सामग्री पर जाएँ
सर्वकोश
संग्रह पर लौटें

सङ्गीतपारिजात (अहोबल - वीणा के तारों पर शुद्ध व विकृत स्वर-स्थान निर्धारण का ऐतिहासिक ग्रन्थ)

Sangitaparijata of Ahobala on Indian Musicology

पण्डित अहोबल (टीकाकार: कलानिधि कलिन्द) द्वारा

DevanagariHindipublished358 पृष्ठ

২৭০ সঙ্গীত পারিজাত
ঝোম্হড়া প্রবন্ধ—নিঃসারুক, কুডুক্ক, ত্রিপুট, প্রতিমণ্ঠ, দ্বিতীয়-গারুগী, রাস,
যতি, লয়, অড্ড ও একতালী—এই দশটি তালের মধ্যে যে কোন একটির
মাধ্যমে গীত হতে পারে। কিন্তু—শার্ঙ্গদেবের মতানুযায়ী—মণ্ঠ তালে ঝোম্হড়া
গাওয়া অনুচিত।
ঝোম্হড়া প্রবন্ধও এলা জাতীয় প্রবন্ধর মতো বহু শাখা-প্রশাখায় বিভক্ত
ছিল। রত্নাকরে ৩৫০ রকম ঝোম্হড়ার পরিচয় উল্লিখিত হয়েছে। এ
ছাড়াও, সোম, শ্রীপতি, সংগত, রুচিত, মাতৃকা প্রভৃতি নামযুক্ত আরও
অনেক ঝোম্হড়া প্রবন্ধ ছিল, যার লক্ষণাদি রত্নাকরে উল্লিখিত হয়নি। ৫৪৭।২
এক খণ্ডে দ্বিখণ্ডে বা যস্যোদগ্রাহো ভবেদিহ।
গীয়তেহসৌ সকৃদ্ দ্বির্্বা ভবেদ্ যত্র ধ্রুবঃ পুনঃ।
দ্বিরাভোগো ধ্রুবে মুক্তিঃ প্রলম্ব স্তু লম্ভকঃ॥ ৫৪৮
যে প্রবন্ধ গানের উদ্গ্রাহ অংশটি একখণ্ডে কিংবা দু'খণ্ডে বিভক্ত তথা যা
একবার কিংবা দু'বার গাইতে হয় এবং যার ধ্রুব ও আভোগ অংশদুটি দু'বার
গেয়ে, গানের সমাপ্তি ঘটাতে হয় পুনরায় ধ্রুব অংশটি গেয়ে, তাকেই প্রলম্ব বা
লম্ভক প্রবন্ধ বলে। ৫৪৮
টিপ্পনী: পারিজাতের লম্ভক রত্নাকরেও লম্ভকরূপে উল্লিখিত হয়েছে।
কিন্তু লম্ভক ও প্রলম্ব অভিন্নরূপে চিহ্নিত হয়নি। লম্ভকের পরিচয় প্রসঙ্গে
শার্ঙ্গদেব বলেছেন, এর উদ্গ্রাহ, ধ্রুব ও আভোগ এই তিনটি অংশকেই একখণ্ডে
অথবা দু'খণ্ডে বিভক্ত করে একবার কিংবা দু'বার গাওয়া যায়। এবং, গান
শেষ করতে হয় আভোগের পর আবার ধ্রুব গেয়ে। অর্থাৎ, লম্ভক ছিল একটি
তারাবলী জাতীয় ত্রি-ধাতুক প্রবন্ধ।
প্রলম্ব প্রসঙ্গে শার্ঙ্গদেব বলেছেন, লম্ভকের উদ্গ্রাহ অংশটি যদি দু'টি খণ্ডে
বিভক্ত হয় এবং এই দু'টি খণ্ডের গীতি বৈশিষ্ট্য যদি অভিন্ন না হয়, অর্থাৎ,
উদ্গ্রাহর দ্বিতীয় খণ্ডটি যদি প্রথম খণ্ডর ধাতুগত বৈশিষ্ট্য বজায় না রেখে
ভিন্ন ধাতুর বৈশিষ্ট্য প্রকট করে তোলে, তাহলে, লম্ভক আর লম্ভক
থাকে না, প্রলম্ব নামে চিহ্নিত হয়। এই প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য পূর্ব সূত্রে
আলোচিত ঝোম্হড়া প্রবন্ধটির বৈশিষ্ট্য। ঝোম্হড়ার ক্ষেত্রেও লম্ভকের মতো
ব্যবস্থা আছে। তবে, ঝোম্হড়ার গীতি-ব্যবস্থার মধ্যে শিল্পীর ইচ্ছাটাকে
( option ) ভিন্ন নামে অভিহিত করা হয়নি। বলাবাহুল্য, প্রলম্ব প্রবন্ধের

সঙ্গীত পারিজাত ২৭১
মধ্যে—দ্বিখণ্ডে বিভক্ত উদ্গ্রাহ অংশটি দুটি ধাতুর বৈশিষ্ট্য প্রকট করে
তুললেও,—অর্থাৎ, সাকুল্যে চারটি ধাতুর বৈশিষ্ট্য পরিলক্ষিত হলেও প্রলম্ভ
মূলতঃ লম্ভকের মতোই ত্রিধাতুক।
লম্ভক প্রবন্ধর আরও অনেক রকম প্রকার ভেদের পরিচয় রত্নাকরে
উল্লিখিত হয়েছে। যেমন, ত্রিধাতুক আলাপ-লম্ভক ও ভাগলম্ভ। দ্বিধাতুক
লম্ভপদ, অনুলম্ভ ও উপলম্ভ। এবং কেবলমাত্র উদ্গ্রাহযুক্ত এক ধাতুক
বিলম্ব। আলোচ্যক্ষেত্রে, এই এক ধাতুযুক্ত বিলম্ব প্রবন্ধটির উদাহরণ স্থাপন
করে প্রশ্ন উঠতে পারে,—এটা কী করে সম্ভব? প্রবন্ধ-সঙ্গীত-বিজ্ঞানে তো
এক ধাতুযুক্ত গানের অস্তিত্ব স্বীকৃত হয় না! অবশ্যই হয় না। সুতরাং, বুঝে
নিতে হবে, বিলম্বের উদ্গ্রাহ অংশটিকেই ভিন্ন ধাতুর বৈশিষ্ট্য যুক্ত করে
পরিবেশন করা হতো—তার নিজস্ব প্রকার-ভেদ-জনিত বৈশিষ্ট্যগুলিকে বজায়
রেখেই। ৫৪৮
ঝোম্বড়ো রাসতালেন রাসঃ স এব সঙ্গতঃ। ৫৪৯।১
ঝোম্বড়া প্রবন্ধই রাসতালের মাধ্যমে পরিবেশিত হলে, রাস-প্রবন্ধ নাম গ্রহণ
করে। ৫৪৯।১
টিপ্পনী: পারিজাতের “রাস” রত্নাকরে “রাসকরূপে” উল্লিখিত হয়েছে।
প্রবন্ধটির পরিচয় প্রসঙ্গেও উভয় গ্রন্থকারই অভিন্ন মত পোষণ করেছেন।
অর্থাৎ, ঝোম্বড়া প্রবন্ধই রাস তালের মাধ্যমে পরিবেশিত হলে “রাস” বা
“রাসক” প্রবন্ধরূপে সূচিহ্নিত হয়: অধিকন্তু, রত্নাকর বলেছেন, রাসক প্রবন্ধ
গমকস্থান বর্জিত। অর্থাৎ, ঝোম্বড়া প্রবন্ধর ক্ষেত্রে, শিল্পীর ইচ্ছানুযায়ী,
গমকযুক্ত মেলাপক অনুষ্ঠানের যে ব্যবস্থা ( option ) আছে, রাসক প্রবন্ধর
ক্ষেত্রে সে ব্যবস্থা নেই। অতএব বোঝা যাচ্ছে, রাসক প্রবন্ধটি ছিল মেলাপক
বর্জিত ত্রিধাতুক তারাবলী জাতীয় প্রবন্ধ। বলাবাহুল্য, রাসক প্রবন্ধর প্রকার-
ভেদের সংখ্যাও, গণ, বর্ণ ও মাত্রাভেদে অসংখ্য ছিল। শার্ঙ্গদেব অপ্রসিদ্ধ
ভেদগুলি সম্বন্ধে আলোচনা করেন নি; মাত্র ৮২টি প্রকার-ভেদের পরিচয়
দিয়েছেন। ৫৪৯।১
লম্ভঃ সর্বৈকতাল স্যাদ্ দ্রুতা গতৈকতালিকা ॥ ৫৪৯।২
লম্ভ প্রবন্ধই যখন একতালি তালে ও দ্রুত লয়ে গীত হয়, তখন তার নাম
হয় একতালিকা প্রবন্ধ। ৫৪৯।২

ताल, वाद्य, प्रबन्ध एवं सङ्गीतपारिजात उपसंहार (अध्याय ६-८)

২১২ সঙ্গীত পারিজাত

টিপ্পনী : এই প্রবন্ধটির পরিচয় প্রসঙ্গে পারিজাতকার যা বলেছেন তা
রত্নাকরের অনুরূপ হলেও কথঞ্চিৎ পরিমাণে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের অবকাশ
রাখে। মূল রত্নাকরের বক্তব্য হচ্ছে, একতালিকা প্রবন্ধর উদগ্রাহ, ধ্রুব ও
আভোগ অংশ দু’বার করে গাইতে হয় এবং শেষে আর একবার ধ্রুব গেয়ে
গান শেষ করতে হয়। কিন্তু, লক্ষ্য করবার বিষয়, লম্ভক প্রবন্ধর ধাতুগুলি
সম্পর্কে রত্নাকরে একবার বা দু’বার গাইবার যে স্বাধীনতা স্বীকৃত হয়েছে,
একতালিকার ক্ষেত্রে সে রকম কোন ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে না। অপরপক্ষে,
একতালিকার ধাতুগুলির পরিবেশনা সম্পর্কে এমন সব মতান্তরের দৃষ্টান্তও
রত্নাকরে পাওয়া যায় যা পারিজাতের পরিচিতির পরিপন্থী। যেমন, একতালিকা
প্রবন্ধর উদগ্রাহ অংশটি কেবলমাত্র আলাপ দ্বারাও অনুষ্ঠিত হতে পারে। কিন্তু,
এই মতান্তরের দৃষ্টান্ত অনুধাবন করে আমাদের পক্ষে কোন সিদ্ধান্তে উপনীত
হওয়া সম্ভবপর? আলোচ্যক্ষেত্রে, “লম্ভক প্রবন্ধ দ্রুত লয়যুক্ত একতালি তালে
গীত হবার” প্রমাণ বহন করছে না, যেহেতু, আলাপের ক্ষেত্রে দ্রুত লয়যুক্ত
একতালির অস্তিত্বই থাকতে পারে না। অপরপক্ষে, লম্ভক প্রবন্ধর উদগ্রাহ
অংশটিকে যদি আলাপযুক্ত করে পরিবেশন করা হয় তাহলে তার নাম হয়ে যায়
আলাপ-লম্ভক। অথচ, আলোচ্যক্ষেত্রে সে রকম কোন প্রকার-ভেদ-এর
ইঙ্গিতও পাওয়া যাচ্ছে না।
এ ছাড়াও, টীকাকার সিংহ ভূপাল আবার মন্তব্য করেছেন, একতালিকার
উদগ্রাহ ও ধ্রুব অংশ দু’বার করে গাইতে হয়। তারপর, আভোগ ও ধ্রুব
আর একবার করে গেয়ে গানের সমাপ্তি ঘটাতে হয় উদগ্রাহে। অর্থাৎ
একতালিকার অনুষ্ঠান ঠিক কোন ধাতুটিকে অবলম্বন করে সমাপ্ত হতো, সে
সম্বন্ধেও মতান্তর ছিল টীকাকারদের মধ্যে। বাস্তবিকপক্ষে, একতালিকা দ্বি-
মেলাপক বর্জিত তারাবলী জাতীয় প্রবন্ধ। ৫৪৯।২
ধ্রুবাদি সপ্তভিস্তালৈঃ সূড ইত্যভিধীয়তে ৷৷ ৫৫০
অপরপক্ষে, যে সব প্রবন্ধ ধ্রুবাদি সাতটি তালের মাধ্যমে গীত হয়, সেগুলিকে
সূড জাতীয় প্রবন্ধরূপে অভিহিত করা যেতে পারে। ৫৫০
টিপ্পনী : ধ্রুবাদি সাতটি তাল হচ্ছে ধ্রুব, মণ্ঠ, প্রতিমণ্ঠ, নিঃস্বার, অড্ড,
একতালি ও রাসক। কেউ কেউ নিঃস্বার তালের পরিবর্তে ত্রিপুট তালেরও
উল্লেখ করেছেন। আলোচ্য সূত্রে পারিজাতকার বলছেন, ইতিপূর্বে আলোচিত
আটটি সূড প্রবন্ধ ছাড়াও আরও এমন অনেক প্রবন্ধগীতি ছিল যেগুলি উপরোক্ত

সঙ্গীত পারিজাত ২৭৩
সাতটি তালের মাধ্যমে গীত হলে, সূড প্রবন্ধর অনুরূপ সাঙ্গীতিক বৈশিষ্ট্য প্রকট
করে তুলতো। বলাবাহুল্য, সূডাঙ্কগ্ প্রবন্ধ ও সূডালিক্রম প্রবন্ধ অভিন্ন নয়।
সূডালিক্রম প্রবন্ধগীতির পরিচয় পরবর্তী সূত্রাদিতে আলোচিত হয়েছে, এখানে
সূডাঙ্কগ্ প্রবন্ধাদির কথা বলা হচ্ছে। সূড অর্থে এখানে শুদ্ধ সূড প্রবন্ধ
বোঝাচ্ছে—যার সংখ্যা হচ্ছে মাত্র আটটি। এর সঙ্গে সূডাঙ্কগ প্রবন্ধাদির সম্পর্ক
ঘনিষ্ঠ হলেও তারা সবতোভাবে অভিন্নধর্মী ছিল না। অর্থাৎ ব্যাপারটা ছিল
পরবর্তীকালের ধ্রুপদ গানের ঘরোয়ানা কৌলীন্যর মতো। তানসেন বিরচিত
কোন চৌতালী-ধ্রুপদের সঙ্গে অপর কোন গুণীর চৌতালী-ধ্রুপদের পার্থক্য
নির্ণয় করা সাধারণ সমজদারের পক্ষে সম্ভবপর হয় না। অনেকেই গানের
ভণিতার ওপর নির্ভর করেই বুঝে নেন কোন গানটি কার রচনা। কিন্তু,
ধ্রুপদ-সঙ্গীত-বিজ্ঞান সম্বন্ধে ধ্যান-ধারণা যাঁর ভণিতার ওপর নির্ভরশীল নয়,
অর্থাৎ যিনি ধ্রুপদ গীতি-রীতি ও বিভিন্ন মহাজনের বাক্য-বিন্যাসের বৈশিষ্ট্য-
বৈচিত্র্য সম্বন্ধে ওয়াকিফ হাল তিনি অনায়াসেই বলে দিতে পারবেন, অমুক গানটি
তানসেনের ভণিতাযুক্ত হলেও আসলে বৈজু-রচিত। কিংবা ভণিতার মধ্যে
"বিলাস" থাকলেই বিলাস খাঁকে বোঝায় না। বাণীবিলাসও একজন ছিলেন।
অথচ, সব গানগুলিই আসলে ভাল চালের গান। তবুও, সেনী-রীতির অনুকরণ
ও সেনী-রীতির কৌলীন্য অভিন্ন নয়। আলোচ্যস্থলে পারিজাতকারও শুদ্ধসূড
ও সূডাঙ্কগ্ প্রবন্ধ গীতি সম্পর্কে এই ধরণের বক্তব্যই পরিবেশন করতে
চেয়েছেন। ৫৫০
বর্ণো বর্ণস্বরো গদ্যং কৈবাডশ্চাঙ্কচারিণী।
কন্দুকস্তুরঙ্গলীলাচ গজলীলা দ্বিপদ্যপি ॥ ৫৫১
চক্রবালঃ স্বরার্থশ্চ গাথা ক্রৌঞ্চ পদস্তথা।
কলহংসো দ্বিপথক আর্যাচ ধ্বনিকুট্টনী ॥ ৫৫২
ঘট্টোরুত্তং মাতৃকাচ তোটকো রাগমশ্রিকঃ।
তালার্ণব স্তথা পঞ্চতাল ইত্যাদি সংশ্রয়াঃ ॥ ৫৫৩
১। বর্ণ ২। বর্ণস্বর ৩। গদ্য ৪। কৈবাড ৫। অঙ্কচারিণী ৬। কন্দুক
৭। তুরঙ্গলীলা ৮। গজলীলা ৯। দ্বিপদী ১০। চক্রবাল ১১। স্বরার্থ
১২। গাথা ১৩। ক্রৌঞ্চপদ ১৪। কলহংস ১৫। দ্বিপথক ১৬। আর্যা
১৭। ধ্বনিকুট্টনী ১৮। ঘট্ট ১৯। বৃত্ত ২০। মাতৃকা ২১। তোটক

২৭৪ সঙ্গীত পারিজাত
২২। রাগমিশ্রক ২৩। তালার্ণব ২৪। পঞ্চতাল—প্রভৃতি প্রবন্ধগুলি
আলি-সংজ্ঞায় জাতীয় প্রবন্ধ। ৫৫১-৫৫৩
টিপ্পনী : রত্নাকর ও পারিজাত উভয় গ্রন্থেই আলি জাতীয় প্রবন্ধর সংখ্যা
উল্লিখিত হয়েছে ২৪। নামের দিক দিয়েও কোন অসামঞ্জস্য পরিলক্ষিত হয়
না। তবে, রত্নাকরের কন্দ, ঘট, বাগকদম্বক ও পঞ্চতালেশ্বর নামক প্রবন্ধ
চারটি পারিজাতে কন্দুক, ঘট্ট, বাগমিশ্রক ও পঞ্চতালরূপে উল্লিখিত হয়েছে। এ
ছাড়া, পারিজাতের ৫৫৩ সূত্রের শেষে “ইত্যাদি সংশ্রয়াঃ” যুক্ত হওয়ার ফলে,
আমরা যেমন আলোচ্য ২৪টি প্রবন্ধ ছাড়াও আরও অনেক অনুল্লিখিত আলি-
জাতীয় প্রবন্ধর অস্তিত্ব কল্পনা করবার সুযোগ পাচ্ছি, রত্নাকরে তেমন কোন
কিছু অনুমান করবার অবকাশ নেই। পরন্তু, রত্নাকরে সঠিক ২৪টি আলি
জাতীয় প্রবন্ধর কথাই উল্লিখিত হয়েছে—“ইত্যাদির” অবকাশ আছে বিপ্রকীর্ণ
প্রবন্ধর সংখ্যা সম্পর্কে। এ সম্বন্ধে, আমরা যথাস্থানেই আলোচনা করবো।
৫৫১—৫৫৩
কর্ণাট ভাষয়োৎপন্নঃ প্রবন্ধো বর্ণ সংজ্ঞকং।
স এব স্বরতালাভ্যাং বর্ণপরোঽপি কথ্যতে ॥ ৫৫৪
যে সকল প্রবন্ধ কর্ণাটিক ভাষায় বিরচিত তাকেই বলে বর্ণ প্রবন্ধ। এবং উক্ত
প্রবন্ধগুলিই যখন আবার স্বর ও তালভুক্ত হয়ে গাত হয়, তখন তার নাম হয়ে
যায় বর্ণস্বর প্রবন্ধ। ৫৫৪
টিপ্পনী : বর্ণ প্রবন্ধ সম্পর্কে পারিজাতকার যা বলেছেন তাতে মনে হয়,
এই প্রবন্ধগুলি অন্ধ্র, মদ্র, তামিল, তেলেগু প্রভৃতি দক্ষিণদেশীয় ভাষায় রচিত
হতো এর পরিবেশিত হতো অনিযুক্ত পদ্ধতির মাধ্যমে। কিন্তু, বর্ণ প্রবন্ধ
প্রসঙ্গে রত্নাকর যা বলেছেন তার সঙ্গে পারিজাতের সামঞ্জস্য নেই। শার্ঙ্গদেব
বলেছেন, বর্ণ প্রবন্ধে বিরুদ অপরিহার্য এবং প্রবন্ধগুলি গাওয়া হয়ে থাকে বর্ণ-
তালের মাধ্যমে। অর্থাৎ রত্নাকরের আমলে বর্ণ প্রবন্ধ রীতিমত তালযুক্ত হয়েই
গীত হতো এবং প্রবন্ধর মধ্যে কোন ধাতুর উল্লেখ না থাকলেও বিরুদের প্রয়োগ
ছিল অপরিহার্য। ব্যাপারটা বিশ্লেষণ করে টীকাকার কল্লিনাথ মন্তব্য করেছেন,
বর্ণ প্রবন্ধ ছিল ভাবনী জাতীয় ত্রি-ধাতুক প্রবন্ধ। অর্থাৎ, ধাতুর উল্লেখ না
থাকলেও গানের পদগুলিকে ধাতু ব্যবস্থানুযায়ী পরের পর পরিবেশন করা
হতো। সর্বোপরি, বর্ণ তাল আবার ছিল তিন রকমের। যথা—

সঙ্গীত পারিজাত ২৭৫
ত্র্যস্রবর্ণ ( ২ লঘু+২ দ্রুত+২ লঘু মাত্রা )
মিশ্রবর্ণ ( ১৪ দ্রুত+২ প্লুত+২ দ্রুত+১ প্লুত+১ লঘু+১ প্লুত+১ লঘু মাত্রা )
চতুরস্রবর্ণ ( ১ প্লুত+১ লঘু+২ দ্রুত+১ প্লুত+১ লঘু মাত্রা )
বর্ণস্বর প্রবন্ধ সম্পর্কে পারিজাতকার বলেছেন, পূর্বোক্ত বর্ণ প্রবন্ধকেই যখন
আবার স্বর ও তালযুক্ত করে নিযুক্ত পদ্ধতির মাধ্যমে পরিবেশন করা হয়, তখন
তার নাম হয়ে যায় বর্ণস্বর প্রবন্ধ। নিযুক্ত অনির্ভুক্তর প্রয়োগ ব্যবস্থাটা দুর্বোধ্য
নয় ; কিন্তু, প্রবন্ধটির মধ্যে স্বরযুক্ত করা অর্থে পারিজাতকার কী বলতে চেয়েছেন
সেটা ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। বর্ণস্বর নামটির দিকে লক্ষ্য করলে বোঝা যায়,
ব্যাপারটা একালের সরগম-গীতির মতো নিরঙ্কুশ ছিল না। কিন্তু, তেলেনা
চতুরঙ্গ প্রভৃতি গানের অন্তর্গত “স্বরগ্রাম” অংশবিশেষরূপেও গ্রাহ্য হতো কিনা
সন্দেহ। কারণ, তেলেনা চতুরঙ্গ প্রভৃতি গানের বৈশিষ্ট্য অর্থহীন বাণীর মাধ্যমেই
প্রকট হয়ে ওঠে, তার মধ্যে কথঞ্চিৎ পরিমাণে অর্থযুক্ত বর্ণর অস্তিত্ব
থাকলেও সেটা এমনই অকিঞ্চিৎকর যে গীতি-পদ্ধতির নামকরণের সহায়ক হতে
পারে না।
অপরপক্ষে, পারিজাতের “তাল”-কে যদি “তাল-অক্ষর” হিসাবে গ্রাহ্য করা
হয় ; অর্থাৎ পাট্ হিসাবেই অনুমান করে নেওয়া যায়, তাহলে দেখা যাবে বর্ণস্বর
প্রবন্ধ প্রসঙ্গে রত্নাকরের বক্তব্য কথঞ্চিৎ পরিমাণে পারিজাতেরই অনুরূপ।
শার্ঙ্গদেব বলেছেন, স্বর, পাট্, পদ ও তেন-যুক্ত গীতিকেই বর্ণস্বর প্রবন্ধ বলে।
গানের মধ্যে স্বর, পাট্ প্রভৃতির বিন্যাসভেদে প্রবন্ধটির চারটি ভেদও হতে
পারে। ৫৫৪
গদ্যং নিগদ্যতে ছন্দোহীনং পদ-কদম্বকম্।
উদ্গ্রাহধ্রুবকৌ যস্য পাটৈরেব বিনির্মিতৌ।
পদৈঃ ক্বতান্তরাভোগৌ কৈবাড়োহত্যন্ত শোভিতঃ॥ ৫৫৫
যে প্রবন্ধর পদগুলি ছন্দহীন তাকে গদ্য প্রবন্ধ বলে। যে প্রবন্ধর উদ্গ্রাহ ও
ধ্রুব অংশ পাট্ দ্বারা এবং অন্তর ও আভোগ অংশ পদ দ্বারা রচিত, সেই অতি
সুন্দর প্রবন্ধকে কৈবাড় প্রবন্ধ বলে। ৫৫৫
টিপ্পনী : গদ্য প্রবন্ধর পরিচয় প্রসঙ্গে পারিজাতকার যা বলেছেন তার সঙ্গে
রত্নাকরের সামঞ্জস্য আছে, কিন্তু আংশিক। গদ্য প্রবন্ধর উদ্গ্রাহ অংশটি অবশ্য
ছন্দহীন তথা অ-তালে গীত হতো। কিন্তু অ-তালের পরে ধ্রুব ও আভোগ অংশ

২৭৬ সঙ্গীত পারিজাত
দুটি গীত হতো স-তালে। এবং, এই স-তাল অনুষ্ঠানের মধ্যে ছয় রকম লয়ের
কাজ যুক্ত করবার অবকাশ ছিল। যথা, দ্রুতা, বিলম্বিতা, মধ্যা, দ্রুত-মধ্যা,
দ্রুত-বিলম্বা ও মধ্যা-বিলম্বিতা। গদ্য প্রবন্ধর কৌলীন্য প্রসঙ্গে রত্নাকর বলেছেন,
গদ্যগুলি সামবেদ থেকে উৎপন্ন (গৃহীত?) হয়েছে এবং এর গেয় বস্তুর
প্রকারভেদ হচ্ছে ন'টি। এর মধ্যে ছন্দশাস্ত্রসম্মত ছয়টি প্রকার হচ্ছে :—
বীর-রসে গেয়—উৎকলিকা,
শান্ত-রসে গেয়—চূর্ণ ও বৃত্তগন্ধি।
শৃঙ্গার-রসে গেয়—ললিতা ও চিত্র।
হাস্য-রসে গেয়—খণ্ড।
এই ছয়টি প্রকার-ভেদকে, মতান্তরে, আবার দুইটিমাত্র প্রকারভেদের মধ্যে
গণ্ডীবদ্ধ করা যেতে পারতো। যথা, বেণী ও মিশ্র।
বলাবাহুল্য পারিজাত পাঠ করে গদ্য প্রবন্ধর ধাতু-ব্যবস্থা সম্বন্ধে কিছুই জানা
যাচ্ছে না। রত্নাকরের মতানুযায়ী, গদ্য ছিল একটি ত্রি-ধাতুক প্রবন্ধ।
কৈবাড় প্রবন্ধ সম্পর্কে পারিজাতকার যা বলেছেন তার সঙ্গে রত্নাকরের
সামঞ্জস্য নেই যদিও উভয় গ্রন্থেই প্রবন্ধটি কৈবাড নামেই উল্লিখিত হয়েছে।
রত্নাকর বলছেন, কৈবাড প্রবন্ধর উদ্গ্রাহ ও ধ্রুব অংশের অনুষ্ঠান হয় পাট ও
অক্ষর সহযোগে। শেষে, আর একবার উদ্গ্রাহ গেয়ে (ধ্রুব নয়) গান শেষ
করতে হয়। এদিক দিয়ে দেখলে কৈবাড ছিল দ্বি-ধাতুক প্রবন্ধ। কিন্তু,
টীকাকার কল্লিনাথ মন্তব্য করেছেন “নেতা ও গায়কের” ভণিতাযুক্ত করে
কৈবাড়ের মধ্যে আভোগের অনুষ্ঠানও করা বক্তব্য। অর্থাৎ, কল্লিনাথের
মতানুযায়ী এটিকে ত্রি-ধাতুক প্রবন্ধরূপেও গ্রহণ করবার অবকাশ রয়েছে।
অপরপক্ষে, পারিজাতকার বলছেন, কৈবাডের উদ্গ্রাহ ও ধ্রুব অংশ কেবলমাত্র
পাট্ (অক্ষর নয়) দ্বারা রচিত এবং অন্তর ও আভোগ অংশ পদদ্বারা রচিত—
যার উল্লেখ রত্নাকরে নেই।
রত্নাকর আরও বলেছেন, কৈবাড প্রবন্ধ দু' রকমের হয়। যথা, সার্থক ও
অনর্থক। কিন্তু, পাট্-এর ক্ষেত্রে 'অনর্থোক্তি বা অর্থহীনতার তাৎপর্য কী হতে
পারে সে সম্বন্ধে শার্ঙ্গদেব ও তার টীকাকারদ্বয় কোন রকম আলোকপাত
করেন নি। তবে, কৈবাড প্রসঙ্গে রত্নাকরে আরও দু'টি ভেদের উল্লেখ দেখা
যায়—শুদ্ধ ও মিশ্র। টীকাকার সিংহভূপাল এ সম্বন্ধে মন্তব্য করেছেন, যা
কেবলমাত্র পাট্ দ্বারা বিরচিত তাকে বলে শুদ্ধ-কৈবাড় এবং শুদ্ধ-কৈবাড়ের মধ্যে

সঙ্গীত পারিজাত ২৭৭
পদ-স্বরাদির মিশ্রণ ঘটলেই প্রবন্ধটি মিশ্র-কৈবাড় নাম গ্রহণ করে। সুতরাং
এদিক দিয়ে দেখতে গেলে পারিজাতকারের বক্তব্য অনুযায়ী, কৈবাড়ের মধ্যে
পাটু ও পদের অস্তিত্ব ছিল বলা চলে। কিন্তু, পারিজাতকার প্রবন্ধগীতির মধ্যে
ধাতু হিসাবে, একই সঙ্গে ধ্রুব ও অন্তর ধাতুর উল্লেখ কী করে করতে পারলেন
সেইটাই দুর্বোধ্য। অন্তর ধাতুটি যে ধ্রুব ধাতুরই খণ্ড বিশেষ ( ৫০৭-৫০৮ সূত্রের
টিপ্পনী দ্রষ্টব্য ) এবং যে প্রবন্ধর মধ্যে অন্তর ধাতুর উল্লেখ থাকে তার মধ্যে যে
কোন অজুহাতেই ধ্রুবর উল্লেখ থাকতে পারে না—প্রবন্ধ-সঙ্গীত-বিজ্ঞানের এই
অতি প্রচলিত আইনটা যে কী কবে আলোচ্য সূত্রের মধ্যে বে-আইনীরূপে
উল্লিখিত হলো সেইটাই বিবেচ্য। বলাবাহুল্য, পারিজাতকার যে একাধিক
ছিলেন এবং সকলেই যে অহোবলের মত সঙ্গীতজ্ঞ ছিলেন না, আলোচ্য
সূত্রটিই তার অন্যতম প্রমাণ। সর্ব্বোপরি, পারিজাতের কৈবাড নিযুক্ত ছিল
কিংবা অনিযুক্ত ছিল সে সম্বন্ধেও কিছু অনুমান করা যাচ্ছে না। কিন্তু,
কল্লিনাথের মন্তব্য পড়ে মনে হয়, কৈবাড প্রবন্ধটি চারটি ভাগে বিভক্ত ছিল
এবং শুদ্ধ কৈবাডগুলি অনিযুক্ত ও মিশ্র-কৈবাডগুলি নিযুক্ত পদ্ধতির মাধ্যমে
পরিবেশিত হতো। কিন্তু, কৈবাড সম্ভবতঃ চিরকালই দ্বিবিধ ছিল না অর্থাৎ
পাটু এবং পদ দ্বারা বিরচিত হতো না বা নিযুক্ত-অনিযুক্ত দ্বিবিধ পদ্ধতির
মাধ্যমেও গীত হতো না। রত্নাকরের বহু পূর্ববর্তীকালে রচিত বৃহদ্দেশীতে দেখা
যায়, কৈবাট্ (কৈবাড) কেবলমাত্র পাটু দ্বারা রচিত হতো এবং গীত হতো
গন্ধর্বতালে। ৫৫৫
সর্বার্থস্য চ গীতস্য গানঞ্চেদঙ্কচারিণী। ৫৫৬-১
যে প্রবন্ধগীতির প্রতিপাদ্য বিষয়বস্তু সহজ সরল অর্থযুক্ত তাকেই অঙ্কচারিণী
প্রবন্ধ বলে। ৫৫৬-১
টিপ্পনী : অঙ্কচারিণী প্রবন্ধর পরিচয় প্রসঙ্গে পারিজাতকার যে কয়টি কথা
বলেছেন, তার মর্মোদ্ধার করা দুঃসাধ্য। বস্তুতঃ, আলোচ্য সূত্রের 'সর্বার্থস্য চ
গীতস্য' কথাটির সম্ভাব্য মর্মার্থ নিয়ে অনেক রকম কল্পনা বিলাসের অবকাশ
আছে। কিন্তু, অনুমান প্রমাণ নয়।
অঙ্কচারিণীর পরিচয় প্রসঙ্গে শার্ঙ্গদেব বলেছেন—
বীররৌদ্রাশ্রিতৈর্বদ্ধা বিরুদৈরঙ্কচারিণী।
বর্ণনামাঙ্কিতাভোগা তালেনেষ্টেন গীয়তে ॥

২৮ সঙ্গীত পারিজাত
অর্থাৎ এই প্রবন্ধটি বীর ও রৌদ্র রসের প্রতিপাদক। বিরুদ হচ্ছে এর একমাত্র
অঙ্গ। এবং, এর আভোগ অংশে নিহিত থাকে নায়কের নাম। বলাবাহুল্য,
নায়ক অর্থে এখানে শৌর্য-বীর্যশালী যুদ্ধবীর বা হৃদয়বান দয়াবীর বা দানবীরকে
বোঝাচ্ছে, যেহেতু, প্রবন্ধটি কেবলমাত্র বীর ও রৌদ্র রসেরই প্রতিপাদক।
এ ছাড়া, অঙ্গচারিণীর একমাত্র অঙ্গ বিরুদের পরিবেশনার মধ্যেও বহুবিধ
বৈচিত্র্য যুক্ত করবার ব্যবস্থা ছিল। ফলে, প্রবন্ধটির প্রকারভেদের সংখ্যা
হয়ে গিয়েছিল ছয়। যথা, বাসনী কলিকা, বৃন্তা, বীরবতী, বেদোত্তরা ও
জাতিমতী। ॥৫৫৬-১
কন্দঃস্যাদেক খণ্ডেন গতিযস্য বিলম্বিতা ॥ ৫৫৬-২
যে প্রবন্ধের একটি খণ্ডের গতি ( লয় ) বিলম্বিত তাকেই কন্দ প্রবন্ধ
বলে। ৫৫৬-২
টিপ্পনী : কন্দ প্রবন্ধ সম্পর্কে পারিজাতকারের বক্তব্য সম্ভবতঃ সম-
সাময়িককালে সুস্পষ্ট ছিল, কিন্তু, বর্তমানে দুর্বোধ্য। এ সম্বন্ধে শার্ঙ্গদেব
যা বলেছেন, তা পড়ে মনে হয় কন্দের প্রচলন ছিল কেবলমাত্র কর্ণাটক
ভাষাভাষীদের মধ্যেই এবং প্রবন্ধটি ছিল তাল-বর্জিত। কিন্তু তাল-বর্জিত
প্রবন্ধ অর্থে এখানে ছন্দহীন আলাপজাতীয় কোন কিছু বোঝাচ্ছে না। বা,
বর্তমানে প্রচলিত বিলম্বিত খেয়াল নামক একজাতীয় গানের প্রতিপাদ্য
“বিস্তার-কর্মের” মতোও কোন পদ্ধতি বোঝাচ্ছে না। কারণ, এ সম্পর্কে
কল্লিনাথ মন্তব্য করেছেন “তালরূপেণ শব্দ্যা গেয় ইত্যর্থ ন তাল 'নয়মশূন্য ইতি
বিবক্ষিতঃ”। অর্থাৎ, কন্দের মধ্যে ছন্দ ছিল। এবং সে ছন্দকে রূপায়িত
করবার জন্য যেমন ছিল সুস্পষ্ট মাত্রার অস্তিত্ব তেমনি তার বিভাগজনিত
আইন-কানুনও ছিল নির্দিষ্ট। হয়তো সে মাত্রার গতি —পারিজাতের বিবৃতি
অনুযায়ী একদা বিলম্বিতই ছিল। কিন্তু ছিল। তবে, সেই মাত্রা সংখ্যার
যোগফলের দ্বারা কোন নির্দিষ্ট তালকে আশ্রয় করবার সুযোগ সুবিধা ছিল না।
বস্তুতঃ কন্দ প্রবন্ধ গাওয়া হতো “আর্যা” নামক ছন্দের “গীতি” নামক একটি
প্রকারের মাধ্যমে। এই “আর্যা-গীতি” ছন্দের মাত্রাসমষ্টি ছিল প্রথমার্ধে
৩০+দ্বিতীয়ার্ধে ৩০=৬০। কিন্তু, এই মাত্রাসমষ্টিকে ছন্দ বজায় রেখে
তালে বদ্ধ করবার উপায় ছিল না। অপরপক্ষে, কন্দ সম্পর্কে রত্নাকরের
বিবৃতি পাঠ করে বর্তমানের “জোড়” বা “আখরের” পরিবেশনা পদ্ধতির
মতো একটা গীতি-রীতির উদাহরণ আমাদের সংস্কারকে আচ্ছন্ন করে।

সঙ্গীত পারিজাত ২৭৯
কিন্তু, কন্দ ছিল স্বয়ংসম্পূর্ণ—জোড় বা আখরের মতো কোন গীতি-পদ্ধতির
বিক্ষিপ্ত অংশ নয়। ৫৫৬-২
শম্পা-তালেন তুরগ-লীলা সা সুখদায়িনী। ৫৫৭-১
শম্পা তালে গঠিত শ্রুতিমধুর গানকে বলে তুরগ-লীলা। ৫৫৭-১
টিপ্পনী : পারিজাতের আমলে তুরগ-লীলা প্রবন্ধটি সম্ভবতঃ শম্পা-তালেই
গাওয়া হতো। কিন্তু, এই শম্পা-তালের মাত্রা বিভাগ ও লয়-ব্যবস্থা কী ছিল
সে সম্বন্ধে আমরা সঠিক কিছু জানতে পারছি না। রত্নাকরে তুরগ লীলা
তুরঙ্গ-লীলা বা হয়-লীলা নামে চিহ্নিত হয়েছে এবং স্বনামধন্য হয়েছে তুরঙ্গ-লীলা বা
হয়-লীল তালের নামেই—শম্পা-তালের ইঙ্গিতমাত্রও কোথাও নেই। তুরঙ্গ-লীলা
তালের লক্ষণ হচ্ছে “বিরামান্তদ্রুতদ্বয়াং দ্রুতৌ তুরঙ্গ-লীলঃ স্যাৎ”। অর্থাৎ
পরের পব দুটি ( ০০-০০ ) দ্রুত মাত্রার পর একটা থেমেই আবার আরও দুটি
দ্রুত মাত্রার অনুষ্ঠান ( ১ + ১ ( ১/২ ) ১ + ১ )।
তুরঙ্গ-লীলা বা হয়-লীলা প্রবন্ধটি ছিল মূলতঃ দ্বিবিধ। গদ্যজ ও পদ্যজ।
কিন্তু, পদ্যজ প্রকারটি ছিল আবার চার রকমের। যথা—
১। প্রবন্ধর প্রথমার্ধটি যখন পদের মাধ্যমে ও হয়-লীলা তালের সাহায্যে
গীত হয় এবং উত্তরার্ধটি যখন গদ্যের অন্তর্গত হয়ে গীত হয় অ-তালে।
২। প্রবন্ধর উত্তরার্ধটি যখন পদের মাধ্যমে ও হয়-লীলা তালের সাহায্যে
গীত হয় এবং প্রথমার্ধটি যখন অ-তালে গীত হয় গদ্যর অন্তর্গত হয়ে।
৩। প্রবন্ধর প্রথম ও উত্তর উভয় অংশই যখন পদের মাধ্যমে ও হয়-লীলা
তালের সাহায্যে গীত হয়।
৪। প্রবন্ধর প্রথমার্ধটির মধ্যে যখন পদ ছাড়াও অধিকন্তু হিসাবে স্বর ও
বিরুদ যুক্ত করা হয় এবং দ্বিতীয়র্ধটির মধ্যে কেবলমাত্র পদের অস্তিত্ব বজায়
রেখে যখন সমস্ত গানটিকেই হয়-লীল তালের সাহায্যে গাওয়া হয়।
তুরঙ্গ-লীল বা হয়-লীল প্রবন্ধ ছিল একটি মেলাপকহীন ত্রিধাতুক
প্রবন্ধ। ৫৫৭-১
তালেন ধ্রুব নাম্না তু গজলীলা প্রতিষ্ঠিতা ॥ ৫৫৭-২
ধ্রুবতালে বিরচিত প্রবন্ধ গানকে বলে গজলীলা। ৫৫৭-২
টিপ্পনী : পারিজাতের গজলীলা প্রবন্ধ ধ্রুবতালে গীত হতো। কিন্তু
রত্নাকরে গজলীল চিহ্নিত হয়েছে গজলীল নামক তালটির জন্যই। গজলীল

২৮০ সঙ্গীত পারিজাত
তালের লক্ষণ হচ্ছে “বিরামান্তমুক্তং লঘু চতুষ্টয়ম্”। অর্থাৎ ( । । । । ’ ) মাত্রা।
এখানে লঘু মাত্রাকে যদি দ্রুত মাত্রার দ্বিগুণরূপে গ্রহণ করা যায় তাহলে
গজলীলের মাত্রা বিভাগ হবে ১+২+২+২+২+( ১ ) বস্তুতঃ গজলীল প্রবন্ধর
যাবতীয় বিধি-ব্যবস্থা ছিল হয়-লীল প্রবন্ধর মতোই, পার্থক্য পরিলক্ষিত হতো
কেবল তালের জন্যই। হয়-লীল ছিল দ্রুত মাত্রাযুক্ত এবং গজলীল ছিল লঘু
মাত্রাযুক্ত। ৫৫৭-২
দ্বিপদীস্যাদ্ দ্বিখণ্ডেন ভবেদ্যস্য-গতি ত্রয়ম্। ৫৫৮-১
যে প্রবন্ধর প্রথমার্ধ ও উত্তরার্ধ উভয় অংশের মধ্যেই তিন রকম গতি
( বিলম্বিত, মধ্য ও দ্রুত ) পরিলক্ষিত হয়, তাকেই বলে দ্বিপদী
প্রবন্ধ। ৫৫৮-১
টিপ্পনী: দ্বিপদী সম্পর্কে পারিজাতকার যা বলেছেন তার সঙ্গে
রত্নাকরের সামঞ্জস্য নির্ণয় করা সহজসাধ্য নয়। শাঙ্গদেব বলেছেন, দ্বিপদী
প্রবন্ধ করুণা নামক তালে রচিত হয়ে থাকে। করুণা তালের লক্ষণ
হচ্ছে “গুরুণা করুণো মতঃ” ( ऽ ) অর্থাৎ গুরুমাত্রাকে যদি এখানে লঘু
মাত্রার দ্বিগুণ রূপে গ্রহণ করা যায় তাহলে করুণার মাত্রা বিভাগ হবে
৪+৪+৪+৪+২+২+২।
নামেই সুপ্রকাশ দ্বিপদী ছিল দুই পাদযুক্ত প্রবন্ধ। কিন্তু, দ্বিধাতুক
ছিল না। এর প্রথমার্ধ ছিল উদগ্রাহ ও দ্বিতীয়া ছিল ধ্রুব। অতঃপর,
আভোগের অনুষ্ঠান করা হতো অবিভক্ত পদ রচনা করে। বলাই বাহুল্য,
গণ, তথা মাত্রাভেদে দ্বিপদীর প্রকারভেদও ছিল আট রকম। যথা, শুদ্ধা, খণ্ডা,
মাত্রা, সম্পূর্ণা, মানবী, চন্দ্রিকা, ধৃতি ও তারা। ৫৫৮-১
পূর্ব্ব পূর্ব্বাক্ষর প্রান্তো যোঽন্ত্যোবর্ণদ্বয়ঃ সচেৎ॥ ৫৫৮-২
উত্তরোত্তর বাক্যাদৌ চক্রবালস্ত দুচ্যতে। ৫৫৯-১
পদের প্রান্তভাগে যে যে অক্ষর সন্নিবেশিত হয়েছে ঠিক সেই সেই অক্ষরযুক্ত
বাক্য যদি পদের শেষের দিকেও পরের পর যোজিত থাকে তাহলে তার নাম
হয় চক্রবাল প্রবন্ধ। ৫৫৮-২—৫৫৯-১
টিপ্পনী: চক্রবাল প্রবন্ধ সম্বন্ধে শাঙ্গদেব কিন্তু বিপরীত কথা বলেছেন।
তিনি বলেছেন, যে প্রবন্ধর একটি পদের শেষের দিকে সন্নিবেশিত কয়েকটি
অক্ষর পরের পর তার পরবর্তী পদগুলির প্রান্তে এসে যোজিত হতে থাকে

সঙ্গীত পারিজাত ২৮১
তাকেই বলে চক্রবাল প্রবন্ধ। এই প্রবন্ধটিও গদ্যজ ও পদ্যজ ভেদে দু রকমের
হতো। কিন্তু, গদ্যজ প্রকারটিও নির্যুক্ত পদ্ধতির অন্তর্গত ছিল; পদ্যজ
প্রকারের মতোই পদ-তালাদির নিয়মানুসারে পরিবেশিত হতো। অর্থাৎ
চক্রবাল ছিল নিরঙ্কুশ তারাবলীজাতীয় নির্যুক্ত প্রবন্ধ।
টীকাকার কল্লিনাথের মতানুযায়ী চক্রবাল ছিল মেলাপকহীন ত্রিধাতুক
প্রবন্ধ, যদিও, এর আভোগ অনুষ্ঠান উদ্গ্রাহ ও ধ্রুবর মতো অপরিহার্য ছিল না।
৫৫৮-২—৫৫৯-১
প্রসঙ্গক্রমে এখানে উল্লেখযোগ্য যে, পারিজাতের অন্তর্গত যে কয়টি
প্রবন্ধের আলোচনা এতক্ষণ করা হলো ( ষাটটি সূড় ও দশটি আলি জাতীয়
প্রবন্ধ ) সেগুলি রত্নাকরে উল্লিখিত প্রবন্ধগুলির সঙ্গে যথাযথভাবে সামঞ্জস্য
রক্ষা করেই পরপর পারিজাতের মধ্যে পরস্ত হয়েছে। অতঃপর দেখা
যাবে, উভয় গ্রন্থের অন্তর্গত আলি ( চব্বিশটি ) ও বিপ্রকীর্ণ ( ছত্রিশটি )
জাতীয় প্রবন্ধগুলির নাম ও সংখ্যার দিক দিয়ে সামঞ্জস্যযুক্ত হলেও তার
পরিচিতির মধ্যে পূর্বেকার মতো ধারা-সঙ্গতি রক্ষিত হয়নি। পারিজাতের
পরবর্তী প্রবন্ধ—অর্থাৎ, আলি জাতীয় প্রবন্ধের একাদশ সংখ্যক প্রতিপাদ্য
"স্বরার্থ" থেকেই প্রবন্ধপরিচিতির ধারার মধ্যে এই অসঙ্গতি পরিলক্ষিত
হয়। ৫৫৮-২—৫৫৯-১
যত্র স্বরাক্ষরেরেব বাঞ্ছিতার্থোঽভিধীয়তে॥ ৫৫৯-২
স স্বরার্থঃ প্রবন্ধঃ স্যাদয় মন্মথ-নামকঃ। ৫৬০-১
যে প্রবন্ধে ষড়জ প্রভৃতি স্বরের সাহায্যেই গানের অভিলক্ষিত অর্থ
পরিবেশিত হয়ে থাকে, তাকেই বলে স্বরার্থ প্রবন্ধ। ৫৫৯-২—৫৬০-১
টিপ্পনী : স্বরার্থ প্রবন্ধের পরিচয় প্রসঙ্গে পারিজাতকার যা বলেছেন তার
সঙ্গে রত্নাকরের সামঞ্জস্য দেখা যায়। শার্ঙ্গদেব বলেছেন, যে প্রবন্ধে কেবলমাত্র
সা-রে-গা-মা প্রভৃতি স্বরাক্ষর পরিবেশনার দ্বারাই শিল্পী তাঁর গীত-কর্মের
অন্তর্নিহিত অর্থকে সুস্পষ্ট করে তোলেন তাকেই বলে স্বরার্থ প্রবন্ধ। নামেই
সুপ্রকাশ, স্বরার্থ কথাটি যোগার্থযুক্ত। এ প্রবন্ধটিও ছিল শুদ্ধ ও মিশ্রভেদে
দু'টি প্রকারে বিভক্ত। শুদ্ধ স্বরার্থ ছিল নিরঙ্কুশ স্বরের দ্বারা গঠিত। কিন্তু,
শুদ্ধ অর্থে এখানে শুদ্ধ স্বর বোঝাচ্ছে না, শুদ্ধ ও বিকৃত দু'রকম স্বরের দ্বারা
গঠিত প্রবন্ধকেই বোঝাচ্ছে। অপরপক্ষে, মিশ্র স্বরার্থ ছিল, স্বরের সঙ্গে অন্যান্য
. ৯

২৮২ সঙ্গীত পারিজাত
অ-স্বর অক্ষরের সংমিশ্রণজাত গীত। স্বরার্থ প্রবন্ধের উদ্গ্রাহ ও ন্যাস স্বর
ছিল অভিন্ন। অর্থাৎ যে স্বরটি উচ্চারণ করে গান আরম্ভ করা হতো ঠিক
সেই স্বরেই ফিরে এসে গানের সমাপ্তি ঘটাতে হতো। অধিকন্তু, এটি ছিল
"ব্যাসাস"-ধর্মী প্রবন্ধ। অর্থাৎ, দুটি (সারে-রেসা) তিনটি (সারেগ',
রেগাসা, গাসারে, রেসাগা, গারেসা)—এইভাবে সাতটি পর্যন্ত স্বর নিয়ে ঘুরিয়ে
ফিরিয়ে যত রকমভাবে সম্ভবপর, স্বরার্থের ভেদ ছিল অসংখ্য। প্রবন্ধটি ছিল
ত্রি-ধাতুক। কল্লিনাথের মতানুযায়ী, স্বরার্থের মধ্যে আভোগ অনুষ্ঠানের
অবকাশ ছিল। অর্থাৎ স্বরার্থকে আভোগহীন ত্রি-ধাতুক প্রবন্ধরূপে পরিবেশন
করা ছিল অপরিহার্য, কিন্তু শিল্পী ইচ্ছা করলে এর মধ্যে আভোগের মতো
একটি অঙ্গও যুক্ত করতে পারতো—যদিও স্বরার্থের আভোগের মধ্যে কী ভাবে
বিরুদ যুক্ত হতো, অথবা আদৌ যুক্ত হতো কিনা সেটা ঠিক বোঝা
যাচ্ছে না। ৫৫৯-২—৫৬০-১
তালেন রহিতা গাথা ধাতুনা সর্বদা যুতা ॥ ৫৬০-২
যে প্রবন্ধ তাল বর্জিত অথচ সর্বদা ধাতুযুক্ত থাকে, তাকেই গাথা প্রবন্ধ
বলে। ৫৬০-২
টিপ্পনী : গাথা প্রবন্ধের পরিচয় প্রসঙ্গে পারিজাতকার যা বলেছেন
তার সঙ্গে গ্রন্থান্তরের সামঞ্জস্য আছে। শার্ঙ্গদেব বলেছেন, গাথা প্রবন্ধ রচিত
হয় আর্যা ছন্দে। অর্থাৎ গাথার মধ্যে আর্যা ছন্দের অস্তিত্ব ছিল; কিন্তু,
সে ছন্দগুলি কোন বিশেষ তালকে আশ্রয় করতে পারতো না। অধিকন্তু,
গাথা প্রবন্ধের পদসংখ্যার মধ্যেও ভেদ ছিল। কোন গাথা হতো ত্রিপদী,
কেউ হতো পঞ্চপদী কেউ বা হতো ষট্ পদী। অনুরূপ, পদের মধ্যে আবার
বর্ণাক্ষরেরও ভেদ ছিল অসংখ্য। বস্তুতঃ গাথা প্রবন্ধের পরিবেশনা পদ্ধতি
ছিল আর্যা প্রবন্ধের মতোই। পার্থক্য এই যে, আর্যা প্রবন্ধ রচিত হতো
সংস্কৃত ভাষায়, কিন্তু গাথা প্রবন্ধের ভাষা ছিল প্রাকৃত। আর্যা প্রবন্ধের মতো
গাথাও ছিল দুটি অংশে বিভক্ত। এর প্রথমার্দ্ধটি ছিল উদ্গ্রাহ ধাতুর
অন্তর্গত এবং গাইতে হতো দু'বার করে। অপরপক্ষে দ্বিতীয়ার্দ্ধটি ছিল ধ্রুব
এবং গাইতে হতো মাত্র একবার। বলা বাহুল্য, আর্যার মতো গাথায় মধ্যেও
বিরুদযুক্ত আভোগ অনুষ্ঠানের অবকাশ ছিল; কিন্তু গান শেষ করতে হতো
আর একবার উদ্গ্রাহ গেয়ে। ৫৬০-২

সঙ্গীত পারিজাত ২৮৩
পদৈঃ স্বরৈঃ পদৈঃ পাটৈঃ পদৈস্তে দ্বিপদৈঃপুনঃ।
বিরুদেন পদৈঃ ক্রৌঞ্চপদাখ্যঃ সোভিধীয়তে॥ ৫৬১
যে প্রবন্ধর দুটি ধাতুর মধ্যে একটিতে স্বর ও অপরটিতে পদ থাকে; বা
একটিতে পাট ও অপরটিতে পদ থাকে; কিংবা, দুটি ধাতুই পদ দ্বারা গঠিত
অথবা, দুটি ধাতুর একটিতে বিরুদ ও অপরটিতে পদ থাকে, তাকেই বলে
ক্রৌঞ্চপদ প্রবন্ধ। ৫৬১
টিপ্পনী : ক্রৌঞ্চপদ প্রবন্ধ প্রসঙ্গে পারিজাতকার যা বলেছেন তার সঙ্গে
রত্নাকরের সম্পর্ক থাকা দুষ্কর। রত্নাকরের ক্রৌঞ্চপদে স্বরের কথা উল্লিখিত
হয়েছে কিন্তু পাট ও বিরুদের অস্তিত্ব সম্বন্ধে ইঙ্গিতমাত্রও নেই। শার্ঙ্গদেব
বলেছেন, ক্রৌঞ্চপদ প্রবন্ধ স্বর ও পদের দ্বারা গঠিত হয়ে গীত হয় প্রতিতালে।
কিংবা প্রবন্ধটি ক্রৌঞ্চপদ ছন্দের মাধ্যমেও পরিবেশিত হতে পারে। প্রতিতালের
লক্ষণ হচ্ছে: “লঘূভৌ প্রতিতালঃ স্যাৎ”। অর্থাৎ, দুটি লঘু ও দুটি দ্রুত (।।০০)
মাত্রার অনুষ্ঠান। অপরপক্ষে, ক্রৌঞ্চপদা ছন্দে, তার গণ-বিভাগ অনুযায়ী
মাত্রা-বিভাগ করলে হয়, s।। + sss + ।।s + s।। + ।।। + ।।। + ।।। + ।।। + s ; কিন্তু,
ক্রৌঞ্চপদ প্রবন্ধ পরিবেশনার ক্ষেত্রে কোন নির্দিষ্ট ছন্দ বজায় রাখাটা অপরিহার্য
ছিল না। এ প্রবন্ধর উদ্গ্রাহ অংশটি ছিল নিবদ্ধাংশ স্বরযুক্ত এবং অপর অংশটি
ছিল পদযুক্ত ধ্রুব। কল্লিনাথের মতানুযায়ী ক্রৌঞ্চপদ ছিল ত্রিধাতুক। অর্থাৎ,
উল্লিখিত দুটি অংশের মধ্যে অপর কোন ধাতু অনুষ্ঠানেরও অবকাশ ছিল।
কিন্তু, গান শেষ করতে হতো স্বর-আচরণ দ্বারা। অর্থাৎ উদ্গ্রাহ অংশের
পুনরাবৃত্তিটিই আভোগরূপে পরিবেশিত হতে পারতো। বলা বাহুল্য, ক্রৌঞ্চপদ
ছিল নির্যুক্ত প্রবন্ধ। ৫৬১
তালেন হংস নাদাৎ তু কলহংসোভিধীয়তে। ৫৬২-১
যে প্রবন্ধ গাইবার সময় তার তালাঘাতজনিত শব্দর মধ্যে হাঁসের ডাকের
মতো ( ছন্দোময় ) শব্দ উত্থিত হয়, তাকেই বলে কলহংস প্রবন্ধ। ৫৬২-১
টিপ্পনী : কলহংসর পরিচয় প্রসঙ্গে পারিজাতকার যা বলেছেন তার
মধ্যে একটা ছন্দর ইঙ্গিত পাওয়া যায়; কিন্তু, সে ছন্দর মাত্রা-ব্যবস্থাটা
কী ছিল তা জানা যায় না। রত্নাকরে দেখা যায়, প্রবন্ধটি কলহংস নামক একটি
বিশেষ ছন্দেই রচিত হতো। টীকাকার কল্লিনাথের মতানুযায়ী কলহংস
ছিল „ হংসাখ্যমেব কলহংসম্”, তথা—কলহংসস্য ছন্দসো লক্ষণং ভারতীঃ।

২৮৪ | সঙ্গীত পারিজাত
জগত্যাং ন কুটভেদেযু মুনিনোক্তম্”। অর্থাৎ, এটি ছিল “জগতী” পর্যায়ের
“হংস” নামক দ্বাদশ অক্ষরযুক্ত ছন্দ এবং এই দ্বাদশ অক্ষরযুক্ত পদের ২, ৪,
৬, ৭, ৯ ও ১২ সংখ্যক অক্ষরগুলি হতো গুরুমাত্রাযুক্ত। হংস বা কলহংস
ছন্দটি ছিল “ঝম্পা” প্রভৃতি তালের আশ্রিত। ঝম্পা তালের লক্ষণ হচ্ছে
“বিরামান্তং দ্রুতদ্বন্দং লঘুস্তথা”। অর্থাৎ, ১½+১½+২ অথবা ৩+৩+৪।
কলহংস প্রবন্ধেরও দুটি প্রকার ছিল—বর্ণজ ও মাত্রিক। বর্ণজ কলহংস
ছিল অ-নিয়মিত গণযুক্ত পদ্যজ। কিন্তু, পদ্যজ ও গদ্যজ তথা বর্ণজ ও মাত্রিক
উভয় প্রকার কলহংসের মধ্যেই মাত্রা সমষ্টির কোন পার্থক্য পরিলক্ষিত হতো
না। এই প্রবন্ধর প্রতি পাদের শেষে স্বর যুক্ত করতে হতো এবং গান শেষ
করতে হতো স্বরানুষ্ঠানের মাধ্যমেই। কলহংসর প্রথমার্ধটি ছিল উদ্গ্রাহ এবং
উত্তরার্ধটি ছিল ধ্রুব। অধিকন্তু, এর মধ্যে আভোগ অনুষ্ঠানেরও অবকাশ
ছিল। সুতরাং, প্রবন্ধটি ছিল ত্রিধাতুক নিযুক্ত প্রবন্ধ। ৫৬১-১
যোহনিবদ্ধো নিবন্ধশ্চ দ্বিপথঃ সোঽভিধীয়তে ॥ ৫৬২-২
যে প্রবন্ধের কিছুটা অংশ নিবন্ধ এবং কিছুটা অংশ অনিবদ্ধ, তাকেই বলে
দ্বিপথ প্রবন্ধ। ৫৬২-২
টিপ্পনী : দ্বিপথ প্রবন্ধ সম্বন্ধে পারিজাতকার যা বলেছেন, তার সঙ্গে
রত্নাকরের কথঞ্চিৎ সামঞ্জস্য আছে। কিন্তু আলোচ্যক্ষেত্রে পাঠককে স্মরণ
রাখতে হবে, নিবন্ধ-অনিবদ্ধ অর্থে এখানে নিযুক্ত-অনিযুক্ত বোঝাচ্ছে। যথার্থ
পরিভাষার পরিবর্তে কেন যে এখানে নিবন্ধ-অনিবদ্ধ কথা দুটি ব্যবহৃত হলো
সে “কেন”-র রহস্য সম্বন্ধে ইতিপূর্বে আমরা একাধিকবার মন্তব্য করেছি।
বস্তুতঃ সংস্কার বড় বালাই। নিবন্ধ-প্রবন্ধ ও নিযুক্ত-প্রবন্ধ যদিও বা অভিন্ন
সংজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত না হয়েও সমধর্মী; কিন্তু অনিবদ্ধ ও অনিযুক্তর পার্থক্য
মূলে। অথচ, বক্তব্য পরিবেশন করবার সময়, যথোচিত ধ্যান-ধারণা থাকা
সত্ত্বেও, বক্তা যে যথার্থ পরিভাষা সম্পর্কে অসাবধান হয়ে পড়েন তার অসংখ্য
প্রমাণ প্রাচীন পুঁথি-পত্রাদির মধ্যে নিহিত আছে। নিযুক্তর বিপরীতে
অনিযুক্তর প্রয়োগ শ্রুতিমধুরও বটে বিজ্ঞান-সম্মতও বটে। কিন্তু, এক্ষেত্রে
নিবন্ধর বিপরীতে অনিবদ্ধর প্রয়োগ শ্রুতিমধুর হলেও বিজ্ঞানসম্মত নয়।
নিবন্ধ প্রবন্ধর মতো অনিবদ্ধও আর এক শ্রেণীর প্রবন্ধ-গীতি। কিন্তু নিযুক্ত
ও অনিযুক্ত হচ্ছে গীতিপদ্ধতি এবং এই দ্বিবিধ পদ্ধতিই নিবন্ধ-প্রবন্ধর মধ্যে

সঙ্গীত পারিজাত ২৮৫
প্রযোজিত হয় থাকে। অপরপক্ষে, অনিবদ্ধ সম্পূর্ণ পৃথক শ্রেণীর প্রবন্ধ
গীতি এবং সে প্রবন্ধ-গীতির সম্যক পরিচয় পরিবেশন করা যে অত্যন্ত
অসুবিধাজনক সে সম্বন্ধে আমরা ৪৯৯ সূত্রের টিপ্পনীতে বিশদভাবেই আলোচনা
করেছি।
দ্বিপথ প্রবন্ধ সম্পর্কে শাঙ্গর্দেব বলেছেন, প্রবন্ধটি গাইতে হয় দ্বিপথ ছন্দ-র
মাধ্যমে। এখানে দ্বিপথ অর্থে দ্বিপথ নামক কোন বিশেষ ছন্দকে বোঝাচ্ছে না,
যে ছন্দর গতি দু'রকম পদ্ধতির ( দ্বা=পথ ) মাধ্যমেই ব্যবহৃত হতে পারে,
আলোচ্যক্ষেত্রে দ্বিপথ ছন্দ অর্থে সেই রকম একটা ছন্দকেই বোঝাচ্ছে—যার
গতি নিযুক্ত ও অনিযুক্ত অর্থাৎ স-তাল ও অ-তাল এই দু'রকম পদ্ধতির
মধ্যেই বজায় থাকতে পারে। মূলত দ্বিপথ প্রবন্ধর চারটি প্রকার ছিল।
যথা :—
১। স্বরযুক্ত গীতি।—যার কিছুটা অংশ ছিল অনিযুক্ত ও কিছুটা অংশ
ছিল নিযুক্ত। অর্থাৎ, এই প্রকারটির সঙ্গে বর্তমানের সরগম-গীতির কিছুটা
সামঞ্জস্য ছিল বলা চলে। বস্তুতঃ, সরগম-গীতির অ-তাল আলাপাংশও
সরগম-এর সাহায্যেই গীত হয়।
২। গমকালিপির দ্বারা অনিযুক্ত।—অর্থাৎ এই প্রকারটি ছিল একালের
অ-তাল রাগালাপের মতো বা গজল গানের “শের”-এর মতো। পার্থক্য
ছিল কেবল বাণীতে। একালের আলাপের বাণীতে অর্থহীন কথা যুক্ত থাকে;
কিন্তু আলোচ্য প্রকারটির বাণীতে অর্থযুক্ত কথা থাকতো—যেমন থাকে গজলের
“শের”-এর পদ্যোচ্চারণ পদ্ধতির মতো।
৩। স্বর ও গমকালিপি উভয়ের দ্বারাই নিযুক্ত।—অর্থাৎ এই প্রকারটির
সব কিছুই তালযুক্ত ছিল। কিন্তু, এই প্রকারটির সঙ্গে পরবর্তীকালের
তারাণা, ত্রিবট, চতুরঙ্গ জাতীয় গানের সামঞ্জস্য ছিল না যেহেতু তারাণা
ত্রিবট জাতীয় গানে অর্থহীন বাণী যুক্ত থাকে।
৪। স্বর ও গমকালিপি—এ দুটির কোনটিই ব্যবহৃত হতো না।—তাহলে
এই প্রকার গীতের মধ্যে কী ব্যবহৃত হতো? বলা বাহুল্য, অনেক চেষ্টা
করেও এই প্রকারটির প্রয়োগজনিত বিষয়বস্তু সম্পর্কে আমরা কোন সিদ্ধান্তে
উপনীত হতে পারিনি।
প্রসঙ্গক্রমে এখানে একথাও উল্লেখযোগ্য যে, দ্বিপথ প্রবন্ধর প্রকারভেদ
প্রসঙ্গে শাঙ্গর্দেব ও তাঁর টীকাকারদ্বয় নিবন্ধ ও অনিবদ্ধ কথা দুটি ব্যবহার

৫৮২ সঙ্গীত পারিজাত
করেছেন। বোঝবার সুবিধার জন্য আমরা নিবন্ধ ও অনিরুদ্ধর পরিবর্তে
নির্যুক্ত ও অনিযুক্ত সংজ্ঞাদুটির প্রয়োগই বাঞ্ছনীয় মনে করেছি।
এখানে প্রশ্ন উঠতে পারে, দ্বিপথ যে "দ্বিবিধ পন্থী” অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে
এবং তার প্রয়োগের মধ্যে অর্থাৎ গমকালাপ্তির মধ্যে যে অর্থযুক্ত বাণী
থাকতোই তার প্রমাণ কী?—প্রমাণ শ্লোকরেই আছে—"দোহ” বা “দোধক”
ছন্দ উদাহরণে। দ্বিপথ প্রবন্ধর অন্তর্গত স্বরাহ্বান অংশেও গমকালাপ্তির
বিষয়বস্তু প্রখ্যাত “দোধক” ছন্দ। মাধ্যমেই পরিবেশিত হতো। এই ছন্দটির
লক্ষণ হচ্ছে “দোধকৌ ভৌ ভগৌ গিতি”। অর্থাৎ, এর গতির মধ্যে যথাক্রমে
তিনটি ভ-গণ ও দুটি গুরু মাত্রাব (১১+১১+১১+১১) অস্তিত্ব থাকতো।
এবং এই ছন্দের ব্যবহৃত ভাষাটি যদি সংস্কৃতর পরিবর্তে প্রাকৃত হতো
তাহলে "দোধক” “দোহ” রূপে চিহ্নিত হতো। অতএব প্রমাণিত হচ্ছে,
দ্বিপথ প্রবন্ধর প্রয়োগজনিত নিবন্ধ বা নির্যুক্ত কি বা অনিবদ্ধ বা অনিযুক্ত
অংশগুলির বাণী অর্থযুক্ত সংস্কৃত অথবা প্রাকৃত ভাষার সাহায্যেই রচিত
হতো এবং পরিবেশিত হতো “দোধক” নামক একটি ছন্দের মাধ্যমে।
মাত্রা ও গণ ভেদে দ্বিপথ প্রবন্ধ আরো ন'টি ভেদ হতো। যথা, সারসী,
ভ্রমরী, হংস, কুরর, চন্দ্রলেখা, কুঞ্জর, ইত ইত্যাদি ও মন্থর।
দ্বিপথ প্রবন্ধ-গান শেষ করা হতো “স্বরাপ্তিব”-এর মাধ্যমে। অর্থাৎ,
স্বর সাচরণের মাধ্যমে। অর্থাৎ, কল্লিনাথের মতানুযায়ী উদ্গ্রাহ, মেলাপক
ও ধ্রুব তো ছিলই, অধিকন্তু তার ভানুযায়ী ধ্রুব এবং সম্ভবতঃ আভোগ
আচরণেরও অবকাশ ছিল। সুতরাং দ্বিপথ ছিল একটি চার ধাতুযুক্ত
প্রবন্ধ। ৫৬১-২
আর্যাবৃত্তেন সঞ্জাতেয় মার্যাহ্বার্থ নামিকা। ৫৬৩ ১
যে প্রবন্ধ আর্যা ছন্দে রচিত তাকেই বলে আর্যা-প্রবন্ধ। এই আর্যা নামটি ও
যোগার্থযুক্ত। ৫৬৩-১
টিপ্পনী: হাতপূর্বে ১৫৬-২ ও ৫৬০-১ সূত্রের অন্তর্গত কন্দ ও গাথা
প্রবন্ধ প্রসঙ্গে আমরা আর্যা ছন্দ সম্পর্কে দু'চার কথা বলেছি। আর্যা-প্রবন্ধ
সম্পর্কে শাঙ্গ দেব যা বলেছেন তা পড়ে মনে হয় প্রবন্ধটি মূলতঃ দুটি ধাতুযুক্ত
ছিল-উদ্গ্রাহ ও ধ্রুব এবং গাওয়া হতো আর্যা ছন্দে। প্রবন্ধটির বৈশিষ্ট্য
ছিল এই যে, এর উদ্গ্রাহ অংশের শেষে স্বর যুক্ত করতে হতো এবং গাহতে

সঙ্গীত পারিজাত ২৮৭
হতো দু’বার করে। অপরপক্ষে ধ্রুব অংশটি গাইতে হতো মাত্র একবার।
শেষে, আর একবার উদ্‌গ্রাহ গেয়ে গান শেষ করতে হতো। কিন্তু, মূলতঃ
দ্বিধাতুক প্রবন্ধ হলেও আর্যার মধ্যে বিরুদযুক্ত আভোগ আচরণেরও অবকাশ
ছিল। অতএব, এটি ছিল একটি ত্রিধাতুক নির্যুক্ত প্রবন্ধ।
বলা বাহুল্য, আর্যা-প্রবন্ধেরও অসংখ্য প্রকার-ভেদ ছিল। কিন্তু, এ সম্বন্ধে
জানতে হলে অনুসন্ধিৎসুদের পক্ষে ছন্দ-বিজ্ঞানের শরণাপন্ন হওয়া কর্ত্তব্য।
৫৫১-১
কথান্তরং যত্র ভাতি সোহয়ং স্যাদ্ ধ্বনিকুট্টনী ॥ ৫৫১-২
যে প্রবন্ধ গানের মধ্যে ধ্রুবায় অর্থের আবরণে অপ্রকাশ্য অর্থান্তর থাকে
তাকেই বলে ধ্বনিকুট্টনী প্রবন্ধ। ৫৫১-২
টিপ্পনী : এই প্রবন্ধটির পরিচয় প্রসঙ্গে পারিজাতকার যা বলেছেন তা
পড়ে মনে হয়, কিছুদিন পূর্বেও, বাংলাদেশে যে কবি-গান তরজা গান, প্রভৃতি
প্রচলিত ছিল তার সঙ্গে ধ্বনিকুট্টনীর স্বধর্ম সামঞ্জস্যযুক্ত। কিন্তু, এসম্বন্ধে রত্নাকর
সম্পূর্ণ অন্য কথা বলেছেন। শাঙ্গদেব বলেছেন, ধ্বনিকুন্টনী হচ্ছে উদ্‌গ্রাহ
ও ধ্রুবধাতুযুক্ত একটি দ্বিধাতুক প্রবন্ধ এবং এর ধাতুদুটিকে পরিবেষণ করতে
হয় বিভিন্ন তালে। অনেক রকম তালের মাধ্যমেই ধ্বনিকুট্টনী পরিবেশিত
হতে পারে, কিন্তু, সে তালগুলি সম মাত্রাসংখ্যার ও সম-বিভাগযুক্ত হওয়া
চায়। অর্থাৎ, গানের মধ্যে তার প্রত্যেকটি পদের মধ্যে তাল-ভেদ করবার
উপায় হত। অবশ্য, উদ্‌গ্রাহ বা ধ্রুব ধাতুর দুটি বা চারটি পদের মধ্যে
দুটি বা চারটি ভিন্ন ভিন্ন তাল যুক্ত করবার উপায় ছিল, কিন্তু অন্ত্য পদের
মধ্যে ভিন্ন তাল যুক্ত করবার অধিকার ছিল না। সর্ব্বোপরি, নিষিদ্ধ ছিল
মঠ্য ও কঙ্কণ তালের প্রয়োগ—যেহেতু, এ দুটি তাল ঢেক্কি (৫৫৬ সূত্র
দ্রষ্টব্য) প্রবন্ধেও ব্যবহৃত হয়ে থাকে এবং ব্যবহারের ফলে ঢেক্কির সঙ্গে
ধ্বনিকুট্টনীর পার্থক্য নির্ণয় করা সুকঠিন হয়ে পড়ে।
ধ্বনিকুট্টনী মূলত দ্বিধাতুক প্রবন্ধ হলেও—ঢেক্কি প্রবন্ধের মতো—এর
মধ্যে বিকল্প ধাতু হিসাবে মেলাপক আচরণেরও অবকাশ ছিল। অতএব,
এদিক দিয়ে দেখতে গেলে ধ্বনিকুট্টনী ছিল ত্রিধাতুক নির্যুক্ত প্রবন্ধ।
৫৫১-২

১৮৮ সঙ্গীত পারিজাত
যত্র স্যাৎ তেন বাহুল্যং ঘট্টঃ স এব সংমতঃ। ৫৬৪।১
যে প্রবন্ধর মধ্যে “তেনক”-এর বাহুল্য পরিলক্ষিত হয়, তাকেই বলে ঘট্ট
প্রবন্ধ। ৫৬৪।১
টিপ্পনী: ঘট্ট প্রবন্ধটি রত্নাকরে ঘট নামে উল্লিখিত হয়েছে। প্রবন্ধটির
পরিচয় প্রসঙ্গে শার্ঙ্গদেব বলেছেন, ঘট প্রবন্ধ রচিত হয় দ্বিপদী ( ৫৫৮ সূত্র
দ্রষ্টব্য) প্রবন্ধর অর্দ্ধাংশমাত্র অবলম্বন করে এবং গান শেষ করতে হয়
“তেনক” অঙ্গ আচরণের দ্বারা। কিন্তু, দ্বি-পদী প্রবন্ধর অর্দ্ধাংশমাত্র অবলম্বন
করে প্রবন্ধ রচনা করার অর্থ এক-পদী তথা একটিমাত্র ধাতুযুক্ত প্রবন্ধর
উপস্থাপনা করা—যা সঙ্গীত-বিজ্ঞানের পরিপন্থী। সুতরাং, বুঝতে হবে,
“তেন” বা “তেনক” অঙ্গ যুক্ত করে গান শেষ করার নির্দেশটি হচ্ছে তাৎপর্য-
পূর্ণ। শার্ঙ্গদেবও “তেনক” অর্থাৎ মাঙ্গলিক অর্থে প্রযোজিত শব্দ যোজনার
দ্বারা গান শেষ করার কথা বলেছেন। এ ছাড়া, টীকাকার কল্লিনাথও মন্তব্য
করে গেছেন—“দ্বিপদী প্রবন্ধর উদ্গ্রাহ অংশটির মধ্যেই “তেন” যুক্ত করে ঘট
প্রবন্ধর অনুষ্ঠান করতে হয়।” অতএব স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে, ঘট-এর ধাতু সংখ্যা
মূলতঃ একটিমাত্র (উদ্গ্রাহ) হলেও তার মধ্যে “তেন” যুক্ত করার ফলে
একাধিক ধাতুর প্রভাব প্রকটিত হয়ে উঠত। অধিকন্তু, দ্বিপদীর মতো, ঘট
প্রবন্ধর মধ্যেও স্বরানুষ্ঠান করবার অবকাশ ছিল। ৫৬৪।১
যজ্জাতং সর্ববৃত্তৈশ্চ বৃত্তং তৎ কথিতং বুধৈঃ॥ ৫৬৪।২
যে প্রবন্ধ সব রকম ছন্দের মাধ্যমেই রচিত হতে পারে, তাকেই বলে বৃত্ত
প্রবন্ধ। ৫৬৪।২
টিপ্পনী: বৃত্ত প্রবন্ধর পরিচয় প্রসঙ্গে পারিজাতকার যা বলেছেন, তার
সঙ্গে রত্নাকরের সামঞ্জস্য আছে। বৃত্ত প্রবন্ধর পরিবেশনা পদ্ধতি সম্পর্কে
রত্নাকরে তিন রকম পদ্ধতির কথা উল্লিখিত হয়েছে। যথা :—
১। শিল্পীর ইচ্ছানুযায়ী যে কোন ছন্দে ও যে কোন তালে বৃত্ত
পরিবেশিত হতে পারে।
২। শিল্পীর ইচ্ছানুযায়ী যে কোন ছন্দে ও যে কোন তালে বৃত্ত
পরিবেশিত হতে পারে, তবে, ছন্দের শেষে স্বর আচরণ
করতে হবে।
৩। বৃত্ত প্রবন্ধ বৃত্ত নামক ছন্দের মাধ্যমেও পরিবেশিত হতে পারে।—
বৃত্ত-ছন্দের অক্ষর সংখ্যা হচ্ছে ২০। গতি-বৈশিষ্ট্য হচ্ছে দ্রুতি

সঙ্গীত পারিজাত ২৮৯
পংক্তির মধ্যে পবের পর একটি গুরু ও একটি লঘু বর্ণর সমাবেশ।—
অর্থাৎ, গানের বাক্যাংশের মধ্যে যদি বৃত্ত-ছন্দব অনুরূপ গুরু ও লঘু
বর্ণর অস্তিত্ব থাকে তবেই সে গানটিকে বৃত্ত-ছন্দব মাধ্যমে পরিবেশন
করা সম্ভবপর হতে পাবে। ৫৬৪।২
যাবদ ভিরক্ষরৈর্জাতা ক্রমাৎ সা মাতৃকাভবেৎ।
সর্ব্বমন্ত্রময়ী যস্মাৎ সর্ব্বসিদ্ধি প্রদায়িনী॥ ৫৬৫
যে প্রবন্ধব ভাষার মধ্যে 'অ' থেকে “ক্ষ” পর্যন্ত (মাতৃকা) অক্ষরগুলি ক্রমিক
নিয়মঅনুসারে বর্তমান থাকে তাকেই বলে মাতৃকা প্রবন্ধ। এই মাতৃকা প্রবন্ধ
সর্ব্বমন্ত্রময়ী, সেই জন্য সর্ব্বসিদ্ধি প্রদায়িনী। ৫৬৫
টিপ্পনী: মাতৃকা প্রবন্ধ সম্পর্কে পারিজাতকার যা বলেছেন তা অবিকল
রত্নাকরের অনুরূপ। এই প্রবন্ধর পংক্তিগুলির মধ্যে “অ” থেকে “ক্ষ” পর্যন্ত
মাতৃকা-অক্ষরগুলি যথাক্রমে অস্তিত্ব বজায় রাখতো। অর্থাৎ, প্রবন্ধটির
প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় চতুর্থ প্রভৃতি পংক্তিগুলির আদিতে যথাক্রমে, অ, আ,
ই, ঈ থেকে আরম্ভ করে “ক্ষ” পর্যন্ত বর্ণমালা ঠিক পবের পর সাজানো
থাকতো। মাতৃকা প্রবন্ধ দু' রকমের হতো। যথা—(১) দিব্য ও (২) দিব্য-
মানুষী। যে মাতৃকা প্রবন্ধ নিরঙ্কুশ দেবভাষা অর্থাৎ সংস্কৃত ভাষায় রচিত
হতো তাকে বলা হতো দিব্য এবং যে মাতৃকা প্রবন্ধ সংস্কৃত ও প্রাকৃত ভাষার
মিশ্রণে রচিত হতো তাকে বলা হতো দিব্য-মানুষী। বলা বাহুল্য, মাতৃকা
প্রবন্ধর প্রকারভেদও ছিল দ্বিবিধ—গদ্যজ ও পদ্যজ। দিব্য বা দিব্য-মানুষী
যে রকমেরই তৃকা-প্রবন্ধই হোক না কেন, ছন্দহীন ও অনিযুক্ত প্রকারের
হলে তাকে গদ্যজ প্রকারের অন্তর্ভূক্ত করা হতো এবং ছন্দবন্ধ নিযুক্ত প্রকারের
হলে সেটি হতো পদ্যজ। পদ্যজ মাতৃকা পরিবেশনার ক্ষেত্রে মার্গ এবং দেশী
দু রকমের তালই প্রযোজ্যিত হতো। অর্থাৎ, দিব্য মাতৃকার ক্ষেত্রে মার্গ
তাল এবং দিব্য মানুষী মাতৃকার ক্ষেত্রে দেশী তাল প্রযোজ্যিত হতো —
হয়তো, এই তালের প্রয়োগ সম্পর্কে কোন নির্দিষ্ট আইন মেনে চলা হতো না;
কিন্তু, গ্রন্থকারের বক্তব্য-ভঙ্গি দেখে আমাদের মনে হয়, তিনি দেবভাষা ও
প্রাকৃত ভাষায় বিরচিত মাতৃকা সম্পর্কেই, মার্গ ও দেশী তাল যোজনার এই
বিধ “ভেদেষ” ইঙ্গিত দিয়ে গিয়েছেন। পরিশেষে, এই মাতৃকা প্রবন্ধর
প্রয়োগ পরিবেশন সম্পর্কে শার্ঙ্গদেব বিশেষভাবে নির্দেশ দিয়ে গিয়েছেন—