ পঞ্চভিঃ প্রোক্ত এবং মেলস্ত্রিধাঃ মতাঃ ॥ ৩৩১
ষাড়বা ঔড়ুবাঃ ষড়্জং বিনা মেলা ন তে মতাঃ। ৩৩২।১
যে মেল সাতটি স্বরের দ্বাবা রচিত হয়, তাকে “পূর্ণ” বা সম্পূর্ণ মেল্
বলে। অনুরূপ, যে সব মেল্-এ স্বরের সংখ্যা ছয়টি থাকে তাকে বলে
ষাডব বা খাড়ব মেল্ এবং যে সব মেল্-এ স্বরের সংখ্যা থাকে পাঁচটি,
তাকে বলে ঔড় ব মেল্। সুতরাং দেখা যাচ্ছে, মেল্-এর সংখ্যা সাকুল্যে
তিন প্রকার। কিন্তু, এখানে একথাও স্মরণ রাখা প্রয়োজন যে, ষাডব
ও ঔড়ু ব মেল্গুলিতে ষড়্জ স্বরটিকে কোন অজুহাতেই বর্জ্জন করা চলবে
না। ৩৩১-৩৩২।১
টিপ্পনী : অহোবলেব মতানুযায়ী সা অবিলোপী স্বব। সুতরাং যদি
কোথাও দেখা যায়, কোন মেল্-এর স্বব পরিচয় দেওয়া হয়েছে রে
গা মা পা ধা, তাহলে বুঝতে হবে মেলটি হচ্ছে ষাডব-জাতীয়,—ঔডব
জাতীয় নয়, যেহেতু, উক্ত পাঁচটি স্ববের সঙ্গে অবিলোপী সা স্ববটি যুক্ত
হয়ে স্ববের সংখ্যাটাকে পাঁচেব পরিবর্ত্তে ছ'যে পরিণত করবে। অধিকন্তু
এখানে একথাও স্মবণ বাখা দরকাব যে, চলতি কথায় মেল্ বলতে যা
বোঝায়, এ মেল্ সে মেল্ নয। চলতি কথায় মেল্ বলতে ঠাট্ বোঝায়।
অর্থাৎ বাগেব স্বব-পবিচিতি বোঝায়। যেমন, কোমল রে গা ধা নি =
ভৈবরী ঠাট্ বা মেল্। কিন্তু এখানে মেল্ বলতে বোঝাচ্ছে, ঔডুর, ষাডব
এবং সম্পূর্ণ জাতিব মেল্—রাগ বিশেষেব ঠাট্ নির্দ্দেশক শুদ্ধ কোমলাদি
স্বরের পরিচয় নির্দ্দেশ করেছে না এ মেল্।—৩৩২।১
শুদ্ধত্ববিকৃতত্বাভ্যামিতি মেলা ময়োদিতাঃ। ৩৩২।২
তত্র যে চ প্রসিদ্ধাঃ স্যূরঞ্জকা যে বিশেষতঃ।
লক্ষণানি ব্রুবে তেষাং সম্মত্যা চ হনূমতঃ ॥ ৩৩৩
উপরোক্ত শুদ্ধ ও বিকৃত মেলগুলির মধ্যে যেগুলি প্রসিদ্ধ ( ও প্রচলিত )

সঙ্গীত পারিজাত ১১৯
এবং বিশেষ ভাবেই লোক-রঞ্জক, এইবার তাদের লক্ষণাদি বলা যাচ্ছে।
লক্ষণগুলিকে হনূমানের মতানুসারে বিবৃত করা যাচ্ছে।—৩৩২/২—৩৩৩
টিপ্পনী: প্রাচীনকালে অনেক রকমের “মত” প্রচলিত ছিল। যেমন,
হনুমান-মত, ভরত-মত, নারদ-মত, রত্নাকরের টিকাকার কল্লিনাথ-মত, গণেশ-
মত, শিব-মত, ইন্দ্রপ্রস্থ-মত, সোমেশ্বর-মত, (রাগ-বিবোধ রচয়িতা পণ্ডিত
সোমনাথকেই সোমেশ্বর নামে উল্লেখ করা হয়ে থাকে—যদিও আরও প্রাচীন-
কালে, সত্যই একজন সোমেশ্বর নামধারী সঙ্গীতজ্ঞ বর্তমান ছিলেন।)
ইত্যাদি। বস্তুতঃ, এঁদের মধ্যে মতভেদ ছিল বলেই এতগুলি মত-এর সৃষ্টি
ও প্রচলন হয়েছিল। পারিজাতকার এখানে হনূমানের মতানুসারে প্রচলিত
লক্ষণগুলির কথাই বলছেন। বলাবাহুল্য, বর্তমানে এই সব “মত”-এর কোনই
মূল্য নেই, যদিও, অনেক ওস্তাদ ব্যক্তি আজও তাঁদের ঘরোয়ানার কৌলীন্য
রক্ষার্থে এই সব “মত”-এর দোহাই পেড়ে থাকেন।—৩৩২/২=৩৩৩
গীতিযুক্তাশ্চ যে রাগাঃ শুদ্ধাস্তে শাস্ত্রসম্মতাঃ।
শুদ্ধা ভিন্না ততো গৌড়ী বেসরা চ ততঃপরম্॥
সাধারণীতি পঞ্চৈতান্তাসাং লক্ষণমুচ্যতে॥ ৩৩৪
যে রাগগুলি গীতিযুক্ত, তাকেই শাস্ত্র-সম্মত শুদ্ধ রাগ বলে। এই গীতি
পাঁচ রকমের হয়। যথা, ১। শুদ্ধা, ২। ভিন্না, ৩। গৌড়ী, ৪। বেসরা ও
৫। সাধারণী। এদের লক্ষণাদি বলা যাচ্ছে।—৩৩৪
টিপ্পনী: উপরোক্ত সূত্রের ব্যাখ্যায় আমরা জানতে পারছি, শুদ্ধা, ভিন্না
প্রভৃতি পাঁচ প্রকার গীতি-পদ্ধতির মধ্যে যে কোন একটি গীতি-পদ্ধতির
আশ্রিত রাগকেই শাস্ত্র-সম্মত শুদ্ধ রাগ বলে। কিন্তু, পারিজাতের পূর্ব্ববর্ত্তী
সঙ্গীত রত্নাকরে দেখা যায় “পঞ্চধা গ্রামরাগাঃ স্যুঃ পঞ্চগীতি সমাশ্রয়াৎ।
গীতয়ঃ পঞ্চ শুদ্ধাদ্যাঃ......”অর্থাৎ, শুদ্ধা, ভিন্না প্রভৃতি পাঁচ প্রকার গীতি-
পদ্ধতির আশ্রিত হয়ে যে গ্রাম-রাগগুলি নিষ্পন্ন হতো সেগুলি উক্ত গীতি-
পদ্ধতির নামানুসারে নামাঙ্কিত হয়েই পাঁচ রকমের হতো। যেমন, যে গ্রাম-রাগ
শুদ্ধা গীতি-পদ্ধতির আশ্রিত, তাকে শুদ্ধ-গ্রাম-রাগ বলা হতো। যে গ্রাম-রাগ
গৌড়ী গীতি-পদ্ধতির আশ্রিত, তার নাম হতো গৌড়ী-গ্রাম-রাগ। অধিকন্তু,

মাগধী, অর্দ্ধ-মাগধী, সম্ভাবিতা ও পৃথুলা নামক আরও চার রকম গীতি-
পদ্ধতিরও উল্লেখ আছে রত্নাকরে এবং এই চার রকম গীতি-পদ্ধতির সংজ্ঞা
পার্থক্য নির্ণীত হতো গানের পদ ও তালের বৈচিত্র্য এবং বৈশিষ্ট্যের প্রতি লক্ষ্য
রেখেই। অর্থাৎ, শুদ্ধা, ভিন্না প্রভৃতি গীতি-পদ্ধতির আশ্রিত যাবতীয় গানকে
আবার আরও দু'টি উপভাগে বিভক্ত করা হতো—স্বরাশ্রিত ও তানাশ্রিত
গান-ভেদে। যে সব গান কেবলমাত্র স্বরাশ্রিত (অনিবদ্ধ) হতো, অর্থাৎ
যে গানগুলি, কতকটা ইদানীংকালের আলাপ বিস্তারের মতো ছাড়া লয়-এ
গীত হতো, তাদের সঙ্গে, ছন্দ-বৈশিষ্ট্যে মনোমুগ্ধকর তালবদ্ধ (নিবদ্ধ)
গানগুলির পার্থক্য ছিল এবং এই সংজ্ঞা-পার্থক্যই নির্ণয় করে গিয়েছেন
শার্ঙ্গদেব তাঁর রত্নাকর গ্রন্থে। সুতরাং এদিক দিয়ে বিচার করে দেখলে,
পারিজাতকারের “শুদ্ধ রাগের” পরিচিতিটা কথঞ্চিৎ পরিমাণে বৈষম্যমূলক
বলেই মনে হবে। তবে, যদি অনুমান করে নেওয়া যায় যে, রত্নাকরের
“গ্রাম-রাগ ও পারিজাতের “রাগ” অভিন্ন সংজ্ঞার বিষয়বস্তু নয়; কিংবা
পারিজাতের “শুদ্ধাস্তে” কথাটিকে যদি “শাস্ত্র-সম্মত”-র স্বাভাবিক অনুপ্রাস
হিসাবে মনে ক'রে নেওয়া যায়, তাহলে সবকিছু বিতর্কেরই নিরসন হতে
পারে। অর্থাৎ, শুদ্ধা, ভিন্না প্রভৃতি গীতি-পদ্ধতির আশ্রিত রাগগুলি যেহেতু
শাস্ত্রসম্মত অতএব বিশুদ্ধ।
এ ছাড়া ও এখানে আর একটি সমস্যার কথা উঠতে পারে। পারিজাতকার
বলেছেন “গীতি যুক্তাশ্চ যে রাগাঃ শুদ্ধ ..” অর্থাৎ যে রাগগুলি গীতিযুক্ত তা-ই
শাস্ত্রসম্মত শুদ্ধ রাগ। সুতরাং প্রশ্ন উঠতে পারে, সেকালে শুদ্ধ রাগের
প্রচার পরিবেশনার ক্ষেত্রে কি কেবলমাত্র কণ্ঠ সঙ্গীতেরই একাধিপত্য ছিল?
বেণু, বীণা প্রভৃতি সঙ্গীত যন্ত্রের মাধ্যমে যা পরিবেশিত হতো, তার সব কিছুই
কি ছিল অশাস্ত্রীয় এবং অশুদ্ধ? বলাবাহুল্য, আলোচ্য ক্ষেত্রে পারিজাতকার
আদৌ কণ্ঠ সঙ্গীতের কথা বলছেন না। এখানে গীতি কথাটাকে তিনি সঙ্গীত
অর্থেই প্রয়োগ করছেন। অর্থাৎ, গীতি অর্থে এখানে পদ্ধতি বা ঢং বোঝাচ্ছে।
যেমন ইদানীংকালের হিন্দুস্থানী গীতি-পদ্ধতি বলতে বিশেষভাবে কণ্ঠ
সঙ্গীতকেই বোঝায় না—কণ্ঠ ও যন্ত্র এই দ্বিবিধ কলাবিদ্যা সম্পর্কেই
কথাটা ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। সকলেই জানেন, গীত কথাটার
উৎপত্তি হয়েছে গতি থেকে। কণ্ঠ সঙ্গীতের গতি যেমন গীতি, তেমনি যন্ত্র
সঙ্গীতের গৎ। অর্থাৎ, কণ্ঠ সঙ্গীতের গীত বলতে যেমন অর্থযুক্ত ভাষার

লালিত্য বোঝায়, তেমনি যন্ত্র সঙ্গীতের গীতি বা গং অর্থে ঘেনে নেনে বা
ডারা ডিরি প্রভৃতির মতো অর্থহীন অথচ অতীব শ্রুতিসুখকর বাণীর
শোভন সমাবেশ বোঝায়। এবং, বলাই বাহুল্য, পারিজাতকার এখানে
এই অতি সাধারণ তথ্যটিকে পৃথকভাবে বিবৃত করবার প্রয়োজন বোধ
করেন নি। বস্তুতঃ রাগ কথাটি হচ্ছে পরবর্ত্তীকালের—পূর্ব্ববর্ত্তীকালে এর নাম
ছিল জাতি-রাগ এবং শাস্ত্রসম্মত জাতি-রাগ সৃষ্টির প্রথম দিন থেকেই, কণ্ঠ
সঙ্গীতের মতো যন্ত্র সঙ্গীতের মাধ্যমেও যে বিশুদ্ধ বস্তুই পরিবেশিত হয়ে
আসছে সে সম্বন্ধে সন্দেহের অবকাশ মাত্রও নেই। তবে সর্ব্বকালেই দেখা
গিয়েছে, জনসাধারণ যন্ত্র সঙ্গীতের তুলনায় কণ্ঠ-সঙ্গীতেরই বেশী অনুরাগী,
যেহেতু, গানের মধ্যে তারা শ্রুতিসুখকর রাগ ছাড়াও অধিকন্তু হিসাবে
অর্থপূর্ণ কাব্যরসেরও আস্বাদ পেয়ে থাকেন। কিন্তু, এবম্বিধ রসাস্বাদনের
ব্যাপারটা অব্যাহত থাকতে পারে কেবলমাত্র সম-ভাষাভাষী সম-প্রদেশবাসীর
মধ্যেই, নচেৎ ভিন্ন ভাষাভাষী বিভিন্ন প্রদেশবাসীর নিকট কাব্যরসের মাধুর্য্য
গৌণ হয়ে গিয়ে মুখ্য হয়ে ওঠে—ভারতীয় সঙ্গীতের সর্ব্বপ্রধান বৈশিষ্ট্য,
রাগ। সুতরাং, ভারতীয় সঙ্গীতের প্রতিপাদ্য বিষয় বিবৃত করবার অবকাশে
অহোবল যে ব্যাপক অর্থেই “গীতি” কথাটি ব্যবহার করেছেন সে কথা বলাই
বাহুল্য! — ৩৩৪

শুদ্ধা বক্ত্রস্বরা জ্ঞেয়া ললিতস্বর সংযুতা।
ভিন্না সূক্ষ্মস্বরৈর্যুক্তৈর্মাধুর্যৈরগমকৈর্যুতা॥ ৩৩৫

যে গীতিগুলির স্বর সহজ সরল ও শুনতে মিষ্টি, তাকে শুদ্ধাগীতি বলে। আর,
যে সব গীতের স্বরগুলি সূক্ষ্ম অলঙ্কারযুক্ত, খুব দ্রুত উচ্চারিত হয় এবং স্ফুরিত
গমকের মতো সুমধুর গমকযুক্ত, তাকে বলে ভিন্নাগীতি।—৩৩৫

আরোহণাবরোহাভ্যাং স্থানত্রয় সুশোভিতা।
অখণ্ডিতস্থিতিঃ স্থানত্রয়ে গৌড়ী মতা সতাম্ ॥ ৩৩৬

যে গীতির স্বরগুলি আরোহণ অবরোহণক্রমে মন্দ্র, মধ্য ও তার্ অর্থাৎ উদারা,
মুদারা ও তারা, এই তিনটি সপ্তকের মধ্যেই বেশ লাগসো-ভাবে বিরাজ করে
এবং বেশ অবিচ্ছিন্ন ভাবেই অবস্থান করে, তাকেই বলে গৌড়ীগীতি। ৩৩৬

১২২ সঙ্গীত পারিজাত
হূঙ্কিত কম্পিতাভ্যাঞ্চাহ্নু দ্রুত সরলৈঃ স্বরৈঃ ।
বেগস্স্বরৈশ্চতুর্ভিশ্চ বর্ণৈঃ সা বেসরা মতা ॥ ৩৩৭
যে সব গীতির স্বরসমূহ হূঙ্কিত ও কম্পিত গমকযুক্ত, সরল, বেগবান ও
দ্রুতগতিতে নিষ্পন্ন হয় এবং যার গতিবিধি ( স্থায়ী, আরোহী, অবরোহী, ও
সঞ্চারী নামক ) চারটি বর্ণের মধ্যেই পরিলক্ষিত হয়, তাকে বলে বেসরা-গীতি !
চতুর্গীতিগতং লক্ষ্ম শ্রিতা সাধারণী মতা ॥ ৩৩৮
যে সব গীতির মধ্যে উপরোক্ত চার রকম গীতি-পদ্ধতিরই লক্ষণসমূহ
বর্ত্তমান থাকে, তাকে বলে সাধারণী-গীতি। ৩৩৮
টিপ্পনী : এই গীতি-পদ্ধতিগুলি যে অহোবলের আমলে প্রচলিত ছিলই—
এমন অনুমানের স্বপক্ষে ও বিপক্ষে অনেক রকমের যুক্তি দেখানো যেতে
পারে। অনুরূপ যুক্তি সঙ্গীত-রত্নাকর সম্বন্ধেও প্রযোজ্য। বস্তুতঃ, এই গ্রন্থগুলি
হচ্ছে সঙ্কলন গ্রন্থ। এই সব গ্রন্থাদিতে উল্লিখিত শুদ্ধা, ভিন্না, মাগধী,
অর্দ্ধ-মাগধী প্রভৃতি গীতিপদ্ধতিগুলি, কে কবে আবিষ্কার করেছিলেন বা
কোনগুলি কার আমলে প্রচলিত ছিল বা লুপ্ত হয়ে গিয়েছিল, সে সম্বন্ধে
বিশদ আলোচনার অবকাশ আছে। কিন্তু, আপাততঃ গ্রন্থের কলেবর বৃদ্ধির
আশঙ্কায় সে সুযোগ গ্রহণ করা আমাদের পক্ষে সম্ভবপর হচ্ছে না। সুতরাং,
অতি সংক্ষেপেই এ সম্পর্কে আলোচনা করা যাচ্ছে।
সঙ্গীত-রত্নাকরের পূর্ব্ববর্ত্তীকালে আমাদের দেশে দুর্গাশক্তি নামক একজন
সঙ্গীত-শাস্ত্রকার ছিলেন। ইনি বলে গেছেন, গান্ধর্ব্ব ( মার্গ ) গীতি-পদ্ধতির
মধ্যে, যে গীতিগুলি প্রধানতঃ অনিবদ্ধ রীতির আশ্রিত, অর্থাৎ যে গান বা
গৎ-গুলির মধ্যে তাল-এর চাইতে স্বর-বৈচিত্র্যর প্রয়োগ হয় বেশী ক'রে,
সেগুলি তাদের পৃথক পৃথক বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী শুদ্ধা, ভিন্না, গৌড়ী, বেসরা ও
সাধারণী নামক পাঁচ রকম গীতি-পদ্ধতির মধ্যে বিভক্তিকৃত হয়ে তাদের সংজ্ঞা-
পার্থক্য রক্ষা করে। এর দ্বারা স্পষ্ট বোঝা যায়, শুদ্ধা, ভিন্না প্রভৃতি
পাঁচ রকমের গীতি-পদ্ধতি একদা নিরঙ্কুশ মার্গ সঙ্গীতের অন্তর্গত অনিবদ্ধ
গীতি-পদ্ধতির বিষয়বস্তু ছিল।
অতঃপর দেখা যায়, নাট্যশাস্ত্রকার ভরত, নিবদ্ধ অর্থাৎ তালযুক্ত ছন্দবদ্ধ

সঙ্গীত পারিজাত ১২৩
সঙ্গীতের বিভক্তিকরণ প্রসঙ্গে মাগধী, অর্দ্ধ-মাগধী, সম্ভাবিতা ও পৃ্থূলা
নামক চারটি গীতি-পদ্ধতির উল্লেখ করেছেন এবং, এই পদ্ধতি চারটিও
দুর্গাংশক্তি বর্ণিত গীতি-পদ্ধতির মতো মার্গ সঙ্গীতেরই বিষয়বস্তু ছিল।
এর পর উল্লেখযোগ্য, সঙ্গীত-শাস্ত্রকার যাষ্টিক ও শান্দিলের অভিমত।
এঁরা, অধিকন্তু হিসাবে, ভাষা, বিভাষা ও অন্তরভাষা নামক আরও তিন
রকমের গীতি-পদ্ধতির উল্লেখ করেছেন—দেশী সঙ্গীত প্রসঙ্গেই।
তারপরে দেখা যায়, বৃহদ্দেশী-প্রণেতা মহামুনি মতঙ্গ, উপবোক্ত গীতি-
পদ্ধতিগুলিকে সুসংস্কৃত ক’রে, নবরূপে পবিবেশন করেছেন। যথা, শুদ্ধা, ভিন্না
গৌড়ী, রাগ, সাধাবণী, ভাষা ও বিভাষা। অর্থাৎ, পূর্ববর্তী আমলের বেসরা
ও অন্তরভাষা নামক গীতি-পদ্ধতিদুটি প্রচ্ছন্ন হয়ে গিয়ে নবরূপে আত্মপ্রকাশ
কবছে “রাগ” নামক পদ্ধতিটি। বলাবাহুল্য, এগুলিও দেশী সঙ্গীতেরই
বিষয়-বস্তু।
শেষে দেখা যায়, উপরোক্ত গ্রন্থকারদেব বর্ণিত সব গীতি-পদ্ধতিগুলিই
সঙ্গীত-রত্নাকরের পৃষ্ঠায় ব্যাপকভাবে বিশ্লেষিত হয়ে পারিজাতের আমলে
আবার শুদ্ধা, ভিন্না, গৌড়ী, বেসরা ও সাধারণী নামক পাঁচটিমাত্র গীতি-
পদ্ধতির মধ্যে সীমিত হয়েছে।
অতএব জানা যাচ্ছে, একদা যা ছিল বিলুপ্ত মার্গ সঙ্গীতেব বিষয় বস্তু,
পরবর্তীকালে তা গৃহীত হয়েছিল দেশী সঙ্গীত-পদ্ধতির মধ্যে। কিন্তু, এই
গীতি-পদ্ধতিগুলির সর্ব্ব-প্রাচীন রূপ কী ছিল সে সম্বন্ধে কিছুটা জানা গেলেও
ক্রম-পরবর্তী যুগে ওগুলি কত রকমভাবে সংস্কৃত হয়ে রূপান্তর গ্রহণ
করেছিল, সে সম্বন্ধে কোন রকম সঠিক সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়ার অসুবিধা
আছে। তবে, সাধারণভাবে বলা যায়, এই পদ্ধতিগুলি ছিল গান-বাজনার
ঢং বা চাল-এর বৈচিত্র্য; ছাড়-লয়ের মন্ত্রপাঠ বা রাগালাপের বৈশিষ্ট্য; বাঁধা-
লয়ের গান বা গৎ প্রভৃতির স্বরূপ বা সংজ্ঞা নির্ধারক। যেমন—
প্রাচীন যুগে, যে গীতি-পদ্ধতির স্বরগুলি পরের পর সোজা সরলভাবে
উচ্চারিত হতো এবং যার মধ্যে অলঙ্কার, মীড়, গমক, কণ., স্যৎ প্রভৃতি সাঙ্গী-
তিক ক্রিয়ার অভাব পরিলক্ষিত হতো, তাকে বলা হতো শুদ্ধা গীতি-পদ্ধতি।
যে গীতি-পদ্ধতির মধ্যে কণ., মীড়., স্বব-উল্লঙ্ঘন্, অলঙ্কার এবং সর্ব্বপ্রকার
গমকের আধিক্য পরিলক্ষিত হতো, তাকে বলা হতো ভিন্না গীতি-পদ্ধতি।
যে গীতি-পদ্ধতির স্বরগুলি ঘন-সন্নিবিষ্ট হয়ে কথঞ্চিৎ দ্রুতলয়ে, সঘন গমক